Select Page

হযরত শাহজালাল রহমাতুল্লাহ জন্ম ও বংশ পরিচয়ঃ ওলি কুলের শিরােমণি হযরত শাহজালাল রহমাতুল্লাহ আল সম্রাজ্যের হেজাজ প্রদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে অবস্থিত ইয়েমেনে ১৩২২ খৃষ্টাব্দে সুপ্রসিদ্ধ শেখ বংশে মাহমুদ কোরাইশীর গৃহে জন্ম গ্রহণ করেন। তার পিতার নাম ছিল মাহমুদ কোরায়শী। তিনিও একজন মহাক্ষমতাশালী বীর পুরুষ ছিলেন। শুধু বীর পুরুষই ছিলেন না বরং তিনি একজন খাঁটি ঈমানদার ও ইসলামের একজন মহান সেবকও ছিলেন। কোন মানুষ কষ্ট ক্লেশ ছাড়া উন্নতির শীর্ষ চূড়ায় আরােহণ করতে পারে না। হযরত শাহজালাল রহমাতুল্লাহ-এর জীবনেও ইহার ব্যতিক্রম ঘটেনি।

প্রথমে তার শিশু জীবনের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেই অন্তরে দুঃখের ঝড় বয়ে যায় । শিহরে উঠে সমস্ত শরীর। | শিশু শাহজালাল মাত্র তিন মাস বয়সের সময় তার মা জননী দুনিয়া থেকে চির নিদ্রায় শায়িত হন। এর পর তার লালন-পালনের ভার স্বীয় পিতা মাহমুদ কোরাইশী গ্রহণ করে, মাহমুদ কোরায়শী সৈয়দ বংশের পূন্যবান একজন স্ত্রীকে পেয়ে খুবই সুখী হয়েছিলেন তাঁর স্ত্রীর মৃত্যুতে তিনি অত্যন্ত ব্যথিত হন।

হযরত শাহজালাল

তিনি আর অন্য কোন নারীকে গ্রহণ না করে বাকী জীবন সংগীহীন অবস্থায়ই কাটিয়েছেন। বর্তমানেও দেখা যায় কোন মলে গৃহিণী না থাকলে সংসার চালাতে হয়। তাই তাে হযরত শাহজালালের মা জননী মারা যাওয়ার পর পিতা মাহমুদ কোরাইশী খুব কষ্ট করেই সংসার চালাতেন এবং শাহ জালালকে লালন-পালন করতেন। অন্য দিকে বীর মাহমুদ কোরাইশী ইসলাম প্রচারের জন্য অসংখ্য যুদ্ধ করেছেন এবং প্রত্যেকটি যুদ্ধে তিনি জয়লাভ করেছেন। অন্যদিকে তিনি ধন সম্পদেও ছিলেন প্রাচুর্যশীল। কিন্তু তিনি ধন সম্পদের উপর কখনও আসক্ত হননি। ইসলাম প্রচারের যুদ্ধ করেই তিনি জীবন কাটিয়েছেন।

এদিকে আস্তে আস্তে শাহ জালালের জীবনেও নেমে আসে শােকের তুফান। কারণ পিতার স্নেহও বেশী দিন তার ভাগ্যে জোটেনি। মা জননীর মৃত্যুর কিছু দিন পরে দেশের সীমান্তে যখন মুসলমানদের সংগে বিধর্মীদের বিরাট যুদ্ধ শুরু হয়। সে যুদ্ধে তখন বীর যােদ্ধা মাহমুদ কোরায়শীর ডাক পড়ে যায়। যখন মাহমুদ এই যুদ্ধের সংবাদ পেলেন তখনই তাঁর মন চিন্তিত হয়ে পড়ল। না জানি যুদ্ধ থেকে আর ফিরে নাও আসতে পারি । অপর দিকে শিশু শাহাজালালের কথাও ভাবতে লাগলেন যে আমি যদি এ যুদ্ধে থেকে ফিরে আসতে না পারি তখন মাতৃ হারা শিশু শাহজালালের অবস্থাটা কি হবে। অন্য দিকে যুদ্ধেও যেতে মন চায়, তখন তিনি উভয় সংকটে পড়ে গেলেন। সে যাই হােক তিনি ঈমানী শক্তিতে ছিলেন শক্তিমান। আল্লাহর উপর ছিল তার অগাধ বিশ্বাস। তাই তিনি শিশু শাহজালালের প্রতিপালনের ভরসা একমাত্র সৃষ্টিকর্তা পালনকারী মহান আল্লাহর উপর রেখেই ধর্ম যুদ্ধের ডাকে সাড়া দিয়ে দেশের সীমান্তে কাফেরদের বিরুদ্ধে বীর বিক্রমে ছুটে চললেন।

যুদ্ধের ময়দানে গিয়ে অনেক শত্রু তার হাতে নিহত হল। যুদ্ধ করতে করতে এক সময় তিনিও শক্রর হাতে শাহাদাত বরণ করেন। আর তিনি যুদ্ধ ময়দান থেকে ফিরে এলেন না। শােক সাগরে ভাসতে লাগলেন শিশু শাহজালাল। এবার তিনি এ ধরায় এতিম হয়ে গেলেন। আল্লাহর লীলা বুঝবার শক্তি কার আছে? তিনি নদীর মাঝে পাহাড় গড়েন আবার পাহাড় ভেংগে নদী করেন। যেমন কোন মানুষ কষ্ট ব্যতিরেখে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করতে পারেন না সেই কষ্টের নমুনা নেমে আসতে লাগল ইয়াতিম শাহজালাল-এর জীবনে।

এদিকে মাহমুদ কোরায়শী গৃহত্যাগের সময় শিশু শাহজালাল রহমাতুল্লাহ ভরসা এক মাত্র আল্লাহর উপরই রেখেছেন। আল্লাহও তেমনি অসহায় শাহজালালকে তার মাতুলের মাধ্যমে আরাম আয়াশ ও সুখের মধ্যই লালন-পালন করিয়েছেন। এ কথা সর্ব বিদিত যে, যে ব্যক্তি আল্লাহকে আপন করে নিয়েছেন। তেমনি আল্লাহও তাকে সেইভাবে আপন করে নেন এই সুযােগই অসহায় শাহজালাল তা মামার সংসারে খুব সুখেই প্রতি পালিত হন।

তার পিতা শহীদ হবার পর তার মামা সৈয়দ কবির আহম্মদ অসহায় ভাগীনাটির লালন-পালনের ভার গ্রহণ করেন। হযরত শাহজালাল রহমাতুল্লাহ তার মামার সংসারে গিয়ে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হতে লাগলেন। সাথে সাথে ইবাদত বন্দেগীর মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্যও লাভ করলেন। তিনি তার জীবনকে ধর্ম প্রচারের জন্যই বিলীন করে দিয়েছিলেন।

মামার আশ্রয় দান ও শিক্ষা দীক্ষাঃ

একথা দিবা লােকের ন্যায় উজ্জ্বল যে, সকল মনীষী ধরার বুকে উচ্চ মর্যাদা লাভ করেছে হযরত শাহজালাল রহমাতুল্লাহ ছিলেন তারে মধ্যে অন্যতম। অতি অল্প বয়সে পিতামাতা হারালে মামা সৈয়দ কবির আহম্মদ তার লালন-পালনের ভার গ্রহণ করেন এবং নিজের সন্তানের মতােই লালন পালন করেন। কোন দিন থেকে কোন অভাব অনুভব করতে হয়নি। তার কারণ তার মামা এই মনােভাব নিয়ে ভাগীনার প্রতিপালন করেছেন যেন কোন সময়ই পিতামাতার কথা তার মনে না উঠে বা পিতামাতার অভাব অনুভব না করতে পারে অর্থাৎ সৈয়দ আহম্মদ কবির তার আপন সন্তাদের চেয়ে বেশী স্নেহ করতেন। আবার শুধু স্নেহ ভালাবাসা দিয়েই বড় করেননি বরং সাথে সাথে উপযুক্ত শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তুলেছিলেন। তার মামা আহম্মদ কবিরও ছিলেন একজন ত্যাগী তাপস ও ধর্ম প্রাণ ব্যক্তি। এক দিকে যেমন ছিলেন বিদ্যোৎসাহী অন্য দিকে ছিলেন কামেল অলি। ফকির বা সুফীলােকদের রীতিনীতি অনুযায়ী তিনিও অতি সাধারণ ভাবে জীবন যাপন করতেন। সকল খারাবিয়াত পরিহার করে একজন ত্যাগী পুরুষে পরিণত হয়েছিলেন।

যারা আল্লাহর প্রেমের সুধা পান করে করেছেন তারা নির্জনতাকেই পছন্দ করতেন। হযরত শাহজালাল রহমাতুল্লাহ-এর জীবনেও ইহার ব্যতিক্রম ঘটেনি। তিনিও নির্জনতাকে পছন্দ করতেন এবং নির্জনে বসে দিন রাত মহা প্রভুর আরাধনা করে জগতের বুকে সিদ্ধ পুরুষ হয়েছিলেন। নামাজ, রােজা, হজ্জ, যাকাৎ যথা নিয়মে আদায় করতেন। সাথে সাথে ওয়াজ নছিহতের কাজও চালাতেন। অর্থাৎ ধর্ম বিরােধি মানুষের মাঝে ওয়াজ নসিহত করে তাদেরকে ধর্মের দিকে আকৃষ্ট করতেন।

শিশু শাহজালাল তার শিশুকাল থেকেই কঠোর সাধনায় আল্লাহর নৈকট্য লাভের আশায় উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন। আর অতি সযত্নের সাথেই নানাবিধ শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে গড়ে উঠতে লাগলেন। হযরত শাহজালাল বাল্যকাল থেকেই ছিলেন বিদ্যোৎসাহী তেমনি ছিলেন আবার ধীর-শক্তিসম্পন্ন। সেহেতু অল্প সময়ে বিভিন্ন শিক্ষায় পারদর্শী হয়েছিলেন। সৈয়দ আহাম্মদ কবির তার ভাগীনাকে শুধু পার্থিব শিক্ষায় শিক্ষিত করলেন না বরং পার্থিব শিক্ষার সাথে সাথে আধ্যাত্মিক শিক্ষা ইবাদত সংযম ও নৈতিক শিক্ষার ভেতর দিয়ে যথা-শরীয়ত ও মারেফত শিক্ষা করে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করতে পারেন সে শিক্ষাও তাকে তার মামা দিয়েছিলেন। এইজন্য তার মামা তাকে প্রথমে আরবী ভাষা শিক্ষা দেন। এক সময় আদরের ভাগনাকে নিয়ে মক্কা শরীফও সফর করেছিলেন।

একথা না বলে পারা যায় না যে, একজন ভাল ছাত্রের মধ্যে যে সকল গুণ থাকা প্রয়ােজন তা এক শাহাজালাল রহমাতুল্লাহ-এর মধ্যে বিদ্যমান ছিল। তার ধীর-শক্তির প্রমাণ হিসেবে একথা বলা যায় যে, তিনি মাত্র সাত বছর বয়সের সময় ৩০ পারা কুরআন শরীফ মুখস্ত করেন। এরপর তিনি তার মামাকে শিক্ষাগুরু হিসেবে গ্রহণ করে তাঁর কাছ থেকে কোরআন, হাদিস তাফসির, ফেকাহ, তাসউফ ও বালগাত, মানতেক ইত্যাদি বিষয়ের উপর গভীর জ্ঞান লাভ করেন।

এক সময় তার মামা সৈয়দ আহম্মদ কবির একার পক্ষে এতগুলি বিষয়ের অধ্যাপনা করা কষ্ট অনুভব করলেন। তখনই তার মামা উচ্চ শ্রেণীর আলেমকে বালক শাহজালালের গৃহশিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত করেন। এবারে তারা উভয়ে বালক শাহজালাল কে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তুলতে লাগলেন।

তিনি শুধু জাহেরী ইলেমই শিক্ষা করেননি বরং বাতেনী ইলেমও শিক্ষা করেছিলেন। তাইতাে দেখা যায় বালকেরা যে বয়সে দুষ্টমী খেলাধুলার মধ্যে কাটায় সে বয়সে বালক শাহজালাল রহমাতুল্লাহ জ্ঞান অর্জনের জন্য নিজেকে মনােনিবেশ করেছিলেন। জ্ঞানের সাধক হযরত শাহজালাল বাল্যকাল থেকে সকল আরাম আয়েশ আনন্দ উৎসব পরিহার করে গভীর জ্ঞান সাগরে সাধনায় মত্ত হয়েছিলেন। তার মামা তাকে শুধু জ্ঞানই শিক্ষা, দেননি জ্ঞান শিক্ষার সংগে সংগে সার্বিক বিষয়ে প্রয়ােজনীয় শিক্ষা দিয়েছিলেন। উত্তম চরিত্র গঠনের জন্য যা কিছুর দরকার তাও তাকে শিক্ষা দিয়েছিলেন। যার কারণে মানুষ তার সংযম, সততা, সরলতা, বিনয় কোমলতা প্রভৃতি মহৎ গুণ দেখে তার প্রতি মুগ্ধ হয়েছিল।

তার মামা সৈয়দ আহম্মদ কবির ছিলেন একজন বিচক্ষণপূর্ণ লােক, সেহেতু তার বিচক্ষণতার দ্বারা তার ভাগীনার পূর্ণ পরিচয় পেয়েছিলেন। সে অতি সহজেই বুঝতে পেরেছিলেন যে বালক শাহজালাল একজন জগৎ বরেণ্য ব্যক্তি হবেন। বালক শাহজালাল এর অন্তরখানা ছিল আয়নার মত স্বচ্ছ ও নির্মল। তাইতাে ঐতিহাসিকরা তাকে ইসলামের দর্পন বলেও আখ্যা দিয়েছেন। শৈশব হতেই কোন খারাপ কাজ করাতাে দূরের কথা কোন দিন তার মধ্যে খারাপ কাজের রেখাপাতও ঘটেনি। ভবঘুরে লাগামহীন বালকদের মত এখানে সেখানে ঘােরা ফেরা করে কখনই সময় কাটাননি। মামা সৈয়দ আহম্মদ কবির তার দিকে কড়া দৃষ্টি রাখতেন, যাতে করে কোন খারাপ কাজে যেন শাহজালালকে স্পর্শ করতে না পারে। এদিকে বালক শাহ জালাল তার মামার ও গৃহশিক্ষকের নিকট থেকে সবক লয়ে আদায় করতে লাগলেন। তার মামাও তাকে উচ্চ হতে উচ্চ স্তরের ফয়েজ দিতে লাগলেন।

আল্লাহ পাকের অপর মহিমায় বালক শাহজালাল এলেমের সিঁড়ি বেয়ে ধাপে ধাপে উচ্চ হতে উচ্চ স্তরে পৌছাতে লাগলেন। আল্লাহর খেলা বুঝা ভার-যাকে তিনি দান করেন অতি অল্প সময়েই মাযিলে মাকছুদে পৌছাতে পারেন। বালক শাহজালালের উপরও আল্লাহর অপর করুণার ধারা প্রবাহিত হল, সেহেতু তিনি মাযিলে মাকছুদে পৌছে ছিলেন। মামা সৈয়দ আহাম্মদ কবীরের অকৃত্রিম প্রচেষ্টা ও বালক শাহ জালালের আগ্রহে তিনি কামেলে ওলির স্তর লাভ করে ছিলেন। তাইতাে তাকে আমরা ভক্তি ভরে স্মরণ করি। শুধু তাই নয় ইতিহাসের পাতায় আজ তার নামটি অমর হয়ে আছে।

মামার পরীক্ষায় উত্তীর্ণঃ

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় হযরত শাহজালাল-এর বাল্যকাল থেকেই তার চরিত্রের মাধুর্যতা ভিন্ন আভার ন্যায় প্রকাশ পেয়েছিল। অতি অল্প বয়সেই পূর্ণ আত্মা মানুষের যে সকল গুণ থাকা দরকার সে সব গুনের বিকাশ ঘটেছিল তার মধ্যে। আর সে সকল ঘুনগরিমার দ্বারাই তিনি অলিত্বের শীর্ষে স্থান দখল করেছিলেন।

বাল্যকাল থেকেই তার চলচলন, আচার-ব্যবহার ছিল সাধারণ মানুষের থেকে ব্যতিক্রম। মাঝে মাঝে বালক শাহ জালালের বিচক্ষণতা দেখে আশ্চর্য না হয়ে পারতেন না। তখন থেকেই তার মামার বুঝতে বাকী রইল না। সে যাই হােক শাহজালাল রহমাতুল্লাহ-এর বয়স যখন বাড়তে লাগল তার মামাও তাকে নানা পরীক্ষা করতে থাকে। এক সময় | ভাগীনাকে একটি কঠোর পরীক্ষা করার মনস্থ করলেন কিন্তু পরীক্ষা করার কোন পন্থা পাচ্ছেন না। এমনই এক সময় একটা তাড়া খাওয়া পাগলা হরিণী এসে সৈয়দ আহাম্মদ কবীরের সম্মুকে হাজির হল। বলল, হুজুর আমার একটা দুঃখের নালিশ করার কাকেও পেলাম না তাই আপনার দরবারে হাজির হলাম। দয়া করে আমার এই বিচারটি আপনি করবেন।

এবারে সকল প্রাণীর ভাষাবিদ সৈয়দ আহম্মদ হরিণীর কথা বুঝতে পেরে বললেন, হে-হরিণী এবারে তােমার ঘটনা খুলে বল। দুঃখিণী হরিণটির চোখের পানি ফেলে বলতে লাগল, হুজুর আমার একটি মাত্র দুগ্ধ সন্তান সেটিকে একটি ক্ষুধার্ত বাঘে নিয়ে হত্যা করে খেয়ে ফেলেছে। এখন আপনি ইহার বিচার করেন। সৈয়দ আহম্মদ কবির এবারে ভাগীনাকে পরীক্ষা করবার একটি পথ পেলেন। অনেক চিন্তা-ভাবনা করে ভাগীনাকে ডাক দিয়ে বললেন, যাও তুমি গিয়ে এই বাঘটিকে খুঁজে বিচার করে এস।

হযরত শাহ জালাল বললেন, বাঘটি ক্ষুধার্ত হয়েইতাে হরিণ ছানা খেয়েছে, এর আবার কি বিচার করা যায়। সে যাই হােক শুরুর আদেশ শিরােধার্য করে গভীর বনের দিকে ছুটে চললেন। গিয়ে অনেক সন্ধানের পর বাঘটির সন্ধান পেলেন। বাঘটি দেখে তাঁর কাছে আসার জন্য ইশারা করলেন। বাঘটি তার হিংস্রত্ব পরিহার করে তার দিকে এগিয়ে আসল। | এদিকে তার মামা ভাগীনাকে বিচার করতে পাঠিয়ে ভাবতে লাগলেন যে, বাঘটির কি বিচার করা যায়; বাঘতাে অন্য প্রাণী শিকার করেই জীবিকা নির্বাহ করে থাকে। তবে বাঘটিকে একটি চপেটাঘাত করে এই বলে দিলেই হয় যে, যেন এভাবে কোন প্রাণীর দুগ্ধ ছানাকে আহার না করে।

হযরত শাহজালাল রহমাতুল্লাহ ছিলেন একজন অগাধ আধ্যাত্মিক জ্ঞানের অধিকারী। তাই তিনি আধ্যাত্মিক জ্ঞানের মাধ্যমে তার মামার মনােভাব জানতে পারলেন এবং সেই অনুসারে বাঘটিকে কাছে ডেকে ভীষণ এক চড় লাগিয়ে বললেন, যা এভাবে আর কখনও কোন দুগ্ধ ছানাকে খাসনে যা বনে চলে যা। আর যেন তাদের বিরুদ্ধে কোন নালিশ না আসে।

আধ্যাত্মিক জ্ঞানের শিরােমণি হযরত শাহজালাল রহমাতুল্লাহ বাঘের বিচার করে মামার কাছে চললেন। গিয়ে হাস্যবদনে বললেন মামা ওদের আর কি বিচার করা যায়? বনের পশু শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করাই তাে ওদের ধর্ম। তবে আপনার আদেশ পেয়ে আমি এই ভাবে বাঘটির বিচার করেছি যে, বাঘটিকে কাছে ডেকে এক চপেটাঘাত করে বলে দিয়েছি যেন এভাবে দুগ্ধছানা কখনও শিকার করিসনে।

মামা ভাগীনার মুখে সে একথা শুনে অতি আশ্চর্য হয়ে গেলেন। ভাবলেন আমি ধারণা করেছি সেটাই করেছে? আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেলেন। তার আর বুঝার বাকী রইল না যে, এ ছেলে পূর্ণ আধ্যাত্মিক জ্ঞান লাভ করেছে। তার মামার শত কষ্টের প্রতিফলন ঘটল সেখানে। তার অন্তরে বিন্দু মাত্র কষ্ট রইল না। আনন্দে ভরে উঠল তার অন্তর। ভাগীনাকে সজোরে জড়িয়ে ধরে বললেন, বৎস! তুমি ধন্য, আমার জীবনে সকল আশা আকাংখা তুমিই পূর্ণ করতে সক্ষম হয়েছ। শুধু তাই নয় তুমিতাে সফলতার শীর্ষ চুড়ায় আরােহণ করেছ। তুমি পূর্ণ ব্যক্তিত্বের অধিকারী হয়েছ। উত্তীর্ণ হয়েছ আমার সকল পরীক্ষায়। এবার তুমি কর্ম ব্যস্ত ঝাপিয়ে পড়। শাহজালালের শ্রদ্ধেয় মামা তথা শিক্ষা গুরু ধর্ম গুরু ছিলেন গভীর জ্ঞানের অধিকারী সেহেতু তিনি ভাবতে পারলেন যে অধিক জ্ঞানীদের এক স্থানে জড়াে হওয়া ঠিক নয়।

তাই তার আদুরে ভাগীনাকে আদরের গভির ভিতরে না রেখে বললেন, বাবা তুমি অন্যত্র চলে যাও। গিয়ে ইসলাম প্রচার শুরু কর। এখানে আর আবদ্ধ হয়ে থাকার দরকার নেই। শত শত পথ ভােলা পথিককে সৎ পথে আনতে পারলেই তুমি হবে ধন্য। ইহ জগতে লাভ করতে পারবে আল্লাহর অশেষ করুণা। পর জগতেও লাভ করতে পারবে জান্নাতের অগণিত সুখ শান্তি। | প্রত্যাদেশ লাভ ও দেশ ত্যাগ ও প্রকাশ থাকে যে সৈয়দ কবির আহম্মেদ তার স্নেহের ভাগীনাকে যে সকল পরীক্ষা করেছেন হযরত শাহজালাল রহমাতুল্লাহ তার মামার প্রত্যেকটি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন। এতে তার কোন বেগ পেতে হয়নি। এবার তার শিক্ষাগুরু তাকে যে দেশ ত্যাগের ইংগিত দিয়েছেন তখন থেকেই তার মনে কি যেন নব অধ্যায়ের সূচনা তিনি দেখতে লাগলেন। কি যেন অদম্য আকাংখায় অস্থির হয়ে উঠলেন।

তিনি বুঝতে পারলেন তার জীবনেও রয়েছে অনেক অনেক দায়িত্ব ও কর্তব্য। আল্লাহর পেমে যখন তিনি অধীর হয়েছেন, তখন আল্লাহ তাওয়ালাও তাকে এমন জ্ঞান দান করলেন যাতে সকল বিষয় বুঝতে পারেন। সেহেতু তিনি একথাও বুঝতে পারলেন যে আমার উপর যে সব দায়িত্ব কর্তব্য রয়েছে এগুলাে শুধু আমার ব্যক্তিগত মঙ্গলের জন্য নয়। আল্লাহর সৃষ্ট জীব আশরাফুল মাক্লুকাতের মঙ্গলের জন্য আমাকে অনেক দায়িত্ব পালন করতে হবে। কিন্তু সে দায়িত্ব কর্তব্যটা যে কি, সেটা তিনি বুঝতে পারতেছেন না। শুধু রাত দিন ভাবতেছেন কি সে দায়িত্ব? এখন তিনি গুরুর সেবায়ে নিজেকে বিলীন করে দিতে লাগলেন। শুধু তাই নয় আল্লাহর ইবাদতে মশগুল থাকতেন।

এক দিন গভীর রাত্রে আল্লাহ আল্লাহ করতে করতে তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়লেন। এমন সময় তিনি স্বপ্নে দেখলেন, কে যেন তাকে ডেকে বলছে, “হে শাহজালাল! তুমি যে কঠোর সাধনা ও তপস্যার দ্বারা আধ্যাত্মিক জ্ঞান ও সংযমতা অর্জন করেছ, এসব তােমার নিজের জন্য নয়। এবার তুমি মানব জাতির কল্যাণের জন্য নিজেকে নিয়ােগ কর। পাপপাচার ধর্মান্ধ মানুষকে আহবান কর ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় দান কর। ইসলাম প্রায় অর্ধ বিলীনের পথে, তাই সকল মানুষকে ইসলামের দাওয়াত দিয়ে ইসলামের পতাকা পূর্ণ উত্তোলন কর। বিপথগামী মানুষকে আশ্রয় দিয়ে মুক্তির দিশা দাও। আর বসার সময় নয়। ইসলাম জগতের মহান আদর্শকে আবার পূর্ণ প্রতিষ্ঠিত করে তার দীপ্ত রশ্মিকে কুআচারে নিমগ্ন পাপী তাপীকে কলুষিত আত্মার থেকে আলােকিত করে তােল।

ইসলাম আবার দুনিয়ার বুকে পূর্ণ জাগরুক হােক এটাই তাে প্রতিপালকের পরম ইচ্ছা। সে ইচ্ছা পূরণের জন্যই আল্লাহ তােমাকে প্রয়ােজনীয় জ্ঞান দান করেছেন। আর বিলম্ব করার সময় নেই। ধর্ম প্রচারের জন্য উদ্বুদ্ধ হয়ে দায়িত্ব পালনে তৎপর হও। যে স্থান থেকে ইসলাম বিলীনের পথে। মানুষ নানা অনাচরি কুআচারে লিপ্ত সেখানে গিয়ে দায়িত্ব পালন কর। এবারে তার নিদ্রা ভাঙ্গল, মনে পড়ল স্বপ্নে পাওয়া প্রত্যাদেশের কথা। সাথে সাথে ভীত হলেন, আবার আনন্দিতও হলেন। কারণ যে বিষয়টা নিয়ে তিনি চিন্তা ভাবনা করতে ছিলেন সে সমস্যার সমাধান হয়ে গেল। তাই তাে তিনি আনন্দিত হয়ে পরের দিন ভােরে শিক্ষা গুরুর নিকট জানালেন।

কিন্তু তিনি বুঝতে পারলেন না কোথায় সে জায়গাটি। কিন্তু মনােবল হালালেন না বরং আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়লেন ভাবলেন তাহলে সেই মহান দায়িত্ব পালনের জন্য কি আমাকে পাঠিয়েছেন? এই প্রত্যাদেশও কি একই উদ্দেশ্যে দিয়েছেন? আবার ভাবতে লাগলেন আল্লাহর এ প্রত্যাদেশও কি উপেক্ষা করা যায়? কখনই না। আমাকে এ পুণ্য দায়িত্ব পালন করতেই হবে। কিন্তু শত চিন্তা ভাবনার পরেও নির্দিষ্ট স্থানটি নির্বাচন করতে পারলেন না। এদিকে তার গুরু সৈয়দ আহম্মদ কবির, তার প্রিয় ভাগীনার স্বপ্ন শুনে অত্যন্ত আনন্দিত হলেন। বললেন এ মহান দায়িত্ব তােমাকে পালন করতেই হবে।

আমিও তােমাকে অনুমতি দিলাম। যাও তুমি গিয়ে তােমার দায়িত্ব পালন কর। এবারে হযরত শাহজালাল রহমাতুল্লাহ তার মামার অনুমতি পেয়ে দেশ ত্যাগের জন্য প্রস্তুত হলেন। পরের দিন ভােরে তার মামা সৈয়দ আহম্মদ কবির এক মুষ্টি মাটি ভাগীনার হাতে দিয়ে বললেন, যাও বাবা এখান থেকে পূর্ব দিকে চলে যাও। এবং যাত্রা পথে যেখানে রাত্রি যাপন করবে সেখানের মাটি পরীক্ষা করে দেখবে। এই মাটির সাথে যে স্থানের মাটির মিল হবে সেখানেই তুমি তােমার আস্তানা তৈরি করে বসবাস শুরু কর। এবং সেখানেই তােমাকে আল্লাহর কর্তব্য পালনে ব্যপ্ত হবে।

দেশ ত্যাগের পূর্বে মামার এ আদেশ পেয়ে স্থান নির্বাচনের ব্যাপারে যে চিন্তা তার মনে দোলা দিতে ছিল সে চিন্তাও বিদূরীত হল। এবার তিনি ১২ জন শিষ্য সহচর নিযে ভারত বর্ষের দিকে রওয়ানা হলেন। অজানা অচেনা পথ ধরে চলতে লাগলেন। কিন্তু কোনরূপ বাঁধা বিঘ্নের কথা অন্তরে স্থান দিলেন না। আল্লাহর দেওয়া প্রত্যাদেশ পালনের জন্যই মানব সেবায় নিজেকে বিলীন করার উদ্দেশ্যেই নতুন পথ ধরে চলতে লাগলেন।

একথা সু-উজ্জ্বল যে আলেম কুলের শিরােমণি হযরত শাহজালাল রহমাতুল্লাহ, বেশি দিন ইয়েমেন থাকলেন না। ইয়েমেন থেকে তিনি পূর্ব বঙ্গ রওয়ানা হলেন। পথিমধ্যে তিনি দিল্লীতেও কিছু সময় অবস্থান করেছিলেন। তখন দিল্লীর বাদশাহ ছিলেন আলাউদ্দীন খলজী। দিল্লীতে তৎকালে একজন প্রখ্যাত আওলিয়া বাস করতেন। তার নাম ছিল হযরত নিজামউদ্দিন আওলিয়া। তার সুনামও সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ল। হযরত শাহজালাল রহমাতুল্লাহ দিল্লীতে এসে তার নাম শুনে তার সাথে সাক্ষাৎ করার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন।

যেই ইচ্ছা সেই কাজ। হযরত শাহজালাল রহমাতুল্লাহ নিজাম উদ্দিন আওলিয়ার সাথে সাক্ষাৎ করলেন। তিনি শাহজালালকে সাধ্যানুযায়ী মেহমানদারী করালেন এবং ওখানে রাত্রি যাপনের জন্য অনুরােধ করলেন। শাহজালাল রহমাতুল্লাহ, ওখানেই রাত্র কাটালেন।

রাত্রে হযরত নিজাম উদ্দিন আওলিয়া হযরত শাহজালালকে তার অলিত্বের ব্যাপারে পরীক্ষা করতে চাইলেন। নিজাম উদ্দিন আওলিয়া একটি কৌটায় কিছু আগুন ও তুলা ভরে কৌটার মুখ বন্ধ করে তার কাছে পাঠালেন। আধ্যাত্মিক জ্ঞানের মহা সাধক হযরত শাহজালাল নিজামউদ্দিন আওলিয়ার মনোভাব বুঝতে পেরে বিসমিল্লাহ বলে কৌটার মুখ খুললেন। দেখা গেল তুলাকে আগুন স্পর্শ করেনি। ইহা দেখে নিজাম উদ্দিন বুঝতে পারলেন শাহজালালের ব্যাপারে। এবং তার পায়ে পড়ে কান্না শুরু করে দিলেন ও তার কাছে ক্ষমা চাইলেন। দয়াল চিত্তের মহা মানব হযরত শাহজালাল তাকে ক্ষমা করে দিলেন।

এবারে হযরত নিজাম উদ্দিন আওলিয়া শাহজালাল রহমাতুল্লাহ-কে চিনতে পেরে অত্যন্ত আনন্দিত হলেন এবং পরের দিন ওখান থেকে হযরত শাহজালাল রহমাতুল্লাহ বাংলাদেশের দিকে রওয়ানা হলেন। তখন নিজাম উদ্দিন আওলিয়া তাকে ধূসর বর্ণের এক জোড়া কবুতর উপহার দিলেন।

সিলেট যে হাজার হাজার জালালী কবুতর দেখা যায়, ইহাদের আদি কবুতর সেই উপহার দেওয়া কবুতর দুটির বংশধর। এখনও সিলেটের দরগাহ শরীফে অসংখ্য কবুতর দেখা যায়। শুধু সিলেটে নয় সারা বাংলাদেশে এই কবুতর দুটির বংশধর বিস্তার লাভ করেছে। বাঙ্গালী মানুষ তাকে এমন ভাবে শ্রদ্ধা ভক্তি করে যেটা তার কবুতরের মধ্যেও কিছুটা বিদ্যমান রয়েছে। এমনকি এই কবুতরের মাধ্যমে অনেকে ভাগ্য নির্ধারণ করে থাকেন। যেমন কোন বাড়ীতে বা ঘরে এই জালালী কবুতর এসে বাসা বাঁধলে মঙ্গলের নিদর্শন হিসেবে ধরে নেয়।

পক্ষান্তরে কোন বাড়ীতে বসবাসকারী জালালী কবুতর যদি বাড়ী থেকে অন্যত্র চলে যায়, আর ফিরে না আসে, তাহলে সেটা অমঙ্গল হিসেবে ধরে নেয়া হয়। বাংলাদেশের কোন সম্প্রদায়ের লােকই এই কবুতরের গােস্ত ভক্ষণ করে না। এ কবুতরের নামও হযরত শাহজালাল রহমাতুল্লাহ-এ নামানুসারে নাম রাখা হয় জালালী কবুতর।

এদিকে হযরত শাহজালাল সকল স্থানেই তার মামার দেওয়া মাটি সহচর বৃন্দের দ্বারা পরীক্ষা করালেন কিন্তু এখন পর্যন্ত মিলাতে পারলেন না। তাই তার যাত্রাও রুদ্ধ হল না। তাই তিনি সামনের দিকেই অগ্রসর হলেন। এবারে তিনি বাংলাদেশের দিকে মনােনিবেশ করেন এবং এই দেশেই তিনি চলে আসেন।

গৌর গােবিন্দের পরিচয় ও তার অত্যাচার।

প্রকাশ থাকে যে গৌর গােবিন্দের পূর্ব পুরুষ সম্পর্ক তেমন কোন তথ্য পাওয়া যায় না। তবে ঐতিহাসিকদের মতে জানা যায় তিনি এক মহিয়সী মহিলার জারজ সন্তান ছিলেন। কোন ঐতিহাসিক বলেন, গােবিন্দ সমুদ্রের বড় পুত্র। একদিন ত্রিপুরা রাজ্যের এক মহীয়সী রাজার অজান্তে সমুদ্র দেবতার সংগে অবৈধ মেলামেশা করে সেই মিলন সমুদ্র দেবতার গর্ভধারণ করে যে বাচ্চা প্রসব করে তিনিই হল গৌর গােবিন্দ। তার দেহের আকৃতি এমন ভয়ানক ছিল যে তাকে দেখলেই মনে ঘৃণা আসত ও ভয় পেত। সে যাই হােক এক সময় সে তার বুদ্ধির চালে কূটনীতির মাধ্যমে গেীর রাজ্যের অধিপতি হয়ে বসে।

সিলেটের উত্তর অঞ্চলে পাহাড়িয়া উচু টিলার উপর ছিল তার রাজ প্রাসাদ। তার রাজ প্রাসাদ এমন ভাবে নির্মাণ করেছিলেন সেখানে বাইরের কোন শত্রু প্রবেশ করতে পারত না। সে এমন অত্যাচারী ছিল যে এক সময় অনুভব করতে পারলে যে আমার অসংখ্য শত্রু হয়েছে। তখন থেকে প্রসাদের চার পাশে পাহাড়ের গুহায় একদল অস্ত্রধারী প্রহরী নিযুক্ত করল যাতে করে কোন শত্রু রাজার উপর আক্রমণ না করতে পারে। গৌর গােবিন্দের রাজ্যের এখানে সেখানে অসংখ্য মূর্তি ছিল। রাজা মন্ত্রী সভার সদস্যগন সকলেই সর্বদা উহার পূজা করিত। রাজা এমন ভ্রমের মধ্য নিপতিত ছিল যে সেই মাটির তৈরী মূর্তির আদেশ উপদেশ অনুযায়ী নিজেকে পরিচালিত করত এবং রাজ্যও সেই অনুপাতে চালাত। তিনি এমন মনগড়া সংবিধানের উপর প্রতিষ্টিত ছিল যে, তার অস্ত্রগারে একটি বৃহাদাকারের ধনুক ছিল। ভ্রান্ত রাজা উহার মাধ্যমে ভাগ্য নির্ধারণ করত।

এবার আসা যাক তার অত্যাচারের দিকে। গেীর রাজা অত্যাচারের দিক থেকেই বেশী খ্যাতি লাভ করেছিল। সমস্ত সিলেট তিন ভাগে বিভক্ত করে তিনজন রাজা শাসন করত। তার মধ্য গৌর রাজ্যের শাসক ছিল গােবিন্ত। তাইতাে তার নাম হয় গৌর গােবিন্দ । তখন তার মতন অত্যাচারী উৎপীড়নকারী শাসক অন্য কোথাও দৃষ্টিমান হত না। তার অত্যাচারের বিক্রমে সকল স্তরের জনগণ সর্বদা ভয়ে কম্পমান থাকত। তার অত্যাচারের কথা পাশ্ববর্তী দেশগুলাের কারাে অজানা ছিল না। এক সময় তিনি পার্শ্ববর্তী রাজ্যের উপর তার অত্যাচারের হাত বাড়াল। তারাও রক্ষা পেল না। রাজা গােবিন্দ শাসকনীতি পরিহার করে পশুত্বের আচরণের দ্বারা পার্শ্ববর্তী রাজ্য দখল করে নিজ রাজ্যকে বিস্তার করেন। শুধু তাই নয় এক সময় তার রাজ্যকে একটি শক্তিশালী রাজ্যে পরিণত করেছিল।

ওলিয়ে কামেল হযরত শাহজালাল রহমাতুল্লাহ-এর সিলেট আগমনের পূর্বে সারা শ্রীহট্টকে(সিলেট) বিধর্মীরা দখল করেছিল। মুসলমানদের কোন অধিকার ছিল না। সকল শ্রেণীর জনগণকে অত্যাচারী রাজা মূর্তি পূজায় বাধ্য করত। এই কুআচরণ থেকে কেউই রক্ষা পেত না। সকলে ঘরে ঘরে গৃহ, দেবী নির্মাণ করে উহার পূজা অর্চনা করত। সেখানে ১২ মাসে ১৩ পূজার সমরোহ ঘটত। যারা রাজার পায়রুণী করত তারা বেশ সুখে-শান্তিতেই বসবাস করতে পারত।

কিন্তু মুসলমানরা তার অত্যাচারের কারণে তাদের ধর্ম পালনে সকলে ব্যর্থ ছিল। গােবিন্দের শাসনামলে সিলেট মুসলমানদের সংখ্যাও ছিল কম। মাঝে মধ্যে যারা দু’চার জন ছিল তাদের দুঃখ যাতনার সীমা ছিল না। কোন মুসলমান স্বীয় ধর্ম পালনে প্রকাশ্যে কোন কাজ করলে বা গােপনেও কিছু করলে তাকে রাজ দরবারে হাজির করে তার উপর নানা নির্যাতন উৎপীড়ন করত।

কোন স্থানে কোন মুসলান আযান দিলে কুকুরের মত লালায়িত হিন্দু গােষ্ঠীরা তাকে ধরে নিয়ে অত্যাচারী গােবিন্দের কাছে নিয়ে যেত। এক কথায় মুসলমানরা স্বাধীনভাবে তাদের ধর্ম পালন করতে পারতেন না। এমন কি কোন মুসলমান গরু জবাই করতে পারতেন না বা কোরবানীও করতে পারত না।

গােবিন্দের অত্যাচারে সকল মুসলমান অতিষ্ঠিত হয়ে উঠল। সকলেই একা একা ভাবতে লাগল যে আমার শক্তি থাকলে গোবিন্দের বিরুদ্ধে সংগ্রাম জারী করতাম। ঈমানী চেতনা তাদের মধ্যে কম ছিল না, কিন্তু কারাে একার পক্ষে রাজার বিরুদ্ধে কিছু বলার ক্ষমতা ছিল না। এমনকি কোন স্থানে রাজ সভায় হাজির করে নানা উপায়ে শাস্তি দিয়ে মারধর করে পাঠিয়ে দিত।

উচ্চস্বরে আযান একামত দিতে পারত না। নামাজের সূরা বা কোরআন তেলওয়াত করতে পারত না। যারা ধর্মে আগ্রহী ছিল তারা সকলেই চায় যে স্বীয় ধর্ম পালন করি তারই মুসলমানরাও এদের থেকে ব্যতিক্রমধর্মী ছিল না। সকল মুসলমানদের মনেই ধর্ম পালনের আগ্রহ ছিল কিন্তু অত্যাচারী শাসক গোবিন্দের কারণে কোন মুসলমান তাদের ধর্ম পালন করতে পারও না।

বুরহান উদ্দিনের ফরিয়াদঃ

রাজা গৌর গােবিন্দের শাসনামলে শ্রীহট্টের এক পাদদেশে পুন্যাত্মার অধিকারী শেখ বুরহান উদ্দিন নামে একজন লােক ছিলেন। তিনি আল্লাহর উপর বিশ্বাসী ছিলেন। তার দানও ছিল অটল। তিনি যখন যুবক বয়সে উপনীত হলেন তখন অনেক জায়গা থেকে বিয়ের প্রস্তাব আসল। কিন্তু বুরহান উদ্দিন যেমন পাকা ঈমানদার ছিলেন তার বুদ্ধি বিবেচনাও ছিল অনুরূপ। অন্য কোন ব্যক্তির ঈমান সম্পর্কে না জানলেও কতগুলাে নিদর্শন তার জানা ছিল তাই সে সেই নিদর্শন খুঁজে তার মত একটি পূর্ণবান মেয়েকে স্ত্রী-রুপে বরণ করলেন। বেশ সুখে-শান্তিতেই কয়েকটি বছর কেটে গেল। বুরহান উদ্দিন ঈমানে যেমন ছিলেন পরিপূর্ণ ধনে-জনে-মানেও তেমনি ছিলেন পরিপূর্ণ। সেহেতু স্ত্রীকে নিয়ে মহা শান্তিতেই দাম্পত্য জীবন যাপন করতে লাগলেন। কিন্তু বুরহান উদ্দিনের যখন যুবক জীবন কেটে গিয়ে বৃদ্ধ অবস্থায় পৌঁছলেন তখনও কোন সন্তানের মুখ দেখার সৌভাগ্য হল না। এতদিন বেশ সুখেই কাটল। যখন সন্তানের চিন্তা মাথায় ঢুকল তখন কে যেন তাদের সুখের ঘরে দুঃখের আগুন জ্বালালাে। এখন আর মনে শান্তি নেই। নানা জনে নানা কথা বলতে লাগল। অনেকেই বন্ধ্যা বলে আখ্যা দিল। এছাড়া অনেক কটূক্তি দ্বারা তাদের মন ও মগজ খারাপ করে তুলল। তিনিও চিন্তায় অধীর হলেন, আল্লাহ যদি আমাদের কোন পুত্র সন্তান দান না করেন, তাহলে আমার বংশ এখানেই শেষ। কারণ সংসারে সন্ধ্যা-বাতি জালালনোর কেউ থাকবে না। তাই চিন্তায় তিনি অধীর হয়ে উঠলেন সন্তান লাভের কোন চেতনাই ছিল না। আল্লাহর লীলা বােঝা ভার। প্রায় বৃদ্ধাবস্থায় তাদের মনে সন্তানের আকাঙ্ক্ষা থামল না।

বুরহান উদ্দিন ছিলেন খাটি ঈমানদার তাই সন্তান লাভের জন্য কৃএিম কোন পদ্ধতি না নিয়ে আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করতে লাগলেন। তাদের উভয়ের মন থেকেই কে যেন শান্তি কেড়ে নিল । এমন অবস্থায় তারা পেীছল যে খাওয়া দাওয়ার প্রতি তাদের তেমন মনযোগ নেই। দিন রাত শুধু সন্তানের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে আল্লাহর শাহী দরবারে ফরিয়াদ করতে লাগলেন। “হে আল্লাহ! তুমি অসীম। তােমার গুণ, মাগফেরাত, দয়া সব কিছুই অসীম। তােমার ধন ভান্ডার সব সময় পরিপূর্ণ। তুমি যাকে ইচ্ছা তাকেই দান করতে পার। তাই আমি তােমার কাছে কোন ধন সম্পদ চাই না। যে উদ্দেশ্যে এই গভীর রাত্রে আমরা তোমার দরবারে হাত তুলেছি তােমার কাছে তা অজানা নয়। “হে মাবুদ! তােমার কাছেই আকুল আবেদন তুমি আমাদের মনের আশা পূর্ণ করে দাও।”

বুরহান উদ্দিন ও তার স্ত্রী দিনের পর রাত আবার রাতের পর দিন আল্লাহর দরবারে ফরিয়াদ করতে লাগলেন। মহান দানশীল আল্লাহর কাছে মন খুলে কিছু চাইতে পারলে আল্লাহ তাকে তা দান করেন। এক সময় দেখতে পেলেন তার স্ত্রী গর্ভধারণ করেছে। কিন্তু তিনি ফরিয়াদ থেকে বিরত হলেন না। এক সময় তিনি ফরিয়াদ করতে গিয়ে বললেন, “হে মাবুদ তুমি আমাকে একটি পুত্র সন্তান দান কর। জানি তােমার দানের হাত খাট নয়। হে প্রভু! তুমি আমাকে একটি পুত্র সন্তান দান করিলে আমি একটি গুরু কোরবানী করব তােমার রাস্তায় বিলিয়ে দিতে। আল্লাহ তার প্রার্থনা কবুল করে একটি পুত্র সন্তান দান করলেন। |

এ কথা দিবালােকের ন্যায় সত্য যে বুরহান উদ্দিনের যুবক জীবনে কোন সন্তানাদি হয়নি। পরিশেষে তার প্রার্থনা আর্তনাদ ও মান্নতের ফলে তাদের উপর আল্লাহর রহমত নাযিল হল। এক সময় দেখা গেল পুন্যবর্তী স্ত্রী গর্ভধারণ করেছেন। এখন আর মনে আনন্দ ধরে না। কে দেখে সে আনন্দ? আনন্দে তারা উভয়ে চাতক পাখীর ন্যায় আশ্বস্ত ছিল, আজ সে আশা পূরণের পথে। তিনি দান সদকার হাতকে প্রসার করলেন। গরীব-দুঃখী তার কাছে এসে খুশি মনে ফিরে যায়। কারণ সে সকল ভিক্ষুককেই বেশী বেশী দান করতেন। ক্রমশঃ দীন পেরিয়ে যায় আনন্দও বাড়তে থাকে, আর আকাঙ্ক্ষাও বাড়তে থাকে, কোন দিন দেখবে সন্তানের মুখ।

অন্য দিকে আল্লাহর দরবারে প্রার্থনাও করতে থাকলেন হে প্রভু! তুমি আমাকে একটি নেক সন্তান দান কর। এদিকে তার স্ত্রীর নির্দিষ্ট সময়ও ঘনিয়ে আসল। রাত্রে তার স্ত্রী প্রসব বেদনায় অস্থির হয়ে পড়লেন। কিন্তু মনে ছিল তার অপার আনন্দ। সে যাই হােক কিছুক্ষণ পরে বুরহান উদ্দিনের অন্ধকার ঘরকে আলােকিত করে এক নবজাত পুত্রসন্তান পদার্পণ করল। তাদের উভয়ের মনে আনন্দের সীমা রইল না। সকলকে তিনি মিষ্টি মুখ করালেন। যারা তাকে কটুক্তি করেছিল তাদেরকেও ডেকে মিষ্টি মুখ করালেন।

বাচ্চার চতুর্দশ দিবসে তার অঙ্গীকার পালনের জন্য তার নিজের পালিত মােটা তাজা গরুটিই আল্লাহর নামে কোরবানী করে দিলেন। সমস্ত গােন্ত গরীব মিসকিনদের মধ্যে বন্টন করে দিলেন। শুধু তাই নয় গরীব মিসকিনদের জন্য এক প্রীতি ভােজের আয়ােজন করেছিলেন। খুব আনন্দের সাথেই কোরবানীর কাজ সমাধা করেছিলেন।

গৌর গােবিন্দের ক্রোধঃ মহান আল্লাহ তায়ালা ১৭০৯৯৯ টি মাখলুকাতকে মানুষের কল্যাণের জন্যই সৃষ্টি করেছেন। কারও থেকে শ্রম নিয়ে কারও গােস্ত ভক্ষণ করে মানুষ উপকৃত হয়। গরু এমন একটি প্রাণী যেটার দ্বারা মানুষ শ্রম ও ভােগ করে এবং ইহার গােস্তও ভক্ষণ করে। যে সব প্রাণীর গােস্ত আল্লাহ হালাল করে দিয়েছেন তাদের মধ্যে গরুর গােস্ত ছিল অন্যতম। তবে বামপন্থী দু একটা ধর্মে গরুকে ভগবতীর ন্যায় মনে করে উহাকে পূজা করে থাকে। সেহেতু তাদের নিকট গরু জবেহ করে হার গােস্ত ভক্ষণ করা খুবই জঘন্য অপরাধ মনে করে। আবার অনেকে গাে প্রাণীকে মায়ের সমান মনে করে খুব ভক্তি শ্রদ্ধা করে থাকে।

দুর্ধর্ষ পৌত্তলিক ও আচারনিষ্ঠ হিন্দু রাজা গৌর গােবিন্দও ছিল বাম পন্থী ভ্রান্ত দলের শামীল। তিনি স্বাভাবিক ভাবেই খুৰ অত্যাচারী লােক তার উপর আবার এহেন জঘন্যতম অপরাধে যে কত পরিবর্তন হয়েছে সেটা বলাবাহুল্য। তিনি এক বার গাে হত্যাকে রাষ্ট্রবিরােধি কাজ বলে ঘােষণা করেছিল যাতে করে কোন মুসলমান স্বীয় ধর্ম ঠিকভাবে পালন করতে না পারেন।

সে যাই হােক আল্লহর খেলা বোঝা ভার। ধর্ম প্রাণ বােরহান উদ্দিন একটি পুত্র সন্তান লাভ করে মহান প্রভুর কাছে কৃত প্রতিজ্ঞা পালন করার জন্য তার গৃহে পালিত সবচেয়ে সুন্দর ও সবচেয়ে হৃষ্টপুষ্ট গরুটাই আল্লাহর নামে কোরবানী করে উহার গােস্ত গরীব দুখীদের মধ্যে বন্টন করে দিলেন। এদিকে যখন গােস্ত বন্টন করতে ছিলেন তখন একটি পাখি এসে ছোঁ মেরে এক টুকরা গােস্ত নিয়ে গেল। আল্লাহর লীলা কে বুঝতে পারে? হতভাগা সে পাখিটি গােস্ত টুকরা খেতে পারল না। যখন গৌর গােবিন্দের রাজপুরীর উপর দিয়ে পাখিটি গােস্ত টুকরা নিয়ে উড়ে যাচ্ছিল তখন রাজপুরীর পূজামন্দিরের আঙ্গিনায় গােস্ত টুকরা পড়ে গেল।

কথায় বলে যেখানে বাঘের ভয় সেখানে রাত হয়। শেখ বােরহান উদ্দিনের পালাও তাই। খুব গােপন সতর্কের সাথে গাে জবাই করে গােস্ত বন্টন করেছিল। তারপরও তার সুখের সংসার তাসের ঘরের ন্যায় বালুর বাধের ন্যায় ফসকে গেল। তার জীবনে নেমে আসে অশাস্তির হাহাকার।

মহান আল্লাহ যে বােরহান উদ্দিনের কষ্টের মাধ্যমে এ বাংলার মুসলমান জাতিকে মুক্তি দেবেন তা কে জানত? গৌর গােবিন্দ যখন শিব পূজায় রত ছিল, ঠিক সেই সময় মন্দিরের সেবায়রত পূজারী দৌড়ে এসে কাপতে কাপতে বলে উঠল, মহারাজ সর্বনাশ হয়েছে, জাত, ধর্ম আচার-অনুষ্টান সব কিছুর সর্বনাশ হয়েছে। বেঁচে থেকে আর কি লাভ? বামন ঠাকুরের চেহারা বিকৃত হয়ে গেল। এবার গৌর গােবিন্দ বামন ঠাকুরকে লক্ষ্য করে বলল তুমি অমন কর না, কি হয়েছে বামন ঠাকুর খুলে বল। বামন ঠাকুর তখন কম্পিত কণ্ঠে বলল, মহারাজ আমরা যাকে ধর্মে মা বলে শ্রদ্ধা নিবেদন করি সেই গো মাংস মন্দিরের আঙ্গিনায়। একথা মুখে আনলেও নরকে যেতে হবে।

ঠাকুরের কথা শেষ না হতেই গৌর গােবিন্দ গর্জে উঠে বলল, অসম্ভব আমার রাজ্যে এমন কাজ করার সাহস কে পেল? তখন বামন তাকে সেখানে নিয়ে পড়ে থাকা গোস্তের টুকরাটি দেখাল। সাথে সাথে তেলে বেগুনে জ্বলে উঠল। বামন ঠাকুর বলল, নিশ্চয়ই কোন মুসলমানই এ কাজ করার সাহস পেয়েছে। গৌর গােবিন্দ রেগে বলল, মােসলমান? কোথায় সে মুসলমান আমার রাজ্যে বসে এতবড় জঘন্য অপরাধ করছে। কোন মুসলমানের বাচ্চায় এত বড় সাহস পেল? তখনই রাজা তার লােক লস্করকে ডেকে পাঠাল কে সেই অপরাধী মুসলমান। মুহুর্তের ভিতরে আমার সম্মুকে হাজির কর। নিজ হাতে আমি তাকে শায়েস্তা করব।

যেই কথা সেই কাজ। রাজার লােক লস্কর সকলে রাজ্যের অলি গলিতে ছড়িয়ে পড়ে। অনেক খোঁজাখুঁজির পর সংবাদ পেল যে শেখ বােরহান উদ্দিনই এই কাজ করেছে। এবারে সেখানে গিয়ে কয়েকজন লােক বােরহান উদ্দিনকে ধরে নিয়ে রাজ দরবারে হাজির করল।

গৌর গােবিন্দ গর্জে উঠে বােরহান উদ্দিনকে জিজ্ঞেস করল, কেন তুমি এহেন কাজ করেছ? কে তোমাকে এমন কাজ করার সাহস দিল। তখন বােরহান উদ্দিন তার সমস্ত ঘটনা খুলে বললেন। অত্যাচারী গােবিন্দ ইহা শুনে আরো ক্রোধে ফেটে পড়ল। বলল একটি ছােট শিশুর মঙ্গলের জন্য এহেন জঘন্যতর অপরাধ করতে সাহস পেলে? আজ আর তােমার রক্ষা নেই। এদিকে পাপিষ্ঠ গৌর গােবিন্দ বােরহান উদ্দিনের সেই অনেক দিনের চাওয়া পাওয়া আকাংখিত নবজাত শিশুকে রাজ দরবারে আনার জন্য আদেশ করল।

নিষ্ঠুর লােক গিয়ে বােরহান উদ্দিনের ঘরে হাজির হল। নির্দয় লােক গুলাে গিয়ে বােরহান উদ্দিনের স্ত্রীর কোল থেকে মায়ের বুকের ধন সেই নবজাত শিশুটাকে কেড়ে নিয়ে এল। এবারে রাজার হুকুম জারী হল। বােরহান উদ্দিন যে ভাবে আমাদের ধর্মের অবমাননা করে গো জবাই করে মাংস টুকরা টুকরা করেছে সেই ভাবে তার সন্তানকে হত্যা করে টুকরা টুকরা করে পশুদের আহার বানিয়ে দাও।

জল্লাদ আগে এসেই রাজ দরবারে হাজির হয়েছে। যখনই গৌর গােবিন্দ এই হুকুম করল জল্লাদও সংগে সংগে প্রস্তুতি নিয়ে সেই বােরহান উদ্দিনের আকাংখিত বন্ধু তথা নবজাত সন্তানকে হত্যা করে ফেলল। এদিকে বােরহান উদ্দিনের উপর যখন এরূপ কঠোর নির্দেশ জারী হল, তখনই তিনি জ্ঞান বুদ্ধি হারা অচেতন নির্বাক হয়ে কাঠের পুতুলের ন্যায় দাড়িয়ে রইলেন। তিনি ভাল মন্দ বিচার করার শক্তিও হারিয়ে ফেললেন। তার সম্মুখে সেই আদরের সন্তানকে হত্যা করা হলেও কিছুই বলার শক্তি তার ছিল না। এখানেই অত্যাচারী রাজার অত্যাচারের হাত ক্ষান্ত হল না। আরাে সম্মুখ দিকে অগ্রসর হল।

এবার রাজা বলল, হে-বােরহান উদ্দিন তুমি যে হাতে গাে-জবেহ করেছ সে হাতিটিও কাটা যাবে। রাজার যেই কথা জল্লাদের সেই কাজ। সাথে সাথে নিষ্ঠুর জল্লাদ বােরহান উদ্দিনের হাত খানও কেটে দিল। উ! কি সে হত্যা কান্ড। সে কি বিভীষিকাময় মুহুর্ত। বােরহান উদ্দিনের অন্তরে দুঃখের ঝড় বয়ে গেল। দুঃখের অন্ত রইল না। তবুও অটল বিশ্বাসী বােরহান উদ্দিন দ্বীন থেকে বিচলিত হলেন না। তিনি হাত তুলে আল্লাহর দরবারে ফরিয়াদ করলেন, হে প্রভু! তোমার আশাই পূর্ণ হােক। তবে সকল অবস্থায় যেন তােমার উপর অটল বিশ্বাস রাখতে পারি সে তাওফিক আমাকে দান কর।

বােরহান উদ্দিনের গােবিন্দের উপর আক্রোশ! ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় গােবিন্দ যেমন ছিল অত্যাচারী তেমন ছিল নিষ্ঠুর। এবারে তার নিষ্ঠুর খেলার নিপাত হল। মাসুম অবুঝ শিশুকে হত্যা করার সময় শিশুর কান্নায় আসমান জমিন স্তম্বিত হল। বাতাস নদীর স্রোত থমকে দাড়াল। পশুর কলগান রুদ্ধ হয়ে গেল। গাছ পালা সব ঝিমুতে লাগল । পৃথিবীর দিকে তাকালে মনে হত, সারাবিশ্ব যেন শিশুর কান্নায় করুণ সুরে সুর মিলিয়ে কান্না জুড়ে দিল। বৃক্ষের পাতা ঝরে পড়ল। শিশুহারা মায়ের হৃদয় ফেটে চৌচির হয়ে গেল। মায়ের কান্না আসমান জমি এমনি আরশ পর্যন্ত কেঁপে উঠল। | কিন্তু পাপিষ্ঠ নরাধম গােবিন্দের সুরে মােটেই ব্যথার উদ্রেক হল না। বরং আনন্দই পেল।

আল্লাহর লিলা বােঝ ভার। বােরহান উদ্দিনের আনন্দ যে ভাবে গােবিন্দ নষ্ট করে দিল। আল্লাহ পাক রাব্বল আলামীনও গােবিন্দের আনন্দকে নস্যাৎ সেভাবে করে দিলেন। বােরহান উদ্দিন তার পুত্র শােকে ভীষণ ভাবে মর্মাহত হলেন। তিনি যেন একেবারেই নির্বাক হয়ে গেলেন। তার অন্তরও যেন ভেংগে চুরে চুরমার হয়ে গেল। এক সময় শেখ বােরহান উদ্দিনের চেতনা ফিরে এল। এবারে মানসিক চিন্তা ছেড়ে ঈমানী, বলে বলিয়ান হয়ে মাথা চাড়া দিয়ে উঠলেন। ধর্ম পালনের জন্যই যদি নবজাত শিশুর মৃত্যুদণ্ড হয় তাহলে আমাকে এর প্রতিশােধ নিতেই হবে। শিশুকে উদ্দেশ্য করে বললেন, বাবা তুমি সুখে ঘুমাও আমি তােমার প্রতি ফোটা রক্তের প্রতিশােধ নিব ইনশাল্লাহ। এক সময় তিনি প্রতিশােধের পথ বের করে সে পথে চলতে লাগলেন। |

গােবিন্দের বিরুদ্ধে অভিযান ॥ গৌর গােবিন্দ বােরহান উদ্দিনের পুত্র হত্যা করায় শেখ বােরহান উদ্দিন পুত্র শােকে শােকাতুর হয়ে পথ চলতেছেন আর গােবিন্দের প্রতিশােধ নেওয়ার পথ খুঁজতেছেন। এক সময় বুদ্ধি আটলেন গােবিন্দের প্রতিশােধ নিতে হলে কোন মুসলমান বাদশার সাহায্য নিতে হবে। নচেৎ একের পক্ষে কিছুতে তা সম্ভব হবে না।

তখন বাংলার রাজধানী ছিল সুকর্ণ গমে। তখন বাংলার সুলতান ছিলেন সামসউদ্দিন আহমেল। বােরহান উদ্দিন সুলতানের দরবারে হাজির হয়ে তার কাছে বােরহান উদ্দিনের পুত্র শােক ও সকল মনের দুঃখ বললেন। শামস উদ্দিন বােৰহান উদ্দিনের দুঃখের কথা শুনে কষ্টে ফেটে পড়লেন। গজে উঠে বললেন, গােবিন্দের প্রতিশােধ নিতেই হবে।

নরাধম পাপিষ্ঠ গৌর গােবিন্দকে সমুচিত শিক্ষা দেওয়ার জন্য তার সুযােগ্য পুত্র সিকান্দার শাহকে সেনাপতি করে একদল সৈন্য বাহিনী পাঠালেন। শ্রীহটের পাহাড়িয়া গিরিপথ ধরে গেীর রাজধানীর দিকে চলতে লাগলেন। এদিকে দুরাত্য গৌর গােবিন্দ সিকান্দার শাহের কবল থেকে মুক্তির জন্য একদল তিরান্দাজ বাহিনীকে গিরি পথের পাশে পাঠালেন।

যখন মুসলিম সেনারা পথ চলতে ছিলেন হঠাৎ দুর্বত্তরা তাদের উপর আকস্মাৎ হামলা চালিয়ে সেনাদলকে চিন্ন ভিন্ন করে দিল। এর পর সেকান্দার ব্যর্থ হয়ে রাজধানীতে ফিরে এলেন। কিন্তু গৌর গােবিন্দের প্রতিশােধ নেবার মনােবল হারাননি। উহার জন্য তিনি পুনরায় বিরাট এক বাহিনী তৈরী করলেন। এর মধ্যে তার পিতা ইন্তেকাল করেন। হলেও তিনি প্রতিশোধ নেবার ইচ্ছা বাদ দিলেন না। এদিকে গৌর গােবিন্দ গােয়েন্দর দ্বারা জানতে পেল যে তার বিরুদ্ধে আবার অভিযান শুরু হবে। এবারে বাঁচার কোন পথ খুঁজে পেল না।

অবশেষে গৌর গােবিন্দ এ কৌশল এঁটে সেকান্দার শাহের কাছে দূত পাঠালেন যে আমি মুসলমানদের সাথে সন্ধি চুক্তিতে আবদ্ধ হতে চাই। এই প্রস্তাবে সিকান্দার শাহ সম্মত হলেন। তার সন্ধির শর্ত ছিল যে আমি মুসলমানদের উপর কোন অত্যচার-অবিচার করিব না। তাদের ধর্ম কর্মের উপর হস্তক্ষেপ করব না। বরং তাদের ধর্ম পালনের জন্য রাজ দরবারে একখানা মসজিদ নির্মাণ করে দিব যাতে করে মুসলমানরা ঠিকভাবে তাদের ধর্ম পালন করতে পারে।

ধর্ম পরায়ণ সিকান্দার শাহ তার প্রস্তাবে রাজী হয়ে তার অভিযান ক্ষান্ত রাখলেন। এতে বােরহান উদ্দিনের মনে শান্তি ছিল না। বােরহান উদ্দিনের অন্তরে প্রতিশােধের আগুন দাউদ করে জ্বলতে লাগল। তিনি সেকান্দার শাহের দ্বারা তেমন ফল না পেয়ে অন্য উপায় খুঁজতে লাগলেন। কিভাবে গােবিন্দের প্রতিশােধ নেয়া যায়।

এর পর দ্বিতীয় পথ ধরে চলতে লাগলেন। তিনি ধর্ম পরায়ণ সুলতান ফিরােজ শাহ-এর দরবারে গিয়ে হাজির হলেন। তিনি তার মনের সকল দুঃখ ব্যাথা সুলতানের কাছে খুলে বললেন। তিনি বােরহান উদ্দিনের মুখে এমন কথা শুনে অত্যন্ত মর্মাহত হলেন। যে মুসলমানদের উপর এমন অত্যাচার। তিনি ব্যথিত হবেনই বা না কেন? পাঠান আমলে তার মত ন্যায়পরায়ণ বাদশাহ, অন্য কেউ ছিলেন না।

এবারে তিনিও গৌর গােবিন্দের প্রতিশােধ নিতে সম্মত হলেন। অপর দিকে পরগণার শাসন কর্তা নারায়নও মুসলমানদের উপর নানা উৎপিড়ন করত। তাই তার অত্যাচার অতিষ্টিত হয়ে সেখানের একজন মুসলমান ফিরােজ শাহের নিকট নালিশ করলেন। এবারে দুই দেশের অত্যাচারী হিন্দু দু’শাসকের বিরুদ্ধে অভিযান করার জন্য সৈন্য বাহিনী গঠন করলেন।

তিনি তাদের উভয়কে সমুচিত শিক্ষা দেবার জন্য তার ভাগীনে সিকান্দার কে গােবিন্দের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার জন্য নির্দেশ দিলেন। সিকান্দর গাজী মামার নির্দেশ পেয়ে সৈন্য বাহানী নিয়ে শ্রীহট্টের দিক যাত্রা করলেন। বােরহান উদ্দিনও ওদের সংগী হলেন, বড়ই পরিতাপের বিষয় যে তিনি গন্তব্য স্থানে পৌছাতে পারলেন না। পথিমধ্যে তিনি বাধার সম্মুখীন হলেন। তখন ছিল বর্ষাকাল তাইতাে সহসা ভীষণ ঝড় শুরু হল। এই ঝড়ের ঠান্ডায় অনেক সৈন্যই রােগাক্রান্ত হয়ে পড়ল। সিকান্দার গাজী তার অভিযানে সামনের দিকে আর আসর হতে পারলেন না।

অনেক সৈন্য পথিমধ্যে রােগাক্রান্ত হয়ে মারাও গিয়েছেন। এ অবস্থা দেখে হতাশায় পড়ে তিনি রােগাক্রান্ত হয়ে পড়লেন। অনেকে এখন মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ল, তখন মৃত্যুর ভয়ে অনেক সৈন্য তাবু থেকে পলায়ন করে চলে গেল । যারা বেঁচে রইল তারাও শক্তিহীন হয়ে পড়লেন।এত বিপদের পরও তিনি নিরাশ হলেন না। তিনি পুনরায় দিল্লীর শাসন কর্তার নিকট লোক মারফতে তার বিপদের কথা জানালেন ও আরাে কিছু সংখ্যক সৈন্য চাইলেন যাতে করে তার যাত্রাকে সফল করে তােলা যায়।

সিকান্দার গাজীর বিফল মনোরথের সংবাদ দিল্লীর সম্রাট আলাউদ্দীন খিলজীর নিকট পৌছায়। সম্রাট এ সংবাদে শুনে খুবই মর্মাহত হন। সম্রাট আলাউদ্দীন খিলজী রাজ দরবারে আলেম উলামাসহ জ্যোতিষীদের নিয়ে আলোচনায় বসেন। মজলিসের আলোচনায় জানতে পারেন সুলতানের সেনাবাহিনীতে আধ্যাত্বিক গুনাবলী সম্পন্ন এক মহান ব্যাক্তি রয়েছেন। যদি ঐ ব্যাক্তির নেতৃত্বে অভিযান প্রেরণ করা হয় তাহলে গৌড় গোবিন্দের যাদু বিদ্যার মোকাবেলা করে সিলেট বা শ্রীহট্ট জয় কারা সম্ভব হতে পারে। আর সেই আধ্যাত্বিক ব্যাক্তি হলেন সৈয়দ নাসির উদ্দীন সিপাসালার। সৈয়দ নাসির উদ্দীন সম্রাট আলাউদ্দীন খিলজীর আদেশে সম্মত হলে সম্রাট তাঁকে সিপাহসালার সনদ প্রদানের মাধ্যেমে সিকান্দর গাজীর কাছে প্রেরণ করেন।

হযরত শাহজালাল রহ এর সাথে বুরহান উদ্দীনের দেখাঃ

আর বুরহান উদ্দীন তখন দিল্লীতে অবস্থান করতেছেন। ঐতিহাসিক আজহার উদ্দীন ধরণা করেন, বুরহান উদ্দীনের সাথে দিল্লীতেই শাহ জালালের সাক্ষাত হয় এবং এখানেই বুরহান উদ্দীন নিজের দুঃখময় কাহিনী তাঁর নিকট বর্ণনা করেন ।

সিপাহশালার নাসির উদ্দীনের সাথে হযরত শাহজালাল রহ এর দেখাঃ

হযরত শাহ জালাল(রহ:) দিল্লী হতে বুরহান উদ্দীনকে সঙ্গে নিয়ে ২৪০ জন সঙ্গীসহচর শ্রীহট্রের উদ্দেশ্য রওয়ানা দেন। হযরত শাহ জালাল সাতগাও এসে ত্রিবেণীর কাছে দিল্লীর সম্রাট প্রেরিত অগ্রবাহিনী সেনাপতি সৈয়দ নাসির উদ্দীন সিপাহসালার এর সাথে মিলিত হন। সৈয়দ নাসির উদ্দীন সিপাহসালার হযরত শাহ জালাল সম্পর্কে অবগত হয়ে তার শিষ্যত্ব গ্রহন করেন। পথে পথে হযরত শাহ জালালের শিষ্য বর্ধিত হতে লাগল । ত্রিবেনী থেকে বিহার প্রদেশে আসার পর আরো কয়েকজন ধর্ম যুদ্ধা সঙ্গী হলেন, যাদের মধ্যে হিসাম উদ্দীন, আবু মোজাফর উল্লেখযোগ্য। এখান থেকে সিপাহসালার সৈয়দ নাসির উদ্দীন সিপাহসালার আনিত একহাজার অশ্বারোহী ও তিন হাজার পদাতিক সৈন্য সহ হযরত শাহ জালাল (রহ:) নিজ সঙ্গীদের নিয়ে সোনার গাঁ অভিমুখে সিকান্দর গাজীর সাথে মিলিত হওয়ার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন।

হযরত শাহ জালাল (রহ:) এর সাথে সিকান্দর গাজীর দেখা ও ব্রহ্মপুত্র পার:
সোনার গাঁ আসা মাত্রই হযরত শাহ জালাল (রহ:) এর সাথে শাহ সিকান্দর গাজীর সাক্ষাত হল। সিকান্দর গাজী হযরত শাহ জালাল (রহ:) কে সসম্মানে গ্রহন করলেন । সিকান্দরের শিবিরে সমাগত হয়ে হযরত শাহ জালাল (রহ:) তাঁর সঙ্গী অনুচর ও সৈন্য সহ শাহ সিকান্দর হতে যুদ্ধ বিষয়ে সব বিষয় অবগত হন। সিকান্দর হযরত শাহ জালাল (রহ:) এর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে শিষ্যত্ব গ্রহন পুর্বক সিলেটের দিকে যাত্রা করলেন । এভাবে হযরত শাহ জালাল (রহ:) এর শিষ্য সংখ্যা ৩৬০ জনে পৌছে।

ঐ দিকে গৌড় গৌবিন্দ নিজেস্ব চরদ্বারা হযরত শাহ জালাল (রহ:) এর সমাগম সংবাদ পেয়ে ঐ দল যাতে ব্রহ্মপুত্র নদী পার না হতে পারেন সেজন্য নদীর সমস্ত নৌ চলা-চল বন্ধ করে দেয় । হযরত শাহ জালাল (রহ:)তাঁর শিষ্যদের নিয়ে বিনা বাধায় জায়নামাজের সাহয্যে ব্রহ্মপুত্র নদী অতিক্রম করেন।

সিলেটে প্রবেশ:
খ্রিস্টিয় দশম শতকে শ্রীহট্ট ভুমী লাউড়, জয়ন্তীয়া ও গৌড় নামে তিনটি স্বাধীন রাজ্যে বিভক্ত ছিল। ঐ রাজ্য গুলোর মধ্যে গৌড় ছিল অন্যতম রাজ্য। ঐ রাজ্যের প্রাচীন সীমা রেখা বর্তমান মৌলভীবাজার জেলা সহ হবিগঞ্জ জেলার কিছু অংশ নিয়ে বিস্তৃত থাকায় গৌড় রাজ্যের দহ্মিণ সীমাভুমী নবীগঞ্জের দিনারপুর পরগণার পাশে গৌড় গৌবিন্দ এর চৌকি ছিল।

হযরত শাহ জালাল (রহ:) তাঁরসঙ্গীদের নিয়ে ব্রহ্মপুত্র নদী পার হয়ে প্রথমত ঐ স্তানে অবস্থান করেন। এখানে গৌড় গৌবিন্দ এর সীমান্ত রক্ষীরা অগ্নীবাণ প্রয়োগ করে তাদেরকে প্রতিহত করার চেষ্টা চালায় । তবে মুসলমান সৈন্যের কোন ক্ষতি করতে পারেনি। গৌড় গৌবিন্দ সমস্ত বিষয় অবগত হয়ে উপায় না পেয়ে বরাক নদীতে নৌকা চলাচল নিষিদ্ধ বলে ঘোষনা জারি করে দেয়। হযরত শাহ জালাল (রহ:) আগের মত জায়নামাজের দ্বারা বরাক নদী পার হন। বরাক নদী পার হওয়ার পর বাহাদুরপুর হয়ে বর্তমান সিলেট জেলার বালাগঞ্জ উপজেলায় ফতেহ পুর নামক স্থানে রাত যাপন করেন।

উল্লেখিত তথ্য সম্মেলিত প্রাচীন গ্রন্থ তোয়ারিখে জালালীতে উল্লেখ আছে।

সকল প্রকার কলা-কৌশল অবলম্বন করার পর রাজা গৌড় গৌবিন্দ যখন দেখলেন সব প্রয়াসই বিফল হইতেছে , তখন শেষ চেষ্টা করার জন্য যাদু মন্ত্র সহ এক প্রকাণ্ড লৌহ ধুনুক হযরত শাহ জালাল (রহ:)কাছে পাঠালেন যার শর্ত ছিল যদি কোন লোক একা উক্ত ধনুকের জ্যা ছিন্ন করতে পারে তখন গৌড় গৌবিন্দ রাজ্য ছেড়ে চলে যাবে। হযরত শাহ জালাল (রহ:) তাঁর দলের লোকদের ডেকে বললেন; যার সারা জীবনের কোনসময় ফজরের নামাজ খাজা হয় নাই বা বাদ পরে নাই কেবল মাত্র সেই লোকই পারবে গৌড় গৌবিন্দ এর লৌহ ধনুক “জ্যা” করতে। অতপর মুসলমান সৈন্য দলের মধ্য থেকে অনুসন্ধান করে সৈয়দ নাসির উদ্দীন সিপাহসালারকে উপযুক্ত পাওয়া গেল আর তিনিই ধনুক জ্যা করলেন।

সুরমা নদী পারাপারঃ
উত্তর পূর্ব ভারতের বরাক নদী বাংলাদেশে প্রবেশ করার সময় সুরমা ও কুশিয়ারা নদীতে বিভক্ত হয়ে গেছে। এ নদী গুলোকে সিলেট বিভাগের বেষ্টনী হিসেবে ধরা হয়। প্রাচীন কালে এ নদী গুলো প্রবল স্রোতে প্রবাহিত হত এবং বর্ষাকালের দৃশ্য প্রায় সাগরের মত দেখা যেত। ঐতিহাসিক পর্যটক ইবন বতুতা সুরমা নদীকে নহরি আজরফ বলে আখ্যায়িত করেছেন । হযরত শাহ জালাল (রহ:) ফতেপুর হতে যাত্রা করে যখন সুরমা নদীর তীরে অবস্থান নিয়েছিলেন। এ নদী পার হয়েই গৌড় গৌবিন্দ এর রাজধানী। শাহ জালাল আউলিয়ার কেরামতি ও আলৌকিক বিভিন্ন ঘটনার কারনে গৌড় গৌবিন্দ বীতশ্রদ্ধ হয়ে পরল। গৌড় গৌবিন্দ শক্রবাহিনীকে কিছু সময় ঠেকিয়ে রাখার জন্য সুরমা নদীতে নৌকা চলাচল নিষিদ্ধ করল। তা সত্ত্বেও হযরত শাহ জালাল (রহ:) নদী পার হলেন।
হযরত শাহ জালাল (রহ:) বিসমিল্লাহ বলে সকল মুরিদকে নিয়ে জায়নামাজে করে অনায়াসে গেলেন চলে নদীর ওপারে।

গৌড় গৌবিন্দ গড়দুয়ারস্থিত রাজবাড়ি পরিত্যাগ করে পেচাগড়ের গুপ্ত গিরি দুর্গে আশ্রয় নেন। এরপর থেকে তার আর কোন হদিস মেলেনি। হযরত শাহ জালাল (রহ:) তিন দিন সিলেটে অবস্থান করার পর মিনারের টিলায় অবস্থিত রাজবাড়ি প্রথমে দখলে নিলেন।

চিরকুমার শাহজালাল। যে সকল মহামানব ধরার বুকে থেকে আল্লাহর প্রেম ও নৈকট্য লাভ করতে সক্ষম হয়েছেন তাদের মধ্যে হযরত শাহজালাল রহমাতুল্লাহ ছিলেন অন্যতম। আল্লাহর প্রেম ও নৈকট্য লাভকারী বান্দারা কোন দিন এই নশ্বর জগতে সংসার পাতাবার ইচ্ছা করেননি। হযরত শাহজালাল রহমাতুল্লাহ-এর জীবন ও ইহার বিন্দুমাত্র ব্যতিক্রম ঘটেনি। তবুও রক্ত মাংসে গড়া মানুষের সংগীনী নিয়ে জীবন চালাতে কার না ইচ্ছে হয়? কিন্তু শুধু আল্লাহর প্রেমে মুদ্ব হয়েই তিনি জীবনের এ দিকটার প্রতি ছিলেন সম্পূর্ণ উদাসীন। অনেক সময় খুব সুন্দরী ও ধনাঢ্য ব্যক্তিদের প্রস্তাব আসত। কিন্তু কোন ক্রমেই তা জনি গ্রহণ করেনি।

কোন কোন সময় তার শিষ্যরা তার কাছে বিয়ে না করার কারণ জিজ্ঞেস করত। তাদের উত্তরে তিনি একথাই বলতেন যে মহান আল্লাহ যে উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করেছেন তার দায়িত্বই ঠিক ভাবে আদায় করতে পারিনি। সেহেতু আবার একটি বিয়ে করে সংসারের ঝামেলা মাথায় নেয়া উচিত মনে করি না। আবার তিনি শিখ শাগরেদরকে বলতেন তােমরা তাে আমার বিয়ের জন্য বল, আসলে যার শরীর আছে, রক্ত আছে তার বিয়ে ও প্রয়ােজন আছে। কিন্তু আমার সে শরীরই নেই, এই যে সেই দেহ খানা দেখ এটাতাে সম্পূর্ণ আল্লাতেই বিলীন করে দিয়েছি। অতএব, আমার বিয়ের দরকার হয় না। আর একবার হযরতের কাছে বিয়ের প্রস্তাব আসলে উহার উত্তরে তিনি বলেন, দুনিয়ার সকল অশাস্তির মূল কারণ হলে নারীরা তাই আমি সেই অমাপ্তির অতল গহবরে ডুবতে চাই না। চাই শুধু আল্লাহর প্রেম ও নৈকট্য। কোন মানুষের কাছে ঋণীহীন জীবন যাপন করা খুবই কষ্টসাধ্য তাই বলে হযরত শাহজালালের বেলায় সেটা হয়ে ওঠেনি। কারণ তিনি সদা সর্বদা আল্লাহকেই প্রকৃত সংগী রূপে গ্রহণ করেছিলেন।

সেহেতু বলা যায় বাহ্যিক দৃষ্টিতে সংহীহীন দেখলেও প্রকৃত পক্ষে তিনি সংগীহীন ছিলেন না। তিনি বিবাহ করেননি বলে সমাজে মােঙ্গাররদি নামেও পরিচিত ছিলেন। ইহার এ হল “চিরকুমার” তিনি দুনিয়ার লােভ-লালসা, ধন-সম্পদ, আরাম-আয়েশের প্রতি খনােই মত্ত হননি। তার জীবনের প্রধান কাজই ছিল জাহেলিয়াতের মধ্যে সুন্দর ও সত্য ধর্ম প্রতিষ্ঠিত করা। যারা অসৎ পথে চলে গেছেতা দেরকে সৎপথে আনা।

আল্লাহর দেয়া এই মহান দায়িত্ব পালনের জন্যই তিনি স্বীয় মায়ামমতায় বিজড়িত ভুমি ত্যাগ করেছেন এবং তার প্রচারের সঠিক জায়গাটা বেছে নেয়ার জন্য এশিয়া বিভিন্ন দেশে ভ্রমণ করেছেন। পরিশেষে শ্রীহট্টেই হলাে তার প্রকৃত ধর্ম প্রচারের স্থান। কৈান এক সময় শীতের মৌসুমে হযরত শাহজালাল রহমাতুল্লাহ শীতে আক্রান্ত হয়ে বারংবার মুসলিম শাসক সেকান্দার গাজীকে জানালেন আমার জন্য শীতের একটা ব্যবস্থা করুন।

এর জবাবে মুসলিম শাসক সেকান্দার গাজী বললেন শাহজালাল শীতের দিনে শরীর গরমের জন্য একজন সুন্দরী নারী চান। রাজার যেই কথা উজিরদের সেই কাজ। সেকান্দার গাজীর হুকুমে একজন সুন্দরী নারীকে পালকিতে করে হযরত এর কাছে পাঠিয়ে দিলেন।সংসার ত্যাগী হযরত শাহজালাল রহমাতুল্লাহ বললেন, হে সংসাসক্ত সেকান্দার গাজী! তুমি নিজেও এ নশ্বর জগতের মায়ায় অতল গহবরে ডুবেছ আর আমাকে ডুবাতে চাও। সেকান্দার গাজীর কারুকার্যে শাহজালাল বিস্মিত হয়ে বললেন, তুমি আমাকে এই নশ্বর জগতের মায়ায় ডুবাতে চাও এর চেয়ে তুমি একাই মর। আল্লাহর ওলির মুখে কথা কি আর বিফল যায়? এদিকে সেকান্দার গাজী পরমা সুন্দরীকে হুজুরের কাছ পাঠিয়ে নদীর ঘাটে বড়শি নিয়ে মাছ ধরতে গেলেন। এদিকে হযরত যখন তাকে একাকী ডুবে মরার জন্য বললেন, সাথে সাথে সেকান্দার গাজী হোঁচট খেয়ে নদীতে পড়ে মারা গেলেন ।

এটা আল্লাহর ওলির অলৌকিক ক্ষমতা ছাড়া কিছুই নয়। “মহাসাধক হযরত শাহজালাল রহমাতুল্লাহঃ নারী সংসর্গকে পছন্দ না করলেও তিনি নারীত্বের অবমাননা হতে দিতেন না। সে যাই হােক তিনি তার একনিষ্ট শিষ্য হাজি ইউসুফকে বললেন হে ইউসুফ! তুমি এই সুন্দরীকে বিয়ে করে নাও। হাজী ইউসুফও ছিলেন সংসার ত্যাগী, তাই তিনি কোমল কন্ঠে বললেন, ওহে হযরত! নিজের ভরণ পােষণের জন্য আল্লাহর উপর নির্ভরশীল তাই একে বিয়ে করে আবার কোন ঝামেলায় পড়ব? সে যাই হােক শুরুর কথা তিনি অমান্য না কর সেই পরমা সুন্দরীকে বিয়ে করলেন।

বর্তমানে সেই শ্রীহট্টে শাহজালালের দরবার যার পরিচালনা করেছেন তারা সেই হাজী ইউসুফেরই বংশধর। পরিশেষে একথা বলা যায় যে, হযরত শাহজালাল চিরকুমার থেকেই আল্লাহর প্রেম লাভ করে জীবনকে ধন্য করেছেন।

হযরত শাহজালাল রহমাতুল্লাহ এর শেষ জীবনঃ

ওলিকুলের শ্রেষ্ঠতম সত্যের মহাসাধক হযরত শাহজালাল রহমাতুল্লাহ মহাসাধনার মাধ্যমে অর্জন করেছিলেন আল্লাহর প্রেম। তাইতাে মানুষ আজ তাকে স্মরণ করে ভক্তি করে। তিনি যেমন ছিলেন ওলিকুলের শিরোমণি সত্যের মহাসাধক ও ইসলাম প্রচারক তেমনি তিনি ছিলেন একজন জনদরদী সমাজ সেবক মহামানব। জনকল্যাণমূলক কাজের জন্যই তিনি আজ সকল শ্রেণীর মানুষের কাছে স্বরনীয় ও বরণীয় হয়ে আছেন। তিনি একথা জানতেন আল্লাহর সেবা করা মানেই তার সৃষ্ট জীব মানুষের সেবা করা। তাইতাে তার সারাটি জীবনই জনসেবার লক্ষ্যে উৎসর্গ করেছেন। এমনভাবে তিনি জনগণের কল্যাণের জন্য নিজেকে বিলীন করেছেন যে তিনি নিজের খাওয়া দাওয়ার কথাও ভুলে যেতেন। কিন্তু দুনিয়ার কোন সুখশান্তি তার অন্তরে স্থান পায়নি। তিনি সর্বদা এ নশ্বর জগতের মতিয়া মোহ-লোভ-লালসা, সুখ-শান্তি থেকে নিজেকে দূরে রাখতেন। যাতে করে আল্লাহর প্রেমর কোন ব্যাঘাত ঘটে। তিনি এমন কোন কাজ করতেন না যাতে আল্লাহ নারাজ হয়ে যান। দিনের বেলায় তিনি অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে ইসলাম প্রচার করতেন এবং মানুষের দ্বারে দ্বারে গিয়ে তাদের সুখ সুবিধা দেখে তাদের মঙ্গলের জন্য উন্নয়নমূলক কাজ করতেন। অবসর পেতেন একটু রাত্রে।

তাও তিনি বিছানায় শুয়ে আরামে নিদ্রা যাননি। সে অবসর সময়টুকুও তিনি আল্লাহর ইবাদতের মাধ্যমে কাটাতেন। তাইতাে তিনি সকল প্রকার জ্ঞান লাভ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তিনি যখন ধর্মের ব্যাপারে আলােচনা করতেন তখন জনগন বুঝত তিনিই একজন শ্রেষ্ঠ সমাজ সংস্কার ও রাজনীতিবিদ ও সুদক্ষ রাষ্ট্র পরিচালক। আবার যখন তিনি অর্থনীতির দিকে আলােকপাত করতেন, তখন সকলের মনে হত হযরত শাহজালাল রহমাতুল্লাহ একজন অন্যতম অর্থনীতিবিদ কারণ তার ঐকান্তিক ইচ্ছা ছিল ধর্ম নীতির সাথে রাজনীতি, অর্থনীতির সমাজনীতির সমন্বয়ে রাষ্ট্রকে সাধন ও প্রতিষ্টিত করা। ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান তাই জীবন চলার পথে সর্বক্ষেত্রের প্রয়ােজন মেটাতেই ইসলাম সক্ষম। আর এ আদর্শের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিলেন হযরত রাসূলে করীম (সঃ) ও খােলাফায়ে রাশেদিন।

হযরত শাহজালাল রহমাতুল্লাহ ছিলেন রাসূলের সুন্দরতম পূর্ণ আদর্শের উপর প্রতিষ্ঠিত। সেহেতু তিনি রাসূলের ন্যায়ই সকল কাজ করার চেষ্টা করতেন। ইসলাম যেমন ব্যাপক তিনি তেমনি ব্যাপক ভাবেই প্রচার করতেন। ইসলামকে কোন প্রতিষ্ঠান বা সংগঠনের মধ্যে সীমিত রাখেননি। শুধু কেবল কলেমা, নামাজ, রােজা হজ্জ, যাকাত, তাসবীহ তাহলিল, মসজিদ ও খনকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখেনি। তিনি ইসলামের সকল নীতির উপর কড়া নজর রেখে সঠিক নীতির গুরুত্ব দান সহকারে ইসলাম প্রচার করেছেন।ইসলাম শব্দের অর্থ ব্যাপক ভাবে পর্যালােচনা করে সেই ভাবেই প্রচার করতেন। তিনি সমস্ত জীবন একেবারেই সাদাসিদের মধ্যে কাটিয়েছেন। বৃদ্ধাবস্থায়ও তার কোন পরিবর্তন ঘটেনি। শুধু মানুষ হিসেবে দেহিক অবস্থা একটু দুর্বল হয়েছিল। তিনি তার জীবনে যাই কিছু করতেন আল্লাহর রেজামন্দি হাসেলের জন্যই করতেন। তাইতাে তিনি লাভ করেছিলেন আল্লাহর সন্তুষ্টি।

হযরত শাহজালালের বিদায়ী ভাষণঃ

একথা দিবালােকের ন্যায় উজ্জ্বল যে সকল ওলি আওলিয়ার ভবিষ্যৎ বাণী সম্পর্কে কিছু না জানলেও ইশারা ইংগীতের মাধ্যমেও নিদের্শনের মাধ্যমে ভবিষৎ সম্পর্কে কিছু অবগত হতে পারতেন। তাইতাে হযরত শাহজালাল রহমাতুল্লাহ এক সময় বুঝতে পারলেন যে তার সময় শেষ হয়ে আসছে। সেজন্য তিনি সকল শিষ্য সাগরেদ, ভক্তবৃন্দ সকল অমুসলিম মুসলিমদেরকে ডেকে একত্র করে তাদের উদ্দেশ্যে বিদায়ী ভাষণ দান করলেন।

তিনি তার ভাষণে সকলকে উদ্দেশ্য করে বললেন, হে মানব সমাজ! তােমরা মনে প্রাণে বিশ্বাস কর যে আল্লাহ এক অদ্বিতীয় তার কোন শরীক নেই। তিনি কাকেও জন্ম দেননি বা কারাে থেকে জন্ম নেননি। তিনি কারাে মুখাপেক্ষী নন। তিনি সারা বিশ্বকে সুন্দর করে সৃষ্টি করেছেন এবং তিনিই প্রতিপালন করেন। তিনিই আমাদের একমাত্র উপাস্য। আল্লাহ যখন ১৮ হাজার মাখলুকাত সৃষ্টি করে মানব জাতিকে আশরাফুল মাখলুকাত বলে আখ্যা দিলেন সে ভাবেই তাে আমাদের জীবন যাপন করতে হবে। তােমরা মনে রাখবে মানুষ সকলের চেয়ে সম্মানিত। তাই কোন মানুষকে ঘৃণার চোখে দেখবে না। এ সম্পর্কে আল্লাহ রাব্বধূল আলামীন পবিত্র কোরআনে বলেন, এরশাদ হচ্ছে, যে ব্যক্তি কোন মানুষকে হিংসা করে ও মনে ব্যথা দিবে তার ইবাদত আল্লাহ কবুল করেন না।

একথাও তােমরা স্মরণ রেখ পৃথিবীর মানুষ পাপ পুণ্যে মিশ্রীত। সেহেতু কোন মানুষকে পাপী বলে ডাকবে না। কারণ গভীর রাতের অন্ধকার যেমন আলাের পরশে বিদূরীত হতে পারে, তেমনি পাপী লােকেরাও পূণ্যবান লােকদের সংস্পর্শে এসে পূণ্যবান হতে পারেন। কোন মানুষের সাথে খারাপ ব্যবহার, মানুষে মানুষে বিবাদ ও ভেদাভেদ সৃষ্টি করা ইসলামে অমার্জনীয় অধরাধ আর এসবের মূলে হল নিজের জিহবা। এ সম্পক্যে রাসূলে মকবুল (সঃ) বলেছেন যে ব্যক্তি স্বীয় জিহবা ও লজ্জাস্থান সংবরণ করবে আমি তার বেহেস্তের জামিন হব।

অতএব, বুঝা যায় যে, মানুষের জীবন চলার পথে লজ্জাস্থান ও জিহবাকে সংবরণনচেৎ জীবনে উন্নতির শিখরে আরােহন করা সম্ভব নয়। কোন দুঃখী গরীব দুঃখীদের সাথে কখনও কঠোর ব্যবহার করাে না।তাদের সাথে সৎ ব্যবহার করবে। এবং তাদের সাহায্যের জন্য নিজেকে আত্ম নিয়ােগ কর। প্রতিবেশী অনাহারে, অনিদ্রায় আর তুমি পেটপুরে খাবে এটা ইসলামে গর্হিত কাজ। কখনও ইসলাম তা পছন্দ করে না। সব সময় গরীবদের প্রতি খেয়াল রাখবে।পাপ ছােট হলেও তাকে বড় মনে করে তা থেকে বিরত থাকবে। পক্ষান্তরে পুন্য ছোট হলেও তাকে বড় মনে করে তা আকড়িয়ে ধরবে। হাশরের ময়দানে তােমরা দেখবে সামান্য পাপের কারণেও মানুষ দোযখে যাবে আবার সামান্য সওয়াবের কারণে মানুষ বেহেস্তে যাবে। অতএব, খবরদার পাপের কাজ করাতাে দূরের কথা পাপের পথেও, পা ফেলবে না।

উপস্থিত জনগণ হযরতের বাণী শুনে দুঃখে কান্নায় ঢলে পড়লেন বুঝতে পারলেন যে হযরত শাহজালাল অতি শীঘ্রই আমাদের থেকে চির বিদায় নিবেন। শ্রীহট্টের জনগণ এবারে শােক সাগরে ভাসতে শুরু করলেন। সে যাই হােক পরিশেষে সকলকে নিয়ে হাতে তুলে দোয়া করলেন আয় আল্লাহ! আমি চলে যাচ্ছি তুমি আমার ভক্ত বৃন্দদেরকে সৎপথে চলার তৌফিক দান কর। এরপর তিনি সকলের গুণাহের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়ে বিদায় সভা সমাপ্ত করলেন।

ইন্তেকালঃ প্রত্যেক মানুষকে মৃত্যুর সাধ গ্রহণ করতে হবে। এ নশ্বর জগতে কেহই অমর হতে পারেনি। কোন নবী পয়গম্বর, ওলি আওলিয়া, রাজা বাদশাহ, কেউই মৃত্যুর তুহিন পরশ থেকে রেহাই পায়নি। হযরত শাহজালাল রহমাতুল্লাহ-এর জীবনেও কোন বিপরীত হয়নি। এক সময় মহা তাপস হযরত শাহজালাল রহমাতুল্লাহ-এরও মৃত্যুর ডাক এল। এ বিশ্বের বুক ঘাের তমসার অন্ধকার কেটে যখন আলাের দিশা পেল এ বাংলার মানুষ এহেন সন্ধিক্ষণেই সুবিশাল জীবনে মহাদায়িত্ব ভার পালন করে তার জীবনের সমাপ্তির রেখা টানলেন।

জনদরদী গরীবের বন্ধু মহাসাধক হযরত শাহজালাল রহমাতুল্লাহ, ১৩৮৪ সালে জিলহজ্জ মাসের ২০ তারিখ সারা বাংলার মানুষকে শােক সাগরের অতল গহবরে ডুবিয়ে দুনিয়া থেকে চির বিদায় নিয়ে চলে যান। ইন্না লিল্লাহে অইন্না ইলাইহে রাজেউন। মহা পুরুষ হযরত শাহজালাল রহমাতুল্লাহ, আজীবন নিষ্কাম কঠোর সাধনা সংযম ও পরিশ্রমের মধ্যেই জীবন কাটিয়েছে। দুনিয়ার আবর্তে যখন তিনি বৃদ্ধাবস্থায় উপনীত হলেন, তখনও কঠোর সাধনায় নিজেকে আত্ম নিয়ােগ করেছেন। এত পরিশ্রম করায় শারীরিক দুর্বল হয়ে পড়াও ছিল স্বাভাবিক। এক সময় তিনি তার শারীরিক দুর্বলতাকে বেশী ভাবেই অনুধাবন করতে পারলেন।

এবারে আল্লাহর ওলি হযরত শাহজালাল রহমাতুল্লাহ, বুতে পারলেন যে তার প্রস্থানের সময় এসে গেছে।সেহেতু এক সময় হিন্দু মুসলিম, বৌদ্ধ, খৃষ্টান, ধনী, দরিদ্র, অসহায় দুঃস্থদের আহবান করলেন তাদের থেকে বিদায় নেবার জন্য এবার তিনি তার সুললিত কন্টে জনতার উদ্দেশ্য বিদায়ী ভাষণ শুরু করলেন। তার ভাষণের প্রতিটি কথাই শ্ৰেতাৱা অনুধাবন করতে পারলেন বুঝতে পারলেন হুজুর আর বেশী দিন আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন না। তিনি কোন সম্প্রদায়ীকতায় বিশ্বাসী ছিলেন না। কোন দল গােষ্ঠীর মধ্যে তার ওলিত্ব সীমাবদ্ধ ছিল না। তাইতাে উপস্থিত সকল ধর্মের সকল স্তরের মানুষ কান্নায় ঢলে পড়ল। মনে হল দুনিয়ায় নেমে এসেছে এক শােকের অন্ধকার। শুধু মানব জাতিই নয় পশু পাখি,গাছপালা, তরুলতা সকলেই যেন দুঃখের সাগরে ভেসে কান্নায় ভেংগে পড়ল। সকলেই অনুভব করল তাদের প্রিয়জন দুনিয়ার বেশী দিন থাকবে না। সারা ময়দানে দুঃখের প্লাবন বয়ে গেল। ওলঠ পালট হয়ে গেল সকলের অন্তর। জীর্ণ শীর্ণ হয়ে গেল সকলের শরীর। সকলেই ধুকে ধুকে প্রার্থনা করতে লাগল হে প্রভু! এই রহমত আমাদের মাকে আরাে কিছু দিন বিদ্যমান রাখুন।

আল্লাহর লীলাকে বুঝতে পারে। আল্লাহও তার প্রিয়নান্দা কে তার সান্নিধ্যে নেয়ার জন্য সঠিক সময়টি স্থির করে ফেললেন। সে যাই হােক এক সময় বিদায়ী সভা ভেংগে গেল আস্তে আস্তে অসুস্থ হয়ে পড়লেন এবারে তিনি স্বীয় হুজরায় ঢুকে ধ্যানে নিমগ্ন হলেন। অনেকে তার হুজরায় ঢুকতে চাইলে হুজুর তাদেরকে নিষেধ করলেন কেউই তার কাছে গেলেন না।

লােকেরা দেখতে লাগল হুজুর হাত তুলে কি যেন বলছেন আর চক্ষু থেকে পানি বয়ে বক্ষদেশ ভিজে জমিনে পড়ছে। তিনি এমন মহাপুরুষ ছিলেন যে তার সময়ও নিজের ব্যক্তিগত কোন স্বার্থের জন্য কাদেননি। এ বলেই তিনি ফরিয়াদ করেছেন হে প্রভূ! আমি আমার দয়িত্ব পূর্ণভাবে পালন করতে পারছি কিনা এ ব্যাপারে নিজেই আমি সন্দিহান। তাইতাে হে প্রভু তুমি আমাকে সকল অপরাধ ক্ষমা করে পরকালেও যেন তােমার প্রেম লাভ করতে পারি সেই তাওফিক দান কর।

এবারে তার শরীরের করুণ অবস্থা দেখে সবাই তার নিকটবর্তী হলেন। এভাবে আপন গতিতে মহামতি আজরাইল হযরত শাহজালাল রহমাতুল্লাহ-এর কাছে আগমন করলেন। হযরত আবার বিষন্ন বদনে সকলকে দূরে যেতে বললেন। আবার সবাই একটু দূরে সরে গেল। কিছুক্ষণ পর সকলে শুনতে পেল হযরত শাহজালাল সুললিত কণ্ঠে কলেমা তাইয়্যেবা ও কলেমা শাহাদাত পাঠ করছেন। সকলে এ দুঃখময় ব্যাপারটা বুঝতে পারল কিন্তু কেউই তার হুজরায় ঢুকল না। সকলে সেখানে দাড়িয়ে রইল। অনেক সময় ধরে কোন টু শব্দটুকু নেই। এবার একজন ঢুকে দেখল হুজুর আর দুনিয়ায় নেই। দুধপায়ী সন্তানের ন্যায় তিনি চির নিদ্রায় শায়ীত হলেন। কেঁদে সকলে জারে জার হয়ে গেল।

সারা বিশ্ব দুঃখের নিঃশ্বাস ফেলে কান্নায় ভেংগে পড়ল। পশু পাখী গাছপালা ঝিমুতে লাগল। | সারা দুনিয়ায় নেমে এল ঘাের অন্ধকার । সকলের চোখেই সরষে ফুল ফুটল। শিষ্য সাগরেদরা এমন কান্না শুরু করল দেখলে মনে হত যেন তাদের আপন জন পিতামাতা | দুনিয়া থেকে বিদায় নিচ্ছে। দেশ-বিদেশ থেকে দলে দলে মানুষ এসে শেষ বারের মত দেখা করতে লাগল সিলেট বাসীরা হযরত শাহজালাল রহমাতুল্লাহ কে পেয়ে ধন্য হয়েছিল। তারা পেয়েছিল তার মাধ্যমে সঠিক পথের সন্ধান।

দেশের মানুষরা নামের পূর্বে লিখত শ্রী সেখানে আজ তারা লিখতে সক্ষম হল নামের শুরুতে মােহাম্মদ। সামাজিক জীবনেও তার অবদান অপরিসীম। সেহেতু এক বাক্যে বলা যেতে পারে হযরত শাহজালাল ছিলেন সলেটের নবজীবনের জন্মদাতা। তাইতাে তার মৃত্যুর শােক সংবাদ শুনে সলেটের সকল স্তরের মানুষের অন্তরে শােকের ঝড় বইল।

ইতিহাসের পাতা থেকে জানা যায় যে তিনি ১৩৫৪ খৃস্টাব্দে সিলেটে শুভ পদার্পণ করেন। তবে তার জন্ম ও মৃত্যু সম্পর্কে দুটি মত পাওয়া যায়। কোন এক ঐতিহাসিক বলেন, তিনি ১৩১৮ খৃঃ জন্ম গ্রহণ করেন এবং ৬২ বছর বয়সে ১৩৮০ খৃষ্টাব্দে ইহধাম ত্যাগ করেন। দ্বিতীয় মত প্রকাশে কোন ঐতিহাসিক বলেন, ওলিয়ে কামেল হযরত শাহজালাল রহমাতুল্লাহ ১৩২২ পৃঃ জন্ম গ্রহণ করেন। এবং ৬২ বছর বয়সে ১৩৮৪ পৃষ্টাব্দে দুনিয়া থেকে চির বিদায় নেন। | তবে একথায় সকল ঐতিহাসিকগণ যে একমত, তাতে কোন সন্দেহ নাই সেটা হল এই যে তিনি দুনিয়ার বুকে ৬২ বছর বেঁচে থেকে জিলহজ্জ মাসের ৩০ তারিখে রােজ শুক্রবার ইহধাম ত্যাগ করেন।

সে যাই হােক আল্লাহ রাব্দুল আলামীন যে বান্দার উপর সন্তুষ্ট থাকেন তার প্রতিটি কাজই সুফল জনক হয়ে থাকে। যার প্রত্যক্ষ উদাহরণ আমরা আমাদের সর্বজন শ্রদ্ধেয় হযরত শাহজালাল রহমাতুল্লাহ-এর জীবনে দেখতে পাই। পবিত্র জুময়ার নামাজ বাদ ৫ সহস্রাধিক মানুষ জমায়েত হয়ে তার নামাজে জানাজা আদায় করেন। যুগে যুগে যে সকল মহাত্মা মনীষীর আবির্ভাব হয়েছে তারা এই পাপাসক্ত পৃথিবীকে পাপ মুক্ত করে মানুষের মাঝে চির অমর হয়ে আছেন। মহাসাধক হযরত শাহজালাল রহমাতুল্লাহ ছিলেন তাদের মধ্যে একজন। তাইতাে আজো গােটা পৃথিবীর আনাচে-কানাচে থেকে অসংখ্য মানুষ হযরত শাহজালাল রহমাতুল্লাহ-এর মাজার জিয়াত করার উদ্দেশ্যে সিলেটে আগমন করেন।

খাজা বাবার জীবনী পড়তে এখানে ক্লিক করুন।

হযরত শাহজালাল এর জীবনী