Select Page
মাওলানা জালাল উদ্দিন রুমি (রহঃ) জীবনী-বানী-কবিতা { মসনবী শরীফ থেকে }

মাওলানা জালাল উদ্দিন রুমি (রহঃ) জীবনী-বানী-কবিতা { মসনবী শরীফ থেকে }

মসনবী শরীফ থেকে কিছু বানী এবং জালাল উদ্দিন রুমি (রহঃ) এর জীবনী।

নাম ও পিতৃ পরিচয়: নাম মুহাম্মদ, উপাধি জালালুদ্দীন, মওলানা রূম বা রূমী ছিল জনপ্রিয় উপাধি। পিতার দিক দিয়ে তার বংশ নবম ঊর্ধ্বতন পুরুষে গিয়ে হযরত আবুবকর সিদ্দীক (রাঃ)এর সঙ্গে মিলিত হয়েছে। তিনি মায়ের দিক দিয়ে হযরত আলী (রা)-র বংশের সাথে সম্পর্কিত ছিলেন।

মওলানা রূমী (রহঃ)-র পিতা খুরাসানের অন্তর্গত বলখের অধিবাসী ছিলেন। সেখানেই মওলানার জন্ম হয়। মওলানার পিতৃ ও মাতৃকুলে বড় বড় উলামায়ে কিরাম ও শাসকের জন্ম হয়। মওলানার পিতামহ মালেকা-ই-জাহান ছিলেন খাওয়ারিম শাহী বংশােদ্ভূতা। মওলানার পিতার নামও ছিল মুহাম্মদ; উপাধি ছিল বাহাউদ্দীন ওয়ালাদ। তাঁর জন্ম সম্ভবত ৫৪৩ হিজরীতে। হযরত বাহাউদ্দীন ওয়ালাদ জীবনের নব প্রভাতেই সকল জ্ঞান-বিজ্ঞানে পারদর্শিতা অর্জন করেন। তার জ্ঞান ও মর্যাদার অবস্থা ছিল এই যে, খুরাসানের দূর-দূরান্তর এলাকা থেকে জটিল ও কঠিন ফতওয়াদি তাঁরই নিকট আসত। তার মজলিস ছিল শাহী মজলিসেরই অনুরূপ। তার উপাধিও ছিল সুলতানুল-উলামা। তিনি সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত সাধারণ দরূস প্রদান করতেন। জুহরের পর তিনি তার বিশিষ্ট সাথীদের মজলিসে হাকীকত ও মারিফত বর্ণনা করতেন। তিনি সােমবার ও জুমু’আর দিন সাধারণভাবে ওয়াজ করতেন। তাকে সব সময় ভীতিগ্রস্ত ও চিন্তাযুক্ত দেখা যেত।

মওলানার জন্ম ও প্রাথমিক শিক্ষাঃ

বাহাউদ্দীন ওয়ালাদের পুত্র মওলানা জালালুদ্দীন রুমী ৬০৪ হিজরীর ৬ই রবিউল-আওয়াল তারিখে জন্মগ্রহণ করেন। সুলতানুল-উলামা বাহাউদ্দীন ওয়ালাদের বিশিষ্ট মুরীদদের ভেতর একজন উন্নত স্তরের বুযুর্গ ছিলেন সায়্যিদ বুরহানুদ্দীন মুহাক্কিক তীরমিযী। সুলতানুল-উলামা তাঁকেই মওলানার গৃহশিক্ষক (651) নিযুক্ত করেন। ৪-৫ বছর বয়স পর্যন্ত মওলানা তারই প্রশিক্ষণাধীনে ছিলেন। মওলানা তার বুযুর্গ পিতার ইনতিকালের পর এই গৃহশিক্ষকের অভিভাবকত্বে আধ্যাত্মিক সাধনার স্তরগুলাে অতিক্রম করেন।

বলখ থেকে জালাল উদ্দিন রুমির পিতার হিজরতঃ

মওলানার পিতা হযরত বাহাউদ্দীন ওয়ালাদের দাওয়াত ও নসীহত সীমাতিরিক্ত জনপ্রিয়তা লাভ করে এবং তার মুরীদদের সংখ্যাও অস্বাভাবিক হারে বৃদ্বি পায়। ফলে তিনি সমসাময়িক কতক আলিম-উলামা’র ঈর্ষার শিকারে পরিণত হন। হযরত সুলতানুল-উলামা তাঁর ওয়াজে গ্রীক দার্শনিকদের ধর্ম বিষয়ক ধ্যান-ধারণার নিন্দা করতেন। তিনি বলতেন, “কিছু লােক আসমানী গ্রন্থ চিতাতে নিক্ষেপ করেছে এবং দার্শনিকদের অপূর্ণ ও কার্যানুপযােগী বাণীকে জেদের অনুকরণীয় আদর্শে পরিণত করেছে। এসব লােক কি করে নাজাতের আশা করতে পারে?” এরূপ খােলাখুলি নিন্দা জ্ঞাপনের ফলে বাহ্যিক দৃষ্টি সম্পর্ন কিছু সংখ্যক ‘আলিম তার সম্পর্কে চরম আকারের বিদ্বেষ পােষণ করতে থাকে। খাওয়ারিম শাহ মওলানা ওয়ালাদের খুবই ভক্ত ও অনুরক্ত ছিলেন বিধায় এরা তার নিকট মওলানার পিতা সম্পর্কে অভিযােগ উত্থাপনের সুযােগ পেত।

আকস্মিকভাবে একদিন সুলতান মওলানা ওয়ালাদের যিয়ারতে আসেন এবং সেখানে আগন্তকদের সাংঘাতিক ভীড় দেখতে পেয়ে তার সফরসঙ্গী একজন ‘আলিমকে বলেন ? দেখুন, মওলানার দরবারে লােকের কত ভীড়। ঐ আলিম এটাকে একটা মােক্ষম মুহুর্ত জ্ঞান করে বলে ওঠেন। বাদশাহ যদি এর একটা ব্যবস্থা না নেন তাহলে সাম্রাজ্যের ব্যবস্থাপনায় বিশৃঙ্খলা দেখা দেবার আশঙ্কা রয়েছে এবং ঐ অবস্থায় পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। কথাটা বাদশাহর মনে ধরে। তিনি জিজ্ঞেস করে জানতে চান, এমতাবস্থায় তিনি কোন্ পথ অবলম্বন করবেন? উল্লিখিত ‘আলিম সংগে সংগে পরামর্শ দেন রাজকোষ ও দুর্গের চাবিগুলাে মওলানা বাহাউদ্দীন ওয়ালাদ-এর খিদমতে পাঠিয়ে বলুন, “লােক সমাগম ও প্রয়ােজনীয় প্রভাব-প্রতিপত্তি সব কিছুই তাে আপনার হাতে চলে গেছে। শাসন সংক্রান্ত বিষয়াবলীর মধ্যে আমার নিকট শুধু এই চাবিগুচ্ছই রয়েছে। অতএব, এগুলােও আপনার খিদমতে হাযির করা হল।

এ কথা শােনার পর মওলানা বলেন : সুলতানকে গিয়ে আমার সালাম বলবে। এবং এও বলবে, “ধ্বংসশীল এ পৃথিবীর সমস্ত ধনভাণ্ডার, গুপ্তধন, বিরাট দেশ ও তার বিশাল সেনাবাহিনী বাদশাহর পক্ষেই কেবল শােভা পায়। এ সবের সঙ্গে দরবেশের কি সম্পর্ক? আমি হৃষ্ট চিত্তে এখান থেকে চলে যাচ্ছি। বাদশাহ তাঁর লােকজন ও বন্ধু-বান্ধব নিয়ে সুখের সঙ্গে রাজত্ব করুন। জুমু’আর দিন নির্ধারিত ওয়া’জ শেষে আমি চলে যাব।”

বলখের অধিবাসীদের কানে এ খবর গিয়ে পৌছুতেই সারা শহরে বিরাট আন্দোলনের সৃষ্টি হয়। এতে খাওয়ারিম শাহ ভীষণ চিন্তিত হয়ে পড়েন। তিনি দূত পাঠান। অতঃপর রাত্রিবেলা নিজেই উজীর সমভিব্যাহারে গিয়ে মওলানা বাহাউদ্দীন ওয়ালাদকে তাঁর বহির্গমন থেকে বিরত রাখতে চেষ্টা করেন। কিন্তু তিনি তাতে রাজি হননি। শেষাবধি তিনি তাঁকে অনুরােধ জানান, তিনি (মওলানা ওয়ালাদ) যেন এমনভাবে বেরিয়ে যান যাতে কেউ টের না পায়। অন্যথায় বিরাট গােলযােগ দেখা দিতে পারে। মওলানা এ অনুরােধে সম্মত হন। জুমু’আর দিন ওয়াজ করেন এবং শনিবার দিন বলখ থেকে বাগদাদের উদ্দেশে বেরিয়ে পড়েন। এ ওয়াজে তিনি খাওয়ারিযুম শাহকে তাতার সেনাবাহিনীর আগমন সম্পর্কে সতর্ক করে দিয়েছিলেন।

সুলতানুল-উলামা বল্খ থেকে অত্যন্ত শান-শওকতের সাথে রওয়ানা হন। পথিমধ্যে তিনি যে শহরে গিয়েই উপস্থিত হন সেখানকার নেতৃস্থানীয় অভিজাত ব্যক্তিবর্গ ও ‘আলিম-উলামা শহরের বাইরে গিয়ে তাকে অভ্যর্থনা জানান এবং অত্যন্ত সম্মান ও শ্রদ্ধা সহকারে তাকে নিজ নিজ শহরে (ক্ষণকালের জন্য হলেও) নিয়ে আসেন। এভাবে বাগদাদ, মক্কা মু’আজ্জমা, দামেস্কের বিভিন্ন স্থান ঘুরে অবশেষে তিনি মালাতিয়া গিয়ে পেীছেন। আকশিহর নামক স্থানে তিনি চার বছর অবস্থান করেন, পঠন-পাঠনে মগ্ন হয়ে পড়েন। অতঃপর আকশিহর থেকে লারিন্দা গমন করেন। এটি কাউনিয়ার অন্তর্গত একটি স্থান।

মওলানা জালাল উদ্দিন রুমি এবং তার পিতার কাউনিয়ায় উপস্থিতিঃ

রূমের সুলতান আলাউদ্দীন কায়কোবাদের আগ্রহ ও অনুরােধে তিনি ৬২৬ হিজরীতে কাউনিয়ায় আগমন করেন। সুলতান নিজেই তাকে অভ্যর্থনা জানান। মওলানা শাহী মহলের নিকট ঘােড়া থেকে অবতরণ করেন এবং সুলতান অত্যন্ত বিনয় সহকারে তাকে গ্রহণ করেন। মওলানা কাউনিয়া মাদরাসায় অবস্থান করেন। সুলতান তার অধিকাংশ সঙ্গী সহ মওলানার মুরীদ হন। হযরত বাহাউদ্দীন ওয়ালাদ দু’বছর কাউনিয়া অবস্থানের পর ৬২৮ হিজরীতে ইনতিকাল করেন।

এই গােটা সময়টাতেই মওলানা রূমী তাঁর পিতার সঙ্গী ছিলেন এবং জাহিরী ও বাতিনী ইলম তারই নিকট থেকে হাসিল করতে থাকেন। বাইশ বছর বয়সে তনি কাউনিয়া শহরে আগমন করেন এবং এ শহরই তার আবাসস্থল ও সমাধিস্থল ইসাবে পরিচিতি লাভ করে।

সুলতান আলাউদ্দিন কায়কোবাদ এবং জালাল উদ্দিন রুমির সম্পর্কের গভীরতাঃ

সুলতানের গৃহ-শিক্ষক আমীর বদরুদ্দীন গহরতাশ জালালুদ্দিন রুমীর গভীর পাণ্ডিত্য ও খােদাদাদ প্রতিভা লক্ষ্য করে তার জন্য কাউনিয়ায় মাদ্রাসা-ই-খােদাওয়ান্দিগার’ নামক একটি মাদ্রাসা নির্মাণ করেন।

সুলতান আলাউদ্দীন কায়কোবাদ জালালুদ্দিন রুমীকে খুবই সম্মান করতেন এবং তার সঙ্গে শ্রদ্ধাপূর্ণ সম্পর্ক রাখতেন। তিনি কাউনিয়ায় দুর্গ নির্মাণ করলে জালালুদ্দিন রুমীকে সেখানে একদিনের জন্য হলেও বেড়িয়ে যাবার আবেদন জানান।

মওলানা জালালুদ্দিন রুমী দুর্গ পরিদর্শন করে মন্তব্য করেন : “প্লাবন রােধ ও শত্রু প্রতিরােধে এ নিঃসন্দেহে একটি উত্তম ব্যবস্থা। কিন্তু মজলুম ও নিপীড়িত মানুষের তীররূপী কাতর ফরিয়াদ, যা হাজারাে নয়, লাখাে বুরূজ থেকে প্রতিদিন নির্গত হচ্ছে এবং বিশ্বকে ভারাক্রান্ত করে তুলছে, তার প্রতিকার সম্পর্কে কি আপনি কোন চিন্তা করেছেন? ‘আদল ও ইনসাফের দুর্গ নির্মাণ করুন। এর ভেতরই বিশ্বের শান্তি ও নিরাপত্তা নিহিত।”

সুলতান মওলানা জালালুদ্দিন রুমীর এ উপদেশে অত্যন্ত প্রভাবিত হন।

মওলানা বাহাউদ্দীন ওয়ালাদের ইনতিকালের পর তৎকালীন সুলতান, উলামায়ে কিরাম ও নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গের ঐকমত্যে মওলানা জালালুদ্দিন রুমী স্বীয় পিতার স্থলাভিষিক্ত হন। তিনি দস-তাদরীস তথা পঠন-পাঠন, তালকীন (ধর্মোপদেশ) ও ইরশাদের ধারা অব্যাহত রাখেন। তার গৃহশিক্ষক সায়্যিদ বুরহানুদ্দীন মুহাক্কিক তিরমিযী তিরমিয়া চলে গিয়েছিলেন। মওলানা বাহাউদ্দীন ওয়ালাদের ইনতিকালের পর তিনিও কাউনিয়া আগমন করেন। মওলানা রূমী তাঁর মুরীদ হন এবং স্বীয় পিতার অবর্তমানে তারই মাধ্যমে আধ্যাত্মিক সাধনার স্তরগুলাে অতিক্রম করেন। নয় বছর তিনি তাঁর সাহচর্যে কাটান। ৬৩৭ হিজরীতে সায়্যিদ বুরহানুদ্দীন ইনতিকাল করেন।

মওলানা জালালুদ্দিন রুমীর শিক্ষা সফর ও কর্মব্যস্ততাঃ

৬৩০ হিজরীতে মওলানা অধিকতর শিক্ষা লাভ ও আধ্যাত্মিক ফয়েয হাসিলের জন্য সিরিয়া (শাম) সফর করেন এবং হলব (আলেপ্পো)-এ অবতরণ করেন। সুলতান সালাহুদ্দীন তনয় আল-মালিকুজ-জাহির সে যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আলিম কাশী বাহাউদ্দীন ইবনে শাদ্দাদের আন্দোলনের ফলে ৫৯১ হিজরীতে অনেকগুলাে বড় মাদ্রাসা তৈরী করেছিলেন। এর ফলে হলবও দামেস্কের মত জ্ঞান চর্চার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল।

হলব-এ এসে মওলানা জালালুদ্দিন রুমী মাদ্রাসা-ই-হালাবিয়ায় অবস্থান নেন এবং কামালুদ্দীন ইবনুল-আদীম থেকে উপকৃত হন। মওলানা জালালুদ্দিন রুমী যদিও এখানে বিদ্যার্জনে ব্যাপৃত ছিলেন, তবু সিপাহসালারের ভাষায় যে সব জটিল সমস্যার সমাধান কেউ করতে পারত না, তার সমাধান তিনিই করে দিতেন এবং সে সবের এমন সব যুক্তি পেশ করতেন যা কোন কিতাবে লিপিবদ্ধ ছিল না। হলব থেকে মওলানা জালালুদ্দিন রুমী দামেস্কে গমন করেন। সেখানে তিনি মাদ্রাসা-ইমুকাদ্দাসিয়ায় অবস্থান করেন। দামেস্কে সে সময় ‘আলিম-উলামার ভীড় লেগেই থাকত। সিপাহসালার লিখেছেন যে, দামেস্কে শায়খ মুহয়িউদ্দীন ইবনে ‘আরাবী, শায়খ সাদুদ্দীন হামুবী, শায়খ উছমান রুমী, শায়খ আওহানুদ্দীন কিরমানী ও শায়খ সদরুদ্দীন কাওনবীর সাহচর্যে মওলানা জালালুদ্দিন রুমী তার সময় অতিবাহিত করতেন।

এখানে হাকীকত ও মা’রিফত বিষয়ে তাদের পরস্পরের মধ্যে আলাপ-আলােচনা হত। ৬৩৪ কিংবা ৬৩৫ হিজরীতে মওলানা জালালুদ্দিন রুমী দামেস্ক থেকে ফিরে এসে কাউনিয়ায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। সায়্যিদ বুরহানুদ্দীনের ইনতিকালের (৬৩৭ হি.)পর পাঁচ বছর পর্যন্ত তিনি বাহ্যত ‘আলিম-উলামার বেশ ধারণ করে সার্বক্ষণিকভাবে জ্ঞান চর্চা ও শিক্ষা দান কর্মে ব্যাপৃত থাকেন। ৬৩৮ হিঃ তে শায়খ মুহয়িউদ্দীন ইবনে আরাবী ইনতিকাল করেন। তার চারপাশে জ্ঞান জগতের যে সব উজ্জ্বল নক্ষত্রের সমাবেশ ঘটেছিল তাঁদের অধিকাংশই কাউনিয়ায় এসে সমবেত হয়েছিল। এঁদের মধ্যে শায়খ সদরুদ্দীনও অন্যতম।

প্রাচ্য ভূখণ্ডের দিক থেকে যে সৰ আলিম-উলামা ও বুযুর্গ সেখানকার ধ্বংসযজ্ঞের কারণে পেরেশান হয়ে রূমের দিকে রওয়ানা হতেন তাদের বেশির ভাগই পথিমধ্যে কাউনিয়াকেই তাদের আবাস ও আশ্রয়স্থল হিসাবে গ্রহণ করতেন। এভাবে কাউনিয়া সে যুগে মদীনাতুল-উলামা’য় (জ্ঞানীদের শহর) পরিণত হয়। এসব আলিম-উলামার মধ্যে মওলানা জালালুদ্দিন রুমীর স্থান ছিল সবার ঊর্ধ্বে। সে যুগে মওলানা ঐ সব কাজই করতেন যা সাধারণত আলিম-উলামা করে থাকেন অর্থাৎ পঠন-পাঠন, ওয়াজ-নসীহত, ফতওয়া প্রদান ইত্যাদি। মওলানা জালালুদ্দিন রুমী বেশির ভাগ সময় শিক্ষা দান কার্যে ব্যাপৃত থাকতেন। তাঁর নিজের মাদরাসায়ই চার শ’র বেশি ছাত্র ছিল।

পঠন-পাঠন ছাড়াও মওলানা জালালুদ্দিন রুমীর দ্বিতীয় যে কাজটি করতেন তা হ’ল ওয়াজ বা বক্তৃতা দান। ফতওয়া দান ছিল তার স্থায়ী কর্মের অন্তর্গত। বায়তু’ল-মাল থেকে মওলানার জন্য এক দীনার নির্ধারিত ছিল। একে তিনি সেই ফতওয়া প্রদানের পারিশ্রমিক হিসাবেই গণ্য করতেন। এ ব্যাপারে তিনি এতটা কঠোর ছিলেন যে, যখন তিনি চরম অভাব-অনটনে পতিত হতেন এবং ইলমের মজলিসে গভীরভাবে ডুবে থাকতেন তখনও তাঁর নির্দেশ ছিল, যে মুহূর্তেই কোন ফতওয়া আসবে তাৎক্ষণিকভাবে যেন তাঁকে খবর দেয়া হয়। দোয়াত-কলম সব সময় তাঁর সাথেই থাকত।

অবস্থার বিপ্লবাত্মক পরিবর্তনঃ

৬৪২ হিজরী অবধি তার ঐ একই অবস্থা ছিল। অতঃপর এমন সব ঘটনার সূত্রপাত হয় যার ফলে তাঁর জীবনে এক বিপ্লবাত্মক পরিবর্তন আসে এবং তিনি মওলবী জালালুদ্দীন কাওনবী থেকে ‘মওলানা-ই-রূমী’তে রূপান্তরিত হন। শাম্স-ই-তাব্রিজী-এর সাথে মােলাকাত এবং তাঁর সত্তার সঙ্গে আসক্তি ও বিলুপ্তির ফলে মওলানার এই অবস্তা ঘটেছিল। তিনি স্বয়ং বলেছেন :

مولوی هرگزنه شد مولائے روم + تاغلام شمس تبریزی نه شد

(রুমী) মওলভী ততক্ষণ পর্যন্ত মওলানা রূম হতে পারেনি যতক্ষণ পর্যন্ত না সে শাম্স তাবরীযীর গােলামী কবুল করেছে।

শামস তাবরীযঃ

শামস তাবরীয (মুহাম্মাদ ইব্‌ন আলী ইব্‌ন মালিকদাদ)-এর দেশ ও বংশ পরিচয় কি? তাঁর বিরুদ্ধবাদীরা অনেক অপবাদই তাঁর প্রতি আরােপ করেছিল। তন্মধ্যে একটি অপবাদ হ’ল তার (শাম্স তাবরীযের) বংশ-পরিচয় অজ্ঞাত।

نے در و اصل ونے نسب پیداست می نه دانیم هم که اوز کجاست

প্রকৃত ব্যাপার এই যে, শৈশব থেকেই তিনি উন্নততর যােগ্যতা, প্রেমের আবেগ ও মুহব্বতের অধিকারী ছিলেন। মানাকি ‘বু’ল-আরিফীন’ নামক গ্রন্থে স্বয়ং তাঁর মুখেই বর্ণিত আছে যে, তিনি যখন সাবালকে উপনীত হননি, তখন থেকেই তিনি মহানবী (সা)-এর ‘ইশক-এ এমন মত্ত হয়ে থাকতেন যে, তিরিশ চল্লিশ দিন পর্যন্ত তাঁর আহার গ্রহণের ইচ্ছেটুকুও হত না।

জাহিরী বিদ্যা অর্জন সমাপ্তির পর তিনি শায়খ আবু বকর সিল্লাবাফের নিকট মুরীদ হন। কতক বর্ণনায় জানা যায় যে, তিনি শায়খ ‘ইযুদ্দীন সনজাসীর মুরীদ ছিলেন। কতক বর্ণনায় অন্য নামের উল্লেখ আছে। হতে পারে যে, তিনি এঁদের সবার কাছ থেকেই ফয়েয লাভে ধন্য হয়েছিলেন।

এতসব সত্ত্বেও যখন তিনি তৃপ্ত হলেন না, তখন আল্লাহওয়ালা মানুষের সন্ধানে চতুর্দিকে ঘুরতে শুরু করলেন। তিনি এরূপ সাধারণ বেশে সফর করতেন যে, স্বয়ং তাঁর বিলায়েত ও কামালিয়ত সম্পর্কে কেউ কিছু জানতেই পারত না। তিনি কালাে পশমী কম্বল পরিধান করতেন এবং যেখানেই যেতেন সাধারণ সরাইখানায় অবস্থান করতেন এবং দরােজায় দামী তালা ঝুলিয়ে দিতেন, যাতে লােকে তাকে ধনী ব্যবসায়ী মনে করে। ঘরের ভেতর চাটাইয়ের বিছানা ছাড়া আর কিছুই থাকত না।

সফরের আধিক্যের কারণে লােকে তাকে ‘শামুস পক্ষী” বলে ডাকতে শুরু করেছিল। তিনি তাবরী, বাগদাদ, জর্দান, রূম, কায়সারিয়া ও দামেস্কে সফর করেন। তিনি পায়জামার ফিতা বুনে বিক্রি করতেন এবং এটাই ছিল তাঁর জীবিকা অর্জনের মাধ্যম। খাদ্য গ্রহণের অবস্থা এ রকম ছিল যে, দামেস্কে তিনি যে এক বছর অবস্থান করেন তখন সপ্তাহে এক পেয়ালা যবাইকৃত পশুর মাথার তৈরি শুরুয়া- তাও কোনরূপ তেল ছাড়া পান করতেন। তার সাহচর্যের বােঝা বহন করতে পারে এমন কাউকে তিনি পেতেন না। অধিকাংশ সময় তিনি দু’আ করতেন : প্রভু হে! আমাকে এমন কোন সঙ্গী জুটিয়ে দাও যে আমার সাহচর্যের ভার বইতে পারে।

শামস তাবরীষীর সঙ্গে জালালুদ্দিন রুমীর সাক্ষাৎ ও বিরাট পরিবর্তনঃ

মওলানা শামস তাবরীষীর শায়খ তাকে রূম যাবার নির্দেশ দেন এবং বলেনঃ সেখানে একটি দগ্ধ অন্তরের সাক্ষাৎ পাবে; তাঁকে আলােকিত করে এস। ৬৪২ হিজরীর ২৬শে জুমাদা আল-উখরার সােমবার তারিখে তিনি কাউনিয়া পৌছেন। এবং সেখানে চিনি বিক্রেতাদের মহল্লায় অবস্থান করেন। একদিন দেখতে পেলেন, মওলানা পশুপৃষ্ঠে সওয়ার হয়ে আসছেন আর তার চারপাশের লােকেরা তার জ্ঞান-ভাণ্ডার থেকে উপকৃত হয়ে চলেছে। শাম্স অগ্রসর হয়ে জিজ্ঞেস করলেন? রিয়াযত ও জ্ঞানের উদ্দেশ্য কি?

মওলানা জালাল উদ্দিন রুমি বললেনঃ আদব ও শরীয়ত সম্পর্কে জ্ঞাত হওয়া। শাম্স তাবরীযী বললেন : না, আসল লক্ষ্যে না পৌছা পর্যন্ত এগিয়ে যাওয়া। এরপর তিনি হাকীম সানাঈ-এর নিম্নোক্ত কবিতাটি আবৃত্তি করেন :

علم كزنو ترانه بستاند + جهل ازاں علم به بود بسیار

যে জ্ঞান তােমার অহংবােধকে তােমা থেকে ছিনিয়ে নিতে পারে না, সে জ্ঞানের চেয়ে মূর্খই উত্তম।

মওলানা জালাল উদ্দিন রুমি এতে বিস্মিত হন। অপরদিকে শাম্স এর তীর লক্ষ্যভেদে সক্ষম হয়। মওলানা জালাল উদ্দিন রুমি তাকে সংগে করে নিজের ঘরে নিয়ে আসেন এবং আফলাকীর ভাষায় চল্লিশ দিন পর্যন্ত তাঁর সঙ্গে এক কামরায় থাকেন। ঐ সময় উক্ত কামরায় কারাে প্রবেশাধিকার ছিল না। সিপাহসালার বলেনঃ ছয় মাস পর্যন্ত সালাহউদ্দীন যরকুবের কামরায় এ দু’জন বুযুর্গ একান্তে অতিবাহিত করেন। শায়খ সালাহউদ্দীন ব্যতিরেকে আর কারােরই উক্ত কামরায় প্রবেশাধিকার ছিল না।

শাম্স তাবরীযী-এর সাক্ষাৎ মওলানা জালাল উদ্দিন রুমিকে এক নতুন জীবন, নতুন চেতনা ও নতুন জগত দান করে। মওলানা জালাল উদ্দিন রুমি নিজেই বলেন :

شمس تبریزی بما راه حقیقت بنمود +ماز فيض قدم اوست که ایمان داریم

শামস তাবরীয আমাদেরকে হাকীকতের রাস্তা দেখিয়েছেন। এটা তারই পদযুগলের ফয়েয যে, আমরাও আজ ঈমানের অধিকারী।

এতদিন পর্যন্ত মওলানা ছিলেন সে যুগের উস্তাদ ও শ্রেষ্ঠতম বুযুর্গের আসনে আসীন। ছাত্র-শিক্ষক, জ্ঞানী-গুণী, সূফী-দরবেশ সবাই ছিল তাঁর অনুগ্রহপ্রাথী, তার থেকে উপকৃত হতে আগ্রহী। কিন্তু আজ তিনি নিজেই অনুগ্রহপ্রার্থী আর শামস তাবরীয তাঁকে ইরশাদ ও ফয়েয প্রদানের মালিক। মওলানার সাহেবজাদা সুলতান ওয়ালাদ বলেন :

شیخ استاذ گشت نو آموز + درس خواندی بخدمتش هر روز گرچه در علم فقر کامل بود + علم نو بود کو بو به نمود

‘আলিমদের শায়খ ও উস্তাদ নতুন করে শিক্ষার্থী সাজলেন; শাম্স-ই তাবরীযীর খেদমতে তিনি দৈনিক পাঠ গ্রহণ করতেন। দরবেশীর ইলমে তিনি কামিল থাকা সত্ত্বেও তাঁকে একটি নতুনতর ইলম প্রত্যক্ষ করান।

খােদ মওলানা (র) তার নিজের মুখেই এ সম্পর্কে বলেন :

زاهد بودم ترئه گویم کردی * سرفتنه بزم و باده جویم کردی سجاده نشين بار قاره بودم + بازیچه کو دکاں گویم کردی

আমি ছিলাম দরবেশ, (তিনি) আমাকে গায়ক বানিয়ে দিলেন, বানিয়ে দিলেন মদ্যপায়ীদের সর্দার ও মদখাের মাতাল। আমি ছিলাম মর্যাদাবান গদ্দীনশীন পীর; তিনি আমাকে অলি-গলিতে ক্রীড়ারত শিশুদের খেলনায় পরিণত করলেন।

ফল দাঁড়াল এই যে, শামস-ই-তাবরীযীর সঙ্গে সাক্ষাৎ হবার পর থেকে মওলানা শিক্ষা দান, ওয়াজ-নসীহত সব কিছুই ছেড়ে দিলেন। তিনি বলেছেন :

عطار دوار دفتر پاره بودم + زدشت او زمانی می نشستم چو دیدم نوح پیشانی ساقی + شدم مست و قلم هارا شکستم

আমি বুধ গ্রহের মত প্রতিটি মজলিসের আলােচ্য বিষয় ছিলাম। এবার অনেক কাল যাবত তার ময়দান থেকে বসে পড়েছি। নূহ (আ)-এর মত ললাটধারী পানীয় পরিবেশনকারী (সাকী)-কে যখন দেখতে পেলাম তখন পাগল হয়ে গেলাম এবং কলমগুলাে ভেঙে ফেললাম।

ব্যাপক আলােড়ন সৃষ্টিঃ

মওলানা যখন এভাবে অন্যান্য সব সম্পর্ক ছিন্ন করে প্রতিটি কথায় শামস তাবরীযীকে অনুসরণ ও অনুকরণ করতে লাগলেন, তখন বিষয়টি মওলানার শাগরিদ ও মুরীদদের নিকট ভীষণ পীড়াদায়ক ঠেকল। অতঃপর এ নিয়ে চারদিকেই আলােড়ন ও গুঞ্জরণের সৃষ্টি হল।

শাম্স-এর অবস্থা সম্পর্কে জনসাধারণ তেমন ওয়াকিফহাল ছিল না। মুরীদদের ধারণা, “আমরা বছরের পর বছর ধরে মওলানার খেদমতে কাটিয়ে দিলাম, মওলানার কারামত দেখলাম, তার খ্যাতি চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ল। অথচ আজ কোথা থেকে নাম-গােত্রহীন এক লােক এসে তাকে আমাদের মাঝ থেকে এমনভাবে ছোঁ মেরে ছিনিয়ে নিয়ে গেল যে, তার চেহারা দেখার সুযােগ থেকেও আমরা বঞ্চিত হয়ে গেলাম। তার লেখাপড়া, শিক্ষা দান, ওয়াজ-নসীহত সবই বন্ধ হয়ে গেল। এ লােক নিঃসন্দেহে কোন যাদুকর হবে, নয়ত প্রতারক। অন্যথায় তার কী সাধ্য যে, পর্বতসম এই ব্যক্তিত্বকে খড়কুটোর মত ভাসিয়ে নিয়ে যায়।”

মােট কথা, সবাই শামস তাবরীযীর দুশমনে পরিণত হল। তারা মাওলানার সামনে কিছু বলতে পারত না বটে, তবে তিনি একটু এদিক-সেদিক গেলেই তারা শামসকে ভাল-মন্দ বলত এবং রাত-দিন এই ধান্ধায় ফিরত কখন ও কিভাবে হযরত শামস তাবরীযীকে সেখান থেকে বিতাড়িত করা যায় যাতে করে তারা পূর্বের মত মওলানার সাহচর্য লাভ করে ধন্য হতে পারে।

শাম্স-এর অন্তর্ধান

হযরত শামসুদ্দীন এসব লােকের গােস্তাখী নীরবে সইতে থাকেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, মওলানার প্রতি ভক্তি-শ্রদ্ধার কারণেই এসব লােক এভাবে মনঃক্ষুন্ন। কিন্তু তাদের আচরণ যখন সীমা লঙ্ন করল এবং তিনি বুঝতে পারলেন যে, এবার গােলযােগ সৃষ্টির সমূহ আশংকা রয়েছে, তখন তিনি একদিন নীরবে নিঃশব্দে কাউনিয়া পরিত্যাগ করলেন। আফলাকী তাঁর এই প্রথম অন্তর্ধানের তারিখ ৬৪৩ হিজরীর ১লা শাওয়াল রােজ বৃহস্পতিবার বলে উল্লেখ করেছেন। সে হিসাবে প্রথমবার তিনি সােয়া বছরের মত কাউনিয়ায় অবস্থান করেন।

শাম্স-এর বিচ্ছেদ ছিল মওলানা জালাল উদ্দিন রুমীর কাছে অত্যন্ত কষ্টকর ও পীড়াদায়ক। মুরীদেরা যা ভেবেছিল– ঘটল তার উল্টোটি। শাম্স চলে যাবার পর মওলানা জালাল উদ্দিন রুমী তাদের প্রতি কী মনােযােগ দেবেন, আগে যেটুকু দিতেন এখন তাও ছেড়ে দেবার উপক্রম হল। কিছু সংখ্যক নাদানের কারণে সৎ ও বিশ্বস্ত লােকেরাও মওলানার সাহচর্য থেকে এভাবে বঞ্চিত হতে হল।

মওলানা জালাল উদ্দিন রুমীর অস্থিরতা এবং শাম্স তাবরীযী-এর প্রত্যাবর্তনঃ

সিপাহসালারের বর্ণনা মুতাবেক দামেস্কও থেকে মওলানার নামে শামসুদ্দীনের পত্র না আসা অবধি এই বিচ্ছেদ ও বিচ্ছিন্নতা বজায় ছিল। পত্র প্রাপ্তির পর মওলানার অবস্থার কিছুটা পরিবর্তন ঘটে এবং শাম্স-এর প্রতি আগ্রহ ও প্রেম তাকে ‘সামা’র প্রতি আকৃষ্ট করে তােলে। তিনি সে সব লােকের প্রতি আগের মতই নেক নজর অব্যাহত রাখেন যারা শামস-এর বিরুদ্ধে কোনরূপ অসদাচরণ করেনি। ঐ সময় মওলানার জালাল উদ্দিন রুমী হযরত শাম্স-এর খেদমতে পত্রাকারে চার লাইন কবিতা লিখে পাঠান। এতে তিনি নিজের অস্থিরতা এবং তাঁর প্রতি অপরিসীম আগ্রহের কথা ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন :

ایها النور في الفواد تعال + غابة الوجد والمراد تعال ايها السابق الذي سبقت + منك مصدوقة الوداد تعال چوں بیانی زهی کشاد و مراد + چوں نیانی زهے کسا نعال

انت كالشمس اذ دشت ونات + با قريبا على البعد تعال

ওহে আলাে! আমার হৃদয়ে এস; হে আমার প্রেম ও লক্ষ্যের শেষ গন্তব্যস্থল! এস। এস, ওহে অগ্রগামী! তােমার দিক থেকে সত্যিকার প্রেম তাে আগেই প্রকাশ পেয়েছে; অতএব আর দেরী নয়, এস। যখন তুমি আসবে তখন তা হবে বিরাট বিজয় ও সাফল্য। যদি তুমি না আস, তাহলে সেটা হবে বিরাট ক্ষতি; অতএব তুমি এস। তুমি তাে সূর্যের মত দীপ্তিময়। চাই কাছে থাক আর দূরেই থাক। হে দূরবর্তী থেকেও নিকটবর্তী, এস।

ইতিমধ্যে গােলমাল কিছুটা স্তিমিত হয়ে যায়। অবকাশ ও প্রসন্নতা লাভের পর লোকেরা শাম্স-এর বিরােধিতা পরিত্যাগ করে। মওলানা শামসকে ফিরিয়ে আনবার উপায় খুঁজে বের করেন। পুত্র সুলতান ওয়ালাদকে ডেকে বলেনঃ তুমি আমার পক্ষ থেকে শাহ-ই-মকবুলের দিকে ছুটে যাও এবং এটা নিয়ে গিয়ে তার পায়ের ওপর উৎসর্গ কর-আর আমার হয়ে বল, যে মুরীদেরা গােস্তাখী করেছিল তারা সকলেই তওবা করেছে এবং আশা করছে, যেসব অন্যায় ও ত্রুটি হয়ে গেছে তা যেন মাফ করে দেওয়া হয়। এবার দয়া করে তিনি যেন এদিকে পা ফেলেন। তিনি তার হাত দিয়ে যে চিঠি লিখেছিলেন তা ছিল নিম্নরূপ :

که از آن دم که تو سفر کردی + از حلاوت جدا شدیم چو موم همه شب چو شمع می سوزیم + ز آتشش جفت و زا أنگبين محروم در فراق جمال تو مارا + جسم و پران و جان از و چون پوم های منان وابدیں طرف پرتاب + زفت کن پیل عیش را خرطوم به حضورت سماع نیست حلال + همچو شیطان طرب شده مرجوم

و يك غزل ہے تو هیچ گفته نشد + نارسیداں مشرفه مفهوم پس بذوق سماع نامه نو + غزل پنج و شش بشد منظوم شام از تو چو صبح روشن باد + اے بنو فخر شام و ارمن وروم

যে মুহূর্তে তুমি এখান থেকে চলে গেছ, আমি মােমের মত গলে গেছি, বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছি জীবনের সকল স্বাদ ও আহলাদ থেকে। সারা রাত আমি মােমবাতির মত জ্বলতে থাকি; আগুনের সঙ্গে সাক্ষাৎ ঘটলেও মধুর স্বাদ থেকে বঞ্চিত আমি।। তােমার সৌন্দর্য সুখ থেকে বঞ্চিত হবার কারণে আমার দেহ-মন পেঁচকের মত বিরান হয়ে গেছে। একটু এদিকে তােমার অশ্বের গতি ফেরাও; আমার জীবনের হস্তীশুণ্ডকে একট ম্যৰূত কর। তােমার উপস্থিতি ব্যতিরেকে সামা’র মজলিস বৈধ নয়; আমার জীবন মালঞ্চের ওপর শয়তানসদৃশ বােঝা চেপে বসেছে। তােমা ব্যতিরেকে কোন গীতি গীত হয়নি, এমতাবস্থায় মুবারক লিপি এসে পেীছল। তােমার পবিত্র লিপি শােনার আনন্দে পাঁচ-ছ’টি কাব্য লিখে ফেলেছি। তােমার সন্দর্শনে আমার সন্ধ্যাও যেন ভােরের ন্যায় আলােকিত হয়ে ওঠে। ওহে। যার সত্তার জন্য শাম, আরমান ও রােম গর্বিত।

সুলতান ওয়ালাদ হযরত শামসকে অত্যন্ত সম্মান ও শ্রদ্ধার সঙ্গে কাউনিয়া নিয়ে আসেন।

শাম্স-এর দ্বিতীয় দফা অন্তর্ধানঃ

হযরত শাম্স-এর কাউনিয়া প্রত্যাবর্তনে মওলানার খুশির সীমা ছিল না। যে সমস্ত লােক গােস্তাখী করেছিল তারা সবাই এসে ক্ষমা প্রার্থনা করে। বেশ কিছুকাল উভয়ের এই নির্মল সাহচর্য অব্যাহত থাকে। ইতিমধ্যে হযরত শামস-এর সঙ্গে মওলানার ঐক্য ও ঘনিষ্ঠতা পূর্বের তুলনায় আরাে বৃদ্ধি পায়। কিন্তু দুঃখের বিষয়, এ সুখ ও সৌভাগ্য বেশি দিন টিকল না। আবার আবিলতা ও মালিন্যের উপকরণ জমে উঠতে লাগল। মওলানার কামরার নিকটই সুফফা দালানের একদিকে হযরত শীস অবস্থান করতেন। শামস সেখানে তাঁর স্ত্রীসহ বসবাস করতেন। কাউনিয়াতেই তিনি এ বিয়ে করেন। মওলানার মেজোপুত্র (চিল্পী ‘আলাউদ্দীন) যখন মওলানার ঘরে যেতেন তখন এদিক দিয়েই যেতেন। কিন্তু এদিক হয়ে তার এ যাওয়া-আসা মওলানা শামসুদ্দীন তাবরীযী পছন্দ করতেন না। তিনি কয়েকবার তাকে অত্যন্ত স্নেহ-কোমল কণ্ঠে কথাটি বােঝাবার চেষ্টা করেন, কিন্তু তা উল্টো ‘আলাউদ্দীনের মনঃকষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। হযরত শামসুদ্দীন সুলতান ওয়ালাদকে বেশি স্নেহ করেন- এটাও ছিল তার মর্মপীড়ার অন্যতম কারণ। আলাউদ্দীন বিষয়টি নিয়ে অন্যদের সঙ্গেও আলােচনা করেন। যে সমস্ত লোক এ ধরনের একটি সুযােগের অপেক্ষা করছিল তারা এর ওপর আরাে একটু রঙ চড়ায়। তারা বলতে থাকে : বেশ তাে লােক! কোথাকার কে, জানা নেই- শােনা নেই,হঠাৎ উড়ে এসে জুড়ে বসেছে। মওলানার ঘর দখল করে তার ছেলেকেই ঘরে আসতে দিচ্ছে না!

হযরত শামসুদ্দীন কেবল বিনয় ও সহিষ্ণুতার কারণে এতদিন এ বিষয়ে মওলানার সঙ্গে কোন আলাপ করেননি। কিন্তু পরিস্থিতি যখন সীমা অতিক্রম করল তখন তিনি সরাসরি সুলতান ওয়ালাদকে বললেন : ঐসব লােকের আচরণে এটা বুঝতে পারছি যে, এবার এমনভাবে অন্তর্ধান করতে হবে যাতে কেউ আর আমার খোজ না পায়। মওলানার কতক গফল থেকে পরিষ্কার প্রতিভাত হয় যে, তিনিও এ ব্যাপারে অবহিত ও আশংকিত ছিলেন এবং কবিতার মাধ্যমে এর থেকে বিরত হবার জন্য শায়খের কাছে অনুনয়-বিনয় করেছিলেন।

যা-ই হােক, হযরত শামসুদ্দীন-এর বিরুদ্ধে লােকের মন-মানসিকতা পুনরায় তুঙ্গে ওঠে। তিনি নিজেও অতিষ্ঠ হয়ে পড়েন। একদিন দেখা গেল যে, তিনি অকস্মাৎ অন্তর্ধান করেছেন।

ناگهان گم شد از میان همه + تار و داز دل اندهان همه

অকস্মাৎ তিনি সবার মাঝ থেকে হারিয়ে গেলেন যাতে করে অন্তর-মন থেকে সর্বপ্রকার অস্থিরতা খতম হয়ে যায়।

মওলানা জালাল উদ্দিন রুমির অস্থিরতাঃ

সকাল বেলা মওলানা জালাল উদ্দিন রুমি যখন মাদরাসায় এসে শাসকে ঘরে পেলেন নাতখনই চিৎকার করে ওঠেন এবং সুলতান ওয়ালাদের ঘরে গিয়ে তাকে ডেকে বলেন :

بہاو الدین چه خفته بر خیز وطلب شیخت کن که باز مشام جان را از فوائح لطف او خالی می بابیم

আরে বাহাউদ্দীন। শুয়ে রয়েছ কেন? ওঠো, স্বীয় শায়খ-এর অনুসন্ধান কর । আমি আমার অন্তরের ঘ্রাণেন্দ্রিয়কে তাঁর মেহেরবানীর সুরভি থেকে বঞ্চিত পাচ্ছি।

দু’তিন দিন যাবত তিনি চতুর্দিকে অনুসন্ধান করতে থাকেন। কিন্তু কোথাও হযরত শাম্স-এর সন্ধান পাওয়া গেল না। এবারে মওলানা শাম্স-এর অন্তর্ধানে মওলানা রূমীর অবস্থা আগের তুলনায় আরাে বেশী পরিবর্তিত হয়ে যায়।

بے سر و پاز مشق او چو ذو النون

شیخ گشت از فراق او مجنون

শায়খ (মওলানা রুমী) তার বিচ্ছেদে ব্যথায় পাগল হয়ে যান এবং তার প্রেমে যুন-নূন মিসরীর মত দিশেহারা হয়ে পড়েন।

যে সমস্ত লােকের কারণে তাঁর জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল মওলানা তাদের সবাইকেই তার (মওলানা রুমীর) নিজের সাহচর্য থেকে বের করে দেন। এবার তিনি গযল গাওয়া ও সামা মাহফিলেই সময় ব্যয় করতে শুরু করেন। এ ঘটনা ৬৪৫ হিজরীর।

হযরত শামস (র) গায়েব হয়ে যাবার পর মওলানা দুদিন চতুর্দিকে তার তালাশ করেন। কোনভাবেই যখন তার সন্ধান পাওয়া গেল না তখন তার নিজের অবস্থার পরিবর্তন শুরু হয়। সামা’র তরীকা (পন্থা-পদ্ধতি) তাে তিনি প্রথমেই এখতিয়ার করেছিলেন। এখন তার অবস্থা হ’ল, সামা ভিন্ন তিনি একটি মুহূর্তেও অতিবাহিত করতে পারেন না। মাদ্রাসায় তিনি টহল দিয়ে ফিরতেন এবং প্রকাশ্যে ও গােপনে শােরগােল করতেন, করতেন ফরিয়াদ। এ সময় তিনি হযরত শামস-এর বিচ্ছেদ যন্ত্রণায় অনেকগুলাে মর্মস্পর্শী গজল রচনা করেন। তাঁর বেদনা-বিধুর গজলগুলির অধিকাংশই এ সময়ের রচনা।

এসব অস্থিরমনা ও চিত্তচাঞ্চল্য সত্ত্বেও মওলানার মন থেকে এ চিন্তা ও চেতনা কিন্তু একেবারে মুছে যায়নি যে, রােমকদের গৃহযুদ্ধ, মিসরীয়দের তুর্কতাযী এবং তাতারীদের ধ্বংসকর অভিযানের কারণে গােটা দেশই যেখানে তছনছ হয়ে যাচ্ছে, সে ক্ষেত্রে এই অশুভ ক্ষণে না জানি হযরত শাম্স-এর কি হয়েছে।

হযরত শামসুদ্দীনের গায়েব হয়ে যাবার পর তাকে পাবার আকাঙ্খায় মওলানার অবস্থা হয়েছিল এরূপ যে, যদি কোন লােক মিছেমিছিও বলত যে, সে হযরত শামুসকে অমুক জায়গায় দেখেছে অমনি মওলানা নিজের পরিহিত পােশাক খুলে তাকে দিয়ে দিতেন এবং শুকরিয়া আদায় করতেন।

সিরিয়া সফর ও সান্ত্বনা লাভঃ এরূপ উৎসাহ-উদ্দীপনার মাঝে মওলানা একদিন সিরিয়া সফরের উদ্দেশে বেরিয়ে পড়েন। তাঁর সঙ্গী-সাথীরাও তাঁর সঙ্গে বেরিয়ে পড়ে। এভাবেই তিনি দামেস্কে পেীছেন এবং সেখানকার মানুষের অন্তর-মানসে প্রেমের আগুন জ্বালিয়ে দেন। সকল লােকই বিস্ময়াপন্ন হত, এরকম একজন আলিম ও ফাযেল ব্যক্তি কেন এরূপ দেওয়ানাপ্রায় হচ্ছেন? শাম্স তাবরীয আসলে বস্তুটা কী যার পেছনে এরূপ একজন বিশিষ্ট ব্যক্তি মাথা কুটে মরছেন।

দামেস্কে যখন শাম্স-এর কোন পাত্তা পাওয়া গেল না তখন মওলানা বললেন : আমি আর শাম্স দুজন নই। তিনি যদি হন সূর্য তাহলে আমি তার আলােক-বিন্দু; আর তিনি যদি হন সমুদ্র তাহলে আমি তার (পানির) ফোটা। আলােক-বিন্দুর অস্তিত্ব তাে সূর্য থেকেই আর পানির ফোঁটার যে আর্দ্রতা তার উৎসও তাে সমুদ্রই। তাহলে আর পার্থক্যটা রইল কি? কয়েকদিন পর সিরিয়া (শাম) থেকে তিনি রূমের দিকে রওয়ানা হন।

অতঃপর কয়েক বছর তিনি কাউনিয়া অবস্থান করেন। এখানে তার প্রেমাবেগ পুনরায় উথলে ওঠে। কিছু লােক সাথে করে তিনি আবার সিরিয়া পানে রওয়ানা হন। এরপর কাউনিয়া প্রত্যাবর্তন করেন। এবারে তিনি এই ধারণা নিয়ে প্রত্যাবর্তন করেন, আমিই শামস তাবরীযী। শাম্স তাবরীযীর অনুসন্ধান আর কিছুই ছিল না, বরং নিজেকেই খুঁজে ফিরছিলাম আমি। এবার তিনি এই ধারণা নিয়ে ফিরে আসেন যে, শাম্স-এর ভেতর যা কিছু ছিল, স্বয়ং আমার মধ্যেও তা বর্তমান।

এবার দামেস্ক থেকে প্রত্যাবর্তনের পর মওলানা হযরত শাম্স-এর সঙ্গে মিলিত হবার ব্যাপারে একেবারে হতাশ হয়ে পড়েন। কিন্তু যে অবস্থা তিনি শামস-এর মাঝে প্রত্যক্ষ করতেন- তা তিনি নিজের মধ্যেই প্রত্যক্ষ করতে থাকেন। শায়খ সালাহউদ্দীন যরকূব বলেন,দামেস্ক থেকে দ্বিতীয় দফা প্রত্যাবর্তনের পর মওলানা কিছুদিন চুপচাপ থাকেন। এরপর তিনি শায়খ সালাউদ্দীনকে তাঁর গুপ্তভেদের সঙ্গী ও খলীফা বানান। ৬৪৭ হিজরীতে তিনি তাকে স্বীয় বিশিষ্ট সহচর নিযুক্ত করেন এবং হযরত শামসুদ্দীনের পরিবর্তে তাকেই স্বীয় সহযােগী ও অন্তরঙ্গ বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করেন।

شه صلاح الدين زبعد شمس دین + گشت اور اندریں درزش معين حال وقالش از وجودش می فزود + سر مائے نادر از وی می شنود

صلاح اور داد و اشيخي و خليفنی – وسر لشکری جنود الله منصوب فرمود دیاران را | باطاعت کے مامور ساخت . ص. ۹۳ (ندوی)

শাহ সালাহ উদ্দীনই শামসুদ্দীন তাবরীযীর এ কাজে তার সাহায্যকারী হন। তাঁর হাল-চাল, কাজ-কর্ম ও কথাবার্তায় তার উন্নতি ঘটে; তার থেকে অনেক বিস্ময়কর গুপ্ত কথা তিনি শােনেন।

শায়খ সালাউদ্দীন কাউনিয়ার নিকটবর্তী একটি গ্রামের অধিবাসী ছিলেন। গরীব পিতামাতার সন্তান ছিলেন। তিনি ছিলেন মৎস্যজীবী। অবশ্য সালাহ উদ্দীন নিজে স্বর্ণকারের পেশা গ্রহণ করেন। প্রথম থেকেই তিনি আমানতদারী, সততা ও বিশ্বস্ততার ক্ষেত্রে মশহুর ছিলেন। সায়্যিদ বুরহানুদ্দীন যখন কাউনিয়ায় আসেন, তখন তিনি তার মুরীদ হন এবং তাঁর দরবারে বিশিষ্ট আসন লাভ করেন। সায়্যিদ বুরহান উদ্দীনের ইনতিকালের পর তিনি মওলানার হাতে নতুন করে বায়’আত হন। মৃত্যুর দশ বছর পূর্বে তিনি মওলানার এরূপ নৈকট্য লাভ করেন যে, এই দশ বছর তিনি তাঁর বিশিষ্ট খলীফা হিসাবেই কাটান। ৬৫৭ হিজরীতে ১লা মুহাররাম তারিখে শায়খ ইনতিকাল করেন।

শায়খ যরকূবের সান্নিধ্যের কারণে পুনরায় গােলযােগ দেখা দেয়। এবার লােকের অভিযােগ ছিল যে, এর চেয়ে শামস তাবরীযীই বরং ছিলেন ভাল। তিনি আর যা-ই হােন, একজন ‘আলিম তাে নিশ্চয়ই ছিলেন। আর এ লােক হচ্ছে এখানকারই অধিবাসী। সবাই তাকে একজন সাধারণ লােক হিসাবে জানে। জীবন গহনার নকশা খােদাই করেছে, আর এখন মওলানার বন্ধু হয়ে বসেছে। আশ্চর্য লাগে যে, মওলানা নিজে এত বড় সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও এমন একজন লােককে ভক্তি ও শ্রদ্ধা প্রদর্শনে কেন এতটা বাড়াবাড়ি করেন! শায়খ এসব শােনার পর বলেনঃ লােকের মনঃকষ্টের কারণ যে, মওলানা কেন আমাকে সবার মাঝে বৈশিষ্ট্য দান করলেন। কিন্তু তারা আসল কথা বুঝতে পারছে না যে, মওলানা নিজেই নিজের ‘আশিক। আমি তাে একটা বাহানামাত্র।

দশ বছর পর্যন্ত মওলানাকে সাহচর্য প্রদানের পর শায়খ হঠাৎ করেই অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং পহেলা মুহাররাম পরিপূর্ণ আত্মিক প্রশান্তির সাথে এই নশ্বর পৃথিবী ত্যাগ করেন।

চিল্পী হুসামুদ্দীনঃ

শায়খ সালাউদ্দীনের ইনতিকালের পর মওলানা চিল্পী হুসামুদ্দীন ইবনে আখী তুর্ককে স্বীয় নায়েব ও খলীফা নিযুক্ত করেন। চিল্পী হুসামুদ্দীন ছিলেন মওলানার বিশিষ্ট মুরীদদের অন্যতম এবং মওলানার ইনতিকালের পর এগার বছর পর্যন্ত তিনি মওলানার খিলাফতের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি মূলত তুৰ্ক ও দেশীয় হিসাবে আরামীয় ছিলেন। রূমের মশহুর ও প্রভাবশালী খান্দান “আখী”-র সঙ্গে সম্পর্কিত ছিলেন তিনি।

হযরত শামসুদ্দীন তাবরীষী ও শায়খ সালাহউদ্দীনেরও তিনি মুরীদ ছিলেন। | তাদের থেকেও তিনি উপকৃত হয়েছিলেন।হযরত হুসামুদ্দীন চিল্পী তার সমস্ত গােলাম ও কর্মচারীকে প্রকাশ্যে বলে রেখেছিলেন, তারা যেন নিজেদের মর্জি মতই কাজ করে। আস্তে আস্তে তিনি তাঁর মালিকানাধীন সমস্ত সম্পত্তি মওলানার খিদমতে ব্যয় করে ফেলেন। শেষে তিনি গােলামদেরকেও আযাদ করে দেন। মওলানাকে তিনি এতটা সম্মান করতেন যে, কোনদিন তিনি মওলানার ওযুখানায় ওযূ করতেন না। তীব্র ঠাণ্ডা ও শীত, গুঁড়ি গুড়ি বরফ পড়ছে, এতদসত্ত্বেও তিনি ঘরে গিয়ে ওযু করে আসতেন। অপর দিকে তাঁর সঙ্গে মওলানার আচরণও ছিল এমনি যে, বহিরাগত কোন দর্শক তা দেখার পর খােদ মওলানাকেই মুরীদ ভেবে বসত।

মসনবী প্রণয়নঃ

মছনবী শরীফ প্রণয়ন এ যুগের একটি উল্লেখযােগ্য কীর্তি। এতে হযরত হুসামুদ্দীনের ক্রমাগত তাকীদ ও চাপের একটি বিরাট ভূমিকা ছিল। যদি বলা হয় যে, মসনবী শরীফের অস্তিত্ব লাভ ঘটেছিল তাঁরই কারণে তাহলে সম্ভবত বেশী বলা হবে না।

সাথী নির্বাচনের কারণঃ

মওলানা কোন না কোন সাথী ব্যতিরেকে আরাম পেতেন না। শামসুদ্দীনের পর সালাহুদ্দীন এবং সালাহুদ্দীনের পর হুসামুদ্দীন তাঁর গুপ্ত-রহস্য সঙ্গী ও অন্তরঙ্গ সাথী ছিলেন, বরং এ সিলসিলা যদি আরাে বাড়ানাে যায় তাহলে পরিষ্কার দেখা যাবে যে, সায়্যিদ বাহাউদ্দীন তিরমিযীও এ দলে শামিল যদিও তিনি ভিন্ন অবস্থান থেকে এ দলে এসেছিলেন। সায়্যিদ বাহাউদ্দীন তিরমিযীর ইনতিকাল এবং হযরত শাম্স-এর আগমন মধ্যবর্তী পাঁচ বছর মওলানা এমনভাবে অতিবাহিত করতেন যাতে মনে হত, এ সময় তিনি একটা কিছুর ঘাটতি অনুভব করছেন। এর থেকে যে ফলাফল বেরিয়ে আসে তা হল এই যে, মওলানার ভেতর যে কামালিয়াত প্রচ্ছন্ন ছিল সে সবের প্রকাশের জন্য কোন না কোন আন্দোলক ও উৎসাহদাতার প্রয়ােজন ছিল। তাঁর রচিত “দীওয়ান” ও “মছনবী” এসব প্রচ্ছন্ন আন্দোলনেরই সাক্ষী। কেবল হুসামুদ্দীনের অন্যমনস্কতার কারণে মছনবী শরীফের রচনা দু’বছর বন্ধ থাকে।

মওলানা কোন লােককে তাঁর কাশফ ও কারামতের কারণে সাহচর্যের জন্য নির্বাচিত করেন নি। এ ক্ষেত্রে তাঁর অভিমত ছিল, মুহব্বতের কারণে সহজাতিত্ব। মওলানা নিজে তাঁর পুত্র সুলতান ওয়ালাদের এক প্রশ্নের উত্তরে বলেছিলেন, “সম্পর্কের দিক দিয়ে এক জাতিত্বের কারণেই তাকে আমি বিশিষ্ট বন্ধু হিসাবে জানি।” তিনি আরও বলেছেন : যে প্রেম ও ভালবাসা সৃষ্টি হয় সম্পর্কের কারণে

তার পরিণতিতে লজ্জিত হবার কিছু নেই। প্রকৃত ভালবাসা ও সম্পর্ক সৃষ্টির দ্বারা দুনিয়া ও আখিরাতে কোথাও লজ্জিত হতে হয় না। সেজন্যই কিয়ামতের ময়দানে ইসাব-নিকাশে আটকে পড়া লােকগুলাে অভিলাষ জাহির করবে, i i »; 91 “হায়। আমি যদি অমুককে বন্ধু হিসাবে গ্রহণ না করতাম।”

মুত্তাকী প্রেমিকদের গুণাবলী হবে নিম্নরূপঃ

الأخلاه يومئذ بعضهم لبعض عدو الأ الثقين.

বন্ধুজনেরা পরস্পরের দুশমন হবে সেদিন; একমাত্র মুত্তাকীরাই হবে এর ব্যতিক্রম। মওলানা নিজে বলেন :

موجب ایمان نه باشد معجزات + ليك جنسیت بود جذب صفات

মু’জিযা ঈমানের কারণ হয় না, বরং স্বজাতিত্বের মিল গুণাবলী আত্মস্থ করবার মাধ্যম হয় (অর্থাৎ পারস্পরিক সম্পর্ক একের গুণ অন্যের মাঝে সংক্রমিত করে)।

সিপাহসালার বলেন ঃ মওলানার ইনতিকালের চল্লিশ দিন পূর্ব থেকেই কাউনিয়ায় ভূমিকম্প হচ্ছিল। আফলাকীর বর্ণনা মুতাবিক মওলানা শয্যাগত থাকাকালে সাতদিন উপর্যুপরি ভূমিকম্প হয়। অত্যধিক ভূমিকম্পের কারণে লােকেরা হাঁপিয়ে ওঠে এবং মওলানার সাহায্যপ্রার্থী হয়। এতে মওলানা বলেন : যমীন ক্ষুধার্ত, সে এখন খাবার চায়। সত্বরই সে তা পাবে আর তােমাদের কষ্টেরও অবসান ঘটবে। সে সময় তিনি নিম্নোক্ত গযল গেয়েছিলেন :

با این همه مهر و مهربانی + دل می دهدت که خشم رانی دین جمله شیشه هائے جانرا + درهم شکنی به لن ترانی

তােমার সেই করুণা ও কৃপা সত্ত্বেও অন্তর-মন তােমাকে ক্রোধান্বিত হবার অনুমতি দিচ্ছে, আর অনুমতি দিচ্ছে ‘লান তারানী’ (তুমি আমাকে কখনাে দেখতে পারবে না) বলে এই সব প্রাণের দর্পণ চূর্ণ করবার।

চিল্পী হুসামুদ্দীন বলেন । একদিন শায়খ সদরুদ্দীন দরবেশ-শ্রেষ্ঠদের সমভিব্যাহারে রুগ্ন মওলানাকে দেখতে আসেন। মওলানার অবস্থাদৃষ্টে তারা ব্যথিত হন এবং আল্লাহর দরবারে তার রােগ মুক্তির জন্য দু’আ করেন। সেই সঙ্গে তারা মওলানার পরিপূর্ণ সুস্থতা ফিরে পাবার ব্যাপারেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন। এতে মওলানা বলেনঃ এখন আরােগ্য লাভ আপনার জন্যই বরকতময় হােক! প্রেমিক ও প্রেমাস্পদের মাঝে অন্তরায় হিসাবে চুলের ন্যায় সরু ও চিকন একটি

আবরণ রয়ে গেছে। আপনি কি চান না যে, সেটা উঠে যাক এবং নূর নূরের সাথে গিয়ে মিলিত হােক। | রােগাক্রান্ত অবস্থায় তিনি নিম্নোক্ত গযল শুরু করেন। হুসামুদ্দীন চিল্পী তা লিখছিলেন আর কাঁদছিলেন।

رو سر بنه ببالين تنها مرا رها کن …. بادست اشارتم کرد که عزم سوني ماكن

যাও, তুমি তাকিয়ায় গিয়ে মাথা রাখ! আমাকে একাকী ছেড়ে দাও; আমার মত বিপর্যস্ত, বিপন্ন এবং রাতে বিচরণকারী মুসাফিরকে ছেড়ে যাও। আমি আছি আর আছে একরাশ চিন্তার উত্তাল তরঙ্গ; রাতদিন একাই থাকি। যদি চাও আস এবং বখশিশ কর অথবা চলে যাও এবং জুলুম কর। আমার থেকে পালিয়ে যাও যাতে তুমিও বিপদে না পড়। শান্তির পথ ধর, বিপদের রাস্তা পরিত্যাগ কর। আমি আছি আর সঙ্গে আছে চোখের পানি; পেরেশানির মধ্যে আটকে আছি। (এমতাবস্থায়) আমার অশ্রুমালার ওপর দিয়ে স্টীম রােলার চালাও। বিনা কারণে আমাকে মারে এবং পাষাণের ন্যায় নির্মমভাবে টানাহেঁচড়া করে। এ কথা বলে না যে, প্রতিশােধ নেবার পথ বের কর। মা’শূক (প্রেমাস্পদ)-দের সর্দারের ওপর বিশ্বস্ততা প্রদর্শন বাধ্যতামূলক নয়; ওহে হলুদ চেহারার প্রেমিক! তুমিই ধৈর্য ধর এবং বিশ্বস্ততা প্রদর্শন কর। আমি এমন এক আঘাত পেয়েছি মৃত্যু ভিন্ন যার কোন চিকিৎসা নেই; অতএব, আমি কেমন করে বলি যে, এ ব্যথার চিকিৎসা কর। গত রাতে আমি স্বপ্নে এক বৃদ্ধকে দেখলাম। সে আমাকে হাতের ইশারায়

বলছে, আমার দিকে চলে আসার সংকল্প কর। ঠিক মৃত্যুর কাছাকাছি সময়ে তিনি বলেন :

گرمومنی شیرین هم موئست مرگت + در کافری و تلخي هم كالومیست مردن

যদি তুমি মুমিন হও, মিষ্ট হও, তাহলে তােমার মৃত্যুও মু’মিন; আর তুমি যদি কাফির হও, তিক্ত ও বিস্বাদ হও, তাহলে তােমার মৃত্যুও কাফির।

৬৭২ হিজরীর জুমাদা আল-উখরার পাঁচ তারিখে সূর্যাস্তের সময় হাকীকত ও মারিফত বর্ণনারত অবস্থায় তিনি ইনতিকাল করেন। ইনতিকালের সময় মওলানার বয়স ছিল ৬৮ বছর তিন মাস।

মওলানার জানাযা বাইরে আনতেই এক কিয়ামত-দৃশ্যের অবতারণা হয়। সকল ধর্মের ও সকল জাতিগােষ্ঠীর লােকই তাতে শরীক ছিল। সবাই কাঁদছিল। ইয়াহুদী ও খ্রিস্টান তাদের স্ব স্ব ধর্মগ্রন্থ (তওরাত ও ইন্‌জীল) পাঠ করছিল।

মুসলমানেরা তাদেরকে বাধা দিচ্ছিল, কিন্তু তারা বিরত হচ্ছিল না। শেষাবধি গােলযোগের আশঙ্কা দেখা দেয়। যখন এ সংবাদ কাউনিয়ার শাসনকর্তা মুঈনুদ্দীন পরওয়ানার নিকট পেীছল তখন তিনি খ্রিস্টান ধর্মযাজক ও পাদরীদের জিজ্ঞেস করেন : (মওলানার জানাযায় শরীক হবার সঙ্গে) তােমাদের কী সম্পর্ক? তারা বলল : আমরা পূর্ববর্তী নবীদের হাকীকত এঁরই বর্ণনার মাধ্যমে বুঝতে পেরেছি এবং কামিল দরবেশদের চলনভঙ্গী তাঁর চলনভঙ্গী থেকেই জেনেছি। যা হােক, ঐ সব লােক জানাযার অনুগমন করে। লােকের ভীড় এত বেশি হয়েছিল যে, মুর্দার খাটিয়া খুব ভােরে মাদরাসা থেকে রওয়ানা হয়েছিল এবং সন্ধ্যার সময় কবরস্থানে গিয়ে পৌছেছিল। রাতের বেলা তাসাওউফ ও ফকীরির এই সুমহান সূর্য লােকচক্ষুর অন্তরালে চলে যায়।

চরিত্র ও বৈশিষ্ট্য

মওলানা শিবলী মরহুম “সওয়ানেহ’-ই-মওলানা রূম” নামক গ্রন্থে বলেন : মওলানা যতদিন পর্যন্ত তাসাওউফের বেস্টনীর মাঝে আসেন নি ততদিন পর্যন্ত তাঁর জীবন ছিল জ্ঞানীসুলভ আঁকজমকের এক আশ্চর্য প্রতিমূর্তি। তার সওয়ারী যখন রাস্তায় বের হত তখন ‘আলিম-উলামা কিংবা ছাত্রই শুধু নয়, আমীর-উমারার একটি দলও তাঁর অনুসরণ করত। আমীর-উমারা ও সুলতানদের দরবারের সঙ্গেও তার সম্পর্ক ছিল। কিন্তু সক (আধ্যাত্মিকতার পথ)-এ প্রবেশ করবার সঙ্গে সঙ্গে তার এ অবস্থার পরিবর্তন ঘটে। পঠন-পাঠন (দৱস ও ভাদরীস), ফতওয়া প্রদান ও জনকল্যাণমূলক কাজের সাথে তাঁর কিছু যােগ ছিল বটে, তবে তা ছিল অতীত জীবনের প্রতীকস্বরূপ। অন্যথায় তিনি সব সময়ই আল্লাহ প্রেম ও তার মা’রিফতের নেশায় ডুবে থাকতেন। রয়াযত ও মুজাহাদা

তাঁর রিয়াযত ও মুজাহাদা ছিল সীমাতিরিক্ত। সিপাহসালার তাঁর সাহচর্যে গটিয়েছেন বছরের পর বছর। তিনি বলেন ঃ আমি কখনােই তাঁকে রাত্রিকালীন পাশাকে দেখিনি। বিছানা কিংবা তাকিয়া (বালিশ) একেবারেই থাকত না। ইচ্ছে চরেই তিনি শয়ন করতেন না। ঘুম আসলে বসে বসেই একটু ঝিমিয়ে নিতেন। কিটি গলে তিনি বলেন : ৬/৭ … » ESS+* * * *

এমন লােক কি করে আরাম করতে পারে- তা সে যে পাশ ফিরেই শয়ন করুক না কেন-যার বিছানা কাটাভরা।

সামা মাহফিলে তাঁর মুরীদদের যখন ঘুম পেত তখন তিনি তাদের খাতিরে দেওয়ালের সঙ্গে হেলান দিয়ে জানুর ওপর মাথা রাখতেন যাতে তার দেখাদেখি অন্যেরা নির্দ্বিধায় কিছুটা শুয়ে নেয়। তারা ঘুমিয়ে পড়তেই তিনি উঠে যেতেন এবং যিকর-আযকার ও তাসবীহ-তাহলীলে মত্ত হয়ে পড়তেন। একটি গলে এরই প্রতি তিনি ইঙ্গিত করেছেন :

همه خفتند و من دل شده را خواب نپرد

همه شب ديده من بر فلك أستاره شمرد خوابم از دیده چنان رفت که هرگز ناید

خواب من زهر فراق تو بنوشید و بمرد

সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে, কিন্তু আমি হত হৃদয়ের ঘুম আসেনি। আমার আঁখিযুগল কেবল আসমানের তারকা গুণেই রাত কাটিয়েছে। ঘুম আমার চোখ থেকে এমনভাবেই উধাও হয়েছে যে, আর কখনাে ফিরে আসবে না। কেননা আমার চোখ তােমার বিচ্ছেদ বিষ পান করে মারা গেছে (আর মৃত তাে পুনরায় ফিরে আসতে পারে না)।

অধিকাংশ সময় তিনি সিয়াম পালন করতেন এবং উপর্যুপরি কয়েক দিন পর্যন্ত কিছুই খেতেন না।

সালাতের অবস্থা

সালাতের ওয়াক্ত হতেই তিনি কিবলামুখী দাঁড়িয়ে যেতেন। এ সময় তার চেহারার রং বদলে যেত। সালাতের মধ্যে তিনি নিজেকে হারিয়ে ফেলতেন। সিপাহসালার বলেন : নিজের চোখেই আমি বহুবার দেখেছি যে, এশার আওয়াল ওয়াক্তে তিনি নিয়ত বেঁধেছেন এবং দু’ রাকআত পড়তেই সুবেহ (তাের) হয়ে গেছে। মওলানা তার একটি গলে স্বীয় সালাতের অবস্থার বর্ণনা দিয়েছেন :

چو نماز شام هر کس نهد چراغ و خوانے

منم و خیال بارے غم و نوحه وفنانے چو وضو ز اشك سازم بود أنشب نمازم

در مسجدم بسوزد چو در در سد اذانے عجبا نماز مستان توبگو درست هست آن

که نداند او زمانی نه ششائد او مکانے عجبة دو رکعت ست ایں عجبا چهارم است این

عجبا چه سوره خواندم. چونداشتم زمانے

در حق چگونه کوبم که نه دست ماندوئے دل

دل دوست چوں توبردی بده لے خدا أمانے بخدا خبر نه دارم چو نمازی گزارم

که تمام شد رکوعی که امام شد فلانی

সবাই সন্ধ্যায় সালাত আদায় করেই দস্তরখানা বিছায় এবং প্রদীপ জ্বালায়; কিন্তু আমি তখন অন্য এক বন্ধুর কল্পনায় থাকি, থাকি পেরেশান। তারই বিরহ গাঁথা গাই এবং তারই কাছে ফরিয়াদ জানাই। চোখের পানিতে যখন ওযূ করি তখন আমার সালাতও আগুনে পরিণত হয়; মসজিদেই আমাকে পুড়িয়ে ফেলে যখন সেখানে আযানের আওয়াজ পেীছে। আরো পাগলদের সালাতই অদ্ভুত ধরনের। তােমরাই বল,এটা কি জায়েয? (এমতাবস্থায় যে,) না তারা (সালাতের) ওয়াক্তের খবর রাখে আর না রাখে স্থানের। বিস্ময়ের ব্যাপার, তারা জানে না এ সালাত দু’ রাক’আতের, না চার রাক’আতের? আরাে বিস্ময় এই যে, সালাতের সময় জ্ঞান যখন আমার নেই তখন কি করে বলি, আমি সালাতে কোন্ সূরা পড়েছি। আল্লাহ্র দরজার কিভাবে কড়া নাড়ি, যখন আমার হাতও নেই, হৃদয়ও নেই। হে খােদা! তুমি যখন হৃদয়, হাত সব কিছুই নিয়ে গেছ- তখন আমাকে (অন্তত) নিরাপত্তা দাও। আল্লাহর কসম! আমি যখন সালাত আদায় করি তখন কোন কিছুরই খবর রাখি না। কোন রুকূ’ পুরা হল কিনা, কে ইমামতি করল তাও জানি না।

একবার শীতের দিনে মওলানা সালাতে দাঁড়িয়ে এত বেশি কাঁদেন যে, তাঁর সমস্ত চেহারা ও দাড়ি চোখের পানিতে ভেসে যায় এবং শীতের তীব্রতায় সে পানি জমে বরফে পরিণত হয়। অবশ্য তিনি সেভাবেই সালাতে মশগুল থাকেন। যুহদ ও অল্পে তুষ্টি

| মেযাজের দিক দিয়ে তিনি সর্বোচ্চ মাত্রায় যুহদ-এ অভ্যস্ত এবং অল্পে তুষ্ট ছিলেন। সকল সুলতান ও আমীর-উমারাই নগদ অর্থ-কড়িসহ সর্বপ্রকার উপহার-উপঢৌকন তার কাছে পাঠাতেন। কিন্তু তিনি সে সবের কিছুই নিজের কাছে রাখতেন না। যা কিছু আসত এবং যেভাবে আসত তিনি তা সালাহুদ্দীন যরকুব অথবা চিল্পী হুসামুদ্দীনের নিকট পাঠিয়ে দিতেন। কখনাে এমনও দেখা | গেছে যে, ঘরে এক মুঠো খাবারও নেই, এমতাবস্থায় মওলানার সাহেবযাদা

সুলতান ওয়ালাদের পীড়াপীড়িতে ঐ সমস্ত জিনিস থেকে কিছুটা ঘরে রেখে দিতেন। যেদিন ঘরে খাবার কিছুই থাকত না-সেদিন মওলানা অত্যন্ত খুশি হয়ে বলতেন, “আজ আমাদের ঘরে দরবেশির গন্ধ অনুভূত হচ্ছে।” বদান্যতা ও কুরবানী

দানশীলতা ও বদান্যতার অবস্থা ছিল এই যে, সায়েল (প্রার্থী)-কে কিছু দিতে পারলে দেহে আবা, কুর্তা যা-ই থাকুক না কেন, তাই খুলে দিয়ে দিতেন। পাছে খুলে দিতে দেরী হয় সেজন্য আবার মত কুর্তার সম্মুখ ভাগও সব সময় খােলা রাখতেন। পরার্থপরতা ও অহংশূন্যতা

একবার মুরীদদের সঙ্গে কোথাও যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে সংকীর্ণ একটি গলিপথের ওপর একটি কুকুর শুয়েছিল। ফলে রাস্তা গিয়েছিল আটকে। মওলানা থেমে গেলেন এবং অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলেন। বিপরীত দিক দিয়ে এক ব্যক্তি হেঁটে আসছিল। লােকটি কুকুরটাকে রাস্তা থেকে হটিয়ে দেয়। মওলানা এতে মনঃক্ষুন্ন হন এবং বলেন : তুমি ওকে না-হক কষ্ট দিলে।

একবার দু’জন লােক রাস্তার ওপর দাঁড়িয়ে ঝগড়া করছিল এবং একে অপরকে গালি দিচ্ছিল। তাদের ভেতর একজন অপরজনকে বলছিল? অভিশপ্ত। তুমি আমাকে একটা বললে বিনিময়ে আমি দশটা শুনিয়ে দেব। আকস্মিকভাবে মওলানা এদিক হয়ে কোথাও যাচ্ছিলেন। তিনি ঐ লােকটিকে ডেকে বললেন : ভাই। তােমার যা কিছু বলার তা ওকে নয়, বরং আমাকে বল। কেননা তুমি আমাকে হাযারটা বললেও আমি প্রত্যুত্তরে একটিও বলব না। এ কথা শুনে লােক দুটি মওলানার পায়ে পড়ে ক্ষমা চেয়ে নেয় এবং নিজেদের মধ্যে সন্ধি করে। হালাল উপার্জন

আওক “ফি বিভাগ থেকে মাসিক ১৫ দীনার ভাতা নির্ধারিত ছিল। এর দ্বারাই মওলানা জীবিকা নির্বাহ কতেন। বিনা শ্রমে প্রাপ্ত অর্থে জীবিকা নির্বাহ করা তিনি অত্যন্ত অপছন্দ করতেন। সেজন্য তিনি এর বিনিময়ে ফতওয়া লিখতেন। মুরীদদেরকে তাকীদ দিয়ে রেখেছিলেন, “যখনই কেউ ফতওয়া নিয়ে আসে, তখন যে অবস্থায়ই থাকি না কেন, আমাকে অবশ্যই সংবাদ দেবে যাতে এর মাধ্যমে আমি হালাল উপার্জন করতে পারি।”

একবার কেউ বলেছিল, “শায়খ সদরুদ্দীন মাসে হাযার রূপিয়া ভাতা পান, আর আপনি পান কেবল পনের দীনার মাসিক।’ মওলানা জওয়াবে বলেছিলেন : শায়খ-এর খরচের পরিমাণও খুব বেশি। আসলে আমি যে পনের দীনার পাই সেটাও তারই পাওয়া উচিত।

দুনিয়াদারদের সংশ্রব বর্জন।

মওলানা প্রকৃতিগতভাবেই আমীর-উমারা, সুলতান ও শাসকদের ঘৃণা করতেন এবং তাদের সংস্রব এড়িয়ে চলতেন। কেবল সদাচরণের খাতিরেই তিনি তাঁদের সঙ্গে কখনাে কখনাে মিলিত হতেন। একবার এক আমীর মওলানার নিকট এই মর্মে সংবাদ পাঠান, “অত্যধিক কাজের চাপে ফুরসৎ পাই না। তাই হযরতের দরবারে হাযির হবার মওকা জোটে খুবই কম। মেহেরবানী করে আমাকে ক্ষমা করবেন।” মওলানা তাকে বলে পাঠান :

“ক্ষমা প্রার্থনার প্রয়ােজন নেই। আসার চেয়ে না আসলেই বরং আমি বেশি কৃতজ্ঞ থাকি।”

মসনবী ও তার জ্ঞানগত ও সংস্কারমূলক অবস্থান ও পয়গাম মছনবী

| মওলানার অবস্থা থেকে বােঝা যায়, তিনি স্বভাবতই উৎসাহী ও আবেগপ্রবণ ছিলেন। ইশক তথা প্রেম তার প্রকৃতির রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করেছিল। জাহির “ইলম ও বুদ্ধিবৃত্তির অনুক্ষণ ধ্যান তাঁর ও প্রেমের এই আগুনকে দাবিয়ে রেখেছিল। শামুস তাবরীযের অগ্নিবৎ ধ্যান তাঁর এ প্রেমের এই আগুনকে দাবিয়ে রেখেছিল। শামুস তাবরীযের অগ্নিবৎ সাহচর্য তাঁর প্রকৃতিকে উস্কে দিয়েছিল এবং প্রশিক্ষণ ও পরিবেশ তাঁর ওপর যে আবরণ ফেলেছিল অত্যন্ত আকস্মিকভাবেই তা বিলীন হয়ে যায়। ফলে তিনি আপাদমস্তক জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরিতে পরিণত হন।

شعلها أخر زهر مويم دميد + ازرگ اندیشه ام أنش چکبد

আমার লােমকূপের গােড়া থেকে শেষাবধি অগ্নি-শিখা নির্গত হচ্ছে; আমার চিন্তার শিরা-উপশিরা থেকে আগুন ঝরে পড়ছে। ২। এই মকামে পৌঁছার পর ‘আরিফের প্রতিটি লােমকূপ থেকে আওয়াজ ধবনিত

در جهاں یارب ندیم من کجاست + نخل سينام كليم من كجاست

হে প্রভু-প্রতিপালক! দুনিয়াতে আমার সাথী (বন্ধু) কোথায়? আমি সিনাই পর্বতের খােরমা বৃক্ষ; আমার কলীম (হযরত মূসা) কোথায়?

আর এটাই একমাত্র কারণ যে, অন্তরঙ্গ বন্ধু ও রহস্য-সঙ্গী ব্যতিরেকে তার পক্ষে জীবন ধারণ করা ছিল অসম্ভব। শামুস তাবরীযের পর যতদিন পর্যন্ত না তিনি সালাহুদ্দীন যরকূব এবং সালাহুদ্দীন যরকূবের পর যতদিন পর্যন্ত হুসামুদ্দীন চিল্পীকে পেয়েছেন তাঁর অশান্ত ও অস্থির চিত্ত শান্ত হয়নি। ১৯৭১ ৩. ৮ “মােমের পক্ষে একাকী ছটফট করা সহজ নয়।” | এই জ্বলন্ত অগ্নিই তাঁকে ক্রমান্বয়ে সামা’র দিকে টেনে নিয়ে যেত এবং তিনি এ থেকে শক্তি ও খােরাক সগ্রহ করতেন। অনন্তর তিনি বলেন :

پس غذایی عاشقان أمد سماع + که از وباشد خیال اجتماع قونی گیرد خیالات ضمير + بلکه صورت گردد از بانک صفير آتش عشق از نواها گرد نیز به آنچنانکه آتش أن جون ریز

‘আশিকের খাদ্যই হচ্ছে সামা’র মাহফিল; কেননা এর দ্বারাই একাগ্রতা ও মানসিক প্রশান্তি আসে। অন্তরের কল্পনা একটা উল্লেখযােগ্য পরিমাণ শক্তি লাভ করে, বরং বাঁশীর আওয়াজে তার একটা ব্যবস্থা কিংবা সুরাহা হয়ে যায়। প্রেমের আগুন শব্দ দ্বারা আরাে বেগবান হয়েছে, যেরূপ এই অগ্নিকুণ্ডে কয়লা নিক্ষেপকারীর আগুনের অবস্থা।

এই তাপ ও জ্বালাই তাকে আরাে উস্কে দিয়েছে এবং চুপচাপ থাকাকে তার পক্ষে অসম্ভব করে তুলেছে। তাঁর ভাষায় :

جوش نطق از دل نشاں دو ستیست + بستگی نطق از پے الفتی است دل که دلبر دید کے ماند ترش + بلبل گل دیده کے ماند خمش

হৃদয় থেকে উৎসারিত শব্দের বন্যা উছলে পড়া মুহব্বতের আলামত; আর শব্দ আটকে যাওয়া সম্পর্কহীনতা ও প্রেমশূন্যতার কারণ। যে হৃদয় প্রেমাস্পদকে দেখতে পেয়েছে সে কি করে নিষ্প্রাণ ও স্বাদহীন। থাকতে পারে; আর যে বুলবুল ফুল দেখেছে সে কি করে না গেয়ে থাকতে পারে।

এই বাদ্যযন্ত্র থেকে যে গীত নির্গত হল তার সংকলনই হ’ল মছনবী। এ তার ধ্যান-ধারণা ও অবস্থা, ঘটনা ও প্রতিক্রিয়া,পর্যবেক্ষণ ও অভিজ্ঞতার দর্পণ। এটা গায়বের ব্যথা ও জ্বালা,জোশ ও মত্ততা এবং ঈমান ও ইয়াকীন দ্বারা পূর্ণ। মছনবীর বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়তা ও নজীরবিহীন প্রভাব সৃষ্টির এটাই আসল কারণ।

هے رگ ساز میں رواصاحب ساز کا لہو

বাদ্যযন্ত্রের প্রতিটি শিরা-উপশিরায় এর নির্মাতার রক্ত প্রবাহিত। বুদ্ধিবৃত্তি ও জাহির পরস্তীর সমালােচনা

মওলানার শিক্ষা ও এর বিকাশ ঘটেছিল সর্বাংশেই আশ’আরীদের জ্ঞানগত পরিবেশ ও পরিমণ্ডলে। তিনি নিজেও একজন সফল শিক্ষক ও যুক্তিবাগীশ ‘আলিম ছিলেন। আল্লাহর অনুগ্রহ যখন তাকে মা’রিফত (পরিচিতি) ও অবহিতির স্তর পর্যন্ত পৌছাল এবং বাণী থেকে অবস্থা, খবর থেকে নজর, শব্দ থেকে অর্থ এবং পরিভাষা ও সংজ্ঞার শাব্দিক ইন্দ্রজাল থেকে হয়ে যখন তিনি মূল সত্যে গিয়ে উপনীত হলেন, তখনই তিনি দর্শন ও ইলমে কালামের দুর্বলতা ও যুক্তি-প্রমাণ ও আনুমানিক সিদ্ধান্তের ভ্রান্তি পরিমাপ করতে সক্ষম হলেন। দার্শনিক, মুতাকাল্লিম ও যুক্তি-বাগীশদের অসহায়ত্ব ও মূল সত্য সম্পর্কে অজ্ঞতার হাকীকত তার সম্মুখে উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। যেহেতু এ সবের প্রতিটি অলি-গলি সম্পর্কে তিনি অবহিত ছিলেন সেজন্য তিনি যা বলতেন তা তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতেই হ’ত এবং এর বাস্তবতাও কেউ অস্বীকার করতে পারত না।

এ যুগে দর্শন ও বুদ্ধিবৃত্তির উৎস হিসাবে সর্বাধিক জোর দেওয়া হত বাহ্য ইন্দ্রিয়ের উপর। বাহ্য-ইন্দ্রিয়কেই জ্ঞান লাভ ও নিশ্চিত বিশ্বাস উৎপাদনের সবচেয়ে বিশুদ্ধ ও নির্ভরযােগ্য মাধ্যম বলে মনে করা হত। আর যে সব বস্তু এর আওতায় আসত না অর্থাৎ বুদ্ধির অগম্য ও ইন্দ্রিয়াতীত বিষয়বস্তুকে অস্বীকার করবার প্রবণতা বেড়ে চলেছিল। মু’তাযিলাগণ এই ইন্দ্রিয়ানুভূতি পূজার সবচেয়ে বড় প্রবক্তা ছিল। এই ইন্দ্রিয়ানুভূতি পূজা ঈমান বি’ল-গায়ৰ তথা অদৃশ্যে বিশ্বাস স্থাপনকে খুবই ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল এবং ইসলামী শরীয়ত ও আল্লাহ কর্তৃক অবতীর্ণ ওয়াহীর পেশকৃত হাকীকতের প্রতি এক ধরনের অনাস্থার ভাব সৃষ্টি করে দিয়েছিল। মওলানা এই পঞ্চেন্দ্রিয় পূজা এবং এর তুখােড় প্রবক্তাদের সমালােচনা করতে গিয়ে বলেন :

چشم حس راهست مذهب اعتزال + دیده عقل است سنی در وصال

سخره حس اند اهل اعتزال + خویش راستی نمایند از ضلال هرکه در حس ماندا ومعتزلی است + گرچه گوید سنیم از خامی است هرکه بیرون شد زحسن ستی ویست + اهل بينش اهل عقل خویش بیست

জ্ঞান-বুদ্ধির চক্ষু সুন্নত ওয়াল-জামা’আতের সঙ্গে সম্পৃক্ত। মু’তাযিলীগণ ইন্দ্রিয়পূজার খেলনামাত্র; বিভ্রান্তি ও গােমরাহীর কারণে তারা নিজেদের সুন্নী হিসেবে দেখিয়ে থাকে। যে কেউই ইন্দ্রিয়-পূজায় অতিবাহিত করল, সে মু’তাযিলী অর্থাৎ সত্যানুসারীদের দলবহির্ভূত; যদি সে সুন্নী হবার দাবি করে, তবে এ তার দুর্বলতা। যে ইন্দ্রিয় পূজা থেকে বেরিয়ে এল সে সুন্নী ; জ্ঞানী ব্যক্তিরা কেবল তাদের বুদ্ধির ওপরই দাঁড়িয়ে থাকে।

তিনি স্থানে স্থানে এটা প্রমাণ করতে চেষ্টা করেছেন যে, ঐসব বাহেন্দ্রিয় ছাড়াও মানুষকে কিছু প্রচ্ছন্ন ইন্দ্রিয় দান করা হয়েছে। আর এই প্রচ্ছন্ন ইন্দ্রিয় বাহেন্দ্রিয়ের তুলনায় অনেক বেশী বিস্তৃত ও গভীর। মওলানা বলেন :

پنج حسب هست جز ایں بنج حس + آن چوزر سرخ رایں حسها چومس اندر ان بازار کا هل محشر اند + حس مس را چوں حس زرکے خرند حس ابداں قوت ظلمت می خورد + حس جان از آفتابی می چرد

ঐ পাঁচটি ইন্দ্রিয় (চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা, জিহ্বা ও ত্বক) ছাড়াও আরও পাঁচটি ইন্দ্রিয় রয়েছে, যেগুলাে স্বর্ণের ন্যায় লাল আর এই বাহেন্দ্রিয় আমার মতই (মূল্যহীন)। জনসমাবেশে পরিপূর্ণ এই বাজারে তামার ন্যায় মূল্যহীন ইন্দ্রিয়কে স্বর্ণের ন্যায় মূল্যবান ইন্দ্রিয়ের বিনিময়ে ক্রয় করবে? শরীরের ইন্দ্রিয়াতৃতির খােরাক হ’ল অন্ধকার; আর হৃদয়ের মাঝে যে অনুভূতি বিরাজমান তার খােরাক সূর্য-কিরণ।

তাঁর মতে কোন বস্তু অস্বীকার কিংবা প্রত্যাখ্যানের জন্য এতটুকু প্রমাণ যথেষ্ট নয় যে, তা দেখা যায় না কিংবা তা ইন্দ্রিয় অনুভূতি অথবা উপলব্ধিতে ধরা পড়ে না। তার মতে বাতেন (প্রচ্ছন্ন বস্তু কিংবা বিষয়) জাহির (বাহ্যিক কিংৰা দৃশ্যমান বস্তু বা বিষয়)-এর পেছনে লুক্কায়িত এবং ঠিক সেইভাবে যেভাবে ঔষধের

অন্তরালে উপকারিতা ও কল্যাণ লুকিয়ে থাকে। যারা এই অদেখা বা প্রচ্ছন্ন বস্তু অস্বীকার করে তাদের সম্পর্কে তিনি বলেন :

حجت منکر همی آمد که من به غیر ازیں ظاهر نمی بینم وطن هیچ نندیشد که هر جا ظاهر است + آن زحکمت هائے پنہاں فجرست

خود باطنیت + همچو نفع اندر دواها مضمریست فانده هر ظاهر

(অদৃশ্য বস্তুর) অস্বীকারকারীদের যুক্তি হ’ল“আমি এই দৃশ্যমান বস্তুজগত ছাড়া আর কোন জগতই দেখছি না।” তারা এটা চিন্তা করে দেখে না যে, প্রতিটি দৃশ্যমান বস্তু একটি প্রচ্ছন্ন মৌলিক সত্যের হিকমত থেকেই প্রকাশ পেয়েছে। প্রতিটি দৃশ্যমান বস্তুর কল্যাণ ও উপকারিতা তাে একটি প্রচ্ছন্ন বিষয়; যেমন ঔষধ দৃশ্যমান বস্তু, কিন্তু তার অন্তর্বর্তী উপকারিতা প্রচ্ছন্ন।

তার বক্তব্য এই যে, অস্বীকারকারীরা নিজেদের এই বাহ্যদর্শিতা ও সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গীজনিত অভ্যাসের কারণে ঐসব বাতেনী হাকীকতের দর্শন থেকে বঞ্চিত এবং আসল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হতে মাহরাম।

چونکه ظاهر هاگر فتند احمقان + آي دقائق شد ازیشان پس نهان لاجرم محجوب گشتند از غرض + که دقیقه فوت شد در مفترض

বেওকুফেরা যখন কেবল প্রকাশ্য ও দৃশ্যমান বস্তুকে গ্রহণ করল তখন সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিষয়বস্তুর হাকীকত তাদের দৃষ্টির অন্তরালে চলে গেল। এজন্যেই অসহায় এসব লােক উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যভ্রষ্ট হ’ল; একটি কাল্পনিক ও কৃত্রিম বন্ধুর জন্য তাদের হাকীকত তথা মূল সত্যই হারিয়ে গেল।

পঞ্চেন্দ্রিয় থেকে অগ্রসর হয়ে তিনি যুক্তি ও জ্ঞান-বুদ্ধির ওপর সমালােচনার ছুরি চালিয়েছেন এই বলে যে, ‘আলম-ই-গায়ব বা অদৃশ্য জগতের হাকীকত ও আম্বিয়া ‘আলায়হিমু’স-সালামের ইলম ও মা’রিফতের ব্যাপারে যুক্তি ও জ্ঞান-বুদ্ধি সংকীর্ণ ও সীমাবদ্ধ। তার নিকট অনুমানের কোন ভিত্তি নেই, এ জগতের কোন অভিজ্ঞতাও তার নেই। যে সমুদ্রের লবণাক্ত পানির অধিবাসী সে সুপেয় মিষ্টি পানির স্বাদ কি করে বুঝবে?

اسے که اندر چشمه شور است جات تو چه دانی شط وجيحون وفرات

ওহে। লবণাক্ত ঝর্ণার মাঝে তােমার অধিবাস, জীহুন ও ফোরাতের মত সুপেয় নদীর পানির স্বাদ তুমি কী করে বুঝবে।

তিনি সেই যুক্তি ও জ্ঞান-বুদ্ধিকে যা পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের সূচনাপর্বের অধীন, আংশিক জ্ঞান নামে স্মরণ করে থাকেন। তাঁর মতে জল্পনা-কল্পনা ও সংশয় তার পরিণাম এবং অন্ধকার জগত তার স্বদেশভূমি। এই আংশিক জ্ঞানের চেয়ে পাগলামিও ভাল।

عقل جزوی آفتش وهم ست وظن … دست در دیوانگی باید زدن

আংশিক জ্ঞানের বিপদ হ’ল অনুমান ও ধারণা ; কেননা অন্ধকারের মাঝেই তার অধিবাস। আংশিক বুদ্ধি বুদ্ধিকেই দুর্নামের ভাগী করেছে ; দুনিয়ার মতলব মানুষকে। ব্যর্থতার শিকারে পরিণত করেছে। এই জ্ঞান ও বুদ্ধি থেকে অমনোেযােগী হওয়াই ভাল । এর চেয়ে বরং পাগলামি আরও ভাল-অর্থাৎ এরূপ জ্ঞান-বুদ্ধি অপেক্ষা অজ্ঞানতার মাঝে বাস করাও ভাল। ৪

তিনি বলেনঃ আমি স্বয়ং এই দূরদর্শী জ্ঞান-বুদ্ধির অভিজ্ঞতা লাভ করেছি, অতঃপর আমি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি।

از مردم عقل دور اندیش را بعد ازیں دیوانه سازم خویش را

এই দূরদর্শী বিদ্যা-বুদ্ধিকে আমি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখেছি এবং এই অভিজ্ঞতা লাভের পরই আমি নিজেকে পাগল বানিয়েছি।

অতঃপর মওলানা সােজা, সরল ও সহজবােধ্য ভাষায় বলেন, যদি ‘আকল (জ্ঞান ও যুক্তি-বুদ্ধি) দীনের হাকীকত ও মারিফত বুঝবার জন্য যথেষ্ট হত তাহলে তার্কিক, দার্শনিক, পণ্ডিত ও মুতাকাল্লিমগণই সবচেয়ে বেশী আল্লাহওয়ালা (আরিফ) এবং ধর্মের সূক্ষ্ম রহস্য সম্পর্কে ওয়াকিফহাল হতেন।

اندریں بحث از خردره بین بدی فخر رازی راز دار دین بدے

মনসুর হাল্লাজ এর কারামত

মনসুর হাল্লাজ এর কারামত

মনসুর হাল্লাজ এর জেলখানার অলৌকিক ঘটনা। 

মনসুর হাল্লাজ এর কারামত

খাজা বাবার কারামত।

গোলামুর রহমান বাবা ভান্ডারীর কারামত।

খাজা বাবার কারামত।

খাজা বাবার কারামত।

 

 

 

মারেফতের জ্ঞান কিভাবে অর্জন করতে হয় বা আধ্যাত্বিকতা জাগরনের পদ্বতি।

মারেফতের জ্ঞান কিভাবে অর্জন করতে হয় বা আধ্যাত্বিকতা জাগরনের পদ্বতি।

মারেফতের জ্ঞান কিভাবে অর্জন করতে হয়ঃ সৃষ্টিগত ভাবে আমাদের প্রত্যেকের মধ্যে মারেফত বা আধ্যাত্বিকতা লুকায়িত রয়েছে। কারন আমাদের প্রত্যেকের উৎপত্তি পরমাত্মা থেকে। আর আধ্যাত্বিকতার মুল হচ্ছে পরমাত্মা। কিন্তু মারেফত বা আধ্যাত্বিকতা সকলের মধ্যে প্রকাশ পায়না। যাদের মন যতটুকু পরিমান পরমাত্মার নিকটে অবস্থান করে ততটুকু পরিমান আধ্যাত্বিকতাই তাদের মধ্যে জাগরিত হয়। কিন্তু দুঃখের বিষয় হচ্ছে পৃথিবিতে খুব অল্প সংখ্যক লোকের মনের ভাব পরমাত্বার ভাবের কাছাকাছি রয়েছে। আর যাদেরই বা কাছাকাছি রয়েছে তাও খুব অল্প ভাব। কারন মানুষের ভাবনা পরমাত্মার দিকে যেতে চায় না। মানুষ পরমাত্মার ভাবনা ভাবতে চায় না। মনুষ ভাবতে চায় না তার মূল কোথায়? সে কোথা থেকে এসেছে? তাই মানুষ তার মূল পরমাত্মা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। ফলে তাদের মনে আধ্যাত্বিকতাও জাগ্রত হয় না।

মোটকথা যে যতটূকু পরমাত্মার সাথে বা সৃষ্টির মুলের সাথে সংযুক্ত রয়েছে তার ততটুকু আধ্যাত্বিকতা রয়েছে। আর আমাদের সাথে পরমাত্মার বা সৃষ্টির মূলের সম্পৃক্ততা নেই বলে আমাদের আধ্যাত্বিক জাগরনও হয় না।

মারেফত

আর কারো খুব অল্প আকারে মারেফতের জ্ঞান বা আধ্যাত্বিকতা জাগরিত হয়। আবার কারো একটু বেশি জাগ্রত হয়। তবে চুরান্ত পর্যায়ে জাগ্রত হয় কেবল মহাপুরুষদের মাঝে। আর এই পৃতিবীতে মহাপুরুষ বড়ই দুর্লভ। তবে যার মধ্যে যতটুকু মারেফতের জ্ঞান বা আধ্যাত্বিকতা জাগরিত হয় ততটুকুকে লালন করে আস্তে আস্তে আধ্যাত্বিকতা বাড়াতে হয়। কারন আধ্যাত্বিকতা জাগরন কোন সাধারন বিষয় নয়। এটা সৃষ্টিগত ভাবে মনের মধ্যে থাকতে হয়। আর সৃষ্টিগত ভাবে মনের মধ্যে না থাকলে এটা জাগানো সম্ভব নয়।

উপরে উল্লেখিত কথাগুলি সকলের জন্য প্রযোজ্য নয়। এটা শুধু উচু স্তরের সাধকদের বেলায় প্রযোজ্য। কারন আধ্যাত্বিকতার চুরান্ত পর্যায়ে পৌছার অনুভুতি ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। এটা বর্ণনা দেওয়াও সম্ভব নয়। যে ঐ স্তরে পৌছেছে কেবল সেই তা বুঝতে পারবে। এই জন্য আধ্যাত্বিক মহাপুরুষ জালাল উদ্দিন রুমি (রহ) বলেছেন, যদি সূর্য পৃ্থিবীর কাছে চলে আসে পৃথিবী তা সহ্য করতে পারবে না। পৃথিবী জ্বলে পুরে ছারকার হয়ে যাবে। সেই রুপ ভাবে মানুষের হৃদয়ে যদি হঠাৎ উচু স্তরের আধ্যাত্বিকতা প্রকাশ পায় তাহলে মানুষ সহ্য করতে পারবেনা। মানুষের হৃদয় জ্বলে পুরে ছারকার হয়ে যাবে।

উপরের কথাগুলি এইজন্য বললাম যে, আমরা আধ্যাত্বিকতার অল্প অনুভুতি পেয়েই মনে করি যে, এটাই বুঝি আধ্যাত্বিকতার পরিপক্কতা। না এটা মোটেই না। এটা আধ্যাত্বিকতার ছুয়া মাত্র। আমি আগেই বলেছি পূর্ণ আধ্যাত্বিকতা কোন সাধারন বিষয় নয়। পবিত্র মহাগ্রন্থ গীতাতে বলা হয়েছে, সাধুকুলে জন্ম লাভ করা দুর্লভ জনম। অর্থাৎ একজন আধ্যাত্বিক মহাপুরুষের সংস্পর্শে থাকাই দুর্লভ বা পরম সৌভাগ্যের বিষয়। তাহলে পুর্ন আধ্যাত্বিকতা লাভ করা যে কত বড় দুর্লভ বিষয় তা একটু ভেবে দেখুন।

তবে হতাশ হওয়ার কিছু নেই। আমাদের হৃদয়ে আধ্যাত্বিকতা যদি জাগরিত নাও হয় তবুও বার বার শ্রেষ্টা করা উচিত। কারন জাগ্রত করার শ্রেষ্টা করাও পরম সৌভাগ্যের বিষয়। পৃথিবীতে কয়জনই বা এর শ্রেষ্টা করে।

মারেফতের জ্ঞান বা আধ্যাত্বিকতা জাগরনের পদ্ধতি এবং মারেফত কিভাবে অর্জন করতে হয়।

১। পজেটিভ চিন্তা চেতনাঃ

মানুষ কর্মমুখী। কর্ম করেই মানুষকে বাঁচতে হয়। কিন্তু কর্মের মূলে রয়েছে চিন্তা চেতনা বা মনের ভাব। মানুষের প্রত্যেকটি কর্মের মূলে যেন

পজেটিভ চিন্তা থাকে। মানুষ যেন সব সময় সৎ চিন্তা করে। মানুষ যেন সবসময় নিজের সার্থের কথা চিন্তা না করে পরার্থে নিজেকে বিলিয়ে দেয়। মানুষের কোন কর্ম বা চিন্তাই যেন তার নিজের স্বার্থের জন্য না হয়। মানুষ যেন অসৎ চিন্তা থেকে দূরে থাকে। কারন মানুষের মনের প্রিত্যেকটি চিন্তাই মনের মধ্যে স্তরে স্তরে জমা হতে থাকে। আর স্তরে স্তরে জমাকৃত পজিটিভ চিন্তার সমষ্টি যদি অধিক পরিমান হয় তবেই মানুষের মনের মধ্যে আস্তে আস্তে আধ্যাত্বিকতা জাগরিত হতে শুরু করে।

২। ধ্যানঃ

আধ্যাত্বিক জাগরনের জন্য ধ্যান হচ্ছে অন্যতম শক্তিশালী পদ্ধতি। সৃষ্টির শুরু থেকে এখন পর্যন্ত যত মহাপুরুষ পৃথিবীতে এসেছেন তাদের জীবনী থেকে জানা

ধ্যানযায় যে তারা প্রত্যেকেই জীবনের কোন না কোন সময়ে ধ্যান সাধনা করেছেন। যেমন ইসলাম ধর্মের প্রচারক হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) একটানা ১৫ বছর হেরা পর্বতের গুহায় ধ্যান সাধনা করেছেন। বৌদ্ধ ধর্মের প্রচারক গৌতম বুদ্ধ সারাজীবন ধ্যান সাধনা করেছেন। হিন্দু ধর্মের গীতাতে ধ্যান সাধনার উপরেই সবছেয়ে বেশী গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মোট কথা আধ্যাত্বিকতা জাগরনের সবছেয়ে নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি হচ্ছে ধ্যান। ধ্যানের দ্বারাই মানুষ তার নিজের মধ্যে আধ্যাত্বিক জাগরন ঘটাতে পারে।

৩। নিজেকে প্রকৃতিতে বিলিন করে রাখাঃ

এমন ভাবে জীবন যাপন করা যেন জীবনে নিজের কোন ইচ্ছা আকাঙ্ক্ষা না থাকে। সবই যেন প্রকৃতির ইচ্ছা।প্রকৃতির ইচ্ছায় যেন আমরা বেছে আছি। আমার বাড়ী আমার গাড়ী এগুলো যেন কিছুই আমার নয়। এগুলোর প্রতি যেন আমার আধিক মায়া বা আকর্ষন না থাকে।মারেফত আমার বলতে যেন কিছুই নাই। আমি যেন অল্প কয়েকদিনের জন্য এখানে এসেছি। এভাবেই প্রকৃতির কাছে নিজেকে সোপর্দ করতে হবে।এভাবেই নিজের ইচ্ছা আকাঙ্খাকে প্রকৃতির কাছে বিলিন করে দিতে হবে, তবেই মনের মধ্যে আস্তে আস্তে আধ্যাত্বিকতা জাগরিত হবে।

৪। শ্বাস-প্রশ্বাস এর অনুসরনঃ

জন্ম লগ্ন থেকেই আমরা মনের আজান্তে প্রতিনিয়ত শ্বাস প্রশ্বাস নিয়ে চলছি। এই শ্বাস প্রশ্বাস আদান প্রদান আমাদের জ্ঞাতসারে বা অজ্ঞাতসারে ঘটতে থাকে। শ্বাস প্রশ্বাস এর সাথে মনের ভাবের সম্পর্ক রয়েছে। আর মনের ভাবের সাথে আধ্যাত্বিকতার সম্পর্ক রয়েছে। আর যখনই শ্বাস প্রশ্বাস এর অনুসরন করবেন তখনই মন অন্য বিষয় ভাবনা থেকে বিরত হতে শুরু করবে। তখন মন আত্মমুখী হবে।মারেফত

এভাবে মনকে বাহিরের ভাবনা থেকে আত্মমুখী করে তুললে আস্তে আস্তে আধ্যাত্বিকতা জাগরিত হতে শুরু করবে। প্রশ্ন আসতে পারে এটা আপনি কখন করবেন? আপনি প্রতিদিন যে কোন সময় এটা করতে পারেন। যত বেশি করবেন তত ভালো। পারলে সারা দিনই করতে পারেন। কারন এটাতে কাজের কোন ব্যাঘাত ঘটেনা।

৫। গুরু ধ্যান

গুরু ধ্যান হলো মারেফত জাগরনের আরেকটি অন্যতম পদ্বতি। যুগ যুগ ধরে গুরু ধ্যান এর মাধ্যমে তাপসগন আধ্যাতিকতা জাগরন করে আসছেন। এশিয়া মহাদেশের মধ্যে গুরু ধ্যান পদ্বতি খুবই জনপ্রিয়। বিশেষ করে ইন্ডিয়াতে এর প্রচলন সবছেয়ে বেশি। খাজা মইনুদ্দিন চিশ্তি বু আলীশাহ কলন্দর, আমির খছরু নিজামুদ্দিন আউলিয়া সবাই গুরু ধ্যান এর মাধ্যমে আধ্যাতিকতার উচ্চ শিখরে আরোহন করেছিলেন। আবার মধ্যপ্রাচ্যে ও যে সব মহাপুরুষ আধ্যাতিকতার উচ্চ শিখরে পৌছেছিলেন তারা ও এ পদ্বতির মাধ্যমে উচ্চ শিখরে পৌছেছিলেন। আব্দুল কাদের জিলানী,জালাল উদ্দিন রুমি,ইমাম গাজ্জালী তাদের মধ্যে অন্যতম। বাংলাদেশের লালন সাঁই লিখাতে গুরুবাদ এর ধারনা স্পষ্ট ফুটে উঠেছে।

খাজা মঈনুদ্দিন চিশতী (রহঃ) জীবনী-খাজা মুঈনুদ্দীন চিশতীর ইসলাম প্রচার

খাজা মঈনুদ্দিন চিশতী (রহঃ) জীবনী-খাজা মুঈনুদ্দীন চিশতীর ইসলাম প্রচার

খাজা মঈনুদ্দিন চিশতী (রহঃ) জীবনীঃ হযরত খাজা গরীব-উন-নওয়াজ বুরহানুল আশেকীন, সেরাজুস সালেকীন, মুরাসিল মুশকিন, শামছিল আরেফীন, আতায়ে রসূল, সূলতানুল আওলিয়া, রৌশনজামীর, খাজায়ে খাজেগান, পীরে পীরান, কুতুবে রব্বানী, মাহবুকে সােবহানী, হযরত খাজা মঈনুখীন হাসান চিশতী সনজরী দুম্মা আজমেরী (রাঃ) হযরত রসূলে খােদা (সাঃ)-এর পৌত্র হযরত ইমাম হাসান (রাঃ)-এর বংশধর। হযরত খাজা গরীব-উন-নওয়াজের পিতার নাম হযরত সৈয়দ গিয়াসুদ্দীন হাসান সজী । সঞ্জরের অন্তর্গত সিস্তান নামক স্থানে হযরত খাজা বুজুর্গ জন্মগ্রহণ করেন। শৈশব ও বাল্যকাল সিস্তানেই তিনি অতিবাহিত করেন। যখন তার বয়স ১৫ বছর তখন তার আব্বা পরলােক গমন করেন। মরহুম আব্বার রেখে যাওয়া সম্পত্তির অংশ যা তিনি পেলেন তার পরিমাণ ধনী হওয়ার জন্য কম ছিল না। খাজা মঈনুদ্দিন চিশতী (রহঃ) জীবনী

খাজা মঈনুদ্দিন চিশতী (রহঃ) সম্পুর্ন জীবনী পড়তে এখানে ক্লিক করুন।

একদিন খাজা ইব্রাহিম (রঃ) নামের এক মজ্জুব (আল্লার প্রেমে উদাস বুজুর্গ) ভার আঙ্গুর বাগানে প্রবেশ করলেন। হযরত খাজা গরীব-উন-নওয়াজ মজ্জুবের প্রতি ভক্তি শ্রদ্ধা নিবেদনের পর একগুচ্ছ তাজা আঙ্গুর তার খেদমতে পেশ করলেন। হযরত খাজা ইব্রাহিম অত্যন্ত সন্তুষ্ট চিত্তে আঙ্গুর ভক্ষণ করলেন এবং কুলির মধ্য থেকে কয়েকটা দানা বের করে স্বীয় দাত দিয়ে ভেঙ্গে হযরত খাজা বাবাকে খেতে দিলেন। তিনি দানা কয়টি খেয়ে নিলেন। খাওয়ার পরপরই তাঁর অন্তর্দৃষ্টি খুলে গেল এবং দুনিয়ার প্রতি বিতৃষ্ণা জেগে উঠলাে। এরপর তিনি তার সমস্ত সম্পত্তি খােদার রাস্তায় দান করে দিলেন এবং সত্যের সন্ধানে নিজের জন্মভূমি ত্যাগ করে বােখারায় চলে গেলেন।

সে সময় বােখারা জ্ঞানার্জনের কেন্দ্র ছিল। সেখানে যেয়ে কিছুদিনের মধ্যেই তিনি সম্পূর্ণ কোরান শরীফ মুখস্ত করে ফেললেন। অর্থাৎ হাফেজে কোরানের মর্যাদা অর্জন করলেন। কিন্তু বেশীর ভাগ লেখকের মতে তিনি তাঁর গ্রামের মকতবে ৭ বছর বয়সেই সম্পূর্ণ কোরান শরীফ মুখস্ত করে হাফেজ হওয়ার সম্মান লাভ করেন। তারপর অতি অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি ধর্মের বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষা সমাপ্ত করে আল্লাহ রাম্বুল আলামিনের পথের পথিকদের অনুসন্ধানে বের হলেন।

ইরাকের অন্তর্গত নিশাপুর তখন ধর্মীয় ও বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রাণকেন্দ্র ছিল এবং এই নিশাপুরের অদূরে হারূন নামক স্থানে তখন প্রখ্যাত কামেল বুজুর্গ হযরত খাজা ওসমান হারুনী কুন্দেসা ছিররুহুল বারী-এর খানকাহ শরীফ ছিল। হযরত খাজা বাবা এই কামেল বুজুর্গের নিকট বয়াত গ্রহণ করে ধন্য হলেন। মুরিদ হওয়ার পর ২০ বছর তিনি স্বীয় পীরের খেদমতে নিয়ােজিত ছিলেন। এই সময়ের মধ্যে তিনি ১২ বার তার মুর্শেদের সাথে দেশ ভ্রমণ করেন। তখন পায়ে হেঁটে চলা ব্যতীত অন্য কোন ভ্রমণ উপযােগী বাহন ছিল না, যার জন্য সব ভ্রমণগুলােই তারা পায়ে হেঁটে সম্পন্ন করেছেন।

প্রত্যেক ভ্রমণের সময়েই মুরশেদের প্রয়ােজনীয় মালপত্র স্বীয় মস্তকে বহন করে নিয়ে যেতেন। খেলাফতপ্রাপ্তি ও সাজ্জাদানশীন হওয়ার পর স্বীয় মুর্শেদ হতে বিদায় নিয়ে বাগদাদের আলিয়া মাদ্রাসায় উপস্থিত হলেন। পরে সরকারে দোজাহান হযরত রসূলে মকবুল (সাঃ)- এর নির্দেশে ৪০ জন সঙ্গীসহ হিন্দুস্থান অভিমুখে রওয়ানা হন। এ সময়ে হিন্দুস্থানে হিন্দুরাজাদের রাজত্ব এবং হিন্দু বসবাসকারীদের সংখ্যাই ছিল সবচে বেশি। অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের সংখ্যা ছিল নামমাত্র। হযরত খাজা হিন্দুস্থানে প্রবেশ করে প্রথমে লাহােরে দাতা গঞ্জেবস্ (রঃ)-এর মাজার শরীফে চল্লিশ দিন অবস্থান করেন। সেখান থেকে সরাসরি তিনি দিল্লিতে আগমন করেন এবং কিছুদিন অবস্থান করেন।

এ সময় হতেই তিনি ইসলাম প্রচারে আত্মনিয়ােগ করেন এবং হিন্দু ধর্মবিলম্বীদের প্রতি ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনা করে ইসলাম গ্রহণের অনুরােধ জানান। হিন্দুদের নিকট এ প্রস্তাব গ্রহণ করা দুঃসাধ্য হয়ে দেখা দেয়। তারা এ প্রচারের বিরুদ্ধে প্রতিরােধ গড়ে তুলে এবং খাজা বুজুর্গের ক্ষতি সাধনে মনােনিবেশ করে। কিন্তু স্বয়ং আল্লাহ যার সহায় মানুষ তার কি করতে পারে? হিন্দুদের মধ্য হতে একজন শক্তিশালী যুবক হুজুরকে শহীদ করার জন্য মাহফিলে প্রবেশ করে। সংগে তার তীক্ষ্ণধার এক ছােরা লুকিয়ে রেখে সামনে এগিয়ে এসে সুযােগের অপেক্ষা করতে থাকে। হজুর তার মনােভাব বুঝতে পেরে সুধামিশ্রিত কণ্ঠে বললেন, “চুপচাপ আছ কেন? ছুড়ি বের করে নিজের কাজ সমাধান কর অযথা সময় নষ্ট করে লাভ কি?” এ কথা শােনার সাথে সাথেই সে ভীত হয়ে পড়ল এবং খাজা বাবার এ অলৌকিক ক্ষমতা দেখে তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ল এবং নিজের কৃতকর্মের জন্য হজুরের পায়ে মাথা রেখে কাঁদতে লাগলাে। খাজা বুজুর্গ তাকে ক্ষমা করলেন।

তখন সে অত্যন্ত পবিত্র অন্তরে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলাে। পরবর্তী সময়ে সে নিজেকে খাজা বাবার গােলামিতে আবদ্ধ করার সংকল্প ঘােষণা করলাে। এ সংবাদ অতি দ্রুত হিন্দু সমাজের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়লাে। ফলে দলে দলে বিধর্মীরা এসে হজুরের নিকট ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে লাগলাে। (আল্হামদুলিল্লাহ)।

খাজা মঈনুদ্দিন চিশতী (রহঃ) এর ২৫ টি বানী

হিন্দুরাজাদের মধ্যে তখন পৃথ্বীরাজ ছিল খুব শক্তিশালী এবং তার রাজধানী ছিল আজমীরে। খাজা গরীব-উন-নওয়াজ তাই দিল্লি ছেড়ে আজমীর অভিমুখে রওয়ানা হলেন এবং যথাসময়ে আজমীর পেীছে প্রথমেই পৃথ্বীরাজকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণের জন্য অনুরােধ জানালেন। কিন্তু এ সৌভাগ্য তার ললাটে ছিল না। তাই সে ঈমানও আনল না বরং পাল্টা আক্রমণ, নির্যাতন ও নানা প্রকার অসুবিধায় ফেলার জন্য যা যা করা দরকার তার কোন কিছুই বাকি রাখল না। প্রথম প্রথম ক্ষুদ্র শক্তি প্রয়ােগে কাজ না হওয়ায় পরে শাদী দৈত্যকে খাজা বাবার বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলল এবং শাদী দৈত্য বিরাট বিরাট পাথর পাহাড়ের ওপর থেকে খাজা বাবার মজলিসের ওপর নিক্ষেপ করতে লাগলাে। কিন্তু খাজা বাবার ইশারায় পাথরগুলাে দূরে যেয়ে পড়তে লাগলাে। শাদী দৈত্য খাজা বাবার কোন ক্ষতি সাধনই করতে পারলাে না। এত বড় শক্তিশালী দৈত্যকে নিয়ােগ করেও যখন রাজা কোন সুবিধা করতে পারলাে না তখন হিন্দুস্থানের সর্বশ্রেষ্ঠ যাদুকর স্বীয় ভ্রাতা জয়পাল যােগীকে ডেকে পাঠালাে।

জয়পালের ছােট হতে বড় বড় সব যাদু যখন বিফল হলাে তখন সে তার সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ যাদু প্রয়ােগ করলাে কিন্তু তবু কোন কাজ হলাে না। জয়পাল অস্থির হয়ে উঠল এবং চিন্তা করতে লাগল এ লােক কোনু শক্তির অধিকারী, যার জন্য এ বিদেশীদের সামান্যতম ক্ষতিও সে করতে পারলাে না, তখন জয়পালের স্থির বিশ্বাস হলাে খাজা বুজুর্গ নিশ্চয়ই অলৌকিক-ঐশী শক্তির অধিকারী যা অন্য কোন ধর্মাবলম্বীদের পক্ষে অর্জন করা সম্ভব নয়। কেননা, সে জানতাে যে সারা ভারতবর্ষে এমন কোন শক্তিধর যােগী-তাপস নেই যে তার একটিমাত্র যাদুর মােকাবেলা করতে সক্ষম হবে। যার অগ্নিবাণ নিক্ষেপে পাথর পর্যন্ত স্কুলে যায়, অথচ এ কোন শক্তি বলে বলিয়ান যার কাছে সমস্ত যাদুই ধুলিস্যাৎ হয়ে গেলাে!

সমস্ত ব্যাপারটা উপলব্ধি করতে পেরে জয়পাল গরীবে নওয়াজের মজলিসে প্রবেশ করলাে এবং খাজা বাবার কদম মােবারকে মস্তক রেখে ইসলামের নিকট আত্মসমর্পণ করলাে । ইসলাম গ্রহণ করার পরে জয়পাল আবদুল্লাহ নাম গ্রহণ করে নিজেকে খাজা বুজুর্গের একজন প্রধান খাদেম হিসেবে নিয়ােজিত রাখার সৌভাগ্য অর্জন করলেন। জয়পালের যােগসাধনার পেছনে উদ্দেশ্য ছিল অমরত্ব লাভ করা। খাজা গরীব-উন-নওয়াজ তার মনের অভিপ্রায় জানতে পেরে রাবুল আলামিনের দরবার হতে তার এ প্রার্থনা মঞ্জুর করিয়ে আনলেন। তখন হতে তার মর্যাদা হলাে “খিজিরে বিয়াবান” (বন জঙ্গলের খিজির) এবং বিয়াবান শব্দটি নামের সাথে যুক্ত হয়ে নাম হলাে আবদুল্লাহ বিয়ানী। এরপর হতে তিনি আবদুল্লাহ বিয়ানী নামেই খ্যাত। ভারতের অন্তর্গত মধ্যপ্রদেশের কুরুপাণ্ডবে অবস্থিত একটা পাহাড়ী জঙ্গল (সেটা এখন আবদুল্লাহ বিয়ানের জঙ্গল নামে পরিচিত), সেখানে তার আস্তানাকে কেন্দ্র করে প্রতিবছর ফারুনে বিরাট মেলা বসে এবং প্রথম বৃহস্পতিবার ফাতেহা হয়। পৃথ্বীরাজের সমস্ত লােকজন ঈমান আনলেও পৃথ্বীরাজ কিন্তু ঈমান আনল না। অবশেষে খাজা বুজুর্গ দুঃখিত হয়ে পৃথ্বীরাজকে লিখে পাঠালেন, “মা তুরা জিন্দাহ মুসলমানানে সপরদেম।” অর্থ-আমরা জীবিত বন্দী অবস্থায় তােমাকে মুসলমানদের হাতে অর্পণ করলাম।”

এ চিঠি দেয়ার পরপরই সুলতান শাহাবুদ্দীন মােহাম্মদ ঘােরীর সাথে পৃথ্বীরাজের যুদ্ধ সংঘটিত হয় এবং যুদ্ধে পৃথ্বীরাজ জীবিত বন্দী হয়। পরে তাকে হত্যা করা হয়। খাজা বাবা জীবনের চল্লিশটি বছর হিন্দুস্থানের মাটিতে স্রষ্টার সৃষ্টিকে সঠিক পথে নিয়ােজিত করার জন্য প্রচেষ্টা চালিয়ে গেছেন। লক্ষ লক্ষ বিধর্মী নরনারী স্বেচ্ছাপ্রণােদিত হয়ে ইসলামের মহানুভবতায় মুগ্ধ হয়ে হযরত খাজা বুজুর্গকে পাওয়ার আশায় তার হাতে হাত রেখে ইসলামের প্রতি ঈমান এনে মুসলমান হয়েছে এবং হযরত খাজা বাবার গােলামি লাভ করে গৌরবান্বিত হয়েছে। ৬৩৩ হিজরীর ৬ই রজব রােববার দারুল খায়ের, আজমীর শরীফে হযরত খাজা বুজুর্গ ইহলােক বর্জন করেন (তাঁর বেসাল শরীফ অর্থাৎ মহামহিমের সাথে মহামিলন ঘটে)। রুহ মােবারক দেহত্যাগ করার পর তার পেশানী মােবারকে (ললাটে) নূরের অক্ষরে লেখা ছিল “মাতা হাবীবুললাহ ফি হুব্বিল্লাহু” অর্থাৎ খােদার প্রেমে খােদার বন্ধু বিদায় নিল।

রওজা মােবারক আজমীর শরীফের দারুলখায়েরে জাতিধর্ম নির্বিশেষে সকল দর্শনপ্রার্থীদের জন্য আজও উন্মুক্ত রয়েছে। আল হামদুলিল্লাহ আলা জালেক।

হযরত খাজা মঈনুদ্দিন চিশতী (রহঃ) জীবনী-ও ১০ টি বানী শুনতে এখানে ক্লিক করুন।

ম্যায় গােলাম খাজাকা তলব কি রাহুমে হাম জিত্ কা সার্মা সমঝতে হ্যায়। দ্বারে খাজা কো বাবে মনজিলে ইরফান সমঝুতে হায় খােদাওন্দে জাহাঁ কে লুছে খাজা ইয়ে দিওয়ানে তােমহারে নাম কো ভি ম্যায় ইমা সমঝতে হয়। নিগাহোঁ মে তােমহারি হায় হাদীসে মুস্তফা খাজা তােমহারি গােতােগা কো শারহে কোৱা সমঝুতে হ্যায় হামে খাজা হে উলফাত হায়, গােলামে সনজরী হাম হ্যায় হর এক মুশকিল কো আপনি জিত মে আসা সমতে হায়। ইয়ে মানা, আয়ে মুঈনুদ্দীন! তুমছে দূর হ্যায়, লেকিন তােমহে হর ওয়াক্ত আপনে দিল মে হাম মেহম সমতে হ্যায় ।

– মনসুর আজমেরী

আমি খাজার গােলাম অনুসন্ধানের পথকে আমি জীবন উপকরণ মনে করি খাজার দরবারকে পরিচয়ের ঠিকানা মনে করি। খােদার জগতে প্রেমে, খাজা আমি দিওয়ানা। তােমার নামকেও ঈমানের মূল মনে করি। তােমার দৃষ্টিতে আছে মােস্তফার হাদীস, হে খাজা, তােমার প্রবচনকে কোরানের সারমর্ম মনে করি। প্রেমিক আমি খাজার গােলাম সনজরীর দুঃখকষ্ট প্রতিটিকে, তােমার স্মরণে সহজ মনে করি। মানি, আছি আমি তােমা হতে বহু দুরে হে মুঈনুদ্দীন, কিন্তু মেহমান তুমি মাের অন্তরে সতত।

খাজা মঈনুদ্দিন চিশতী (রহঃ) এর সম্পূর্ণ জীবনী পড়তে এখানে ক্লিক করুন।

ইমাম গাজ্জালী (রহঃ) এর জীবনী

ইমাম গাজ্জালী (রহঃ) এর জীবনী

ইমাম গাজ্জালী (রহঃ) এর জীবনীঃ শৈশব থেকেই আমার স্বভাব ছিল সব কিছু বিচার-বিশ্লেষণ করে দেখা এবং যে কোন তথ্য সম্পর্কে অবহিত হওয়ার জন্য চিন্তা-ভাবনা করা। প্রতিটি ফের্কা ও দলের সঙ্গে আমি মিশতাম এবং তাদের আকীদা ও ধ্যান-ধারণা সম্পর্কে অবহিত হবার চেষ্টা করতাম। এর ফলে ক্রমে ক্রমে আমা থেকে তাকলীদ তথা অন্ধ পরানুগত্যের বন্ধন ছুটে যায়। যে আকীদা-বিশ্বাস শৈশব থেকেই আমার মস্তিষ্কে দানা বেঁধেছিল তা নড়বড়ে ও শিথিল হয়ে পড়ে। আমি লক্ষ্য করলাম যে, একজন খৃষ্টান ও একজন ইহুদি তাদের নিজ নিজ ‘আকীদাবিশ্বাসের ওপর লালিত-পালিত হয়। প্রকৃত ইলম এই যে, তাতে কোন প্রকার সন্দেহের এতটুকু অবকাশ কিংবা আশংকা থাকবে না।

উদাহরণত, আমার এ ব্যাপারে স্থির বিশ্বাস আছে যে, দশ সংখ্যাটি তিন-এর অধিক। এখন যদি কেউ বলে, “তিন সংখ্যাটিই অধিক এবং আমি আমার দাবির সপক্ষে আমার এই লাঠিটাকে সাপ বানাতে পারি”, অতঃপর তিনি যদি তা বানিয়ে দেখিয়েও দেন তবুও তা আমার জ্ঞানের ক্ষেত্রে এতটুকু সন্দেহ কিংবা সংশয় সৃষ্টি করবে না। আমি বিস্মিত হব ঠিকই, কিন্তু তা আমার স্থির ও নিশ্চিত বিশ্বাসে এতটুকু চিড় ধরাতে পারবে না। আমার বিশ্বাস অটল ও অনড় থাকবে যে, তিনের চেয়ে দশ বেশী। আমি গভীরভাবে ভেবে দেখে বুঝতে পারলাম যে, এ ধরনের নিশ্চিত জ্ঞান কেবল অনুভূতিলব্ধ ও অপরিহার্য সত্য সম্পর্কিত বিষয়াবলীর গণ্ডীতে সীমাবদ্ধ। কিন্তু যখন আরও বেশী সাধনা চালালাম তখন জানতে পারলাম, এতেও সন্দেহের অবকাশ পুরােপুরি বিদ্যমান। আমি দেখলাম যে, পঞ্চেন্দ্রিয়ের মধ্যে সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী ইন্দ্রিয় হচ্ছে দৃষ্টিশক্তি, অথচ এতেও ভুল হয়।

আমার এই সন্দেহ এত দূর বৃদ্ধি পেল যে, আমার ইন্দ্রিয়ানুভূতির নিশ্চিত হবার ব্যাপারে কোন নিশ্চয়তাই থাকল না। পুনরায় আমি বুদ্ধিবৃত্তির ওপর গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করলাম। কিন্তু তাকে ইন্দ্রিয়ানুভূতির চেয়েও বেশী সন্দেহযুক্ত পেলাম। প্রায় দু’মাস অবধি আমার এই দোদুল্যমান অবস্থা চলতে থাকল এবং আমার ওপর সােফিষ্ট মতবাদের প্রাধান্য বজায় রইল। অতঃপর আল্লাহ পাক আমাকে এই বিমারী থেকে আরােগ্য দান করলেন এবং আমার স্বভাবে সুস্থতা ও ভারসাম্য ফিরে এল এবংবুদ্ধিবৃত্তিক ও যুক্তিনির্ভর অপরিহার্য সত্যের ওপর তৃপ্তি ফিরে পেলাম, বরং এটি ছিল আমার অন্তরাত্মায় আল্লাহপ্রদত্ত নূরের আকস্মিক ঝলকানি। এই ব্যাধি থেকে আরােগ্য লাভ করবার পর এখন আমার সামনে চারটি দল রয়ে গেল-যাদের সত্য-সন্ধানী বলে মনে হচ্ছিল।

মুতাকাল্লিমীন-যারা জ্ঞান ও বুদ্ধিবৃত্তির অধিকারী বলে দাবি করত; বাতেনীদের দাবি ছিল যে, তাদের নিকট বিশেষ শিক্ষামালা গুপ্ত রহস্য আছে এবং তারা সরাসরি নিস্পাপ ইমাম (ইমামে মা’সূ’ম) থেকে হাকীকতে ‘ইলম তথা জ্ঞানের হাকীকত হাসিল করেছে; দার্শনিকদের বক্তব্য হ’ল, কেবল তারাই যুক্তিবাদী এবং কেবল তারাই দলীল-প্রমাণের ভিত্তিতে কথা বলেন। সূফীগণ নিজেদেরকে কাশফ ও হৃদ তথা অন্তর্দৃষ্টি ও পর্যবেক্ষণ জ্ঞানের অধিকারী মনে করেন। আমি প্রতিটি দলের কিতাবাদি ও চিন্তাধারা অধ্যয়ন করলাম। কিন্তু কারাে ব্যাপারেই নিশ্চিন্ত হতে পারিনি। ইলমে কালাম সম্পর্কে এই বিষয়ের বিশেষজ্ঞদের (মুহাক্কিক) রচিত গ্রন্থাদি পড়ি এবং নিজেও এই বিষয়বস্তুর ওপর বই-পুস্তক লিখি। আমি দেখলাম যে, যদিও এটি এমন একটি বিষয় যা স্বীয় উদ্দেশ্য পূরণ করে, কিন্তু তা আমাকে সান্ত্বনা প্রদানের জন্য যথেষ্ট নয়। কেননা তার ভেতর এমন সব প্রস্তাবনার ওপর ভিত্তি রাখা হয়েছে যা সম্মুখস্থ প্রতিপক্ষের পেশকৃত এবং মুতাকাল্লিমীন (ধর্মতাত্ত্বিক) যেগুলােকে কেবল অন্ধ আনুগত্যের কারণে মেনে নিয়েছেন অথবা তা ইজমা কিংবা কুরআন ও হাদীছ-এর নয়।

এসব জিনিস সেই ব্যক্তির মুকাবিলায় খুব একটা কার্যকর নয়, যারা যুক্তিসঙ্গত অপরিহার্য সত্য ছাড়া আর কিছু স্বীকার করে না। দর্শন সম্পর্কে মতামত কায়েম করবার জন্য প্রথমে আমি গবেষণামূলক মনােভঙ্গী নিয়ে তা করাকে অত্যাবশ্যক মনে করলাম যদিও অধ্যাপনা ও পুস্তক রচনায় অত্যন্ত ব্যস্ত থাকায় ফুরসত মিলত খুব কম। আমার দরসের মাহফিলে বাগদাদের তিন-তিন শ’ ছাত্র যােগদান, করত। এতদসত্ত্বেও আমি এজন্য কিছুটা সময় বের করে নিলাম এবং দু’ বছরের ভেতরই দর্শনের তাবৎ জ্ঞান-ভাণ্ডার অধ্যয়ন করে দেখলাম। অতঃপর এক বছর পর্যন্ত এর ওপর চিন্তা-ভাবনা করলাম। আমি দেখলাম, তাদের জ্ঞান ছয় প্রকারের ঃ যথাঃ অংকশাস্ত্র, যুক্তিবিদ্যা, প্রকৃতিবিদ্যা বা প্রাকৃতিক বিজ্ঞান, রাষ্ট্রনীতি, নীতিশাস্ত্র ও ধর্মশাস্ত্র। প্রথম পাঁচ প্রকারের জ্ঞানের সঙ্গে ধর্মের হাঁ-না কোন সম্পর্কই নেই এবং ধর্মের ইতিবাচক দিক সপ্রমাণ করবার জন্য সে সবের অস্বীকৃতিরও কোন প্রয়ােজন নেই। কতক দৃষ্টিভঙ্গির ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের সাথে ধর্মের টক্কর লাগে, কিন্তু তা কতিপয় জিনিসে মাত্র।

এই ব্যাপারে নীতিগতভাবে এই ‘আকীদা পােষণ করতে হবে যে, প্রকৃতি বা স্বভাব আল্লাহর এখতিয়ারাধীন এবং বিজ্ঞান স্বয়ম্ভর ও স্বশাসিত নয়। অবশ্য যে সমস্ত লােক ঐ সমস্ত জ্ঞান ও নিবন্ধে দার্শনিকদের মেধা ও সূক্ষ্মদৃষ্টি লক্ষ্য। কবে তারা সাধারণত ভীত ও সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে এবং মনে করে যে, জ্ঞানের সকল শাখা-প্রশাখায়ই বুঝি তাদের এরূপ অধিকার রয়েছে! অথচ এটা জরুরী নয় যে, কোন ব্যক্তির জ্ঞান-বিজ্ঞানের একটি বিশেষ শাখায় অতুলনীয় দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা আছে বলে এর সব শাখাতেই তার দক্ষতা থাকবে। এরপর যখন তারা এই সমস্ত লােকের মধ্যে ধর্মহীনতা ও ধর্মকে অস্বীকার করবার মানসিক প্রবণতা লক্ষ্য করে তখন তারা এসব জ্ঞানী ও বিজ্ঞানীদের প্রতি অন্ধ আনুগত্যবশত ধর্মকে অস্বীকার এবং ধর্মের ভূমিকাকে হাল্কা ও খাটো করে দেখবার প্রয়াস পায়।

অপরদিকে ইসলামের কতক নাদান দোস্ত দার্শনিকদের প্রতিটি দৃষ্টিভঙ্গি ও মতামত এবং তাদের প্রতিটি দাবিকেই প্রত্যাখ্যান করাকে তাদের অবশ্য পালনীয় কর্তব্য বলে গণ্য করেন এবং এটাকে তারা ইসলামের খিদমত বলে মনে করেন। এমন কি তারা প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে তাদের সকল অনুসন্ধান ও পর্যবেক্ষণকেও অস্বীকার করতে এগিয়ে যান। এর একটি ক্ষতিকর প্রতিক্রিয়া এই যে, যে সব লোেক তাদের বিজ্ঞান সম্পর্কীয় মতামত ও দৃষ্টিভঙ্গির সত্যতার ব্যাপারে নিশ্চিত এবং তাদের নিকট সে সব বস্ত প্রমাণিত ,সত্যের চূড়ায় উপনীত, উপরিউক্ত ধর্মান্ধতার কারণে তাদের ইসলাম সম্পর্কে আকীদাই নড়বড়ে হয়ে যায় এবং দর্শনশাস্ত্র অস্বীকার করার পরিবর্তে তারা ইসলাম সম্পর্কেই বিরূপ ধারণা পােষণ করতে থাকেন।

মােট কথা, আমি এই সিদ্ধান্তে পৌছলাম যে, দর্শনশাস্ত্র দ্বারা আমার চিত্ত সান্ত্বনা পাবে না এবং বুদ্ধি একাকী সকল উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য আয়ত্ত করতে পারে না বা সকল অসুবিধা দূর করবার ক্ষমতাও রাখে না।

থাকল বাতেনীয়া সম্প্রদায়। এ সম্পর্কে আমার গ্রন্থ ‘মুস্তাজহিরী’ রচনা করতে গিয়ে তাদের মযহাব সম্পর্কে বেশ ভালভাবে অধ্যয়ন করার সুযােগ পেয়েছিলাম। আমি দেখতে পেলাম তাদের ‘আকীদার ভিত্তি যুগের ইমামের শিক্ষার ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু যুগের ইমামের অস্তিত্ব ও তার সত্যতা প্রমাণ সাপেক্ষ বস্তু এবং এ দু’টোই সীমাতিরিক্ত সন্দেহে ভরপুর। এখন রইল কেবল তাসাওউফ। সার্বক্ষণিকভাবে তাসাওউফের প্রতি আমি মনােনিবেশ করলাম। তাসাওউফ যেমন জ্ঞানগত বিষয়- তেমনি ব্যবহারিক বিষয়ও বটে। আমার কাছে জ্ঞানগত ব্যাপার অনেকটা সহজ ছিল। আমি আবু তালিব মক্কীর “তু’ল-কুব, হারিছ মুহাসিবীর রচিত গ্রন্থাদি ও হযরতজুনায়দ বাগদাদী, হযরত শিবলী,হযরত আবু ইয়াযীদ বিস্তামী (র)-এর ‘মালফুজাত’ পড়লাম এবং ইলম-এর রাস্তা ধরে যা কিছু অর্জন করা যায় তা অর্জন করলাম। অতঃপর আমি বুঝতে পারলাম যে, মূল হাকীকত তথা আসল সত্য পর্যন্ত শিক্ষার মাধ্যমে নয়, বরং প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা, যওক বা স্বাদ, তন্ময় সাধনা ও অবস্থার পরিবর্তনের দ্বারা পৌছা যায়।

যে জ্ঞান আমার পুঁজি ছিল, চাই তা শরীয়ত সম্পর্কিত হােক অথবা বুদ্ধিবৃত্তিক, তারা আমি আল্লাহর অস্তিত, নবুওত ও আখিরাতের (পারলৌকিক জীবনের) ওপর সুদৃঢ় ঈমান লাভ করেছিলাম। অবশ্য তা কেবল দলীল-প্রমাণের ভিত্তিতেই নয়, বরং ঐ সব কার্যকারণ, ঘটনাপরম্পরা ও বিচিত্র অভিজ্ঞতার মাধ্যমে লাভ করেছিলাম যার বিস্তারিত বর্ণনা দেওয়া মুশকিল। আমার কাছে এটা বেশ ভাল রকম পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল যে, পারলৌকিক সৌভাগ্য লাভের পন্থা কেবল তাকওয়া তথা আল্লাহ-ভীতি অবলম্বন করা এবং তথা প্রবৃত্তিকে তার কামনা থেকে ফিরিয়ে রাখা। এজন্য যে কৌশল অবলম্বন করতে হবে তা হল, এই নশ্বর পৃথিবীর মায়া ও আকর্ষণ ত্যাগ করে পারলৌকিক জীবনের প্রতি আকর্ষণ বাড়ানাে এবং পূর্ণ একাগ্রতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে আল্লাহর দিকে মনােনিবেশের মাধ্যমে অন্তরের দুর্নিবার স্বাভাবিক আকর্ষণকে দুনিয়া থেকে ছিন্ন করা। আর তা একমাত্র পার্থিব শান-শওকত, ধন-সম্পদ, মান-মর্যাদা ও ভােগ-লালসার আকর্ষণ পরিত্যাগ করার মাধ্যমেই সম্ভব হতে পারে। আমি আমার অবস্থা গভীরভাবে নিরীক্ষণ করলাম। 

বুঝতে পারলাম যে, আমার আপাদমস্তক পার্থিব আসক্তির কঠিন শিখরে আবদ্ধ। আমার সর্বোত্তম আমল হিসাবে শিক্ষা দান ছিল উল্লেখ করার মত। কিন্তু গভীরভাবে অনুসন্ধান চালাতে গিয়ে বুঝতে পারলাম, আমার গােটা সাধনা ও মনঃসংযােগই ছিল সেই সমস্ত জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রতি যা তেমন গুরুত্বপূর্ণ ছিল না এবং আখিরাতের স্বার্থের প্রতিও তা তেমন কল্যাণকর ছিল না। আমার অধ্যাপনার পেছনে যে নিয়ত ক্রিয়াশীল ছিল সে সম্পর্কে আমি ভেবে দেখলাম এবং বুঝতে পারলাম যে, তা একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর উদ্দেশ্যে ছিল না, বরং তার পেছনে পার্থিব শান-শওকত বৃদ্ধি, প্রভাব-প্রতিপত্তি কায়েম ও সুখ্যাতি অর্জনের মানসিকতাটাই সর্বাধিক সক্রিয় ছিল। আমার নিশ্চিত বিশ্বাস হ’ল যে, আমি ধ্বংসােনুখ নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে আছি। আমি যদি আমার অবস্থার সংস্কার সাধনে প্রয়াসী না হই তা হলে আমার জন্য তা কঠিন বিপদের কারণ হবে।

দীর্ঘকাল পর্যন্ত আমি এই সব ছেড়ে-ছুঁড়ে বাগদাদ পরিত্যাগ করার চিন্তাভাবনা করতে থাকি। কিন্তু চূড়ান্ত ফয়সালায় উপনীত হতে ব্যর্থ হই। ছ’মাস এরূপ দ্বিধা-দ্বন্দের মাঝে কেটে যায়। কখনাে পার্থিব কামনা-বাসনা আমাকে আকৃষ্ট করত, আবার কখনাে আমার ঈমান আমাকে ডেকে বলত, “যাত্রার সময় নিকটবর্তী, জীবন বড় ক্ষণস্থায়ী, অথচ চলার পথ অনেক দীর্ঘ। এই সব “ইলম ও আমল স্রেফ লােক দেখানাে ভণ্ডামি ও প্রতারণা ছাড়া আর কিছু নয়।” কখনাে আমার ‘নফস(শয়তানী প্রবৃত্তি) আমাকে বলত, “এসব সাময়িক চিত্তবৈকল্যমাত্র। আল্লাহ পাক তােমাকে যা কিছু প্রভাব-প্রতিপত্তি ও মান-মর্যাদা দান করেছেন- বাগদাদ ছেড়ে দেবার পর যদি আবার কখনাে ফিরে আস তাহলে এগুলাে আবার ফিরে পাওয়া তােমার পক্ষে মুশকিল হবে।” মােট কথা, এই উভয়বিধ টানাপােড়েনের মাঝে আরও ছয়টি মাস কেটে গেল, এমন কি পরিস্থিতি আমার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। আমার মুখের ভাষা হ’ল বন্ধ, যেন কেউ আমার মুখে তালা লাগিয়ে দিয়েছে। আমি চেষ্টা করতাম আমার নিকট আগত ও নির্গত লােকদের (ছাত্র ও অতিথি-অভ্যাগত) মনস্তৃষ্টির জন্য একই দিনে সব কিছু পড়িয়ে দিই। কিন্তু কি করব, আমার জিহ্বা আমার সহযােগিতা করছিল না এবং আমার মুখ দিয়ে একটি শব্দও উচ্চারিত হচ্ছিল না।

জিহ্বা ও মুখের এই আড়ষ্টতা আমার অন্তরে দুশ্চিন্তা ও বেদনার সৃষ্টি করল, যার ফলে আমার হযম শক্তিও লােপ পেতে লাগল, এমন কি এক চুমুক পানি পান ও এক লােকমা খাদ্য হযম করাও আমার জন্য কষ্টসাধ্য হয়ে উঠল। ক্রমান্বয়ে আমার শারীরিক শক্তিতেও ভাটা দেখা দিল। শেষাবধি চিকিৎসকেরাও আমার চিকিৎসার ব্যাপারে নিরাশ হয়ে পড়লেন এবং বললেন: আসলে অসুখ আপনার হৃদয়-অভ্যন্তরে এবং তার প্রতিক্রিয়া দেখা দিচ্ছে আপনার সর্বশরীরে। যতদিন আপনার মন থেকে এ অসুখ না সারবে ততদিন পর্যন্ত কোন চিকিৎসাই ফলপ্রসূ হবে না। অগত্যা আমি আল্লাহর শরণাপন্ন হলাম এবং নিতান্ত অসহায়ভাবে কাতর স্বরে তাঁকে ডাকতে লাগলাম। এর ফলে আমার পক্ষে এই প্রভাব-প্রতিপত্তি, পদ-মর্যাদা, ধন-সম্পদ ও পরিবার-পরিজন সব কিছু ছেড়ে দেওয়া সহজ মনে হতে লাগল। আমি মক্কা শরীফ গমনের অভিপ্রায় ব্যক্ত করলাম। আমার অন্তরের এই বাসনা ছিল যে, আমি শামও সফর করব। এরপর অত্যন্ত চমৎকারভাবে আমি বাগদাদ ত্যাগ করবার বন্দোবস্ত করে ফেললাম।

ইরাকবাসী যখন আমার অভিপ্রায় সম্পর্কে অবহিত হ’ল তখন তারা চতুর্দিক থেকে আমাকে ভৎসনা করতে লাগল। কেননা কারাের ধারণায় এটা আসছিল যে, এত সব কিছু ছেড়ে দেবার পেছনে কোন ধর্মীয় কারণ থাকতে পারে। কেননা তাদের ধারণায় আমি তাে ধর্মীয় খিদমতের জন্য সর্বোচ্চ পদটিতে সমাসীন ছিলামই। অতঃপর জনমনে নানারূপ জল্পনা-কল্পনা শুরু হল। যারা রাজধানী থেকে দূরে অবস্থান করতেন তারা মনে করলেন যে, এর ভেতর সরকারী কর্মকর্তাদের ইশারা-ইঙ্গিত রয়ে গেছে অর্থাৎ সরকারী কোপানলই আমার এ ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের পেছনে কাজ করছে। কিন্তু যাঁরা সরকারী মহলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত তারা দেখছিলেন যে, সরকারী মহল আমাকে ধরে রাখবার জন্য কি প্রাণান্তকর কোশেশই না করছে। তারা বলেছিলেন, ইসলামের এই রওনক ও জ্ঞানমার্গের এই উজ্জ্বল জোতিষ্কের ওপর কারাে বদনজর পড়েছে, আর তাইতেই তিনি সব কিছু অবহেলায় ত্যাগ করে নিরুদ্দেশের পথে পা বাড়িয়েছেন। এ ছাড়া তাদের আর কিই-বা বলার থাকতে পারে!

মােট কথা, আমি বাগদাদ ত্যাগ করলাম। আমার নিকট মাল-মাস্তা যা কিছু ছিল, চলার মত কিছু রেখে বাকী সব কিছুই বিলি-বণ্টন করে দিলাম। বাগদাদ থেকে আমি শামে এলাম এবং সেখানে দু’বছরের কাছাকাছি থাকলাম। সেখানে আমার কাজ রিয়াযত ও মুজাহাদা, নিঃসঙ্গ জীবন যাপন ও নির্জনতা অবলম্বন ছাড়া আর কিছুই ছিল না। ইলমে তাসাওউফ থেকে আমি কিছু হাসিল করেছিলাম। সেই মুতাবিক তাযকিয়ায়ে নফস তথা আত্মশুদ্ধি, চারিত্রিক সংশােধন, পরিমার্জন ও আল্লাহর যিকিরের জন্য নিজ কলবকে পরিকৃতকরণের কাজে মগ্ন থাকি। অনেক দিন পর্যন্ত আমি দামেস্কের মসজিদেই ই’তিকাফরত ছিলাম। মসজিদের মিনারে আরােহণ করতাম এবং সমস্ত দিন দরজা বন্ধ করে সেখানেই বসে থাকতাম।

অবশেষে আমি বায়তুল-মুকাদ্দাসে আসি। সেখানেও আমি দৈনিক মসজিদে সাখরার অভ্যন্তরে চলে যেতাম এবং দরজা বন্ধ করে সময় কাটাতাম। অতঃপর সায়্যিদুনা হযরত ইবরাহীম (আ)-এর রওয়া যিয়ারতের পর আমার মনে হজে বায়তুল্লাহ ও যিয়ারতে রওযা পাক (সা)-এর প্রবল বাসনা জাগ্রত হ’ল এবং মক্কা মুকাররামা ও মদীনা মুনাওয়ারার বরকত লাভ করে উপকৃত হবার খেয়াল জাগল। অনন্তর আমি হজ্জে গমন করলাম। হজ্জ করার পর পরিবার-পরিজনের প্রতি স্বাভাবিক আকর্ষণ ও সন্তান-সন্ততির ডাকে আমাকে দেশে ফিরতে হ’ল, অথচ একদিন দেশের নাম শুনলেই আমি কয়েক মাইল পালাতাম। সেখানে গিয়েও আমি একাকিত্বের মাঝেই কাটাবার ব্যবস্থা করলাম, আত্মশুদ্ধির ব্যাপারে এতটুকু অলসতার প্রশ্রয় দিলাম না। কিন্তু নানান ঘটনা-প্রবাহ, পরিবার-পরিজনের চিন্তা ও অর্থনৈতিক প্রয়ােজন তথা জীবিকার তাগিদ আমার স্বভাব ও প্রকৃতিতে বিশৃঙ্খল অবস্থার সৃষ্টি করত এবং এতে মনের একাগ্রতা ও চিত্তের প্রশান্তি অখণ্ডভাবে জুটত না।

কিন্তু তাতে আমি নিরাশ হতাম না; সময় সময় এ থেকে বরং লাভবানই হতাম। এভাবে কাটিয়ে দিলাম দশটি বছর। এই নির্জন নিঃসঙ্গ মুহূর্তগুলােতে আমার নিকট যে সব রহস্য উদঘাটিত হয়েছে এবং আমি যা লাভ করেছি তার বিস্তারিত বর্ণনা দান সম্ভব নয়। তবে পাঠকের উপকারের জন্য এতটুকু অবশ্যই বলব যে, আমি নিশ্চিতভাবেই অবহিত হয়েছি যে, কেবল সূফীরাই আল্লাহর পথের পথিক। তাঁদের সীরাত (জীবনচরিত)-ই সর্বোত্তম সীরাত, তাদের পথই সর্বাধিক সুদৃঢ়, তাঁদের আখলাক তথা নৈতিক চরিত্রই সর্বাধিক ট্রেনিংপ্রাপ্ত, বিশুদ্ধ ও সঠিক। বুদ্ধিজীবীদের বুদ্ধি, জ্ঞানীদের হিকমত ও শরীয়তের সূক্ষ্ম রহস্যবিদদের ইলম মিলেও যদি তাদের সীরাত ও নৈতিক চরিত্র থেকে উত্তম কিছু আনতে চায় তবে তা সম্ভব নয়। তাদের সকল প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য গতি ও স্থৈর্য নবুওতের প্রদীপালােক থেকে উৎসারিত এবং নবুওতের জ্যোতি থেকে বড় কোন আলাে এ ধরার বুকে নেই যা থেকে আলাে-কণা পাওয়া যেতে পারে।

জনসমাবেশের দিকে প্রত্যাবর্তন:-

সম্ভব ছিল ইমাম গাযালী (র) এই নিঃসঙ্গ জীবন ও নির্জনতার মাঝেই থেকে যেতেন এবং বাকী জীবনও রূহানী আনন্দ উপভােগ এবং একাগ্রতার আরাম ও পরিতৃপ্তির মাঝেই কাটিয়ে দিতেন। কিন্তু আল্লাহ তা’আলা তার থেকে যে বিরাট মহান খিদমত নিতে চাচ্ছিলেন তার জন্য অপরিহার্য ছিল যে, তিনি নির্জনবাস থেকে বেরিয়ে আসবেন এবং পঠন-পাঠন, রচনা সংকলন ও সামাজিক জীবন এখতিয়ার করবেন যাতে করে গােটা সৃষ্টিকুলের কল্যাণ সাধিত হয়, ধর্মদ্রোহী মতবাদ ও দর্শন প্রত্যাখ্যাত হয় এবং জ্ঞানগত ও বুদ্ধিবৃত্তিক উপায়ে ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব ও সত্যতা প্রমাণিত হয়। বিশেষ করে আল্লাহ তা’আলা তাঁকে এমন নিশ্চিত জ্ঞান, বিশ্বাস ও পর্যবেক্ষণের স্তরে পৌঁছে দিয়েছিলেন যে, তৎকালীন মুসলিম বিশ্বে তার থেকে অধিক যথার্থ ও যােগ্য ব্যক্তিত্ব আর কেউ ছিলেন না।

যেহেতু এই কর্মের পেছনে আল্লাহর মঞ্জুরী ছিল এবং ইসলামেরও এর ভীষণ প্রয়ােজন ছিল, এজন্য স্বয়ং তার নিজের মনেই এর অনুপ্রেরণা সৃষ্টি হল এবং এ ধারণাও প্রাধান্য পেল যে, এটি সাধনার ধন এবং এটি আম্বিয়া-ই-কিরাম (‘আ)-এর প্রতিনিধিত্ব, যুগের দাবি ও সর্বোত্তম ইবাদত। তিনি তার নিজ অনুভূতিকে খােদ নিজেই বর্ণনা করেছেন এবং নিঃসঙ্গ জীবন থেকে জনসমাবেশে ফিরে আসার কারণও লিপিবদ্ধ করেছেন।

আমি দেখতে পেলাম যে, দর্শনশাস্ত্রের প্রভাবে তাসাওউফের বহু দাবিদারের গােমরাহী, অনেক ‘আলিম-উলামা’র বে’আমল জীবন ও মুতাকাল্লিমার ত্রুটিপূর্ণ ও দুর্বল প্রতিনিধিত্বের কারণে অধিকাংশ শ্রেণীর ঈমান দোদুল্যমান ও নড়বড়ে হয়ে গেছে এবং আকীদা তথা ধর্মবিশ্বাসের ওপর এর খুবই খারাপ প্রতিক্রিয়া পড়ছে। দর্শনশাস্ত্রজাত বহু লােক শরীয়তের প্রকাশ্য বিধি-বিধান ও হুকুম-আহকামের পালন করে বটে, কিন্তু নবুওত ও দীনের হাকীকতের ওপর তাদের ঈমান নেই। কতক লােক কেবল শারীরিক ব্যায়ামের ধারণায় নামায পড়ে, কেউ পড়ে কেবল সােসাইটি ও নগরবাসীর অভ্যাসের অনুসরণ এবং নিজেদের হেফাজতের জন্য। কতক লােক শর’ঈ হুকুম-আহকামের বস্তুগত সুবিধা লাভ এবং সেগুলাে পালন না করলে জাগতিক ক্ষতি হবে ধারণা করে তা পালন করে। আমি দেখছি যে, আমি সে সব সন্দেহ নিরসন করবার মত যােগ্যতা রাখি এবং সহজেই তা করতে পারি, এমন কি ঐ সব লােককে পর্দান্তরালে প্রেরণ আমার কাছে পানি পান করার চেয়েও অধিকতর সহজ বলে মনে হয়।

এতদৃষ্টে আমার মনে শক্তভাবে এই ধারণার সৃষ্টি হ’ল যে, আমার এই কাজই করা উচিত এবং এটাই সময়ের অপরিহার্য দায়িত্ব ও কর্তব্য। আমি আপন মনেই বললাম, “এই নিঃসঙ্গ ও জনমানবের সঙ্গে সম্পর্কহীন জীবন তােমার জন্য কবে এবং কখন জায়েয হ’ল? রােগ-ব্যাধি চতুর্দিকে ছড়িয়ে গেছে। চিকিৎসক নিজেই আজ রােগী। আল্লাহর সৃষ্ট জগত আজ ধ্বংসের প্রান্তে এসে উপনীত।” অতঃপর আমি বললাম, “এই এতবড় বিরাট ও মহান দায়িত্ব তােমা দ্বারা কিভাবে পালিত হতে পারে। বর্তমান যুগ তাে নবী যুগ থেকে বহু দূরে এসে গেছে। চারদিকে বাতিলেরই রাজত্ব। যদি তুমি আল্লাহর সৃষ্টিজগতকে তাদের প্রিয় ও পরিচিত বস্তুসমূহ থেকে সরিয়ে নিয়ে আসতে চেষ্টা কর তাহলে গােটা যুগ-যমানা তােমার বিরােধী হয়ে যাবে। তুমি একাকী কিভাবে তাদের মুকাবিলা করবে এবং কীভাবে জীবন যাপন করবে।(Imam Gazzali)

এটা তাে তখনই সম্ভব যখন যুগ-যমানা অনুকূল হয় এবং সমকালীন সুলতানও দীনদার হন।” আমি এই বলে আমার মনকে বুঝ দিলাম এবং নিজের জন্য নিঃসঙ্গ ও নির্জন জীবন যাপন জায়েয বলে অভিহিত করলাম। কিন্তু আল্লাহ তা’আলার অন্য কিছু মঞ্জুর ছিল। তিনি তর্কালীন সুলতানের মনে নিজেই একটি বিপ্লবত্মক পরিবর্তন এনে দিলেন। তিনি (সুলতান) আমাকে এই ফেতনা মুকাবিলা করবার জন্য নিশাপুর পেীছবার জন্য জোর তাগিদসহ নির্দেশ দিলেন। সুলতানের এই নির্দেশ এই পর্যায়ের ছিল যে, আমি অনুভব করলাম, যদি আমি এই হুকুম তামিল না করি তাহলে এর পরিণতি সুলতানের অসন্তুষ্টি পর্যন্ত পৌঁছবে। আমি ভাবলাম যে, এবার আমার জন্য আর কোন ওযর অবশিষ্ট রইল না। এরপরও যদি আমি নির্জনতা অবলম্বন করি এবং নিঃসঙ্গ জীবনকেই বেছে নিই তা হবে আমার অলসতা, আরামপ্রিয়তা এবং দায়িত্ব ও কর্তব্যের বােঝা হালকা করবারই নামান্তর, তা হবে পরীক্ষা ও দুঃখকষ্টপূর্ণ অবস্থা থেকে গা বাঁচিয়ে চলবার স্বার্থেই, অথচ আল্লাহ পাক ইরশাদ করেনঃ

أنسب الناس أن يتركوا أن يقولوا امثا وهم يفتنون – ولقد قثا الذين من قبلهم فليعلمن الله الذين صدقوا وليعلمن الكذبين

“মানুষ কি মনে করে যে, আমরা ঈমান এনেছি’ একথা বললেই ওদেরকে পরীক্ষা না করেই অব্যাহতি দেওয়া হবে! আমি তাে এদের পূর্ববর্তীদেরকেও পরীক্ষা করেছিলাম; আল্লাহ অবশ্যই প্রকাশ করে দেবেন কারা সত্যবাদী আর কারা মিথ্যাবাদী”। | -সূরা আনকাবুত, ২-৩ আয়াত। অধিকন্তু রসূল করীম (সা)-এর প্রতি, যিনি তাঁর বান্দাদের মধ্যে সর্বাধিক সম্মানিত ও মর্যাদাবান ছিলেন, ইরশাদ করেনঃ

ولقد كذبت رسل من قبلك فصبروا على ماقبوا وأوثوا حتى أتاهم نصرنا – ولا مبدل لكلمات الله – ولقد جاءك من با المرسلين

“তােমার পূর্বেও অনেক রসূলকে অবশ্যই মিথ্যাবাদী বলা হয়েছিল; কিন্তু তাদেরকে মিথ্যাবাদী আখ্যা দেওয়া ও ক্লেশ দেওয়া সত্ত্বেও তারা ধৈর্য ধারণ করেছিল যে পর্যন্ত না আমার সাহায্য তাদের নিকট এসেছে। আল্লাহর আদেশে কেউ পরিবর্তন করতে পারে না। রসূলদের কিছু সংবাদ তােমার নিকট অবশ্যই এসেছে।”

-সূরা আন’আম, ৩৪ আয়াত।

আমি কতিপয় সূফী ও আধ্যাত্মিক পুরুষের সঙ্গে এ ব্যাপারে পরামর্শ করলাম। তারা সকলেই একমত হয়ে আমাকে নির্জনতা ছেড়ে বেরিয়ে আসবার পরামর্শ দিলেন। এর সমর্থনে আল্লাহর বহু সৎকর্মশীল বান্দা একাদিক্রমে স্বপ্ন দেখেন যা থেকে আমি অবহিত হই যে, আমার এ পদক্ষেপ বিরাট কল্যাণ ও বরকতের কারণ হবে এবং হিজরী পঞ্চম শতাব্দীর শুরুতে যার এক মাস মাত্র বাকী- সম্ভবত কোন বিরাট ও মহান সংস্কারমূলক কাজ হবে। আর তা এজন্য যে, হাদীছ শরীফে এসেছে, “আল্লাহ্ তা’আলা প্রতি শতাব্দীর মাথায় এমন একজন মানুষ পয়দা করেন যিনি এই উম্মতের দীনকে জীবন্ত করে তােলেন।” এই সব আলামত ও কার্যকারণদৃষ্টে আমার মনেও এরূপ আশা জাগরূক হল। 

আল্লাহ তা’আলা আমার জন্য নিশাপুরের সফরের আয়ােজন করে দিলেন এবং আমি এই মহান খিদমতের জন্য নিয়ত করে ফেললাম। এটি ৪৯৯ হিজরীর যি’ল-কাদ মাসের ঘটনা। ৪৮৮ হিজরীর যিল-কাদাঃ মাসে বাগদাদ থেকে বহির্গত হয়েছিলাম। এই হিসাবে দেখা যায় আমি ১১ বছর নির্জন বাস করেছি। এসবই তকদীরে ইলাহীর পরিকল্পিত ব্যবস্থামাত্র। বাগদাদ থেকে বহির্গত হওয়া এবং সেখানকার প্রভাব-প্রতিপত্তি ও পদমর্যাদাকে বিদায় সালাম জানানাে আমার কল্পনায় আসত না, কিন্তু আল্লাহর হুকুমে তা সহজে হয়ে গেল। অনুরূপভাবে আমার এই নির্জনতা অবলম্বন কালীন যুগে নিঃসঙ্গ জীবন থেকে জনসমাবেশের মাঝে পুনর্বার ফিরে যাবার ধারণাও মনে উদয় হ’ত না, অথচ সময়ে তার আয়ােজনও সম্পন্ন হয়ে গেল।

মােটকথা, ৪৯৯ হিজরীর যিল-কাদা মাসে ইমাম সাহেব পুনরায় নিশাপুরের দিকে গতি ফেরালেন। তিনি নিজামিয়া মাদরাসায় অধ্যাপনার কাজে যােগ দিলেন। এবং পুনর্বার অধ্যাপনা ও কল্যাণধর্মী কাজে আত্মনিয়ােগ করলেন। কিন্তু ইমাম | গাযালী (র)-এর এবারকার দরস ও তাদরীস তথা পঠন-পাঠন, সংস্কার ও সৎ পথ প্রদর্শন এবং পূর্বেকার পঠন-পাঠন কার্যক্রম, ওয়াজ-নসীহত ও ইরশাদ-এর মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য ছিল। অনন্তর বিষয়টি তিনি নিজেই পরিষ্কার ভাষায় লিখেছেন :

আমি অনুভব করি যে, যদিও ইলম-এর প্রচার ও প্রসারের দিকে পুনরায় আমি ফিরে এলাম, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে একে আমার প্রথম অবস্থার দিকে প্রত্যাবর্তন বলা ঠিক হবে না। আমার পূর্বের ও পরের অবস্থার ভেতর আসমান-যমীন ফারাক। প্রথমে আমি সেই “ইলম-এর প্রচার করতাম যা প্রভাব ও পদমর্যাদা বৃদ্ধির মাধ্যম ছিল এবং আমি আমার কথা ও কর্ম দ্বারা তারই দাওয়াত দিতাম এবং এটাই ছিল আমার অভীষ্ট লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। কিন্তু এখন আমি সেই “ইলম-এর দাওয়াত দিই যার কারণে পদমর্যাদা ও প্রভাব-প্রতিপত্তির মায়া চিরদিনের তরে কাটাতে হয়। এখন আমি আমার নিজের ও অন্যের সংস্কার ও সংশােধন চাই। আমি জানি না, আমি আমার অভীষ্ট লক্ষ্য পর্যন্ত পৌছুতে পারব কিনা অথবা এর পূর্বেই আমাকে কর্মের জগত থেকে চিরবিদায় নিতে হবে।

কিন্তু নিজস্ব ইয়াকীন ও পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে আমার ঈমান এই যে, আসল শক্তি আল্লাহুরই শক্তি। তারই কারণে মানুষ গােমরাহী ও মন্দ থেকে বাঁচতে পারে এবং হিদায়াত ও আনুগত্যের শক্তি অর্জন করতে পারে। আসলে আমি নিজের তরফ থেকে সচল ও সক্রিয় হইনি, আল্লাহই আমাকে সচল ও গতিশীল বানিয়েছেন। আমি নিজে থেকে কাজ শুরু করিনি, আল্লাহ পাকই আমাকে কাজে লাগিয়েছেন। আমার দু’আ, আল্লাহ পাক প্রথমে আমাকে সংশােধন করুন, অতঃপর আমা দ্বারা অন্যদের সংস্কার ও সংশােধন হােক; প্রথমে আমাকে পথে আনুন, এরপর আমা দ্বারা অন্যদের পথ প্রদর্শনের কাজ নিন। সত্য যেন আমার সম্মুখে উদ্ভাসিত হয় এবং তার বদৌলতে আমি যেন আনুগত্য করার সৌভাগ্য লাভ করতে পারি; বাতিল যেন আমার চোখে উজ্জ্বলভাবে প্রতিভাত হয় এবং আমি যেন তার অনুসরণ থেকে বাছি।

ইমাম গাযালী (র)-এর সংস্কার ও ইসলামী পুনর্জাগরণমূলক কাজঃ

ইমাম গাযালী (র) এরপর যে সংস্কার ও ইসলামী পুনর্জাগরণমূলক কাজ আঞ্জাম দেন তাকে দু’ভাগে ভাগ করা যায়ঃ-

১. দর্শন ও বাতেনী মতবাদের বর্ধিত প্লাবনের মুকাবিলা এবং ইসলামের পক্ষ থেকে সে সবের মূল ভিত্তির ওপর আঘাত হানা।

২. সমাজ ও ব্যক্তিগত জীবনের ইসলামী ও নৈতিক পর্যালােচনা এবং সে সবের ওপর সমালােচনা ও সংস্কার।

দর্শনের ওপর কার্যকর অপারেশন

তাঁর প্রথম ও সর্ববৃহৎ কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের বিস্তারিত বিবরণ এই যে, ধর্মদ্রোহী মতবাদ ও বাতেনিয়াদের বিরুদ্ধে তখন পর্যন্ত যা কিছু করা হচ্ছিল তা ছিল আত্মরক্ষামূলক এবং প্রত্যুত্তর দেওয়ার মাঝেই সীমাবদ্ধ ছিল। সে সময় পর্যন্ত দর্শন ইসলামের ওপর হামলারত ছিল এবং মুতাকাল্লিমগণ ইসলামের সমর্থনে সাফাই পেশ করছিলেন। দর্শনশাস্ত্র ইসলামের মূল বুনিয়াদের ওপর কুঠারঘাত করত এবং ইলমে কালাম ইসলামের ঢাল হবার কোশেশ করত। সেই সময় পর্যন্ত মুতাকাল্লিমগণ ও উলামায়ে ইসলামের ভেতর কেউই স্বয়ং দর্শনের ভিত্তির ওপর আঘাত হানবার সাহস করেন নি। দর্শন যে সব কাল্পনিক ও মনগড়া বিষয়ের ওপর দাঁড়িয়েছিল কয়েক শতাব্দী পর্যন্ত সে সবের ওপর আঘাত হানা এবং সে সবের জ্ঞানগর্ভ সমালােচনা করার হিম্মত কারাে হয়নি। ইমাম আবুল হাসান আশ’আরীকে বাদ দিলে (দর্শনের সঙ্গে যার সরাসরি টক্কর লাগে নি) গােটা “ইলমে কালামের কণ্ঠস্বর তথা উচ্চারণ ভঙ্গী ছিল আত্মরক্ষামূলক।

ইমাম গাযালী (র)-ই প্রথম ব্যক্তি যিনি দর্শনকে বিস্তারিত ও সমলােচনার নিরিখে অধ্যয়ন করেন। এরপর দার্শনিকদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য-এই নামে একটি বই লিখেন। এতে তিনি সহজ সরল ভাষায় বিশ্লেষণমূলক পন্থায়। যুক্তিবিদ্যা, অধিবিদ্যা তথা Metaphysics ও প্রকৃতিবিদ্যার খােলাসা বা সারসংক্ষেপ পেশ করেন এবং পরিপূর্ণ নিরপেক্ষতার সঙ্গে দার্শনিকদের দৃষ্টিভঙ্গি ও আলােচনা লিপিবদ্ধ করেন। গ্রন্থের ভূমিকায় তিনি খােলাখুলিভাবে বলেছেন যে, গণিতশাস্ত্রে আলােচনা কিংবা তর্ক-বিতর্কের সুযােগ নেই এবং ধর্মের সঙ্গে এর ‘হা” বা ‘না’-এর কোনরূপ সম্পর্ক নেই। কিন্তু ধর্মের আসল সংঘর্ষ অধিবিদ্যার সঙ্গে। যুক্তিবিদ্যায়ও খুব অল্পই ভুল আছে। যদি কিছু মতভেদ থাকে তা পরিভাষার ক্ষেত্রে। প্রকৃতিবিদ্যায় অবশ্যই সত্য-মিথ্যার তথা হক ও বাতিলের মিশ্রণ আছে। এজন্য তার আলােচ্য বিষয় প্রকৃতপক্ষে অধিবিদ্যা এবং কিছুটা পরিমাণ প্রকৃতিবিদ্যা। আর যুক্তিবিদ্যা কেবল ভূমিকাস্বরূপ ও পরিভাষার জন্য।

এই গ্রন্থ শেষ করে, যা ইলমে কালামের শিবিরে খুবই দরকার ছিল, তিনি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘তাহাফতুল-ফালাসিফা’ (দার্শনিকদের ভ্রান্তি ও অসঙ্গতি) লেখেন যার জন্যই তিনি মাক “সি ‘দু’ল-ফালাসিফা’ লিখেছিলেন। এতে তিনি দর্শন, অধিবিদ্যা ও প্রকৃতিবিদ্যার ওপর ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে সমালোচনা করেন। এবং তার জ্ঞানগত দুর্বলতা, তার যুক্তি-প্রমাণের অসারতা এবং দার্শনিকদের পারস্পরিক বৈপরীত্য ও মতভেদকে পরিপূর্ণ শক্তি ও সাহসিকতার সঙ্গে প্রকাশ করেন। উক্ত গ্রন্থে তাঁর কণ্ঠস্বর ও উচ্চারণভঙ্গী আবপূর্ণ, তাঁর ভাষা শক্তিশালী ও প্রস্ফুটিত, কোথাও কোথাও তা বিদ্রুপাত্মক ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ ভঙ্গি অনুসরণ করে, যা কিনা দর্শনশাস্ত্রের ভয়ে ভীত ও অভিভূত মহলের জন্য দরকার ছিল। তা পাঠ করলে অনুভূত হয় যে, গ্রন্থের গ্রন্থকার দার্শনিকদের মুকাবিলায় হীনমন্যতাবােধের সামান্যতম মিশ্রণ থেকেও মুক্ত ও পবিত্র, আস্থা ও দৃঢ় বিশ্বাসে তিনি ভরপুর এবং দর্শনশাস্ত্র সম্পর্কে তিনি এতটুকু আতংকিত কিংবা অভিভূত নন।

তিনি গ্রীক দার্শনিকদেরকে তারই কাতারের মানুষ মনে করেন এবং তাঁদের সঙ্গে সমতার ভিত্তিতে ও প্রতিদ্বন্দিতার ভাষায় কথা বলেন। সে সময় এমন একজন লােকেরই দরকার ছিল, যিনি দর্শনশাস্ত্রের চোখে চোখ রেখে কথা বলতে পারেন এবং আত্মরক্ষামূলক ও জবাবদিহির ভূমিকার পরিবর্তে দর্শনশাস্ত্রের ওপর পূর্ণ শক্তিতে আর্ঘাত হানতে পারেন। ইমাম গাযালী (র) তাহাফতুল-ফালাসিফা’ নামক গ্রন্থে এই খেদমতই আঞ্জাম দিয়েছেন। গ্রন্থের ভূমিকায় তিনি লিখেছেনঃ

আমাদের যুগে এমন কিছু লােক জন্মেছে যাদের ধারণা এই যে, তাদের দিল ও দিমাগ তথা মন ও মস্তিষ্ক সাধারণ লােকের তুলনায় বিশিষ্ট। এ সমস্ত লােক ধর্মীয় বিধি-বিধান ও বাধ্যবাধকতাকে অবজ্ঞার চোখে দেখে। এর কারণ একমাত্র এই যে, তারা সক্রেটিস, হিপােক্রেট (Hippocrate-খৃ. পূ. ৪৬০৩৭৭), প্লেটো ও এরিস্টটলের ভীতিপূর্ণ নাম শুনেছে এবং তাদের শানে তাদের অনুরাগী ভক্তবৃন্দের বিরাট স্তুতিপূর্ণ গলগল্প ও লম্বা-চওড়া ফিরিস্তি শুনেছে। তারা জানতে পেরেছে যে, অংকশাস্ত্র, যুক্তিবিদ্যা ও অধিবিদ্যার ক্ষেত্রে তারা (সক্রেটিস প্রমুখ দার্শনিক) বিরাট সূক্ষ্ম দৃষ্টির পরিচয় দিয়েছেন এবং তাদের বুদ্ধি ও মেধার সমকক্ষ কেউ ছিলেন না। তাঁরা তাঁদের উন্নত মস্তিষ্ক ও মেধার সঙ্গে ধর্ম ও তার আনুষঙ্গিক বিষয়ের অস্তিত্ব অস্বীকার করত।

তাদের নিকট তাদের ধর্মের মূলনীতি ও নিয়মবিধি ছিল মনগড়া ও কৃত্রিম। ব্যস, আর কথা নেই, তারাও তাদের গুরুদের অন্ধ আনুগত্যে বাদরামি অনুকরণ করতে গিয়ে ধর্ম অস্বীকার করাকে নিজেদের জন্য একটা ফ্যাশন বানিয়ে নিল। তারা। শিক্ষিত ও প্রগতিশীল নামে অভিহিত হবার খাহেশ মেটাতে ধর্মকে অস্বীকার করতে থাকল যাতে করে তাদের মর্যাদা সাধারণের তুলনায় উন্নত মনে করা হয় এবং তারা যাতে জ্ঞানী-গুণী ও বুদ্ধিজীবীদের কাতারে শামিল হতে পারে। এরই ভিত্তিতে আমি ইচ্ছা করলাম যে, ঐসব জ্ঞানী দার্শনিকরা ঐশী বিদ্যা (অধিবিদ্যা)-র ওপর যা কিছু লিখেছেন সে সবের ভ্রান্তি আমি দেখিয়ে দিই এবং প্রমাণ করে দিই যে, তাদের সংকট, সমস্যাবলী ও মূলনীতিগুলাে। ছেলেমিপূর্ণ এবং তাদের অনেক উক্তি ও দৃষ্টিভঙ্গি সীমাহীন রকমের হাস্যকর।

এই গ্রন্থের সম্মুখে গিয়ে তার বর্ণনাশক্তি ও বিদ্রুপাত্মক লেখনী পদ্ধতি আরও শাণিত ও উদ্ধত হয়ে যায় এবং আল্লাহর সত্তা ও গুণাবলী সম্পর্কে দার্শনিকদের অত্যাশ্চর্য বিষয়সমূহ, বুদ্ধিবৃত্তি ও আকাশমার্গের পুরাে বংশতালিকা লেখেন যা দার্শনিকরা লিখেছেনঃ Imam Ghazzali

ثلنا ماذكرتموه تحكمات وهي على التحقيق ظلمات فرق للمات لو حكاه الانسان عن منام راه لاستدل على سوء مزاجه

তােমাদের এই যে বিস্তৃত বিবরণ, তা কেবল গালভরা দাবি ও স্বেচ্ছাচারিতা ছাড়া আর কিছু নয়, বরং প্রকৃতপক্ষে তা অন্ধকারের ওপর অন্ধকারের প্রলেপ মাত্র। যদি কোন ব্যক্তি তার নিজের দেখা এমন স্বপ্নও বর্ণনা করে তাহলেও তার মস্তিষ্ক বিকৃতির প্রমাণ হবে। সামনে এগিয়ে তিনি লিখেনঃ

الست أدري كيف يقنع المجنون من نفسه بمثل هذه الأوضاع فضلا عن العقلاء الذين يشقون الشعر بزعم في العقولات.

আমার বিস্ময় জাগে যে, পাগলেও কিভাবে এ ধরনের স্বনির্মিত ও স্বকপােলকল্পিত কথার ওপর তুষ্ট হতে পারে। সেখানে জ্ঞানী ও বুদ্ধিজীবীদের কথা তাে ভাবাই যায় না, যারা তাদের নিজস্ব ধারণা মাফিক বােধগম্য বস্তুনিচয় ও সম্ভাবনার ভেতরও চুলচেরা বিশ্লেষণ করে ছাড়েন। অন্যত্র লিখেন ?

انتهى بهم التعمق في التعظيم الي أن أبطلوا كل مايفهم من العظمة وقربوا حاله الميت الذي لاخبر له بما يجري في العالم الا انه فارق الميت في شعوره بنفسه نقط – وهكذا يفعل الله بالزانغين من سبيله والناكبین من طريق الهدى المنکرین لقوله تعالى ما أشهدهم خلق السموات والأرض ولا خلق أنفسهم الظانين بالله ظن السوء المعتقدين أن الأمور الربوبية نستعلی کنهها القوى البشرية المغرورين بعقولهم زاعمين أن فيها مندوحة عن تقليد الرسل واتباعهم فلا جرم اضطروا الى الاعتراف بان لباب معقولاتهم رجع الى مالوحكي في المنام لتعجب منه

প্রথম স্বয়ম্বর সম্মানে উচ্ছাস ও সীমাতিরিক্ততা প্রকাশ করতে গিয়ে তাঁকে (স্বয়ষ্ণু বা প্রথম স্রষ্টাকে) এমন সীমায় পৌঁছে দিয়েছে যে, তারা মর্যাদার সব শর্ত ও আবশ্যকীয় বিষয়াবলীকেও বাতিল আখ্যায়িত করেছে এবং আল্লাহ তা’আলাকে (নিজেদের দর্শনে) সেই মুর্দা লাশের ন্যায় বানিয়ে দিয়েছে যে জানেই না যে, বহির্জগতে কি হচ্ছে কিংবা ঘটছে। অবশ্য এই দিক দিয়ে তিনি (স্রষ্টা, স্বয়ং) মুর্দা অপেক্ষা ভাগ্যবান যে, তার উপলব্ধি ও অনুভূতি শক্তি লােপ পায়নি, বরং তা আছে (আর মৃত লাশের উপলব্ধি, চেতনা কিংবা অনুভূতি থাকে না)। আল্লাহ পাক এ ধরনের লােকদেরকে এমন পরিণতির সম্মুখীন করেন যে, তারা আল্লাহর পথ থেকে দূরে সরে যায়, সৎ ও সত্য পরিত্যাগ করে এবং নিম্নোক্ত আয়াতকে অস্বীকার করে :

ما أشهدهم خلق السموت والأرض ولا خلق أنفسهم

“আর আমি সেই সব কাফির ও মুশরিকদেরকে আসমান ও যমীন সৃষ্টি করবার সময় সাক্ষী বানাই নি, এমন কি তাদের পয়দা করবার মুহূর্তেও না”, যারা আল্লাহর প্রতি কুধারণা পােষণ করে এবং খারাপ আকীদা রাখে, যাদের ধারণা যে, আল্লাহর রবুবিয়তের (পালনবাদ-এর) হাকীকতের ওপর মানবীয় শক্তি প্রভাব বিস্তার করতে পারে, যারা তাদের নিজেদের জ্ঞান ও বুদ্ধিমত্তার ব্যাপারে গর্বিত এবং মনে করে যে, তাদের উপস্থিতি ও বর্তমান থাকা অবস্থায় পয়গম্বরদের অনুকরণ ও আনুগত্যের প্রয়ােজন নেই। নিশ্চিতরূপেই এর পরিণতি এই হয়েছে যে, তাদের মুখ দিয়ে (যুক্তিবুদ্ধির নামে) এমন সব হাস্যকর কথাবার্তার বেরােয়, যদি কেউ এ ধরনের স্বপ্নের বর্ণনাও দেয় তাহলে লােকে বিস্মিত হবে। তাহাফতুল-ফালাসিফার প্রভাব দর্শনশাস্ত্রের ওপর এই সাহসিকতাপূর্ণ সমালােচনা এবং নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত তার প্রতি অবজ্ঞা ও তাচ্ছিল্য প্রদর্শন ইলম-ই-কালামের ইতিহাসে এমন একটি নতুন যুগের সৃষ্টি করে যার সার্বিক কৃতিত্ব ইমাম গাযালীর প্রাপ্য।

পরে শায়খুল ইসলাম ইমাম ইবুন তায়মিয়া (র) এর পূর্ণতা দান করেন এবং দর্শনশাস্ত্র ও যুক্তিবিদ্যার মৃতদেহের “পােস্ট মর্টেম”-এর দায়িত্ব পালন করেন। দর্শনশাস্ত্রের অপারেশনের এই ধারার সূচনাও ইমাম গাযালী (র)-এর রচিত গ্রন্থাদি থেকেই। ‘তাহাফতুল-ফালাসিফা’ দর্শনশাস্ত্রের কাল্পনিক ভােজবাজির ওপর কার্যকর আঘাত হানে এবং তার শ্রেষ্ঠত্ব, মর্যাদা ও মেধাগত পবিত্রতাকে বেশ ক্ষতিগ্রস্ত করে। এই গ্রন্থের রচনা দর্শনশাস্ত্রের জগতে একটি অস্থিরতা, চাঞ্চল্য ও ক্রোধের জন্ম দেয়। কিন্তু শত বছর পর্যন্ত এর প্রত্যুত্তরে কোন উল্লেখযােগ্য গ্রন্থ প্রণীত হয়নি, এমন কি হিজরী ষষ্ঠ শতাব্দীর শেষে দর্শনশাস্ত্রের প্রখ্যাত উৎসাহী প্রবক্তা ও এরিস্টটলের অনুসারী ইব্‌ন রুশদ (মৃত্যু ৫৯৫ হিজরী) “তাহাফতু’ততাহাফুত নামের একটি বইয়ের মাধ্যমে এর জবাব লেখেন। পাশ্চাত্যের বিদ্বানমণ্ডলী বলেন, যে দর্শনশাস্ত্র গাযালী (র)-এর আক্রমণে প্রায় মরণদশায় পৌছে গিয়েছিল, ইব্‌ন রুশদের সমর্থন তাকে এক শ’ বছরের জন্য পুনরায় জীবন দান করে। ১. তাহাফতুল-ফালাসিফা, ৩১ পৃ.। ২. প্রাচ্যে ও পাশ্চাত্যে ইসলামী দর্শনের ইতিহাস-মুহাম্মদ সুফী জুম’আ, পৃ. ৭২।

বাতেনী মতবাদের ওপর হামলা | দর্শনশাস্ত্র ছাড়াও ইমাম গাযালী (র) বাতেনী মতবাদের ফেতনার দিকেও মনােযােগ দেন। তিনি বাগদাদের নিজামিয়া মাদরাসায় অধ্যাপনাকালে বাতেনীদের প্রত্যাখ্যানে ততকালীন খলীফার ইঙ্গিতে ‘আল-মুস্তাজহির’ নামক গ্রন্থ প্রণয়ন করেছিলেন, যার উল্লেখ তিনি তাঁর আত্মজীবনীমূলক ‘আল-মুনকি ‘য’ মিনাদ্দ লাল নামক গ্রন্থে করেছেন। এই গ্রন্থ ছাড়াও এই বিষয়ের ওপর তার আরও তিনটি গ্রন্থ রয়েছে যা সম্বত তার ভ্রমণকালীন সময়ের রচনাঃ হুজ্জাতুল-হক, মুফাসসালু’ল-খিলাফ ও কাসামুল-বাতেনিয়া’। তাঁর গ্রন্থের তালিকায় এই বিষয়ের ওপর Laura ও bluly নামক আরও দুটি গ্রন্থের সন্ধান পাওয়া যায়। বাতেনিয়া মতবাদের প্রত্যাখ্যানের জন্য প্রকৃতপক্ষে আহলে সুন্নাত ওয়াল-জামা’আত মহলে তার চেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তি মেলা মুশকিল ছিল। তিনি দর্শনশাস্ত্র, তাসাওউফ, জাহিরী ইলম ও হাকীকত ও মা’রিফতের উভয় দিককার গলি-ঘুপচি সম্পর্কে ওয়াকিফহাল ছিলেন এবং তিনি বাতেনী মতবাদের রহস্য ভেদ ও তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক ষড়যন্ত্রের পর্দা সহজেই উন্মােচন করতে পারতেন।

বাতেনী মতবাদের বড় অত্র ছিল দর্শনশাস্ত্র ও তার পরিভাষাসমূহ। শুধু ইমাম গাযালী (র)-এর মতই কোন পরিপক্ক ব্যক্তি ও বুদ্ধিবৃত্তির পর্যালােচক সে সবের প্রত্যাখানের কাজটি করতে পারতেন। বাস্তবেও তিনি তাই করেন। তিনি জ্ঞানগত দিক দিয়ে দর্শনশাস্ত্রকে এক নিষ্প্রভ ও গুরুত্বহীন বস্তুতে পরিণত করেন।

জীবন ও সমাজের ইসলামী পর্যালােচনা

ইমাম গাযালী (র)-এর অপর সংস্কারমূলক কাজ ছিল জীবন ও সমাজের ইসলামী পর্যালােচনা এবং তার সংস্কার ও পুনর্জাগরণের প্রচেষ্টা। তার এই প্রচেষ্টার একটি সফল পরিণতি তাঁর জীবন্ত ও চিরন্তন গ্রন্থ “এহইয়াউ উলুমিদ্দীন”। ইসলামের ইতিহাসে যে কতিপয় গ্রন্থ মুসলমানদের দিল ও দিমাগ তথা মন ও মস্তিষ্ক এবং তাদের জীবনের ওপর সর্বাধিক প্রভাব বিস্তার করেছে তার ভেতর “এহইয়াউ উলুমিদ্দীন”-এর নাম সবিশেষ উল্লেখযােগ্য।

‘আলফিয়াহ’ নামক গ্রন্থের লেখক হাফিজ যয়নুদ্দীন আল-ইরাকী (মৃত্যু ৮০৬ হি.), যিনি ইহাতে উল্লিখিত হাদীছগুলাে খুঁজে বের করেছেন, বলেছেনঃ ইমাম গাযালী (র)-এর “এহইয়া উলুমুদ্দীন ইসলামের সর্বোত্তম গ্রন্থের একটি। ইমাম গাযালী (র)-এর সমসাময়িক ও ইমামুল-হারামায়ন-এর শাগরিদ আবদুল গাফির ফারসী বলেন : এহইয়া উলুমুদ্দীন-এর পূর্বে এ ধরনের কোন কিতাব রচিত হয়নি। শায়খ মুহাম্মদ গারুনীর দাবি ছিল, “যদি দুনিয়ার সমস্ত জ্ঞান-ভাণ্ডার নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হয়। তাহলে আমি “এহইয়া উলুমুদ্দীন”-এর দ্বারা পুনরায় তা জীবিত করে দেব।” হাফিজ ইবন জওহী কতিপয় বিষয়ে মতভেদ সত্ত্বেও এই গ্রন্থের প্রভাব ও ব্যাপক জনপ্রিয়তার স্বীকৃতি দিয়েছেন এবং “মিনহাজুল-ক সে দীন” নামে এর সংক্ষিপ্তসার লিখেছেনঃ

এই গ্রন্থটি বিশেষ অবস্থা, মনােভঙ্গি ও বিশেষ প্রেরণা ও উৎসাহ নিয়ে লেখা হয়েছে। বাগদাদ থেকে সত্যের অন্বেষায় এবং সুদৃঢ় প্রত্যয় ও বিশ্বাসের সন্ধানে যে সফর ইমাম গাযালী (র) শুরু করেছিলেন যা সুদীর্ঘ দশটি বছরের কঠোরকঠিন সাধনা, মুজাহাদা ও নির্জনবাসের পর সফলতা লাভের মাধ্যমে শেষ হয়েছিল- “ইহ’য়াউ’ল-উলুম ছিল সেই সফরেরই বিশিষ্ট সওগাত, যা তিনি (গাযালী) স্বীয় দেশবাসীর জন্য বহন করে এনেছিলেন। এটি ছিল তার হৃদয়ের অভিব্যক্তি ও প্রতিক্রিয়া, জ্ঞানগত অভিজ্ঞতা, সংস্কারমূলক ধ্যান-ধারণা এবং হৃদয়ের স্বতঃউৎসারিত আবেগ ও মত্ততাবস্থারই দর্পণ।

মওলানা শিবলী নু’মানী তাঁর “আল-গাযালী (র) নামক গ্রন্থে লিখেছেন :

তার মধ্যে সত্য অনুধাবনের প্রবল আগ্রহ সৃষ্টি হয়। দুনিয়ার বুকে প্রচলিত সকল ধর্ম-বিশ্বাসই খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে তিনি দেখেন। কিন্তু কোনটিই তাকে পূর্ণ তৃপ্তি দিতে পারেনি, আশ্বস্ত করতে পারেনি। শেষাবধি তিনি তাসাওউফের দিকে ঝুঁকে পড়েন। কিন্তু তা মুখে বলে বােঝাবার বস্তু ছিল না, বরং আপাদমস্তক অনুভব করবার বিষয় ছিল। অনুশীলনের মাধ্যমে উপলব্ধি করবার বস্তু ছিল । আর তার পয়লা সৌন্দর্য (3) অভ্যন্তরীণ সংস্কার তথা ইসলাহে বাতেন ও তাযকিয়ায়ে নফস তথা আত্মার পরিশুদ্ধি। ইমাম সাহেবের কর্মব্যস্ততা ও পেশা ছিল এ পথের প্রতিবন্ধক। একদিকে জনপ্রিয়তা, নাম, খ্যাতি, পদমর্যাদা, সম্মান, প্রতিপত্তি, আলােচনা-বিতর্ক, আর অন্যদিকে আত্মার পরিশুদ্ধি। উভয়ের মাঝে সহস্র যােজনের ব্যবধান। শেষ পর্যন্ত তিনি সব কিছু ছেড়ে ছুঁড়ে একটি কম্বলমাত্র পরিধান করে বাগদাদ থেকে বেরিয়ে পড়েন। তখন থেকেই তাঁর প্রান্তর-জীবনের শুরু।

অতঃপর কঠোর রিয়াযত ও মুজাহাদার পর তিনি তাসাওউফের রহস্য উদ্যানে প্রবেশাধিকার লাভ করেন। এখানে পৌঁছার পর স্বীয় অবস্থায় মত্ত হয়ে গােটা জীবন ও জগত থেকে তাঁর বেখবর হয়ে পড়ার আশংকা ছিল। কিন্তু এই অবস্থায়ও সাধারণের কল্যাণের দিকে ছিল তাঁর কড়া নজর। তিনি দেখতে পেলেন, ব্যাপক জনগণের অবস্থা বিগড়ে গেছে। ধনী-দরিদ্র, বিশিষ্ট-অবিশিষ্ট, জ্ঞানী-মূর্খ, চরিত্রবান-দুশ্চরিত্র সকলেরই নৈতিক চরিত্র হয় ধ্বংস হয়ে গেছে, নয়ত হতে যাচ্ছে। উলামা সম্প্রদায়, যারা সত্য পথের দলীলস্বরূপ হতে পারতেন, তারাই জাকজমক ও পদমর্যাদার কাঙাল। এসব দৃশ্য তাকে ব্যথিত করে তােলে। আর তারই প্রতিক্রিয়াস্বরূপ তিনি এই গ্রন্থ রচনা করেন।

ভূমিকায় তিনি নিজেই লিখেছেন, “আমি দেখতে পেলাম, রােগব্যাধি গােটা জগতটাকে ছেয়ে ফেলেছে এবং পারলৌকিক সৌভাগ্যর রাস্তা বন্ধ হয়ে গেছে। উলামা, যারা ছিলেন সত্য পথের দলীলস্বরূপ, ক্রমেই তাদের অস্তিত্ব লােপ পাচ্ছে। আলিম নামধারী যারা এখনাে আছেন, তারা নামকাওয়াস্তে ‘আলিম, ব্যক্তিগত স্বার্থ ও উদ্দেশ্য তাদেরকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে। তাদের মতে, “ইলম স্রেফ তিনটি জিনিসের নাম, যথা : মুনাজারাহ বা পারস্পরিক বিতর্ক অনুষ্ঠান (যা গর্ব, অহমিকা ও যশ লাভের মাধ্যম); ওয়াজ বা বক্তৃতা (যার ভেতর জনসাধারণের মনােরঞ্জনের জন্য রঙীন ও ছন্দোবদ্ধ ছড়া, কবিতা ও শ্লোক আবৃত্তি করা হয়) এবং ফতওয়া প্রদান (যা বিভিন্ন মামলা-মােকদ্দমার ফয়সালার মাধ্যম)। বাকী রইল আখিরাতের ইলম। এটা মূল লক্ষণীয় বিষয় হলেও অধিকাংশ আলিমই তা ভুলে গিয়েছে। এতদৃষ্টে আমি আর ধৈর্য ধারণ করতে পারলাম না। আমার নিস্তব্ধতা ভেঙে চুরে খান খান হয়ে গেল।” 

পর্যালােচনা ও হিসাব-নিকাশ

ইমাম গাযালী (র)-এর গ্রন্থ প্রণয়নের উদ্দেশ্য ছিল ইসলাহ ও তরবিয়ত তথা সংস্কার-সংশােধন ও প্রশিক্ষণ। আর এজন্য জরুরী ছিল সে সব দুর্বলতা ও খারাপ দিকগুলাে চিহ্নিত করা যা শিক্ষা ও ধর্মীয় কেন্দ্রগুলােতে এবং সাধারণভাবে মুসলিম জনসমাজে বিদ্যমান ছিল। অধিকন্তু প্রয়ােজন ছিল, নফস ও শয়তান কিভাবে বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষকে ধোকা দিয়ে রেখেছে, হাকীকতসমূহ কিভাবে বদলে গেছে, মানুষ কিভাবে হাকীকত থেকে সরে গিয়ে বাহ্যিক আবরণ, চাকচিক্য ও রসম-রেওয়াজের মধ্যে নিজেদের বন্দী করে ফেলেছে অর্থাৎ জীবনের মূল লক্ষ্য তথা পারলৌকিক সৌভাগ্য, রি-ই-ইলাহী ও আল্লাহর সন্তুষ্টি থেকে কিভাবে তারা গাফিল হয়ে পড়েছে, তা জনসাধারণের গােচরীভূত করা। এজন্য তিনি স্বীয় যুগের জীবন-যাত্রা ও সমসাময়িক সমাজের কার্যকলাপের পূর্ণ পর্যালােচনা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন এবং প্রতিটি শ্রেণীর রােগ-ব্যাধি ও ত্রুটি-বিচ্যুতি তথা ভুল-ভ্রান্তিগুলাে পরিষ্কার ভাষায় বর্ণনা করেন, লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ও উপায়উপকরণাদির ভেতর পার্থক্য নির্ণয় করেন, “ইলম-এর মধ্যে ধর্মীয় “ইম ও পার্থিব “ইলম, অতঃপর প্রশংসিত ‘ইলম ও নিন্দনীয় ইলম, অতঃপর ফরয-ই-আইন, ফরয-ই-কিফায়া ইত্যাদির শ্রেণী বিন্যাস করেন।

তিনি সময়ের দাবি অপরিহার্য দায়িত্ব ও কর্তব্য এবং মূল কর্মের দিকেও সকলের মনােযােগ আকর্ষণ করেন। ধনিক ও বিত্তশালীদের দায়িত্বহীনতা, গাফিলতি ও তাদের বিশেষ ও যথার্থ রােগ-ব্যাধিগুলাে খােলাখুলি বর্ণনা করেন। সুলতান ও শাসন কর্তৃত্বে সমাসীন ব্যক্তিবর্গের নির্ভীক সমালােচনা করেন এবং তাদের জোর-জুলুম ও নির্যাতন, শরীয়তবিরুদ্ধ কার্যকলাপ ও আইন-কানুনের নিন্দা করেন। এতদ্ভিন্ন তিনি জনসাধারণের ব্যাধিসমূহ, বিভিন্ন শ্রেণীর ও স্থানের গহিত আচরণসমূহ, নিন্দনীয় অভ্যাস এবং ইসলাম বিরােধী ধর্মীয় প্রথা-পদ্ধতি ও বিদ’আতমূলক কর্মের বিস্তারিত বিবরণ দেন।

মােট কথা, এই গ্রন্থটি ইসলামের প্রথম বিস্তারিত ও যুক্তি-প্রমাণভিত্তিক গ্রন্থ যার মধ্যে গােটা জীবনের ও বিগড়ে যাওয়া ইসলামী সমাজব্যবস্থার পরিপূর্ণ খতিয়ান রয়েছে এবং নৈতিক চরিত্রের ব্যাধিগুলাের উৎস ও তার কারণ এবং এর চিকিৎসা-পদ্ধতির ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে।

উলামা ও ধার্মিক ব্যক্তিবর্গ

ইমাম গাযালী (র)-এর মতে, বিশ্বব্যাপী অশান্তি, বিপর্যয় ও ধর্মীয় ও চারিত্রিক অবনতির সর্বাপেক্ষা বড় যিম্মাদার উলামায়ে কিরাম যারা মুসলিম উম্মার জীবনে লবণস্বরূপ। যদি লৰণই নষ্ট হয়ে যায় তাহলে এমন কোন বস্তু আছে যা তাকে ভাল করতে পারে? কবির ভাষায় ঃ

با معشر القراء يا ملح البلد + ما يصلح الملح اذ الملح فسد

ওহে উলামা সম্প্রদায়! তােমরা যারা শহরের লবণসদৃশ, আমাকে বলে দাও, যদি লবণই নষ্ট হয়ে যায় তাহলে আর কি দিয়ে তা ভাল করা যায়? অন্তরের ব্যাধির আধিক্য ও সাধারণ মানুষের গাফিলতির কারণ বর্ণনা করতে গিয়ে এক স্থানে তিনি লিখেছেনঃ

الثالثة وهو الداء العضال فقد الطبيب فان الاطباء هم العلماء وقد مرضوا في هذه الاعصار مرضا شديدة وعجزوا من علاجه

তৃতীয় কারণ এবং সেটাই এমন ব্যাধি যার চিকিৎসা নেই আর তা এই যে, রােগী বর্তমান, কিন্তু চিকিৎসক লাপাত্তা। উলামায়ে কিরাম সমাজের চিকিৎসক আর তারাই এ যুগে ব্যাধিতে সাংঘাতিকভাবে আক্রান্ত। সুতরাং চিকিৎসা করতে তারা অক্ষম।

তাঁর মতে, সুলতান ও শাসকবর্গের খারাপ হবার কারণ ‘উলামায়ে কিরামের কমযােরী এবং স্বীয় দায়িত্ব পালনে তাঁদের গাফিলতি। এক স্থানে তিনি লিখেছেন:

وبالجملة انما فسدت الرعية بفساد الملوك وفساد الملوك بفساد العلماء فلولا القناة السوء والعلماء السوء لقل خوفا من انگار هم

সংক্ষিপ্তসার এই যে, প্রজাবর্গের খারাপ হবার কারণ রাজা-বাদশাহর তথা শাসন কর্তৃত্বে সমাসীন ব্যক্তিবর্গের খারাবী এবং উলামায়ে কিরামের খারাপ হওয়া বাদশাহ তথা শাসকবর্গের খারাপ হবার কারণ। যদি আল্লাহভীতিহীন কাযী ও উলামায়ে (‘সূনীতি, আদর্শ ও চরিত্রহীন স্বার্থসর্বস্ব দুনিয়াদার ‘আলিম) না থাকত তাহলে শাসককুল এভাবে বিগড়ে যেত না, বরং তারা ‘আলিমদের সমালােচনাকে ভয় করেই চলত।

সে যুগের ‘আলিমদের সম্পর্কে ইমাম গাযালী (র)-এর অভিযােগ যে, তারা পূর্ব যুগের আলিম-উলামার ন্যায় আমর বিল-মা’রূফ ওয়া নাহী আনিল মুনকার তথা সৎ কাজে আদেশ ও অসৎ কাজ থেকে নিষেধ এবং অত্যাচারী শাসকের সম্মুখে হক-কথা বলার দায়িত্ব পালন করছেন না। তার মতে, এর কারণ এই যে, ‘আলিম-উলামা দুনিয়াদার হয়ে গেছেন এবং পদমর্যাদার পেছনে ঘুরছেন। তিনি সে যুগের সুলতান ও শাসনকর্তৃত্বে সমাসীন ব্যক্তিবর্গের সম্মুখে সত্যপন্থী উলামায়ে কিরামের সাহসিকতা, নির্ভীকতা ও হিসাব গ্রহণ ও অস্বীকৃতি জ্ঞাপনের প্রভাবমণ্ডিত ঘটনাবলী লিপিবদ্ধ করবার পর বলেনঃ Imam Gazzali

এই ছিল আলিমদের কর্মপদ্ধতি এবং আমর বিল-মা’রূফ ও নাহী আনিলমুনকার’-এর অবস্থা। রাজা-বাদশাহর শান-শওকতের এতটুকু পরওয়া তাদের ছিল না। তারা আল্লাহর অনুগ্রহের ওপর আস্থাশীল ছিলেন এবং নিশ্চিন্ত ও আশ্বস্ত ছিলেন যে, আল্লাহতা’আলা তাদেরকে হেফাজত করবেন। তাঁরা আল্লাহ তা’আলার সেই ফয়সালার ওপরও রাজী ছিলেন যে, তাদের ভাগ্যে শাহাদত লাভ ঘটুক। যেহেতু তাঁদের নিয়ত ছিল ভালো, সেহেতু তাঁদের কথায় পাথরও মােমের মত গলে যেত এবং বিরাট থেকে বিরাটতর পাষাণ হৃদয়ও প্রভাবিত হত।

এখন তাে অবস্থা এই যে, দুনিয়ার লােভ ‘আলিমদের বােবা বানিয়ে দিয়েছে এবং তারা একেবারে নিশ্চুপ। আর যদি কখনও তারা মুখ খােলে তাহলে দেখা যায় তাদের কথা ও কাজের মধ্যে কোন সামঞ্জস্য নেই। ফলে তাদের কথায়ও কোন আছর হয় না। যদি আজও তারা নিষ্ঠা ও সততার সঙ্গে কাজ করেন এবং ইলম-এর হক আদায় করার চেষ্টা করেন তাহলে অবশ্যই তারা কামিয়াব হবেন। কেননা প্রজাবৃন্দের খারাপ আচরণ শাসকবর্গের খারাপ আচরণের পরিণতিমাত্র। আর শাসকবর্গের আচরণের খারাপ দিকগুলাে আলিম-উলামার খারাপ আচরণের পরিণতি ছাড়া কিছু নয়। আলিমদের মন্দ হওয়ার কারণ পার্থিব সম্পদ ও উচ্চ পদমর্যাদা প্রীতি। কেননা যার ওপর দুনিয়ার ভালবাসা চেপে বসে সে উচ্চ পর্যায়ের লােক কিংবা রাজা-বাদশাহদের সমালােচনা করাতাে দূরের কথা, নিম্নশ্রেণীর একটি লােকেরও হিসাব গ্রহণের এবং তার ভুল-ত্রুটিগুলাে ধরিয়ে দেবার সাহস রাখে না।

ইমাম গাযালী (র)-এর যুগে একজন আলিমের জগত ফিকাহের ছােটখাটো ও খুঁটিনাটি ইখতিলাফী মসলা-মাসাইলের ভেতরই সীমাবদ্ধ ছিল। আলােচনাসমালােচনা ও তর্ক-বিতর্কের মজলিস বসত ঘরে ঘরে, দেশের-আনাচে-কানাচে। বাদশাহদের দরবারগুলাের রওনকও ছিল এই সব মাযহাবী ও ফিকহ বাহাছ-মুবাহাছা ও বিতর্কমূলক অনুষ্ঠান। এ ব্যাপারে উলামা ও ছাত্রদের মগ্নতা ও বাড়াবাড়ি এতটা বেড়ে গিয়েছিল যে, অন্যান্য সব জ্ঞান-বিজ্ঞান, পেশা ও দীনী খেদমতের বিভিন্ন বিভাগ উপেক্ষিত হতে চলেছিল। এর সীমা এত দূর বিস্তৃত হয়েছিল যে, আত্মার সংস্কার, চারিত্রিক শালীনতা ও পারলৌকিক সৌভাগ্য যেই ইলম ও প্রয়াসের ওপর নির্ভরশীল তা থেকে সবার মনােযােগ সরে গিয়েছিল। ইমাম গাযালী (র) এই অবস্থা সম্পর্কে সমালােচনা করতে গিয়ে লিখেছেন :

“যদি কোন ফকীহকে সে সব বিষয়ের (সবর, শােকর, আশা ও ভয় অথবা হিংসা, বিদ্বেষ, ঈর্ষা, অকৃতজ্ঞতা, প্রতারণা, ধোকা ইত্যাদির) কোন একটি সম্পর্কে অথবা ইখলাস, তাওয়াক্কুল ও রিয়া থেকে বেঁচে থাকবার পন্থা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয় যা জানা তার জন্য ফরযে আইন এবং এর প্রতি এতটুকু গাফিলতি প্রদর্শনের ভেতর আখিরাত বরবাদ হবার বিপদাশংকা বিদ্যমান, তাহলে তিনি জবাব দিতে পারবেন না। আর যদি (ক) লি’আন, (খ) জিহার সবক ও (গ) রমী সম্পর্কে তাকে জিজ্ঞাসা করা হয় তাহলে তিনি এর জবাবে এমন সব সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ও খুঁটিনাটি বিষয়ের অবতারণা করবেন, বহুকাল ধরে যার কোন আবশ্যকতা দেখা দেয় নি এবং কখনাে যদি দেখাও দেয় তাহলে শহরে এ সম্পর্কে ফতওয়া দেবার মত লােকের কোন অভাব নেই। অথচ দেখা যাচ্ছে, এই সব ‘আলিম দিনরাত শুধু এই জাতীয় খুঁটিনাটি বিষয় নিয়েই মাথা ঘামাচ্ছেন এবং মুখস্থ করে এগুলােরই পাঠ দানে ব্যাপৃত রয়েছেন। অপরদিকে তারা সেই সব বিষয় থেকে পরাঙ্মুখ রয়েছেন যা ধর্মীয় দিক দিয়ে তাদের জন্য জরুরী। যদি কখনাে তাদেরকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হয় তাহলে তারা বলেন ; আমরা এই ইলম-এর ভেতর মশগুল রয়েছি এজন্য যে, এটা ধর্মীয় ‘ইলম ও ফরযে কিফায়া। 

তারা তাদের শিক্ষা দান ও শিক্ষা গ্রহণ সম্পর্কে নিজেদেরকেও ভুল পথে পরিচালিত করেন এবং অন্যদেরকেও বিভ্রান্ত করেন। অথচ বুদ্ধিমান ও সমঝদার মানুষ বেশ ভালভাবেই জানেন যে, যদি তাদের উদ্দেশ্য হয় ফরযে কিফায়ার হক আদায় করা এবং স্বীয় যিম্মাদারীর হাত থেকে মুক্ত হওয়া, তাহলে তারা সেই ফরযে কিফায়ার ওপর এই ফরযে ‘আইনকে অগ্রাধিকার দিতেন। তাছাড়া আরাে কিছু কিছু ফরযে কিফায়া আছে যেগুলাের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া উচিত। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, বহু শহর এমন রয়েছে যেখানে কেবল অমুসলিম চিকিৎসক রয়েছেন যাদের সাক্ষ্য ফিকহী বিধানে কবুল করা যায় না। অথচ আমরা দেখতে পাই না যে, কোন ‘আলিম (এই কমতি ও যরুত অনুভব করে) চিকিৎসাশাস্ত্রের দিকে মনােযােগ দিয়েছেন, বরং দেখা যায় এর মুকাবিলায় ছাত্ররা ইলমে ফিক্হ, বিশেষ করে বিরােধিতা ও বিতর্কমূলক বিষয়ের ওপরই ঝাপিয়ে পড়ছে। প্রকৃতপক্ষে এ ধরনের ‘আলিম দ্বারা শহর ভতি যাদের একমাত্র কাজ ফতওয়া প্রদান ও মসলা-মাসায়েল বাৎলে দেওয়া। আমার উপলব্ধিতে আসে না, উলামায়ে দীন শুধু এ ধরনের ফরযে কিফায়ার ভেতর মশগুল হওয়াকে কিভাবে সঠিক মনে করেন এবং এমন ফরযকে কিভাবে তারা পেছনে ফেলে রাখেন যার প্রতি এখনই মনােযােগ দেওয়া জরুরী। এর কারণ কি এই যে, চিকিৎসাশাস্ত্রের মাধ্যমে ওয়াক্ফ সম্পত্তির মুতাওয়াল্লী, য়াতীমের ধন-সম্পদের তত্ত্বাবধায়ক

এবং কাযী বা মুফতী হওয়া যায় না কিংবা সমবয়সীদের ওপর প্রাধান্য অর্জন

এবং দুশমন ও প্রতিপক্ষের ওপর নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব লাভ করা যায় না। অন্য এক স্থানে লিখেছেন ?

এমন অনেক ফরযে কিফায়া আছে যেগুলাের দিকে দৃষ্টি দেবার কেউ নেই। ‘আলিম-উলামাদেরও সে দিকে বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ নেই। বেশি দূর যাবার দরকার নেই। চিকিৎসাশাস্ত্রের কথাই ধরুন। অধিকাংশ মুসলিম শহরে কোন মুসলিম চিকিৎসক নেই, অথচ একমাত্র তাদের সাক্ষ্যই শর’ঈ বিষয়াবলীতে নির্ভরযােগ্য। উলামায়ে কিরামের এই পেশার প্রতি এতটুকুও আকর্ষণ নেই। অনুরূপভাবে আমর বিল-মা’রূফ ও নাহী আনিল-মুনকারও ফরযে কিফায়া (কিন্তু এটিও পরিত্যক্ত হচ্ছে)।

তিনি এক স্থানে মূর্খতা, অলসতা ও দীন-ধর্ম সম্পর্কে ব্যাপক অজ্ঞতার এবং তাবলীগ ও সাধারণ তা’লীমের অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেনঃ যে ব্যক্তির নিজের দীন সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা ও উদ্বেগ আছে সে তাবলীগ ও তালীম ছেড়ে এমন সব বিষয় নিয়ে, যা কদাচিৎ ঘটে, কখনাে ব্যস্ত থাকতে পারে না। | কেন ইখতিলাফী মসলা-মাসাইল বিগত যুগগুলােতে অত্যধিক গুরুত্ব ও জনপ্রিয়তা লাভ করেছেঃ “উলামায়ে কিরাম কেন একে নিজেদের মেধা ও পরিশ্রমের ক্ষেত্র বানিয়ে নিয়েছেন? ইমাম গাযালী (র)-এর মতে এর কিছু ঐতিহাসিক কারণ রয়েছে এবং সে সবের ফলে এমনটি হওয়া বিলকুল স্বাভাবিক ছিল। তিনি লিখেছেন।

মহানবী (সা)-এর পর তাঁর স্থলাভিষিক্ত হযরত খুলাফায়ে রাশেদীন (রা) নিজেরা স্বয়ং বড় ‘আলিম, ফকীহ ও ফতওয়া দানের অধিকারী ছিলেন। তাই তাদের কদাচিৎ কোন বিশেষ অবস্থায় অন্য কোন জ্ঞানী ও বিজ্ঞ সাহাবা (রা)-এর দ্বারস্থ হবার প্রয়ােজন হ’ত। ফলে ‘আলিম সাহাবীরা পারলৌকিক “ইলম-এর মধ্যেই ডুবে ছিলেন। যদি কখনও কোন ফতওয়া এসে উপস্থিত হত তাহলে তাঁরা এ ব্যাপারে প্রয়ােজনীয় ব্যবস্থা অবলম্বনের জন্য নিজেদের মধ্যে যােগ্যতর ব্যক্তিকেই অগ্রাধিকার দিতেন এবং নিজেরা সার্বক্ষণিকভাবে আল্লাহর ধ্যানে নিবিষ্ট থাকতেন। যখন সে সব লােকের পালা আসল যারা খিলাফতের হকদার বা যােগ্য ছিলেন না এবং যাদের ভেতর কোন বিষয়

ফয়সালা করার বা ফতওয়া দেবার যােগ্যতা ছিল না তখন থেকেই ‘উলামায়ে | কিরামের প্রত্যক্ষ সাহায্য-সহযােগিতার প্রয়ােজন দেখা দেয়। অযােগ্য শাসকরা ‘আলিমদের নিজেদের সঙ্গে রাখতে শুরু করে যাতে তাদের থেকে ফতওয়া লাভ করা যায়। তাবি’ঈ’ আলিমদের ভেতর তখনও এমন লােক | জীবিত ছিলেন যারা প্রাচীন ভাবধারার অনুসারী ছিলেন এবং যাদের ভেতর দীনের হাকীকত ও প্রাচীন বুযুর্গদের শান জাগরূক ছিল। যখন তাদেরকে ডাকা হ’ত তখন তারা শাসকদের এড়িয়ে চলতেন এবং তাদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতেন। তাই খলীফারাই বাধ্য হয়ে (বনী উমায়্যা ও বনী ‘আব্বাস) তাদেরকে খুঁজে বের করতেন। সে যুগের মানুষ যখন ‘উলামাদের এই শান। | (প্রভাব ও মর্যাদা) প্রত্যক্ষ করল তখন তারা ধরে নিল যে, ফিক্‌হ (ইসলামী

আইন ও বিধি-বিধান) সম্পর্কিত জ্ঞানই হচ্ছে সম্মান ও পদমর্যাদা লাভের | সর্বোত্তম মাধ্যম। এর দ্বারা শাসকবর্গের নৈকট্য, ফতওয়া ও বিচার বিভাগীয়

পদ লাভ করা যায়। ব্যস! তারা সকলেই শুধু ফিকহশাস্ত্রের দিকে মনােনিবেশ করল এবং উচ্চ পদের লােভে নিজেদের শাসকবর্গের সামনে পেশ করল। এ প্রচেষ্টায় কতক লােক সফল হ’ল, আবার কতক লােক কিছুই পেল না। যারা কিছুই পেল না তারা তাে ইহলােক-পরলােকে ক্ষতিগ্রস্ত হ’ল। আর যারা কিছু পেল, সম্মান প্রার্থী হবার কারণে তারাও হীন হ’ল। ফল দাঁড়াল এই যে, যে ‘উলামা ছিলেন সকলের কাজিত, মুখাপেক্ষীহীনতার কারণে ছিলেন সম্মানিত। ও শ্রদ্ধেয়, দুনিয়াদারদের দিকে লক্ষ্য ও মনােযােগ দেবার কারণে হয়ে গেলেন। হেয় ও লাঞ্ছিত। অবশ্য এই সামগ্রিক অবস্থার মধ্যেও প্রতিটি যুগেই আল্লাহ্র কিছু সংখ্যক বান্দার মধ্যে এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম লক্ষ্য করা গেছে।

সেই সমস্ত যুগে সর্বাধিক গুরুত্ব ও মনােযােগ ছিল ইসলামী বিধি-বিধান ও ফতওয়ার দিকে। অবশ্য রাষ্ট্রীয়, সামাজিক ব্যবস্থাপনা ও মামলা-মােকদ্দমার ক্ষেত্রে এর প্রয়ােজনও ছিল। অতঃপর ইসলামী উসূল ও আকীদার প্রতিও কোন কোন শাসকের আকর্ষণ সৃষ্টি হয়। তাদের আগ্রহ জন্মে প্রতিটি পক্ষের দলীল-প্রমাণ ও পারস্পরিক আলােচনা শুনবার এবং তাদের বাহাছ-মুবাহাছার দৃশ্য দেখবার। মানুষ যখন শাসকদের এই রুচি ও স্বাদের ব্যাপারটা জানতে পারল তখন তারা “ইলমে কালামের প্রতিও ঝুঁকে পড়ল। গ্রন্থকাররা এ বিষয়ের ওপর ভূরি ভূরি কিতাব লিখলেন এবং পারস্পরিক বিতর্ক প্রতিযােগিতার মূলনীতি ও নিয়ম-কানুন প্রণয়ন করলেন, জন্ম দিলেন তারা যুক্তি-প্রমাণ রদকারী এবং প্রতিপক্ষের ওপর সমালােচনা বাণ নিক্ষেপকারীএকটি শাস্ত্রের। তাদের ভাষায়, এর দ্বারা তাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল, কর্মের অনুকলে প্রতিরােধ সৃষ্টি, সুন্নাহর সাহায্য ও সমর্থন এবং বিদ’আতের বিরােধিতা ও মুলােৎপাটন। তাদের এ বক্তব্য তাদের পূর্বসূরীদের বক্তব্যেরই অনুরূপ। পূর্বসূরীরা বলত, ফতওয়ার ক্ষেত্রে তাদের লিপ্ত হওয়ার উদ্দেশ্য কেবল দীন ও খালুকের খিদমত তথা ধর্ম ও সৃষ্টির সেবা ও কল্যাণ সাধন। অতঃপর দেখা গেল, কোন কোন শাসক ইলমে কালাম ও বিতর্ক অনুষ্ঠান পসন্দ করছেন না। তাঁদের মতে এর দ্বারা পক্ষপাতিত্ব, ঝগড়া-বিবাদ এবং কোন কোন সময় রক্তারক্তির ন্যায় অনেক অনাসৃষ্টি কাণ্ড ঘটে যায়। অবশ্য ফিকহী আলােচনা ও বিতর্কের প্রতি ঐ সব শাসকের অন্তরের টান ছিল, বিশেষ করে একটি ব্যাপারে তাদের আগ্রহের মাত্রা বেশী ছিল যে, ইমাম আবু হানীফা (র) ও ইমাম শাফিঈ (র)-এর মহাবই অধিকতর সঠিক। এতদৃষ্টে মানুষ কালাম ও ‘আকাইদশাস্ত্রের মাধ্যমে ইখতিলাফী মসলা-মাসাইল, বিশেষ করে ইমাম আবু হানীফা (র) ও ইমাম শাফিঈ (র)-এর মতভেদমূলক বিষয়গুলােকে আলাপ-আলােচনার বিষয়ে পরিণত করল এবং ইমাম মালিক (র), ইমাম সুফিয়ান ছাওরী ও ইমাম আহমদ (র) প্রমুখের মযহাব ও মতভেদগুলােকে উপেক্ষা করল এজন্য যে, এঁদের মতানৈক্যগুলাের প্রতি শাসকবর্গের কোন আকর্ষণ নেই। তাদের বক্তব্য ছিল, তাদের ভাষায় এ ক্ষেত্রেও তাদের উদ্দেশ্য শরীয়তের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিষয়গুলাের প্রকাশ, মযহাবের বিভিন্ন কার্যকারণ বর্ণনা এবং ফতওয়ার মূলনীতি প্রণয়ন ও সংকলন। এ বিষয়ে তারা প্রচুর বই-পুস্তক লেখেন, মসলা-মাসাইল খুঁজে বের করেন এবং তর্কশাস্ত্র ও পুস্তক প্রণয়নের ক্ষেত্রে উন্নতি সাধন করেন। এই ধারা এখনাে অব্যাহত আছে। সংক্ষেপে বলতে গেলে, মতবাদমূলক মসলা-মাসাইল ও পারস্পরিক বিতর্ক অনুষ্ঠানের প্রতি আলিমদের আকর্ষণ এবং এর প্রতি নিমগ্নতার কারণ তাই ছিল যার বর্ণনা আমরা এই মাত্র দিলাম। যদি দুনিয়াবাসী ও ক্ষমতাসীন ব্যক্তিবর্গ (ইমাম আবু হানীফা ও ইমাম শাফিঈ ভিন্ন) অন্য কোন ইমাম অথবা (ইখতিলাফী মসলা-মাসাইল ও বিতর্ক অনুষ্ঠান ভিন্ন) অন্য কোন বিদ্যার প্রতি আকর্ষণ বােধ করে তা হলে আমার বিশ্বাস ‘আলিমরাও সেদিকে ঝুঁকে পড়বে এবং পড়ার কারণ হিসাবে বলবে যে, তাদের উদ্দেশ্য ইলমে দীন ও আল্লাহর নৈকট্য লাভ ব্যতিরেকে অন্য কিছু নয়।

মনসুর হাল্লাজ এর কাহীনী পড়তে এখানে ক্লিক করুন।

অতঃপর ইমাম গাযালী (র) বিস্তারিতভাবে তর্ক-বিতর্ক ও আলােচনাসমালােচনার নৈতিক ও আধ্যাত্মিক ক্ষয়ক্ষতির দিকগুলাে বর্ণনা করেন। তিনি দীর্ঘ দিন এই ক্ষেত্রে একজন কৃতবিদ্য পুরুষ ছিলেন। তার বর্ণনা চাক্ষুষ সাক্ষ্যের মর্যাদা রাখে এবং তা ছিল প্রত্যক্ষ জ্ঞান ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ওপর প্রতিষ্ঠিত।

অবশ্য এ ব্যাপারে একটি বড় ভ্রম পরিলক্ষিত হ’ত এবং তা ছিল শব্দসম্পর্কিত। ইমাম গাযালী (র)-এর যুগের প্রচলিত জ্ঞান- সেগুলাের বিকৃত রূপ ও কাঠামাের জন্য যে সব শব্দ শিরােনামের কাজ দিত সেগুলাে ছিল ঐ সব প্রাচীন। বুযুর্গদের জীবন-চরিতে ব্যাপকভাবে প্রচলিত। দৃষ্টান্তস্বরূপ, ইখতিলাফী মসলামাসাইল ও ফিকহের ক্ষেত্রে কদাচিৎ ঘটে এমন সব খুঁটিনাটি ও সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিষয়ের জন্য বিনা দ্বিধায় “ফিক্হ” শব্দের ব্যবহার চলত আর সব ধরনের জ্ঞান সম্পর্কিত কায়কারবার এবং শরীয়তসম্মত ও শরীয়তবিরােধী “ইলমের জন্য। ঢালাওভাবে ব্যবহৃত হত “ইলম শব্দটি। ইলমে কালাম ও দার্শনিকসুলভ আলােচনাকে “তাওহীদ” নামে অভিহিত করা হত। আগা-মাথাহীন ভাসা ভাসা কথার ফুলঝুরি ছড়ানাে বর্ণনাকে “তায কীর” আখ্যা দেওয়া হত। সব ধরনের ঠিকানা-পরিচয়হীন পেঁচালাে রচনাভঙ্গিকে বলা হত “হিকমত”। অতঃপর ঐ সব স্বনির্মিত কার্যকলাপ ও কাজকারবারের ওপর সেই সব ফযীলতের ছাপ মারা হ’ত যা কুরআন ও হাদীছে ঐ সব শব্দ সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে। উদাহরণত, ফিকাহ-এর এই বিকৃত রূপ ও কাঠামাের (কেবল মতভেদ ও খুঁটিনাটি বিষয়গুলাের জন্য) ফযীলত বর্ণনায় কুরআন মজীদের আয়াত ।

এবং হাদীছ ৩১ ৩ul issu-এর দর্শন ও পঞ্চম শতাব্দীর ইলমে কালামের ফযীলত বর্ণনায় । ।

kils: -এর খােশ খবর, মূর্খ জাহিল ও আল্লাহভীতিহীন ওয়াইজ ও বক্তাদের সাধারণ ওয়াজ-নসীহতের ফযীলত বর্ণনায় ৫ i ka এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য আয়াত কারীমা ও হাদীছে রাসূল (সা) উদ্ধৃত করা হত। ইমাম গাযালী (র) এই বিভ্রান্তির পর্দা উন্মোচন করেন এবং বিস্তারিতভাবে বলেন যে, এই শব্দসমষ্টি তার আসল হাকীকত খুইয়েছে এবং তা প্রকৃত অর্থ ও মর্ম থেকে অনেক দূরে সরে পড়েছে। ইসলামের প্রথম যুগে এ সবের যে অর্থ ও মর্ম ছিল তার সাথে ‘আলিমদের বর্ণিত অর্থ ও মর্মের কোন সম্পর্ক নেই।

দ্বিতীয় যে কারণটি ইমাম গাযালী (র) -এর মতে এই পৃথিবীব্যাপী ফিতনা-ফাসাদ, নৈতিক ও চারিত্রিক অধঃপতন এবং ধর্মীয় অধঃগতির যিম্মাদার ছিল তা হচ্ছে সরকারী কর্মচারী, সুলতান ও তার আমীর-উমারার কার্যকলাপ। ইমাম গাযালী (র)-এর দু’শ’ বছর আগে হযরত আবদুল্লাহ ইবন মুবারক (র) উল্লিখিত দু’টি শ্রেণী (‘আলিম-উলামা তথা পণ্ডিতমণ্ডলী ও শাসকবর্গ)-কেই। ধর্মের বিকৃতি সাধনকারী হিসাবে অভিহিত করেছিলেন।

وهل افسد الدين الا الملوك واحبار سوء ورهبانها.

ইমাম গাযালী (র) এমন একটি যুগে উল্লিখিত দুটি শ্রেণীকে পরিপূর্ণ সাহসের সঙ্গে স্বাধীনভাবে সমালােচনার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেন যখন বাদশাহ ছিলেন একচ্ছত্র কর্তৃত্বের অধিকারী এবং সব ধরনের আইন-কানুন ও বিধি-নিষেধের উর্ধে। তখন বাদশাহর প্রতি সমালােচনা বাণ নিক্ষেপ করা ছিল মৃত্যুকে সাদর হাতছানি দেবারই নামান্তর। তার যুগে বাদশাহের উপহার, দান ও পেশকৃত লােভনীয় প্রস্তাব কবুল করাই ছিল সাধারণ রেওয়াজ। ইমাম গাযালী (র) বাদশাহ ও শাসকবর্গের ধন-সম্পদকে নাজায়েয ও হারাম বলে ঘােষণা করেন। এক স্থানে তিনি লিখেছেন :

اغلب اموال السلاطين حرام في هذه الاعمار والهلال في أيديهم معدوم او عزيز |

বাদশাহদের ধন-সম্পদ এ যুগে সাধারণভাবে হারাম। হালাল ধন-সম্পদ

তাদের নিকট হয়ই না আর হলেও পরিমাণে খুব কম। তিনি অন্যত্র লিখেছেন :

ان اموال السلاطين في عصرنا حرام كلها او اكثرها – وكيف لا والحلال هو الصدقات والتين والغنيمة ولا وجود لها وليس بدخل منها في بد السلطان ولم يبق الا الجزية وانهاتوخذ بانواع من الظلم لا يحل اخذها به فانهم بجاوزون حدود الشرع في المأخوذ والماخوذ منه والوفاء له بالشرط ثم اذا نسب اليهم من الخراج المضروب علي المسلمين ومن المصادرات و الرشاد صنوف الظلم لم يبلغ عشر معشار عشيرة .

সুলতান তথা শাসকদের ধন-সম্পদ আমাদের যুগে হয় সবটাই হারাম নতুবা এর বৃহত্তম অংশ। আর এর মধ্যে আশ্চর্যের কিছু নেই। কেননা তাদের হালাল মাল বলতে যাকাত, যুদ্ধলব্ধ সম্পদ (মালে গনীমত) অথবা বিনা যুদ্ধে লব্ধ সম্পদই বােঝাত, অথচ আজ কোথাও এর অস্তিত্ব নেই। এসবের কিছুই বাদশাহু পর্যন্ত পৌঁছে না। এখন বাকি থাকল শুধু জিয়া। আর জিয়ার অবস্থা

এই যে, তা নানান অত্যাচার ও নির্যাতনের মাধ্যম আদায় করা হয় যা আদৌ জায়েয নয়। সরকারী কর্মচারীরা শরীয়তের নির্ধারিত সীমা লংঘন করে থাকে। মালের পরিমাণের ক্ষেত্রে যেমন শরীয়তের বিধান মেনে চলা হয় না, তেমনি যিম্মী, যাদের থেকে জিযয়া উসুল করা হয়, তাদের ক্ষেত্রেও শরঈ বিধানের তােয়াক্কা করা হয় না। মুসলমানদের ওপর নির্ধারিত রাজস্বও

যবরদস্তিমূলকভাবে আদায় করা হয়। ইমাম গাযালী (র) আরও এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে লিখেছেন :

“যুগের সুলতান থেকে সেই অর্থ কবুল করাটাও সমীচীন নয়, যে অর্থ সম্পর্কে এই ধারণাই বেশী যে, তা সন্দেহমুক্ত ও জায়েয নয়। কেননা এর মধ্যে বহু ধর্মীয় বিপর্যয় (লুকিয়ে) রয়েছে। অবশ্য এক্ষেত্রে অতীত যুগের দৃষ্টান্ত পেশ করা হয়। এবং বলা হয় যে, প্রাচীন বুযুর্গদের মধ্য থেকে কোন কোন ‘আলিম ও সালিহ (জ্ঞানী, সৎ ও সত্যনিষ্ঠ) ব্যক্তি স্বীয় যুগের খলীফা ও সুলতানের পেশকৃত উপহার-উপঢৌকনের প্রস্তাব কোন কোন সময় কবুল করেছেন। তাই ইমাম গাযালী এ যুগ ও সে যুগের রাজা-বাদশাহ ও সুলতানদের অবস্থার পার্থক্য নিম্নভাবে বর্ণনা করেছেন :

প্রথম যুগের জালিম সুলতানদের অন্তরে খুলাফায়ে রাশেদীনের খিলাফত যুগের নৈকট্যের কারণে জুলুম ও নির্যাতনমূলক আচরণের কিছুটা অনুভূতি ছিল। উপরন্তু তারা সাহাবায়ে কিরাম ও তাবিঈদের অন্তর জয় ও নিজেদের দিকে তাদের দৃষ্টি আকৃষ্ট করবার চেষ্টা করত এবং এমন ধরনের ব্যবহার করত যাতে তারা কোন না কোনভাবে তাদের উপহার-উপঢৌকন ও পুরস্কারাদি গ্রহণ করেন। তারা তাদের নিকট এসব অর্থ ও নযরানা না চাইতেই এবং তাদের শান ও মর্যাদার ওপর কোনরূপ কটাক্ষ না করেই পাঠাত। শুধু তাই নয়, তারা তাদের প্রদত্ত উপহারাদি গ্রহণ করার কারণে কৃতজ্ঞও থাকত এবং আনন্দ প্রকাশ করত। ঐ সব বুযুর্গও এসব উপহার গ্রহণ করে সঙ্গে সঙ্গে তা সাধারণ্যে বণ্টন করে দিতেন। তাঁরা সুলতানদের নিয়ত ও লক্ষ্যের দিকে দৃকপাত করতেন না, তাদের সঙ্গে কোন অন্যায় কাজে সহযােগিতাও করতেন না এবং তাদের দরবারে মুলাকাতের উদ্দেশ্যে গমনও করতেন না। তারা দীর্ঘায়ু হােন, প্রকাশ্যে তারা এ ধরনের কোন কামনাও করতেন না, বরং তারা জালিম শাসকদের ব্যাপারে প্রকাশ্যে বদদু’আ করতেন। তাদের সম্পর্কে স্বাধীনভাবে মতামত ব্যক্ত করতেন এবং তাদের মুখের ওপর তাদের শরীয়তবিরুদ্ধ কাজের তারা সমালােচনা করতেন।তাই ঐ সব গ্রহণ তাঁদের জন্য অবৈধ ছিল না। অপর দিকে আজকের সুলতানগণ সেই সব লােককেই মুক্ত হস্তে দান করেন যাদের সম্পর্কে তাদের ধারণা যে, তাদের থেকে যে কোন ব্যাপারে সমর্থন আদায় করা যাবে, তাদের পৃষ্ঠপােষকতা পাওয়া যাবে, উপরন্তু তাদের দ্বারা দরবার ও মজলিসের রওনকও বৃদ্ধি পাবে। সর্বোপরি তারা সব সময় তাদের জন্য দু’আ করবে, | প্রশংসা কীর্তন করবে এবং সাক্ষাতে-অসাক্ষাতে তাদের তারীফ ও গুণপনা | বর্ণনায় মেতে থাকবে। অর্থাৎ এই ক্ষেত্রে প্রথম স্তর শাসকদের কাছে নিজেদের মর্যাদাকে হেয় করা; দ্বিতীয়, তাদের খেদমতের জন্য আনাগােনা; তৃতীয়, তাদের প্রশংসা কীর্তন ও তাদের জন্য দু’আ প্রার্থনা; চতুর্থ, তাদের ন্যায়-অন্যায় উদ্দেশ্য হাসিলে সহায়তা করা; পঞ্চম, তাদের ভাড়ামি করা, তাদের প্রতি ভালবাসা প্রকাশ এবং প্রতিদ্বন্দীর মুকাবিলায় তাদের সাহায্য-সহযােগিতা করা; ষষ্ঠ, তাদের জুলুম ও কুকর্ম ঢেকে রাখা। যদি কোন ব্যক্তি এগুলাের কোন একটি করতেও সম্মত না হন তাহলে তিনি ইমাম শাফিঈ (র)-এর ন্যায় মরতবা ও মর্যাদার অধিকারী হলেও এই সব সুলতান তার জন্য একটি পয়সাও ব্যয় করতে রাযী হবে না। এজন্যই বর্তমান যুগে এই সব বাদশাহর থেকে কোন ধন-সম্পদ গ্রহণ করা জায়েয হবে না। কেননা এর পরণতি তাই হবে যার উল্লেখ ওপরে করা হয়েছে। এখন যদি কেউ ঐ সব সুলতানের অর্থ-সম্পদ সাহসিকতার সংগে কবুল করে এবং নিজের পক্ষে সাহাবী ও তাবিঈদের নজীর পেশ করে তাহলে আসলে সে ফেরেশতাদেরকে একজন কর্মকারের সঙ্গে তুলনা করল। কেননা এই অর্থ সম্পদ কবুল করার পর সুলতানদের সঙ্গে তার মেলামেশার এবং পারস্পরিক ঘনিষ্ঠতা ও বন্ধুত্ব স্থাপনের প্রয়ােজনীয়তা দেখা দেবে, তাদেরকে তার সমীহ করে চলতে হবে, তাদের (নিয়ােজিত) কর্মকর্তা ও শাসনকর্তৃত্বে আসীন কর্মচারীদের সেবা করতে হবে এবং তাদের সম্মুখে মস্তকাবনত হয়ে চলতে হবে। অতঃপর তাদের প্রশংসা কীর্তন এবং তাদের দরবারে হাযিরা দেওয়া ছাড়া তার কোন গত্যন্তর থাকবে না। আর এ সবই পাপ ও অন্যায়। | হ্যা, যদি কেউ শাহী অর্থের ভেতর থেকে একটা অংশ কবুল করে যা হালাল এবং সে তার হকদার এবং ঐ অর্থ তার নিকট ঘরে বসে থাকা অবস্থায়ই আসে, কোন শাসক কিংবা অনুচরের সন্ধান ও খিদমত এবং ঐ সব সুলতান ও শাসকের প্রশংসা-কীর্তন ও সাক্ষ্য-প্রমাণেরও প্রয়ােজনীয়তা দেখা না দেয়, তাদেরকে সাহায্য ও সমর্থন দিতে হবে-এমন শর্তাদিও না থাকে, তাহলে

 

মাইজভান্ডারী জীবন কাহিনী- বানী ও কারামত

মাইজভান্ডারী জীবন কাহিনী- বানী ও কারামত

সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভান্ডারী (রহঃ)।।।

সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভান্ডারী (রহঃ)। মাইজভান্ডারী তরীকার প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন তিনি । তিনি জন্ম গ্রহন করেন (রহঃ) বাংলা ১২৩৩ এবং ১৮২৬ সালের ১লা মাঘ মাইজভান্ডার শরীফে । তিনি হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)এর বংশধর ছিলেন। তার পিতা ছিলেন সৈয়দ মতিউল্লাহ (রহঃ) এবং মাতা ছিলেন সৈয়দা খায়রুন্নেছা বিবি (রহঃ)। চার বছর বয়সে নিজ গ্রামের মক্তবে তার শিক্ষাজীবন শুরু হয়। অতঃপর তিনি কলকাতায় চলে যান এবং ১২৬৮ হিজরি সনে তিনি কলকাতায় তার শিক্ষাজীবন শুরু করেন। কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসা থেকে কৃতিত্বের সহিত শেষ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১২৬৯ হিজরি সালে তিনি যশোর জেলায় যান এবং সেখানে তিনি কাজী পদে যোগদান করেন। ১২৭০ হিজরিতে তিনি কাজী পদ থেকে পদত্যাগ করে কলকাতায় চলে যান এবং কলকাতায়মুন্সি বু-আলী মাদ্‌রাসার প্রধান মোদার্‌রেছের পদে নিয়োযিত হন।

মাইজভান্ডারী

শেখ সৈয়দ আবু শাহমা মুহাম্মদ ছালেহ আল কাদেরী লাহোরী (রহঃ) ছিলেন আহমদ উল্লাহ মাইজভান্ডারী(রহঃ) এর পীর। আর আহমদ উল্লাহ মাইজভান্ডারী(রহঃ) তিনি তরিকতের বড় ভাই হযরত সৈয়দ দেলাওয়ার আলী পাকবাজ (রহঃ) এঁর কাছ থেকে কুতুবিয়তের ফয়েজ অর্জন করেন। ১৮৫৭ সালে হযরত গাউছুল আজম মাইজভান্ডারী তাঁর পীরে ত্বরিকতের নির্দেশে নিজ গ্রাম মাইজভান্ডারে চলে আসেন। এরপর থেকে আস্তে আস্তে মাইজভান্ডার আধ্যাত্মিক সাধক ও দোয়া প্রত্যাশীদের ভীড়ে পরিনত হয় এবং ক্রমান্বয়ে এই সাধকের বাসগৃহ মানবতার কল্যানকর এক উচ্চমার্গীয় আধ্যাত্মিক দরবারে পরিণত হয়। লোকসমাজে পরিচিতি পায় ‘মাইজভান্ডার দরবার শরীফ’ হিসেবে।

জিয়াউল হক মাইজভান্ডারীর জীবনী

গোলামুর রহমান বাবা ভান্ডারীর অলৌকিক ঘটনা বা কারামত

জিয়াউল হক মাইজভান্ডারীর ২০টি বানী

জিয়াউল হক মাইজভান্ডারীর ১৮টি বানী


মনসুর হাল্লাজ এর জিবনী জানতে এখানে ক্লিক করুন।