Select Page

ইমাম গাজ্জালী (রহঃ) এর জীবনীঃ শৈশব থেকেই আমার স্বভাব ছিল সব কিছু বিচার-বিশ্লেষণ করে দেখা এবং যে কোন তথ্য সম্পর্কে অবহিত হওয়ার জন্য চিন্তা-ভাবনা করা। প্রতিটি ফের্কা ও দলের সঙ্গে আমি মিশতাম এবং তাদের আকীদা ও ধ্যান-ধারণা সম্পর্কে অবহিত হবার চেষ্টা করতাম। এর ফলে ক্রমে ক্রমে আমা থেকে তাকলীদ তথা অন্ধ পরানুগত্যের বন্ধন ছুটে যায়। যে আকীদা-বিশ্বাস শৈশব থেকেই আমার মস্তিষ্কে দানা বেঁধেছিল তা নড়বড়ে ও শিথিল হয়ে পড়ে। আমি লক্ষ্য করলাম যে, একজন খৃষ্টান ও একজন ইহুদি তাদের নিজ নিজ ‘আকীদাবিশ্বাসের ওপর লালিত-পালিত হয়। প্রকৃত ইলম এই যে, তাতে কোন প্রকার সন্দেহের এতটুকু অবকাশ কিংবা আশংকা থাকবে না।

উদাহরণত, আমার এ ব্যাপারে স্থির বিশ্বাস আছে যে, দশ সংখ্যাটি তিন-এর অধিক। এখন যদি কেউ বলে, “তিন সংখ্যাটিই অধিক এবং আমি আমার দাবির সপক্ষে আমার এই লাঠিটাকে সাপ বানাতে পারি”, অতঃপর তিনি যদি তা বানিয়ে দেখিয়েও দেন তবুও তা আমার জ্ঞানের ক্ষেত্রে এতটুকু সন্দেহ কিংবা সংশয় সৃষ্টি করবে না। আমি বিস্মিত হব ঠিকই, কিন্তু তা আমার স্থির ও নিশ্চিত বিশ্বাসে এতটুকু চিড় ধরাতে পারবে না। আমার বিশ্বাস অটল ও অনড় থাকবে যে, তিনের চেয়ে দশ বেশী। আমি গভীরভাবে ভেবে দেখে বুঝতে পারলাম যে, এ ধরনের নিশ্চিত জ্ঞান কেবল অনুভূতিলব্ধ ও অপরিহার্য সত্য সম্পর্কিত বিষয়াবলীর গণ্ডীতে সীমাবদ্ধ। কিন্তু যখন আরও বেশী সাধনা চালালাম তখন জানতে পারলাম, এতেও সন্দেহের অবকাশ পুরােপুরি বিদ্যমান। আমি দেখলাম যে, পঞ্চেন্দ্রিয়ের মধ্যে সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী ইন্দ্রিয় হচ্ছে দৃষ্টিশক্তি, অথচ এতেও ভুল হয়।

আমার এই সন্দেহ এত দূর বৃদ্ধি পেল যে, আমার ইন্দ্রিয়ানুভূতির নিশ্চিত হবার ব্যাপারে কোন নিশ্চয়তাই থাকল না। পুনরায় আমি বুদ্ধিবৃত্তির ওপর গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করলাম। কিন্তু তাকে ইন্দ্রিয়ানুভূতির চেয়েও বেশী সন্দেহযুক্ত পেলাম। প্রায় দু’মাস অবধি আমার এই দোদুল্যমান অবস্থা চলতে থাকল এবং আমার ওপর সােফিষ্ট মতবাদের প্রাধান্য বজায় রইল। অতঃপর আল্লাহ পাক আমাকে এই বিমারী থেকে আরােগ্য দান করলেন এবং আমার স্বভাবে সুস্থতা ও ভারসাম্য ফিরে এল এবংবুদ্ধিবৃত্তিক ও যুক্তিনির্ভর অপরিহার্য সত্যের ওপর তৃপ্তি ফিরে পেলাম, বরং এটি ছিল আমার অন্তরাত্মায় আল্লাহপ্রদত্ত নূরের আকস্মিক ঝলকানি। এই ব্যাধি থেকে আরােগ্য লাভ করবার পর এখন আমার সামনে চারটি দল রয়ে গেল-যাদের সত্য-সন্ধানী বলে মনে হচ্ছিল।

মুতাকাল্লিমীন-যারা জ্ঞান ও বুদ্ধিবৃত্তির অধিকারী বলে দাবি করত; বাতেনীদের দাবি ছিল যে, তাদের নিকট বিশেষ শিক্ষামালা গুপ্ত রহস্য আছে এবং তারা সরাসরি নিস্পাপ ইমাম (ইমামে মা’সূ’ম) থেকে হাকীকতে ‘ইলম তথা জ্ঞানের হাকীকত হাসিল করেছে; দার্শনিকদের বক্তব্য হ’ল, কেবল তারাই যুক্তিবাদী এবং কেবল তারাই দলীল-প্রমাণের ভিত্তিতে কথা বলেন। সূফীগণ নিজেদেরকে কাশফ ও হৃদ তথা অন্তর্দৃষ্টি ও পর্যবেক্ষণ জ্ঞানের অধিকারী মনে করেন। আমি প্রতিটি দলের কিতাবাদি ও চিন্তাধারা অধ্যয়ন করলাম। কিন্তু কারাে ব্যাপারেই নিশ্চিন্ত হতে পারিনি। ইলমে কালাম সম্পর্কে এই বিষয়ের বিশেষজ্ঞদের (মুহাক্কিক) রচিত গ্রন্থাদি পড়ি এবং নিজেও এই বিষয়বস্তুর ওপর বই-পুস্তক লিখি। আমি দেখলাম যে, যদিও এটি এমন একটি বিষয় যা স্বীয় উদ্দেশ্য পূরণ করে, কিন্তু তা আমাকে সান্ত্বনা প্রদানের জন্য যথেষ্ট নয়। কেননা তার ভেতর এমন সব প্রস্তাবনার ওপর ভিত্তি রাখা হয়েছে যা সম্মুখস্থ প্রতিপক্ষের পেশকৃত এবং মুতাকাল্লিমীন (ধর্মতাত্ত্বিক) যেগুলােকে কেবল অন্ধ আনুগত্যের কারণে মেনে নিয়েছেন অথবা তা ইজমা কিংবা কুরআন ও হাদীছ-এর নয়।

এসব জিনিস সেই ব্যক্তির মুকাবিলায় খুব একটা কার্যকর নয়, যারা যুক্তিসঙ্গত অপরিহার্য সত্য ছাড়া আর কিছু স্বীকার করে না। দর্শন সম্পর্কে মতামত কায়েম করবার জন্য প্রথমে আমি গবেষণামূলক মনােভঙ্গী নিয়ে তা করাকে অত্যাবশ্যক মনে করলাম যদিও অধ্যাপনা ও পুস্তক রচনায় অত্যন্ত ব্যস্ত থাকায় ফুরসত মিলত খুব কম। আমার দরসের মাহফিলে বাগদাদের তিন-তিন শ’ ছাত্র যােগদান, করত। এতদসত্ত্বেও আমি এজন্য কিছুটা সময় বের করে নিলাম এবং দু’ বছরের ভেতরই দর্শনের তাবৎ জ্ঞান-ভাণ্ডার অধ্যয়ন করে দেখলাম। অতঃপর এক বছর পর্যন্ত এর ওপর চিন্তা-ভাবনা করলাম। আমি দেখলাম, তাদের জ্ঞান ছয় প্রকারের ঃ যথাঃ অংকশাস্ত্র, যুক্তিবিদ্যা, প্রকৃতিবিদ্যা বা প্রাকৃতিক বিজ্ঞান, রাষ্ট্রনীতি, নীতিশাস্ত্র ও ধর্মশাস্ত্র। প্রথম পাঁচ প্রকারের জ্ঞানের সঙ্গে ধর্মের হাঁ-না কোন সম্পর্কই নেই এবং ধর্মের ইতিবাচক দিক সপ্রমাণ করবার জন্য সে সবের অস্বীকৃতিরও কোন প্রয়ােজন নেই। কতক দৃষ্টিভঙ্গির ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের সাথে ধর্মের টক্কর লাগে, কিন্তু তা কতিপয় জিনিসে মাত্র।

এই ব্যাপারে নীতিগতভাবে এই ‘আকীদা পােষণ করতে হবে যে, প্রকৃতি বা স্বভাব আল্লাহর এখতিয়ারাধীন এবং বিজ্ঞান স্বয়ম্ভর ও স্বশাসিত নয়। অবশ্য যে সমস্ত লােক ঐ সমস্ত জ্ঞান ও নিবন্ধে দার্শনিকদের মেধা ও সূক্ষ্মদৃষ্টি লক্ষ্য। কবে তারা সাধারণত ভীত ও সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে এবং মনে করে যে, জ্ঞানের সকল শাখা-প্রশাখায়ই বুঝি তাদের এরূপ অধিকার রয়েছে! অথচ এটা জরুরী নয় যে, কোন ব্যক্তির জ্ঞান-বিজ্ঞানের একটি বিশেষ শাখায় অতুলনীয় দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা আছে বলে এর সব শাখাতেই তার দক্ষতা থাকবে। এরপর যখন তারা এই সমস্ত লােকের মধ্যে ধর্মহীনতা ও ধর্মকে অস্বীকার করবার মানসিক প্রবণতা লক্ষ্য করে তখন তারা এসব জ্ঞানী ও বিজ্ঞানীদের প্রতি অন্ধ আনুগত্যবশত ধর্মকে অস্বীকার এবং ধর্মের ভূমিকাকে হাল্কা ও খাটো করে দেখবার প্রয়াস পায়।

অপরদিকে ইসলামের কতক নাদান দোস্ত দার্শনিকদের প্রতিটি দৃষ্টিভঙ্গি ও মতামত এবং তাদের প্রতিটি দাবিকেই প্রত্যাখ্যান করাকে তাদের অবশ্য পালনীয় কর্তব্য বলে গণ্য করেন এবং এটাকে তারা ইসলামের খিদমত বলে মনে করেন। এমন কি তারা প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে তাদের সকল অনুসন্ধান ও পর্যবেক্ষণকেও অস্বীকার করতে এগিয়ে যান। এর একটি ক্ষতিকর প্রতিক্রিয়া এই যে, যে সব লোেক তাদের বিজ্ঞান সম্পর্কীয় মতামত ও দৃষ্টিভঙ্গির সত্যতার ব্যাপারে নিশ্চিত এবং তাদের নিকট সে সব বস্ত প্রমাণিত ,সত্যের চূড়ায় উপনীত, উপরিউক্ত ধর্মান্ধতার কারণে তাদের ইসলাম সম্পর্কে আকীদাই নড়বড়ে হয়ে যায় এবং দর্শনশাস্ত্র অস্বীকার করার পরিবর্তে তারা ইসলাম সম্পর্কেই বিরূপ ধারণা পােষণ করতে থাকেন।

মােট কথা, আমি এই সিদ্ধান্তে পৌছলাম যে, দর্শনশাস্ত্র দ্বারা আমার চিত্ত সান্ত্বনা পাবে না এবং বুদ্ধি একাকী সকল উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য আয়ত্ত করতে পারে না বা সকল অসুবিধা দূর করবার ক্ষমতাও রাখে না।

থাকল বাতেনীয়া সম্প্রদায়। এ সম্পর্কে আমার গ্রন্থ ‘মুস্তাজহিরী’ রচনা করতে গিয়ে তাদের মযহাব সম্পর্কে বেশ ভালভাবে অধ্যয়ন করার সুযােগ পেয়েছিলাম। আমি দেখতে পেলাম তাদের ‘আকীদার ভিত্তি যুগের ইমামের শিক্ষার ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু যুগের ইমামের অস্তিত্ব ও তার সত্যতা প্রমাণ সাপেক্ষ বস্তু এবং এ দু’টোই সীমাতিরিক্ত সন্দেহে ভরপুর। এখন রইল কেবল তাসাওউফ। সার্বক্ষণিকভাবে তাসাওউফের প্রতি আমি মনােনিবেশ করলাম। তাসাওউফ যেমন জ্ঞানগত বিষয়- তেমনি ব্যবহারিক বিষয়ও বটে। আমার কাছে জ্ঞানগত ব্যাপার অনেকটা সহজ ছিল। আমি আবু তালিব মক্কীর “তু’ল-কুব, হারিছ মুহাসিবীর রচিত গ্রন্থাদি ও হযরতজুনায়দ বাগদাদী, হযরত শিবলী,হযরত আবু ইয়াযীদ বিস্তামী (র)-এর ‘মালফুজাত’ পড়লাম এবং ইলম-এর রাস্তা ধরে যা কিছু অর্জন করা যায় তা অর্জন করলাম। অতঃপর আমি বুঝতে পারলাম যে, মূল হাকীকত তথা আসল সত্য পর্যন্ত শিক্ষার মাধ্যমে নয়, বরং প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা, যওক বা স্বাদ, তন্ময় সাধনা ও অবস্থার পরিবর্তনের দ্বারা পৌছা যায়।

যে জ্ঞান আমার পুঁজি ছিল, চাই তা শরীয়ত সম্পর্কিত হােক অথবা বুদ্ধিবৃত্তিক, তারা আমি আল্লাহর অস্তিত, নবুওত ও আখিরাতের (পারলৌকিক জীবনের) ওপর সুদৃঢ় ঈমান লাভ করেছিলাম। অবশ্য তা কেবল দলীল-প্রমাণের ভিত্তিতেই নয়, বরং ঐ সব কার্যকারণ, ঘটনাপরম্পরা ও বিচিত্র অভিজ্ঞতার মাধ্যমে লাভ করেছিলাম যার বিস্তারিত বর্ণনা দেওয়া মুশকিল। আমার কাছে এটা বেশ ভাল রকম পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল যে, পারলৌকিক সৌভাগ্য লাভের পন্থা কেবল তাকওয়া তথা আল্লাহ-ভীতি অবলম্বন করা এবং তথা প্রবৃত্তিকে তার কামনা থেকে ফিরিয়ে রাখা। এজন্য যে কৌশল অবলম্বন করতে হবে তা হল, এই নশ্বর পৃথিবীর মায়া ও আকর্ষণ ত্যাগ করে পারলৌকিক জীবনের প্রতি আকর্ষণ বাড়ানাে এবং পূর্ণ একাগ্রতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে আল্লাহর দিকে মনােনিবেশের মাধ্যমে অন্তরের দুর্নিবার স্বাভাবিক আকর্ষণকে দুনিয়া থেকে ছিন্ন করা। আর তা একমাত্র পার্থিব শান-শওকত, ধন-সম্পদ, মান-মর্যাদা ও ভােগ-লালসার আকর্ষণ পরিত্যাগ করার মাধ্যমেই সম্ভব হতে পারে। আমি আমার অবস্থা গভীরভাবে নিরীক্ষণ করলাম। 

বুঝতে পারলাম যে, আমার আপাদমস্তক পার্থিব আসক্তির কঠিন শিখরে আবদ্ধ। আমার সর্বোত্তম আমল হিসাবে শিক্ষা দান ছিল উল্লেখ করার মত। কিন্তু গভীরভাবে অনুসন্ধান চালাতে গিয়ে বুঝতে পারলাম, আমার গােটা সাধনা ও মনঃসংযােগই ছিল সেই সমস্ত জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রতি যা তেমন গুরুত্বপূর্ণ ছিল না এবং আখিরাতের স্বার্থের প্রতিও তা তেমন কল্যাণকর ছিল না। আমার অধ্যাপনার পেছনে যে নিয়ত ক্রিয়াশীল ছিল সে সম্পর্কে আমি ভেবে দেখলাম এবং বুঝতে পারলাম যে, তা একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর উদ্দেশ্যে ছিল না, বরং তার পেছনে পার্থিব শান-শওকত বৃদ্ধি, প্রভাব-প্রতিপত্তি কায়েম ও সুখ্যাতি অর্জনের মানসিকতাটাই সর্বাধিক সক্রিয় ছিল। আমার নিশ্চিত বিশ্বাস হ’ল যে, আমি ধ্বংসােনুখ নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে আছি। আমি যদি আমার অবস্থার সংস্কার সাধনে প্রয়াসী না হই তা হলে আমার জন্য তা কঠিন বিপদের কারণ হবে।

দীর্ঘকাল পর্যন্ত আমি এই সব ছেড়ে-ছুঁড়ে বাগদাদ পরিত্যাগ করার চিন্তাভাবনা করতে থাকি। কিন্তু চূড়ান্ত ফয়সালায় উপনীত হতে ব্যর্থ হই। ছ’মাস এরূপ দ্বিধা-দ্বন্দের মাঝে কেটে যায়। কখনাে পার্থিব কামনা-বাসনা আমাকে আকৃষ্ট করত, আবার কখনাে আমার ঈমান আমাকে ডেকে বলত, “যাত্রার সময় নিকটবর্তী, জীবন বড় ক্ষণস্থায়ী, অথচ চলার পথ অনেক দীর্ঘ। এই সব “ইলম ও আমল স্রেফ লােক দেখানাে ভণ্ডামি ও প্রতারণা ছাড়া আর কিছু নয়।” কখনাে আমার ‘নফস(শয়তানী প্রবৃত্তি) আমাকে বলত, “এসব সাময়িক চিত্তবৈকল্যমাত্র। আল্লাহ পাক তােমাকে যা কিছু প্রভাব-প্রতিপত্তি ও মান-মর্যাদা দান করেছেন- বাগদাদ ছেড়ে দেবার পর যদি আবার কখনাে ফিরে আস তাহলে এগুলাে আবার ফিরে পাওয়া তােমার পক্ষে মুশকিল হবে।” মােট কথা, এই উভয়বিধ টানাপােড়েনের মাঝে আরও ছয়টি মাস কেটে গেল, এমন কি পরিস্থিতি আমার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। আমার মুখের ভাষা হ’ল বন্ধ, যেন কেউ আমার মুখে তালা লাগিয়ে দিয়েছে। আমি চেষ্টা করতাম আমার নিকট আগত ও নির্গত লােকদের (ছাত্র ও অতিথি-অভ্যাগত) মনস্তৃষ্টির জন্য একই দিনে সব কিছু পড়িয়ে দিই। কিন্তু কি করব, আমার জিহ্বা আমার সহযােগিতা করছিল না এবং আমার মুখ দিয়ে একটি শব্দও উচ্চারিত হচ্ছিল না।

জিহ্বা ও মুখের এই আড়ষ্টতা আমার অন্তরে দুশ্চিন্তা ও বেদনার সৃষ্টি করল, যার ফলে আমার হযম শক্তিও লােপ পেতে লাগল, এমন কি এক চুমুক পানি পান ও এক লােকমা খাদ্য হযম করাও আমার জন্য কষ্টসাধ্য হয়ে উঠল। ক্রমান্বয়ে আমার শারীরিক শক্তিতেও ভাটা দেখা দিল। শেষাবধি চিকিৎসকেরাও আমার চিকিৎসার ব্যাপারে নিরাশ হয়ে পড়লেন এবং বললেন: আসলে অসুখ আপনার হৃদয়-অভ্যন্তরে এবং তার প্রতিক্রিয়া দেখা দিচ্ছে আপনার সর্বশরীরে। যতদিন আপনার মন থেকে এ অসুখ না সারবে ততদিন পর্যন্ত কোন চিকিৎসাই ফলপ্রসূ হবে না। অগত্যা আমি আল্লাহর শরণাপন্ন হলাম এবং নিতান্ত অসহায়ভাবে কাতর স্বরে তাঁকে ডাকতে লাগলাম। এর ফলে আমার পক্ষে এই প্রভাব-প্রতিপত্তি, পদ-মর্যাদা, ধন-সম্পদ ও পরিবার-পরিজন সব কিছু ছেড়ে দেওয়া সহজ মনে হতে লাগল। আমি মক্কা শরীফ গমনের অভিপ্রায় ব্যক্ত করলাম। আমার অন্তরের এই বাসনা ছিল যে, আমি শামও সফর করব। এরপর অত্যন্ত চমৎকারভাবে আমি বাগদাদ ত্যাগ করবার বন্দোবস্ত করে ফেললাম।

ইরাকবাসী যখন আমার অভিপ্রায় সম্পর্কে অবহিত হ’ল তখন তারা চতুর্দিক থেকে আমাকে ভৎসনা করতে লাগল। কেননা কারাের ধারণায় এটা আসছিল যে, এত সব কিছু ছেড়ে দেবার পেছনে কোন ধর্মীয় কারণ থাকতে পারে। কেননা তাদের ধারণায় আমি তাে ধর্মীয় খিদমতের জন্য সর্বোচ্চ পদটিতে সমাসীন ছিলামই। অতঃপর জনমনে নানারূপ জল্পনা-কল্পনা শুরু হল। যারা রাজধানী থেকে দূরে অবস্থান করতেন তারা মনে করলেন যে, এর ভেতর সরকারী কর্মকর্তাদের ইশারা-ইঙ্গিত রয়ে গেছে অর্থাৎ সরকারী কোপানলই আমার এ ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের পেছনে কাজ করছে। কিন্তু যাঁরা সরকারী মহলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত তারা দেখছিলেন যে, সরকারী মহল আমাকে ধরে রাখবার জন্য কি প্রাণান্তকর কোশেশই না করছে। তারা বলেছিলেন, ইসলামের এই রওনক ও জ্ঞানমার্গের এই উজ্জ্বল জোতিষ্কের ওপর কারাে বদনজর পড়েছে, আর তাইতেই তিনি সব কিছু অবহেলায় ত্যাগ করে নিরুদ্দেশের পথে পা বাড়িয়েছেন। এ ছাড়া তাদের আর কিই-বা বলার থাকতে পারে!

মােট কথা, আমি বাগদাদ ত্যাগ করলাম। আমার নিকট মাল-মাস্তা যা কিছু ছিল, চলার মত কিছু রেখে বাকী সব কিছুই বিলি-বণ্টন করে দিলাম। বাগদাদ থেকে আমি শামে এলাম এবং সেখানে দু’বছরের কাছাকাছি থাকলাম। সেখানে আমার কাজ রিয়াযত ও মুজাহাদা, নিঃসঙ্গ জীবন যাপন ও নির্জনতা অবলম্বন ছাড়া আর কিছুই ছিল না। ইলমে তাসাওউফ থেকে আমি কিছু হাসিল করেছিলাম। সেই মুতাবিক তাযকিয়ায়ে নফস তথা আত্মশুদ্ধি, চারিত্রিক সংশােধন, পরিমার্জন ও আল্লাহর যিকিরের জন্য নিজ কলবকে পরিকৃতকরণের কাজে মগ্ন থাকি। অনেক দিন পর্যন্ত আমি দামেস্কের মসজিদেই ই’তিকাফরত ছিলাম। মসজিদের মিনারে আরােহণ করতাম এবং সমস্ত দিন দরজা বন্ধ করে সেখানেই বসে থাকতাম।

অবশেষে আমি বায়তুল-মুকাদ্দাসে আসি। সেখানেও আমি দৈনিক মসজিদে সাখরার অভ্যন্তরে চলে যেতাম এবং দরজা বন্ধ করে সময় কাটাতাম। অতঃপর সায়্যিদুনা হযরত ইবরাহীম (আ)-এর রওয়া যিয়ারতের পর আমার মনে হজে বায়তুল্লাহ ও যিয়ারতে রওযা পাক (সা)-এর প্রবল বাসনা জাগ্রত হ’ল এবং মক্কা মুকাররামা ও মদীনা মুনাওয়ারার বরকত লাভ করে উপকৃত হবার খেয়াল জাগল। অনন্তর আমি হজ্জে গমন করলাম। হজ্জ করার পর পরিবার-পরিজনের প্রতি স্বাভাবিক আকর্ষণ ও সন্তান-সন্ততির ডাকে আমাকে দেশে ফিরতে হ’ল, অথচ একদিন দেশের নাম শুনলেই আমি কয়েক মাইল পালাতাম। সেখানে গিয়েও আমি একাকিত্বের মাঝেই কাটাবার ব্যবস্থা করলাম, আত্মশুদ্ধির ব্যাপারে এতটুকু অলসতার প্রশ্রয় দিলাম না। কিন্তু নানান ঘটনা-প্রবাহ, পরিবার-পরিজনের চিন্তা ও অর্থনৈতিক প্রয়ােজন তথা জীবিকার তাগিদ আমার স্বভাব ও প্রকৃতিতে বিশৃঙ্খল অবস্থার সৃষ্টি করত এবং এতে মনের একাগ্রতা ও চিত্তের প্রশান্তি অখণ্ডভাবে জুটত না।

কিন্তু তাতে আমি নিরাশ হতাম না; সময় সময় এ থেকে বরং লাভবানই হতাম। এভাবে কাটিয়ে দিলাম দশটি বছর। এই নির্জন নিঃসঙ্গ মুহূর্তগুলােতে আমার নিকট যে সব রহস্য উদঘাটিত হয়েছে এবং আমি যা লাভ করেছি তার বিস্তারিত বর্ণনা দান সম্ভব নয়। তবে পাঠকের উপকারের জন্য এতটুকু অবশ্যই বলব যে, আমি নিশ্চিতভাবেই অবহিত হয়েছি যে, কেবল সূফীরাই আল্লাহর পথের পথিক। তাঁদের সীরাত (জীবনচরিত)-ই সর্বোত্তম সীরাত, তাদের পথই সর্বাধিক সুদৃঢ়, তাঁদের আখলাক তথা নৈতিক চরিত্রই সর্বাধিক ট্রেনিংপ্রাপ্ত, বিশুদ্ধ ও সঠিক। বুদ্ধিজীবীদের বুদ্ধি, জ্ঞানীদের হিকমত ও শরীয়তের সূক্ষ্ম রহস্যবিদদের ইলম মিলেও যদি তাদের সীরাত ও নৈতিক চরিত্র থেকে উত্তম কিছু আনতে চায় তবে তা সম্ভব নয়। তাদের সকল প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য গতি ও স্থৈর্য নবুওতের প্রদীপালােক থেকে উৎসারিত এবং নবুওতের জ্যোতি থেকে বড় কোন আলাে এ ধরার বুকে নেই যা থেকে আলাে-কণা পাওয়া যেতে পারে।

জনসমাবেশের দিকে প্রত্যাবর্তন:-

সম্ভব ছিল ইমাম গাযালী (র) এই নিঃসঙ্গ জীবন ও নির্জনতার মাঝেই থেকে যেতেন এবং বাকী জীবনও রূহানী আনন্দ উপভােগ এবং একাগ্রতার আরাম ও পরিতৃপ্তির মাঝেই কাটিয়ে দিতেন। কিন্তু আল্লাহ তা’আলা তার থেকে যে বিরাট মহান খিদমত নিতে চাচ্ছিলেন তার জন্য অপরিহার্য ছিল যে, তিনি নির্জনবাস থেকে বেরিয়ে আসবেন এবং পঠন-পাঠন, রচনা সংকলন ও সামাজিক জীবন এখতিয়ার করবেন যাতে করে গােটা সৃষ্টিকুলের কল্যাণ সাধিত হয়, ধর্মদ্রোহী মতবাদ ও দর্শন প্রত্যাখ্যাত হয় এবং জ্ঞানগত ও বুদ্ধিবৃত্তিক উপায়ে ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব ও সত্যতা প্রমাণিত হয়। বিশেষ করে আল্লাহ তা’আলা তাঁকে এমন নিশ্চিত জ্ঞান, বিশ্বাস ও পর্যবেক্ষণের স্তরে পৌঁছে দিয়েছিলেন যে, তৎকালীন মুসলিম বিশ্বে তার থেকে অধিক যথার্থ ও যােগ্য ব্যক্তিত্ব আর কেউ ছিলেন না।

যেহেতু এই কর্মের পেছনে আল্লাহর মঞ্জুরী ছিল এবং ইসলামেরও এর ভীষণ প্রয়ােজন ছিল, এজন্য স্বয়ং তার নিজের মনেই এর অনুপ্রেরণা সৃষ্টি হল এবং এ ধারণাও প্রাধান্য পেল যে, এটি সাধনার ধন এবং এটি আম্বিয়া-ই-কিরাম (‘আ)-এর প্রতিনিধিত্ব, যুগের দাবি ও সর্বোত্তম ইবাদত। তিনি তার নিজ অনুভূতিকে খােদ নিজেই বর্ণনা করেছেন এবং নিঃসঙ্গ জীবন থেকে জনসমাবেশে ফিরে আসার কারণও লিপিবদ্ধ করেছেন।

আমি দেখতে পেলাম যে, দর্শনশাস্ত্রের প্রভাবে তাসাওউফের বহু দাবিদারের গােমরাহী, অনেক ‘আলিম-উলামা’র বে’আমল জীবন ও মুতাকাল্লিমার ত্রুটিপূর্ণ ও দুর্বল প্রতিনিধিত্বের কারণে অধিকাংশ শ্রেণীর ঈমান দোদুল্যমান ও নড়বড়ে হয়ে গেছে এবং আকীদা তথা ধর্মবিশ্বাসের ওপর এর খুবই খারাপ প্রতিক্রিয়া পড়ছে। দর্শনশাস্ত্রজাত বহু লােক শরীয়তের প্রকাশ্য বিধি-বিধান ও হুকুম-আহকামের পালন করে বটে, কিন্তু নবুওত ও দীনের হাকীকতের ওপর তাদের ঈমান নেই। কতক লােক কেবল শারীরিক ব্যায়ামের ধারণায় নামায পড়ে, কেউ পড়ে কেবল সােসাইটি ও নগরবাসীর অভ্যাসের অনুসরণ এবং নিজেদের হেফাজতের জন্য। কতক লােক শর’ঈ হুকুম-আহকামের বস্তুগত সুবিধা লাভ এবং সেগুলাে পালন না করলে জাগতিক ক্ষতি হবে ধারণা করে তা পালন করে। আমি দেখছি যে, আমি সে সব সন্দেহ নিরসন করবার মত যােগ্যতা রাখি এবং সহজেই তা করতে পারি, এমন কি ঐ সব লােককে পর্দান্তরালে প্রেরণ আমার কাছে পানি পান করার চেয়েও অধিকতর সহজ বলে মনে হয়।

এতদৃষ্টে আমার মনে শক্তভাবে এই ধারণার সৃষ্টি হ’ল যে, আমার এই কাজই করা উচিত এবং এটাই সময়ের অপরিহার্য দায়িত্ব ও কর্তব্য। আমি আপন মনেই বললাম, “এই নিঃসঙ্গ ও জনমানবের সঙ্গে সম্পর্কহীন জীবন তােমার জন্য কবে এবং কখন জায়েয হ’ল? রােগ-ব্যাধি চতুর্দিকে ছড়িয়ে গেছে। চিকিৎসক নিজেই আজ রােগী। আল্লাহর সৃষ্ট জগত আজ ধ্বংসের প্রান্তে এসে উপনীত।” অতঃপর আমি বললাম, “এই এতবড় বিরাট ও মহান দায়িত্ব তােমা দ্বারা কিভাবে পালিত হতে পারে। বর্তমান যুগ তাে নবী যুগ থেকে বহু দূরে এসে গেছে। চারদিকে বাতিলেরই রাজত্ব। যদি তুমি আল্লাহর সৃষ্টিজগতকে তাদের প্রিয় ও পরিচিত বস্তুসমূহ থেকে সরিয়ে নিয়ে আসতে চেষ্টা কর তাহলে গােটা যুগ-যমানা তােমার বিরােধী হয়ে যাবে। তুমি একাকী কিভাবে তাদের মুকাবিলা করবে এবং কীভাবে জীবন যাপন করবে।(Imam Gazzali)

এটা তাে তখনই সম্ভব যখন যুগ-যমানা অনুকূল হয় এবং সমকালীন সুলতানও দীনদার হন।” আমি এই বলে আমার মনকে বুঝ দিলাম এবং নিজের জন্য নিঃসঙ্গ ও নির্জন জীবন যাপন জায়েয বলে অভিহিত করলাম। কিন্তু আল্লাহ তা’আলার অন্য কিছু মঞ্জুর ছিল। তিনি তর্কালীন সুলতানের মনে নিজেই একটি বিপ্লবত্মক পরিবর্তন এনে দিলেন। তিনি (সুলতান) আমাকে এই ফেতনা মুকাবিলা করবার জন্য নিশাপুর পেীছবার জন্য জোর তাগিদসহ নির্দেশ দিলেন। সুলতানের এই নির্দেশ এই পর্যায়ের ছিল যে, আমি অনুভব করলাম, যদি আমি এই হুকুম তামিল না করি তাহলে এর পরিণতি সুলতানের অসন্তুষ্টি পর্যন্ত পৌঁছবে। আমি ভাবলাম যে, এবার আমার জন্য আর কোন ওযর অবশিষ্ট রইল না। এরপরও যদি আমি নির্জনতা অবলম্বন করি এবং নিঃসঙ্গ জীবনকেই বেছে নিই তা হবে আমার অলসতা, আরামপ্রিয়তা এবং দায়িত্ব ও কর্তব্যের বােঝা হালকা করবারই নামান্তর, তা হবে পরীক্ষা ও দুঃখকষ্টপূর্ণ অবস্থা থেকে গা বাঁচিয়ে চলবার স্বার্থেই, অথচ আল্লাহ পাক ইরশাদ করেনঃ

أنسب الناس أن يتركوا أن يقولوا امثا وهم يفتنون – ولقد قثا الذين من قبلهم فليعلمن الله الذين صدقوا وليعلمن الكذبين

“মানুষ কি মনে করে যে, আমরা ঈমান এনেছি’ একথা বললেই ওদেরকে পরীক্ষা না করেই অব্যাহতি দেওয়া হবে! আমি তাে এদের পূর্ববর্তীদেরকেও পরীক্ষা করেছিলাম; আল্লাহ অবশ্যই প্রকাশ করে দেবেন কারা সত্যবাদী আর কারা মিথ্যাবাদী”। | -সূরা আনকাবুত, ২-৩ আয়াত। অধিকন্তু রসূল করীম (সা)-এর প্রতি, যিনি তাঁর বান্দাদের মধ্যে সর্বাধিক সম্মানিত ও মর্যাদাবান ছিলেন, ইরশাদ করেনঃ

ولقد كذبت رسل من قبلك فصبروا على ماقبوا وأوثوا حتى أتاهم نصرنا – ولا مبدل لكلمات الله – ولقد جاءك من با المرسلين

“তােমার পূর্বেও অনেক রসূলকে অবশ্যই মিথ্যাবাদী বলা হয়েছিল; কিন্তু তাদেরকে মিথ্যাবাদী আখ্যা দেওয়া ও ক্লেশ দেওয়া সত্ত্বেও তারা ধৈর্য ধারণ করেছিল যে পর্যন্ত না আমার সাহায্য তাদের নিকট এসেছে। আল্লাহর আদেশে কেউ পরিবর্তন করতে পারে না। রসূলদের কিছু সংবাদ তােমার নিকট অবশ্যই এসেছে।”

-সূরা আন’আম, ৩৪ আয়াত।

আমি কতিপয় সূফী ও আধ্যাত্মিক পুরুষের সঙ্গে এ ব্যাপারে পরামর্শ করলাম। তারা সকলেই একমত হয়ে আমাকে নির্জনতা ছেড়ে বেরিয়ে আসবার পরামর্শ দিলেন। এর সমর্থনে আল্লাহর বহু সৎকর্মশীল বান্দা একাদিক্রমে স্বপ্ন দেখেন যা থেকে আমি অবহিত হই যে, আমার এ পদক্ষেপ বিরাট কল্যাণ ও বরকতের কারণ হবে এবং হিজরী পঞ্চম শতাব্দীর শুরুতে যার এক মাস মাত্র বাকী- সম্ভবত কোন বিরাট ও মহান সংস্কারমূলক কাজ হবে। আর তা এজন্য যে, হাদীছ শরীফে এসেছে, “আল্লাহ্ তা’আলা প্রতি শতাব্দীর মাথায় এমন একজন মানুষ পয়দা করেন যিনি এই উম্মতের দীনকে জীবন্ত করে তােলেন।” এই সব আলামত ও কার্যকারণদৃষ্টে আমার মনেও এরূপ আশা জাগরূক হল। 

আল্লাহ তা’আলা আমার জন্য নিশাপুরের সফরের আয়ােজন করে দিলেন এবং আমি এই মহান খিদমতের জন্য নিয়ত করে ফেললাম। এটি ৪৯৯ হিজরীর যি’ল-কাদ মাসের ঘটনা। ৪৮৮ হিজরীর যিল-কাদাঃ মাসে বাগদাদ থেকে বহির্গত হয়েছিলাম। এই হিসাবে দেখা যায় আমি ১১ বছর নির্জন বাস করেছি। এসবই তকদীরে ইলাহীর পরিকল্পিত ব্যবস্থামাত্র। বাগদাদ থেকে বহির্গত হওয়া এবং সেখানকার প্রভাব-প্রতিপত্তি ও পদমর্যাদাকে বিদায় সালাম জানানাে আমার কল্পনায় আসত না, কিন্তু আল্লাহর হুকুমে তা সহজে হয়ে গেল। অনুরূপভাবে আমার এই নির্জনতা অবলম্বন কালীন যুগে নিঃসঙ্গ জীবন থেকে জনসমাবেশের মাঝে পুনর্বার ফিরে যাবার ধারণাও মনে উদয় হ’ত না, অথচ সময়ে তার আয়ােজনও সম্পন্ন হয়ে গেল।

মােটকথা, ৪৯৯ হিজরীর যিল-কাদা মাসে ইমাম সাহেব পুনরায় নিশাপুরের দিকে গতি ফেরালেন। তিনি নিজামিয়া মাদরাসায় অধ্যাপনার কাজে যােগ দিলেন। এবং পুনর্বার অধ্যাপনা ও কল্যাণধর্মী কাজে আত্মনিয়ােগ করলেন। কিন্তু ইমাম | গাযালী (র)-এর এবারকার দরস ও তাদরীস তথা পঠন-পাঠন, সংস্কার ও সৎ পথ প্রদর্শন এবং পূর্বেকার পঠন-পাঠন কার্যক্রম, ওয়াজ-নসীহত ও ইরশাদ-এর মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য ছিল। অনন্তর বিষয়টি তিনি নিজেই পরিষ্কার ভাষায় লিখেছেন :

আমি অনুভব করি যে, যদিও ইলম-এর প্রচার ও প্রসারের দিকে পুনরায় আমি ফিরে এলাম, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে একে আমার প্রথম অবস্থার দিকে প্রত্যাবর্তন বলা ঠিক হবে না। আমার পূর্বের ও পরের অবস্থার ভেতর আসমান-যমীন ফারাক। প্রথমে আমি সেই “ইলম-এর প্রচার করতাম যা প্রভাব ও পদমর্যাদা বৃদ্ধির মাধ্যম ছিল এবং আমি আমার কথা ও কর্ম দ্বারা তারই দাওয়াত দিতাম এবং এটাই ছিল আমার অভীষ্ট লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। কিন্তু এখন আমি সেই “ইলম-এর দাওয়াত দিই যার কারণে পদমর্যাদা ও প্রভাব-প্রতিপত্তির মায়া চিরদিনের তরে কাটাতে হয়। এখন আমি আমার নিজের ও অন্যের সংস্কার ও সংশােধন চাই। আমি জানি না, আমি আমার অভীষ্ট লক্ষ্য পর্যন্ত পৌছুতে পারব কিনা অথবা এর পূর্বেই আমাকে কর্মের জগত থেকে চিরবিদায় নিতে হবে।

কিন্তু নিজস্ব ইয়াকীন ও পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে আমার ঈমান এই যে, আসল শক্তি আল্লাহুরই শক্তি। তারই কারণে মানুষ গােমরাহী ও মন্দ থেকে বাঁচতে পারে এবং হিদায়াত ও আনুগত্যের শক্তি অর্জন করতে পারে। আসলে আমি নিজের তরফ থেকে সচল ও সক্রিয় হইনি, আল্লাহই আমাকে সচল ও গতিশীল বানিয়েছেন। আমি নিজে থেকে কাজ শুরু করিনি, আল্লাহ পাকই আমাকে কাজে লাগিয়েছেন। আমার দু’আ, আল্লাহ পাক প্রথমে আমাকে সংশােধন করুন, অতঃপর আমা দ্বারা অন্যদের সংস্কার ও সংশােধন হােক; প্রথমে আমাকে পথে আনুন, এরপর আমা দ্বারা অন্যদের পথ প্রদর্শনের কাজ নিন। সত্য যেন আমার সম্মুখে উদ্ভাসিত হয় এবং তার বদৌলতে আমি যেন আনুগত্য করার সৌভাগ্য লাভ করতে পারি; বাতিল যেন আমার চোখে উজ্জ্বলভাবে প্রতিভাত হয় এবং আমি যেন তার অনুসরণ থেকে বাছি।

ইমাম গাযালী (র)-এর সংস্কার ও ইসলামী পুনর্জাগরণমূলক কাজঃ

ইমাম গাযালী (র) এরপর যে সংস্কার ও ইসলামী পুনর্জাগরণমূলক কাজ আঞ্জাম দেন তাকে দু’ভাগে ভাগ করা যায়ঃ-

১. দর্শন ও বাতেনী মতবাদের বর্ধিত প্লাবনের মুকাবিলা এবং ইসলামের পক্ষ থেকে সে সবের মূল ভিত্তির ওপর আঘাত হানা।

২. সমাজ ও ব্যক্তিগত জীবনের ইসলামী ও নৈতিক পর্যালােচনা এবং সে সবের ওপর সমালােচনা ও সংস্কার।

দর্শনের ওপর কার্যকর অপারেশন

তাঁর প্রথম ও সর্ববৃহৎ কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের বিস্তারিত বিবরণ এই যে, ধর্মদ্রোহী মতবাদ ও বাতেনিয়াদের বিরুদ্ধে তখন পর্যন্ত যা কিছু করা হচ্ছিল তা ছিল আত্মরক্ষামূলক এবং প্রত্যুত্তর দেওয়ার মাঝেই সীমাবদ্ধ ছিল। সে সময় পর্যন্ত দর্শন ইসলামের ওপর হামলারত ছিল এবং মুতাকাল্লিমগণ ইসলামের সমর্থনে সাফাই পেশ করছিলেন। দর্শনশাস্ত্র ইসলামের মূল বুনিয়াদের ওপর কুঠারঘাত করত এবং ইলমে কালাম ইসলামের ঢাল হবার কোশেশ করত। সেই সময় পর্যন্ত মুতাকাল্লিমগণ ও উলামায়ে ইসলামের ভেতর কেউই স্বয়ং দর্শনের ভিত্তির ওপর আঘাত হানবার সাহস করেন নি। দর্শন যে সব কাল্পনিক ও মনগড়া বিষয়ের ওপর দাঁড়িয়েছিল কয়েক শতাব্দী পর্যন্ত সে সবের ওপর আঘাত হানা এবং সে সবের জ্ঞানগর্ভ সমালােচনা করার হিম্মত কারাে হয়নি। ইমাম আবুল হাসান আশ’আরীকে বাদ দিলে (দর্শনের সঙ্গে যার সরাসরি টক্কর লাগে নি) গােটা “ইলমে কালামের কণ্ঠস্বর তথা উচ্চারণ ভঙ্গী ছিল আত্মরক্ষামূলক।

ইমাম গাযালী (র)-ই প্রথম ব্যক্তি যিনি দর্শনকে বিস্তারিত ও সমলােচনার নিরিখে অধ্যয়ন করেন। এরপর দার্শনিকদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য-এই নামে একটি বই লিখেন। এতে তিনি সহজ সরল ভাষায় বিশ্লেষণমূলক পন্থায়। যুক্তিবিদ্যা, অধিবিদ্যা তথা Metaphysics ও প্রকৃতিবিদ্যার খােলাসা বা সারসংক্ষেপ পেশ করেন এবং পরিপূর্ণ নিরপেক্ষতার সঙ্গে দার্শনিকদের দৃষ্টিভঙ্গি ও আলােচনা লিপিবদ্ধ করেন। গ্রন্থের ভূমিকায় তিনি খােলাখুলিভাবে বলেছেন যে, গণিতশাস্ত্রে আলােচনা কিংবা তর্ক-বিতর্কের সুযােগ নেই এবং ধর্মের সঙ্গে এর ‘হা” বা ‘না’-এর কোনরূপ সম্পর্ক নেই। কিন্তু ধর্মের আসল সংঘর্ষ অধিবিদ্যার সঙ্গে। যুক্তিবিদ্যায়ও খুব অল্পই ভুল আছে। যদি কিছু মতভেদ থাকে তা পরিভাষার ক্ষেত্রে। প্রকৃতিবিদ্যায় অবশ্যই সত্য-মিথ্যার তথা হক ও বাতিলের মিশ্রণ আছে। এজন্য তার আলােচ্য বিষয় প্রকৃতপক্ষে অধিবিদ্যা এবং কিছুটা পরিমাণ প্রকৃতিবিদ্যা। আর যুক্তিবিদ্যা কেবল ভূমিকাস্বরূপ ও পরিভাষার জন্য।

এই গ্রন্থ শেষ করে, যা ইলমে কালামের শিবিরে খুবই দরকার ছিল, তিনি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘তাহাফতুল-ফালাসিফা’ (দার্শনিকদের ভ্রান্তি ও অসঙ্গতি) লেখেন যার জন্যই তিনি মাক “সি ‘দু’ল-ফালাসিফা’ লিখেছিলেন। এতে তিনি দর্শন, অধিবিদ্যা ও প্রকৃতিবিদ্যার ওপর ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে সমালোচনা করেন। এবং তার জ্ঞানগত দুর্বলতা, তার যুক্তি-প্রমাণের অসারতা এবং দার্শনিকদের পারস্পরিক বৈপরীত্য ও মতভেদকে পরিপূর্ণ শক্তি ও সাহসিকতার সঙ্গে প্রকাশ করেন। উক্ত গ্রন্থে তাঁর কণ্ঠস্বর ও উচ্চারণভঙ্গী আবপূর্ণ, তাঁর ভাষা শক্তিশালী ও প্রস্ফুটিত, কোথাও কোথাও তা বিদ্রুপাত্মক ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ ভঙ্গি অনুসরণ করে, যা কিনা দর্শনশাস্ত্রের ভয়ে ভীত ও অভিভূত মহলের জন্য দরকার ছিল। তা পাঠ করলে অনুভূত হয় যে, গ্রন্থের গ্রন্থকার দার্শনিকদের মুকাবিলায় হীনমন্যতাবােধের সামান্যতম মিশ্রণ থেকেও মুক্ত ও পবিত্র, আস্থা ও দৃঢ় বিশ্বাসে তিনি ভরপুর এবং দর্শনশাস্ত্র সম্পর্কে তিনি এতটুকু আতংকিত কিংবা অভিভূত নন।

তিনি গ্রীক দার্শনিকদেরকে তারই কাতারের মানুষ মনে করেন এবং তাঁদের সঙ্গে সমতার ভিত্তিতে ও প্রতিদ্বন্দিতার ভাষায় কথা বলেন। সে সময় এমন একজন লােকেরই দরকার ছিল, যিনি দর্শনশাস্ত্রের চোখে চোখ রেখে কথা বলতে পারেন এবং আত্মরক্ষামূলক ও জবাবদিহির ভূমিকার পরিবর্তে দর্শনশাস্ত্রের ওপর পূর্ণ শক্তিতে আর্ঘাত হানতে পারেন। ইমাম গাযালী (র) তাহাফতুল-ফালাসিফা’ নামক গ্রন্থে এই খেদমতই আঞ্জাম দিয়েছেন। গ্রন্থের ভূমিকায় তিনি লিখেছেনঃ

আমাদের যুগে এমন কিছু লােক জন্মেছে যাদের ধারণা এই যে, তাদের দিল ও দিমাগ তথা মন ও মস্তিষ্ক সাধারণ লােকের তুলনায় বিশিষ্ট। এ সমস্ত লােক ধর্মীয় বিধি-বিধান ও বাধ্যবাধকতাকে অবজ্ঞার চোখে দেখে। এর কারণ একমাত্র এই যে, তারা সক্রেটিস, হিপােক্রেট (Hippocrate-খৃ. পূ. ৪৬০৩৭৭), প্লেটো ও এরিস্টটলের ভীতিপূর্ণ নাম শুনেছে এবং তাদের শানে তাদের অনুরাগী ভক্তবৃন্দের বিরাট স্তুতিপূর্ণ গলগল্প ও লম্বা-চওড়া ফিরিস্তি শুনেছে। তারা জানতে পেরেছে যে, অংকশাস্ত্র, যুক্তিবিদ্যা ও অধিবিদ্যার ক্ষেত্রে তারা (সক্রেটিস প্রমুখ দার্শনিক) বিরাট সূক্ষ্ম দৃষ্টির পরিচয় দিয়েছেন এবং তাদের বুদ্ধি ও মেধার সমকক্ষ কেউ ছিলেন না। তাঁরা তাঁদের উন্নত মস্তিষ্ক ও মেধার সঙ্গে ধর্ম ও তার আনুষঙ্গিক বিষয়ের অস্তিত্ব অস্বীকার করত।

তাদের নিকট তাদের ধর্মের মূলনীতি ও নিয়মবিধি ছিল মনগড়া ও কৃত্রিম। ব্যস, আর কথা নেই, তারাও তাদের গুরুদের অন্ধ আনুগত্যে বাদরামি অনুকরণ করতে গিয়ে ধর্ম অস্বীকার করাকে নিজেদের জন্য একটা ফ্যাশন বানিয়ে নিল। তারা। শিক্ষিত ও প্রগতিশীল নামে অভিহিত হবার খাহেশ মেটাতে ধর্মকে অস্বীকার করতে থাকল যাতে করে তাদের মর্যাদা সাধারণের তুলনায় উন্নত মনে করা হয় এবং তারা যাতে জ্ঞানী-গুণী ও বুদ্ধিজীবীদের কাতারে শামিল হতে পারে। এরই ভিত্তিতে আমি ইচ্ছা করলাম যে, ঐসব জ্ঞানী দার্শনিকরা ঐশী বিদ্যা (অধিবিদ্যা)-র ওপর যা কিছু লিখেছেন সে সবের ভ্রান্তি আমি দেখিয়ে দিই এবং প্রমাণ করে দিই যে, তাদের সংকট, সমস্যাবলী ও মূলনীতিগুলাে। ছেলেমিপূর্ণ এবং তাদের অনেক উক্তি ও দৃষ্টিভঙ্গি সীমাহীন রকমের হাস্যকর।

এই গ্রন্থের সম্মুখে গিয়ে তার বর্ণনাশক্তি ও বিদ্রুপাত্মক লেখনী পদ্ধতি আরও শাণিত ও উদ্ধত হয়ে যায় এবং আল্লাহর সত্তা ও গুণাবলী সম্পর্কে দার্শনিকদের অত্যাশ্চর্য বিষয়সমূহ, বুদ্ধিবৃত্তি ও আকাশমার্গের পুরাে বংশতালিকা লেখেন যা দার্শনিকরা লিখেছেনঃ Imam Ghazzali

ثلنا ماذكرتموه تحكمات وهي على التحقيق ظلمات فرق للمات لو حكاه الانسان عن منام راه لاستدل على سوء مزاجه

তােমাদের এই যে বিস্তৃত বিবরণ, তা কেবল গালভরা দাবি ও স্বেচ্ছাচারিতা ছাড়া আর কিছু নয়, বরং প্রকৃতপক্ষে তা অন্ধকারের ওপর অন্ধকারের প্রলেপ মাত্র। যদি কোন ব্যক্তি তার নিজের দেখা এমন স্বপ্নও বর্ণনা করে তাহলেও তার মস্তিষ্ক বিকৃতির প্রমাণ হবে। সামনে এগিয়ে তিনি লিখেনঃ

الست أدري كيف يقنع المجنون من نفسه بمثل هذه الأوضاع فضلا عن العقلاء الذين يشقون الشعر بزعم في العقولات.

আমার বিস্ময় জাগে যে, পাগলেও কিভাবে এ ধরনের স্বনির্মিত ও স্বকপােলকল্পিত কথার ওপর তুষ্ট হতে পারে। সেখানে জ্ঞানী ও বুদ্ধিজীবীদের কথা তাে ভাবাই যায় না, যারা তাদের নিজস্ব ধারণা মাফিক বােধগম্য বস্তুনিচয় ও সম্ভাবনার ভেতরও চুলচেরা বিশ্লেষণ করে ছাড়েন। অন্যত্র লিখেন ?

انتهى بهم التعمق في التعظيم الي أن أبطلوا كل مايفهم من العظمة وقربوا حاله الميت الذي لاخبر له بما يجري في العالم الا انه فارق الميت في شعوره بنفسه نقط – وهكذا يفعل الله بالزانغين من سبيله والناكبین من طريق الهدى المنکرین لقوله تعالى ما أشهدهم خلق السموات والأرض ولا خلق أنفسهم الظانين بالله ظن السوء المعتقدين أن الأمور الربوبية نستعلی کنهها القوى البشرية المغرورين بعقولهم زاعمين أن فيها مندوحة عن تقليد الرسل واتباعهم فلا جرم اضطروا الى الاعتراف بان لباب معقولاتهم رجع الى مالوحكي في المنام لتعجب منه

প্রথম স্বয়ম্বর সম্মানে উচ্ছাস ও সীমাতিরিক্ততা প্রকাশ করতে গিয়ে তাঁকে (স্বয়ষ্ণু বা প্রথম স্রষ্টাকে) এমন সীমায় পৌঁছে দিয়েছে যে, তারা মর্যাদার সব শর্ত ও আবশ্যকীয় বিষয়াবলীকেও বাতিল আখ্যায়িত করেছে এবং আল্লাহ তা’আলাকে (নিজেদের দর্শনে) সেই মুর্দা লাশের ন্যায় বানিয়ে দিয়েছে যে জানেই না যে, বহির্জগতে কি হচ্ছে কিংবা ঘটছে। অবশ্য এই দিক দিয়ে তিনি (স্রষ্টা, স্বয়ং) মুর্দা অপেক্ষা ভাগ্যবান যে, তার উপলব্ধি ও অনুভূতি শক্তি লােপ পায়নি, বরং তা আছে (আর মৃত লাশের উপলব্ধি, চেতনা কিংবা অনুভূতি থাকে না)। আল্লাহ পাক এ ধরনের লােকদেরকে এমন পরিণতির সম্মুখীন করেন যে, তারা আল্লাহর পথ থেকে দূরে সরে যায়, সৎ ও সত্য পরিত্যাগ করে এবং নিম্নোক্ত আয়াতকে অস্বীকার করে :

ما أشهدهم خلق السموت والأرض ولا خلق أنفسهم

“আর আমি সেই সব কাফির ও মুশরিকদেরকে আসমান ও যমীন সৃষ্টি করবার সময় সাক্ষী বানাই নি, এমন কি তাদের পয়দা করবার মুহূর্তেও না”, যারা আল্লাহর প্রতি কুধারণা পােষণ করে এবং খারাপ আকীদা রাখে, যাদের ধারণা যে, আল্লাহর রবুবিয়তের (পালনবাদ-এর) হাকীকতের ওপর মানবীয় শক্তি প্রভাব বিস্তার করতে পারে, যারা তাদের নিজেদের জ্ঞান ও বুদ্ধিমত্তার ব্যাপারে গর্বিত এবং মনে করে যে, তাদের উপস্থিতি ও বর্তমান থাকা অবস্থায় পয়গম্বরদের অনুকরণ ও আনুগত্যের প্রয়ােজন নেই। নিশ্চিতরূপেই এর পরিণতি এই হয়েছে যে, তাদের মুখ দিয়ে (যুক্তিবুদ্ধির নামে) এমন সব হাস্যকর কথাবার্তার বেরােয়, যদি কেউ এ ধরনের স্বপ্নের বর্ণনাও দেয় তাহলে লােকে বিস্মিত হবে। তাহাফতুল-ফালাসিফার প্রভাব দর্শনশাস্ত্রের ওপর এই সাহসিকতাপূর্ণ সমালােচনা এবং নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত তার প্রতি অবজ্ঞা ও তাচ্ছিল্য প্রদর্শন ইলম-ই-কালামের ইতিহাসে এমন একটি নতুন যুগের সৃষ্টি করে যার সার্বিক কৃতিত্ব ইমাম গাযালীর প্রাপ্য।

পরে শায়খুল ইসলাম ইমাম ইবুন তায়মিয়া (র) এর পূর্ণতা দান করেন এবং দর্শনশাস্ত্র ও যুক্তিবিদ্যার মৃতদেহের “পােস্ট মর্টেম”-এর দায়িত্ব পালন করেন। দর্শনশাস্ত্রের অপারেশনের এই ধারার সূচনাও ইমাম গাযালী (র)-এর রচিত গ্রন্থাদি থেকেই। ‘তাহাফতুল-ফালাসিফা’ দর্শনশাস্ত্রের কাল্পনিক ভােজবাজির ওপর কার্যকর আঘাত হানে এবং তার শ্রেষ্ঠত্ব, মর্যাদা ও মেধাগত পবিত্রতাকে বেশ ক্ষতিগ্রস্ত করে। এই গ্রন্থের রচনা দর্শনশাস্ত্রের জগতে একটি অস্থিরতা, চাঞ্চল্য ও ক্রোধের জন্ম দেয়। কিন্তু শত বছর পর্যন্ত এর প্রত্যুত্তরে কোন উল্লেখযােগ্য গ্রন্থ প্রণীত হয়নি, এমন কি হিজরী ষষ্ঠ শতাব্দীর শেষে দর্শনশাস্ত্রের প্রখ্যাত উৎসাহী প্রবক্তা ও এরিস্টটলের অনুসারী ইব্‌ন রুশদ (মৃত্যু ৫৯৫ হিজরী) “তাহাফতু’ততাহাফুত নামের একটি বইয়ের মাধ্যমে এর জবাব লেখেন। পাশ্চাত্যের বিদ্বানমণ্ডলী বলেন, যে দর্শনশাস্ত্র গাযালী (র)-এর আক্রমণে প্রায় মরণদশায় পৌছে গিয়েছিল, ইব্‌ন রুশদের সমর্থন তাকে এক শ’ বছরের জন্য পুনরায় জীবন দান করে। ১. তাহাফতুল-ফালাসিফা, ৩১ পৃ.। ২. প্রাচ্যে ও পাশ্চাত্যে ইসলামী দর্শনের ইতিহাস-মুহাম্মদ সুফী জুম’আ, পৃ. ৭২।

বাতেনী মতবাদের ওপর হামলা | দর্শনশাস্ত্র ছাড়াও ইমাম গাযালী (র) বাতেনী মতবাদের ফেতনার দিকেও মনােযােগ দেন। তিনি বাগদাদের নিজামিয়া মাদরাসায় অধ্যাপনাকালে বাতেনীদের প্রত্যাখ্যানে ততকালীন খলীফার ইঙ্গিতে ‘আল-মুস্তাজহির’ নামক গ্রন্থ প্রণয়ন করেছিলেন, যার উল্লেখ তিনি তাঁর আত্মজীবনীমূলক ‘আল-মুনকি ‘য’ মিনাদ্দ লাল নামক গ্রন্থে করেছেন। এই গ্রন্থ ছাড়াও এই বিষয়ের ওপর তার আরও তিনটি গ্রন্থ রয়েছে যা সম্বত তার ভ্রমণকালীন সময়ের রচনাঃ হুজ্জাতুল-হক, মুফাসসালু’ল-খিলাফ ও কাসামুল-বাতেনিয়া’। তাঁর গ্রন্থের তালিকায় এই বিষয়ের ওপর Laura ও bluly নামক আরও দুটি গ্রন্থের সন্ধান পাওয়া যায়। বাতেনিয়া মতবাদের প্রত্যাখ্যানের জন্য প্রকৃতপক্ষে আহলে সুন্নাত ওয়াল-জামা’আত মহলে তার চেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তি মেলা মুশকিল ছিল। তিনি দর্শনশাস্ত্র, তাসাওউফ, জাহিরী ইলম ও হাকীকত ও মা’রিফতের উভয় দিককার গলি-ঘুপচি সম্পর্কে ওয়াকিফহাল ছিলেন এবং তিনি বাতেনী মতবাদের রহস্য ভেদ ও তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক ষড়যন্ত্রের পর্দা সহজেই উন্মােচন করতে পারতেন।

বাতেনী মতবাদের বড় অত্র ছিল দর্শনশাস্ত্র ও তার পরিভাষাসমূহ। শুধু ইমাম গাযালী (র)-এর মতই কোন পরিপক্ক ব্যক্তি ও বুদ্ধিবৃত্তির পর্যালােচক সে সবের প্রত্যাখানের কাজটি করতে পারতেন। বাস্তবেও তিনি তাই করেন। তিনি জ্ঞানগত দিক দিয়ে দর্শনশাস্ত্রকে এক নিষ্প্রভ ও গুরুত্বহীন বস্তুতে পরিণত করেন।

জীবন ও সমাজের ইসলামী পর্যালােচনা

ইমাম গাযালী (র)-এর অপর সংস্কারমূলক কাজ ছিল জীবন ও সমাজের ইসলামী পর্যালােচনা এবং তার সংস্কার ও পুনর্জাগরণের প্রচেষ্টা। তার এই প্রচেষ্টার একটি সফল পরিণতি তাঁর জীবন্ত ও চিরন্তন গ্রন্থ “এহইয়াউ উলুমিদ্দীন”। ইসলামের ইতিহাসে যে কতিপয় গ্রন্থ মুসলমানদের দিল ও দিমাগ তথা মন ও মস্তিষ্ক এবং তাদের জীবনের ওপর সর্বাধিক প্রভাব বিস্তার করেছে তার ভেতর “এহইয়াউ উলুমিদ্দীন”-এর নাম সবিশেষ উল্লেখযােগ্য।

‘আলফিয়াহ’ নামক গ্রন্থের লেখক হাফিজ যয়নুদ্দীন আল-ইরাকী (মৃত্যু ৮০৬ হি.), যিনি ইহাতে উল্লিখিত হাদীছগুলাে খুঁজে বের করেছেন, বলেছেনঃ ইমাম গাযালী (র)-এর “এহইয়া উলুমুদ্দীন ইসলামের সর্বোত্তম গ্রন্থের একটি। ইমাম গাযালী (র)-এর সমসাময়িক ও ইমামুল-হারামায়ন-এর শাগরিদ আবদুল গাফির ফারসী বলেন : এহইয়া উলুমুদ্দীন-এর পূর্বে এ ধরনের কোন কিতাব রচিত হয়নি। শায়খ মুহাম্মদ গারুনীর দাবি ছিল, “যদি দুনিয়ার সমস্ত জ্ঞান-ভাণ্ডার নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হয়। তাহলে আমি “এহইয়া উলুমুদ্দীন”-এর দ্বারা পুনরায় তা জীবিত করে দেব।” হাফিজ ইবন জওহী কতিপয় বিষয়ে মতভেদ সত্ত্বেও এই গ্রন্থের প্রভাব ও ব্যাপক জনপ্রিয়তার স্বীকৃতি দিয়েছেন এবং “মিনহাজুল-ক সে দীন” নামে এর সংক্ষিপ্তসার লিখেছেনঃ

এই গ্রন্থটি বিশেষ অবস্থা, মনােভঙ্গি ও বিশেষ প্রেরণা ও উৎসাহ নিয়ে লেখা হয়েছে। বাগদাদ থেকে সত্যের অন্বেষায় এবং সুদৃঢ় প্রত্যয় ও বিশ্বাসের সন্ধানে যে সফর ইমাম গাযালী (র) শুরু করেছিলেন যা সুদীর্ঘ দশটি বছরের কঠোরকঠিন সাধনা, মুজাহাদা ও নির্জনবাসের পর সফলতা লাভের মাধ্যমে শেষ হয়েছিল- “ইহ’য়াউ’ল-উলুম ছিল সেই সফরেরই বিশিষ্ট সওগাত, যা তিনি (গাযালী) স্বীয় দেশবাসীর জন্য বহন করে এনেছিলেন। এটি ছিল তার হৃদয়ের অভিব্যক্তি ও প্রতিক্রিয়া, জ্ঞানগত অভিজ্ঞতা, সংস্কারমূলক ধ্যান-ধারণা এবং হৃদয়ের স্বতঃউৎসারিত আবেগ ও মত্ততাবস্থারই দর্পণ।

মওলানা শিবলী নু’মানী তাঁর “আল-গাযালী (র) নামক গ্রন্থে লিখেছেন :

তার মধ্যে সত্য অনুধাবনের প্রবল আগ্রহ সৃষ্টি হয়। দুনিয়ার বুকে প্রচলিত সকল ধর্ম-বিশ্বাসই খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে তিনি দেখেন। কিন্তু কোনটিই তাকে পূর্ণ তৃপ্তি দিতে পারেনি, আশ্বস্ত করতে পারেনি। শেষাবধি তিনি তাসাওউফের দিকে ঝুঁকে পড়েন। কিন্তু তা মুখে বলে বােঝাবার বস্তু ছিল না, বরং আপাদমস্তক অনুভব করবার বিষয় ছিল। অনুশীলনের মাধ্যমে উপলব্ধি করবার বস্তু ছিল । আর তার পয়লা সৌন্দর্য (3) অভ্যন্তরীণ সংস্কার তথা ইসলাহে বাতেন ও তাযকিয়ায়ে নফস তথা আত্মার পরিশুদ্ধি। ইমাম সাহেবের কর্মব্যস্ততা ও পেশা ছিল এ পথের প্রতিবন্ধক। একদিকে জনপ্রিয়তা, নাম, খ্যাতি, পদমর্যাদা, সম্মান, প্রতিপত্তি, আলােচনা-বিতর্ক, আর অন্যদিকে আত্মার পরিশুদ্ধি। উভয়ের মাঝে সহস্র যােজনের ব্যবধান। শেষ পর্যন্ত তিনি সব কিছু ছেড়ে ছুঁড়ে একটি কম্বলমাত্র পরিধান করে বাগদাদ থেকে বেরিয়ে পড়েন। তখন থেকেই তাঁর প্রান্তর-জীবনের শুরু।

অতঃপর কঠোর রিয়াযত ও মুজাহাদার পর তিনি তাসাওউফের রহস্য উদ্যানে প্রবেশাধিকার লাভ করেন। এখানে পৌঁছার পর স্বীয় অবস্থায় মত্ত হয়ে গােটা জীবন ও জগত থেকে তাঁর বেখবর হয়ে পড়ার আশংকা ছিল। কিন্তু এই অবস্থায়ও সাধারণের কল্যাণের দিকে ছিল তাঁর কড়া নজর। তিনি দেখতে পেলেন, ব্যাপক জনগণের অবস্থা বিগড়ে গেছে। ধনী-দরিদ্র, বিশিষ্ট-অবিশিষ্ট, জ্ঞানী-মূর্খ, চরিত্রবান-দুশ্চরিত্র সকলেরই নৈতিক চরিত্র হয় ধ্বংস হয়ে গেছে, নয়ত হতে যাচ্ছে। উলামা সম্প্রদায়, যারা সত্য পথের দলীলস্বরূপ হতে পারতেন, তারাই জাকজমক ও পদমর্যাদার কাঙাল। এসব দৃশ্য তাকে ব্যথিত করে তােলে। আর তারই প্রতিক্রিয়াস্বরূপ তিনি এই গ্রন্থ রচনা করেন।

ভূমিকায় তিনি নিজেই লিখেছেন, “আমি দেখতে পেলাম, রােগব্যাধি গােটা জগতটাকে ছেয়ে ফেলেছে এবং পারলৌকিক সৌভাগ্যর রাস্তা বন্ধ হয়ে গেছে। উলামা, যারা ছিলেন সত্য পথের দলীলস্বরূপ, ক্রমেই তাদের অস্তিত্ব লােপ পাচ্ছে। আলিম নামধারী যারা এখনাে আছেন, তারা নামকাওয়াস্তে ‘আলিম, ব্যক্তিগত স্বার্থ ও উদ্দেশ্য তাদেরকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে। তাদের মতে, “ইলম স্রেফ তিনটি জিনিসের নাম, যথা : মুনাজারাহ বা পারস্পরিক বিতর্ক অনুষ্ঠান (যা গর্ব, অহমিকা ও যশ লাভের মাধ্যম); ওয়াজ বা বক্তৃতা (যার ভেতর জনসাধারণের মনােরঞ্জনের জন্য রঙীন ও ছন্দোবদ্ধ ছড়া, কবিতা ও শ্লোক আবৃত্তি করা হয়) এবং ফতওয়া প্রদান (যা বিভিন্ন মামলা-মােকদ্দমার ফয়সালার মাধ্যম)। বাকী রইল আখিরাতের ইলম। এটা মূল লক্ষণীয় বিষয় হলেও অধিকাংশ আলিমই তা ভুলে গিয়েছে। এতদৃষ্টে আমি আর ধৈর্য ধারণ করতে পারলাম না। আমার নিস্তব্ধতা ভেঙে চুরে খান খান হয়ে গেল।” 

পর্যালােচনা ও হিসাব-নিকাশ

ইমাম গাযালী (র)-এর গ্রন্থ প্রণয়নের উদ্দেশ্য ছিল ইসলাহ ও তরবিয়ত তথা সংস্কার-সংশােধন ও প্রশিক্ষণ। আর এজন্য জরুরী ছিল সে সব দুর্বলতা ও খারাপ দিকগুলাে চিহ্নিত করা যা শিক্ষা ও ধর্মীয় কেন্দ্রগুলােতে এবং সাধারণভাবে মুসলিম জনসমাজে বিদ্যমান ছিল। অধিকন্তু প্রয়ােজন ছিল, নফস ও শয়তান কিভাবে বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষকে ধোকা দিয়ে রেখেছে, হাকীকতসমূহ কিভাবে বদলে গেছে, মানুষ কিভাবে হাকীকত থেকে সরে গিয়ে বাহ্যিক আবরণ, চাকচিক্য ও রসম-রেওয়াজের মধ্যে নিজেদের বন্দী করে ফেলেছে অর্থাৎ জীবনের মূল লক্ষ্য তথা পারলৌকিক সৌভাগ্য, রি-ই-ইলাহী ও আল্লাহর সন্তুষ্টি থেকে কিভাবে তারা গাফিল হয়ে পড়েছে, তা জনসাধারণের গােচরীভূত করা। এজন্য তিনি স্বীয় যুগের জীবন-যাত্রা ও সমসাময়িক সমাজের কার্যকলাপের পূর্ণ পর্যালােচনা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন এবং প্রতিটি শ্রেণীর রােগ-ব্যাধি ও ত্রুটি-বিচ্যুতি তথা ভুল-ভ্রান্তিগুলাে পরিষ্কার ভাষায় বর্ণনা করেন, লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ও উপায়উপকরণাদির ভেতর পার্থক্য নির্ণয় করেন, “ইলম-এর মধ্যে ধর্মীয় “ইম ও পার্থিব “ইলম, অতঃপর প্রশংসিত ‘ইলম ও নিন্দনীয় ইলম, অতঃপর ফরয-ই-আইন, ফরয-ই-কিফায়া ইত্যাদির শ্রেণী বিন্যাস করেন।

তিনি সময়ের দাবি অপরিহার্য দায়িত্ব ও কর্তব্য এবং মূল কর্মের দিকেও সকলের মনােযােগ আকর্ষণ করেন। ধনিক ও বিত্তশালীদের দায়িত্বহীনতা, গাফিলতি ও তাদের বিশেষ ও যথার্থ রােগ-ব্যাধিগুলাে খােলাখুলি বর্ণনা করেন। সুলতান ও শাসন কর্তৃত্বে সমাসীন ব্যক্তিবর্গের নির্ভীক সমালােচনা করেন এবং তাদের জোর-জুলুম ও নির্যাতন, শরীয়তবিরুদ্ধ কার্যকলাপ ও আইন-কানুনের নিন্দা করেন। এতদ্ভিন্ন তিনি জনসাধারণের ব্যাধিসমূহ, বিভিন্ন শ্রেণীর ও স্থানের গহিত আচরণসমূহ, নিন্দনীয় অভ্যাস এবং ইসলাম বিরােধী ধর্মীয় প্রথা-পদ্ধতি ও বিদ’আতমূলক কর্মের বিস্তারিত বিবরণ দেন।

মােট কথা, এই গ্রন্থটি ইসলামের প্রথম বিস্তারিত ও যুক্তি-প্রমাণভিত্তিক গ্রন্থ যার মধ্যে গােটা জীবনের ও বিগড়ে যাওয়া ইসলামী সমাজব্যবস্থার পরিপূর্ণ খতিয়ান রয়েছে এবং নৈতিক চরিত্রের ব্যাধিগুলাের উৎস ও তার কারণ এবং এর চিকিৎসা-পদ্ধতির ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে।

উলামা ও ধার্মিক ব্যক্তিবর্গ

ইমাম গাযালী (র)-এর মতে, বিশ্বব্যাপী অশান্তি, বিপর্যয় ও ধর্মীয় ও চারিত্রিক অবনতির সর্বাপেক্ষা বড় যিম্মাদার উলামায়ে কিরাম যারা মুসলিম উম্মার জীবনে লবণস্বরূপ। যদি লৰণই নষ্ট হয়ে যায় তাহলে এমন কোন বস্তু আছে যা তাকে ভাল করতে পারে? কবির ভাষায় ঃ

با معشر القراء يا ملح البلد + ما يصلح الملح اذ الملح فسد

ওহে উলামা সম্প্রদায়! তােমরা যারা শহরের লবণসদৃশ, আমাকে বলে দাও, যদি লবণই নষ্ট হয়ে যায় তাহলে আর কি দিয়ে তা ভাল করা যায়? অন্তরের ব্যাধির আধিক্য ও সাধারণ মানুষের গাফিলতির কারণ বর্ণনা করতে গিয়ে এক স্থানে তিনি লিখেছেনঃ

الثالثة وهو الداء العضال فقد الطبيب فان الاطباء هم العلماء وقد مرضوا في هذه الاعصار مرضا شديدة وعجزوا من علاجه

তৃতীয় কারণ এবং সেটাই এমন ব্যাধি যার চিকিৎসা নেই আর তা এই যে, রােগী বর্তমান, কিন্তু চিকিৎসক লাপাত্তা। উলামায়ে কিরাম সমাজের চিকিৎসক আর তারাই এ যুগে ব্যাধিতে সাংঘাতিকভাবে আক্রান্ত। সুতরাং চিকিৎসা করতে তারা অক্ষম।

তাঁর মতে, সুলতান ও শাসকবর্গের খারাপ হবার কারণ ‘উলামায়ে কিরামের কমযােরী এবং স্বীয় দায়িত্ব পালনে তাঁদের গাফিলতি। এক স্থানে তিনি লিখেছেন:

وبالجملة انما فسدت الرعية بفساد الملوك وفساد الملوك بفساد العلماء فلولا القناة السوء والعلماء السوء لقل خوفا من انگار هم

সংক্ষিপ্তসার এই যে, প্রজাবর্গের খারাপ হবার কারণ রাজা-বাদশাহর তথা শাসন কর্তৃত্বে সমাসীন ব্যক্তিবর্গের খারাবী এবং উলামায়ে কিরামের খারাপ হওয়া বাদশাহ তথা শাসকবর্গের খারাপ হবার কারণ। যদি আল্লাহভীতিহীন কাযী ও উলামায়ে (‘সূনীতি, আদর্শ ও চরিত্রহীন স্বার্থসর্বস্ব দুনিয়াদার ‘আলিম) না থাকত তাহলে শাসককুল এভাবে বিগড়ে যেত না, বরং তারা ‘আলিমদের সমালােচনাকে ভয় করেই চলত।

সে যুগের ‘আলিমদের সম্পর্কে ইমাম গাযালী (র)-এর অভিযােগ যে, তারা পূর্ব যুগের আলিম-উলামার ন্যায় আমর বিল-মা’রূফ ওয়া নাহী আনিল মুনকার তথা সৎ কাজে আদেশ ও অসৎ কাজ থেকে নিষেধ এবং অত্যাচারী শাসকের সম্মুখে হক-কথা বলার দায়িত্ব পালন করছেন না। তার মতে, এর কারণ এই যে, ‘আলিম-উলামা দুনিয়াদার হয়ে গেছেন এবং পদমর্যাদার পেছনে ঘুরছেন। তিনি সে যুগের সুলতান ও শাসনকর্তৃত্বে সমাসীন ব্যক্তিবর্গের সম্মুখে সত্যপন্থী উলামায়ে কিরামের সাহসিকতা, নির্ভীকতা ও হিসাব গ্রহণ ও অস্বীকৃতি জ্ঞাপনের প্রভাবমণ্ডিত ঘটনাবলী লিপিবদ্ধ করবার পর বলেনঃ Imam Gazzali

এই ছিল আলিমদের কর্মপদ্ধতি এবং আমর বিল-মা’রূফ ও নাহী আনিলমুনকার’-এর অবস্থা। রাজা-বাদশাহর শান-শওকতের এতটুকু পরওয়া তাদের ছিল না। তারা আল্লাহর অনুগ্রহের ওপর আস্থাশীল ছিলেন এবং নিশ্চিন্ত ও আশ্বস্ত ছিলেন যে, আল্লাহতা’আলা তাদেরকে হেফাজত করবেন। তাঁরা আল্লাহ তা’আলার সেই ফয়সালার ওপরও রাজী ছিলেন যে, তাদের ভাগ্যে শাহাদত লাভ ঘটুক। যেহেতু তাঁদের নিয়ত ছিল ভালো, সেহেতু তাঁদের কথায় পাথরও মােমের মত গলে যেত এবং বিরাট থেকে বিরাটতর পাষাণ হৃদয়ও প্রভাবিত হত।

এখন তাে অবস্থা এই যে, দুনিয়ার লােভ ‘আলিমদের বােবা বানিয়ে দিয়েছে এবং তারা একেবারে নিশ্চুপ। আর যদি কখনও তারা মুখ খােলে তাহলে দেখা যায় তাদের কথা ও কাজের মধ্যে কোন সামঞ্জস্য নেই। ফলে তাদের কথায়ও কোন আছর হয় না। যদি আজও তারা নিষ্ঠা ও সততার সঙ্গে কাজ করেন এবং ইলম-এর হক আদায় করার চেষ্টা করেন তাহলে অবশ্যই তারা কামিয়াব হবেন। কেননা প্রজাবৃন্দের খারাপ আচরণ শাসকবর্গের খারাপ আচরণের পরিণতিমাত্র। আর শাসকবর্গের আচরণের খারাপ দিকগুলাে আলিম-উলামার খারাপ আচরণের পরিণতি ছাড়া কিছু নয়। আলিমদের মন্দ হওয়ার কারণ পার্থিব সম্পদ ও উচ্চ পদমর্যাদা প্রীতি। কেননা যার ওপর দুনিয়ার ভালবাসা চেপে বসে সে উচ্চ পর্যায়ের লােক কিংবা রাজা-বাদশাহদের সমালােচনা করাতাে দূরের কথা, নিম্নশ্রেণীর একটি লােকেরও হিসাব গ্রহণের এবং তার ভুল-ত্রুটিগুলাে ধরিয়ে দেবার সাহস রাখে না।

ইমাম গাযালী (র)-এর যুগে একজন আলিমের জগত ফিকাহের ছােটখাটো ও খুঁটিনাটি ইখতিলাফী মসলা-মাসাইলের ভেতরই সীমাবদ্ধ ছিল। আলােচনাসমালােচনা ও তর্ক-বিতর্কের মজলিস বসত ঘরে ঘরে, দেশের-আনাচে-কানাচে। বাদশাহদের দরবারগুলাের রওনকও ছিল এই সব মাযহাবী ও ফিকহ বাহাছ-মুবাহাছা ও বিতর্কমূলক অনুষ্ঠান। এ ব্যাপারে উলামা ও ছাত্রদের মগ্নতা ও বাড়াবাড়ি এতটা বেড়ে গিয়েছিল যে, অন্যান্য সব জ্ঞান-বিজ্ঞান, পেশা ও দীনী খেদমতের বিভিন্ন বিভাগ উপেক্ষিত হতে চলেছিল। এর সীমা এত দূর বিস্তৃত হয়েছিল যে, আত্মার সংস্কার, চারিত্রিক শালীনতা ও পারলৌকিক সৌভাগ্য যেই ইলম ও প্রয়াসের ওপর নির্ভরশীল তা থেকে সবার মনােযােগ সরে গিয়েছিল। ইমাম গাযালী (র) এই অবস্থা সম্পর্কে সমালােচনা করতে গিয়ে লিখেছেন :

“যদি কোন ফকীহকে সে সব বিষয়ের (সবর, শােকর, আশা ও ভয় অথবা হিংসা, বিদ্বেষ, ঈর্ষা, অকৃতজ্ঞতা, প্রতারণা, ধোকা ইত্যাদির) কোন একটি সম্পর্কে অথবা ইখলাস, তাওয়াক্কুল ও রিয়া থেকে বেঁচে থাকবার পন্থা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয় যা জানা তার জন্য ফরযে আইন এবং এর প্রতি এতটুকু গাফিলতি প্রদর্শনের ভেতর আখিরাত বরবাদ হবার বিপদাশংকা বিদ্যমান, তাহলে তিনি জবাব দিতে পারবেন না। আর যদি (ক) লি’আন, (খ) জিহার সবক ও (গ) রমী সম্পর্কে তাকে জিজ্ঞাসা করা হয় তাহলে তিনি এর জবাবে এমন সব সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ও খুঁটিনাটি বিষয়ের অবতারণা করবেন, বহুকাল ধরে যার কোন আবশ্যকতা দেখা দেয় নি এবং কখনাে যদি দেখাও দেয় তাহলে শহরে এ সম্পর্কে ফতওয়া দেবার মত লােকের কোন অভাব নেই। অথচ দেখা যাচ্ছে, এই সব ‘আলিম দিনরাত শুধু এই জাতীয় খুঁটিনাটি বিষয় নিয়েই মাথা ঘামাচ্ছেন এবং মুখস্থ করে এগুলােরই পাঠ দানে ব্যাপৃত রয়েছেন। অপরদিকে তারা সেই সব বিষয় থেকে পরাঙ্মুখ রয়েছেন যা ধর্মীয় দিক দিয়ে তাদের জন্য জরুরী। যদি কখনাে তাদেরকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হয় তাহলে তারা বলেন ; আমরা এই ইলম-এর ভেতর মশগুল রয়েছি এজন্য যে, এটা ধর্মীয় ‘ইলম ও ফরযে কিফায়া। 

তারা তাদের শিক্ষা দান ও শিক্ষা গ্রহণ সম্পর্কে নিজেদেরকেও ভুল পথে পরিচালিত করেন এবং অন্যদেরকেও বিভ্রান্ত করেন। অথচ বুদ্ধিমান ও সমঝদার মানুষ বেশ ভালভাবেই জানেন যে, যদি তাদের উদ্দেশ্য হয় ফরযে কিফায়ার হক আদায় করা এবং স্বীয় যিম্মাদারীর হাত থেকে মুক্ত হওয়া, তাহলে তারা সেই ফরযে কিফায়ার ওপর এই ফরযে ‘আইনকে অগ্রাধিকার দিতেন। তাছাড়া আরাে কিছু কিছু ফরযে কিফায়া আছে যেগুলাের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া উচিত। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, বহু শহর এমন রয়েছে যেখানে কেবল অমুসলিম চিকিৎসক রয়েছেন যাদের সাক্ষ্য ফিকহী বিধানে কবুল করা যায় না। অথচ আমরা দেখতে পাই না যে, কোন ‘আলিম (এই কমতি ও যরুত অনুভব করে) চিকিৎসাশাস্ত্রের দিকে মনােযােগ দিয়েছেন, বরং দেখা যায় এর মুকাবিলায় ছাত্ররা ইলমে ফিক্হ, বিশেষ করে বিরােধিতা ও বিতর্কমূলক বিষয়ের ওপরই ঝাপিয়ে পড়ছে। প্রকৃতপক্ষে এ ধরনের ‘আলিম দ্বারা শহর ভতি যাদের একমাত্র কাজ ফতওয়া প্রদান ও মসলা-মাসায়েল বাৎলে দেওয়া। আমার উপলব্ধিতে আসে না, উলামায়ে দীন শুধু এ ধরনের ফরযে কিফায়ার ভেতর মশগুল হওয়াকে কিভাবে সঠিক মনে করেন এবং এমন ফরযকে কিভাবে তারা পেছনে ফেলে রাখেন যার প্রতি এখনই মনােযােগ দেওয়া জরুরী। এর কারণ কি এই যে, চিকিৎসাশাস্ত্রের মাধ্যমে ওয়াক্ফ সম্পত্তির মুতাওয়াল্লী, য়াতীমের ধন-সম্পদের তত্ত্বাবধায়ক

এবং কাযী বা মুফতী হওয়া যায় না কিংবা সমবয়সীদের ওপর প্রাধান্য অর্জন

এবং দুশমন ও প্রতিপক্ষের ওপর নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব লাভ করা যায় না। অন্য এক স্থানে লিখেছেন ?

এমন অনেক ফরযে কিফায়া আছে যেগুলাের দিকে দৃষ্টি দেবার কেউ নেই। ‘আলিম-উলামাদেরও সে দিকে বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ নেই। বেশি দূর যাবার দরকার নেই। চিকিৎসাশাস্ত্রের কথাই ধরুন। অধিকাংশ মুসলিম শহরে কোন মুসলিম চিকিৎসক নেই, অথচ একমাত্র তাদের সাক্ষ্যই শর’ঈ বিষয়াবলীতে নির্ভরযােগ্য। উলামায়ে কিরামের এই পেশার প্রতি এতটুকুও আকর্ষণ নেই। অনুরূপভাবে আমর বিল-মা’রূফ ও নাহী আনিল-মুনকারও ফরযে কিফায়া (কিন্তু এটিও পরিত্যক্ত হচ্ছে)।

তিনি এক স্থানে মূর্খতা, অলসতা ও দীন-ধর্ম সম্পর্কে ব্যাপক অজ্ঞতার এবং তাবলীগ ও সাধারণ তা’লীমের অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেনঃ যে ব্যক্তির নিজের দীন সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা ও উদ্বেগ আছে সে তাবলীগ ও তালীম ছেড়ে এমন সব বিষয় নিয়ে, যা কদাচিৎ ঘটে, কখনাে ব্যস্ত থাকতে পারে না। | কেন ইখতিলাফী মসলা-মাসাইল বিগত যুগগুলােতে অত্যধিক গুরুত্ব ও জনপ্রিয়তা লাভ করেছেঃ “উলামায়ে কিরাম কেন একে নিজেদের মেধা ও পরিশ্রমের ক্ষেত্র বানিয়ে নিয়েছেন? ইমাম গাযালী (র)-এর মতে এর কিছু ঐতিহাসিক কারণ রয়েছে এবং সে সবের ফলে এমনটি হওয়া বিলকুল স্বাভাবিক ছিল। তিনি লিখেছেন।

মহানবী (সা)-এর পর তাঁর স্থলাভিষিক্ত হযরত খুলাফায়ে রাশেদীন (রা) নিজেরা স্বয়ং বড় ‘আলিম, ফকীহ ও ফতওয়া দানের অধিকারী ছিলেন। তাই তাদের কদাচিৎ কোন বিশেষ অবস্থায় অন্য কোন জ্ঞানী ও বিজ্ঞ সাহাবা (রা)-এর দ্বারস্থ হবার প্রয়ােজন হ’ত। ফলে ‘আলিম সাহাবীরা পারলৌকিক “ইলম-এর মধ্যেই ডুবে ছিলেন। যদি কখনও কোন ফতওয়া এসে উপস্থিত হত তাহলে তাঁরা এ ব্যাপারে প্রয়ােজনীয় ব্যবস্থা অবলম্বনের জন্য নিজেদের মধ্যে যােগ্যতর ব্যক্তিকেই অগ্রাধিকার দিতেন এবং নিজেরা সার্বক্ষণিকভাবে আল্লাহর ধ্যানে নিবিষ্ট থাকতেন। যখন সে সব লােকের পালা আসল যারা খিলাফতের হকদার বা যােগ্য ছিলেন না এবং যাদের ভেতর কোন বিষয়

ফয়সালা করার বা ফতওয়া দেবার যােগ্যতা ছিল না তখন থেকেই ‘উলামায়ে | কিরামের প্রত্যক্ষ সাহায্য-সহযােগিতার প্রয়ােজন দেখা দেয়। অযােগ্য শাসকরা ‘আলিমদের নিজেদের সঙ্গে রাখতে শুরু করে যাতে তাদের থেকে ফতওয়া লাভ করা যায়। তাবি’ঈ’ আলিমদের ভেতর তখনও এমন লােক | জীবিত ছিলেন যারা প্রাচীন ভাবধারার অনুসারী ছিলেন এবং যাদের ভেতর দীনের হাকীকত ও প্রাচীন বুযুর্গদের শান জাগরূক ছিল। যখন তাদেরকে ডাকা হ’ত তখন তারা শাসকদের এড়িয়ে চলতেন এবং তাদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতেন। তাই খলীফারাই বাধ্য হয়ে (বনী উমায়্যা ও বনী ‘আব্বাস) তাদেরকে খুঁজে বের করতেন। সে যুগের মানুষ যখন ‘উলামাদের এই শান। | (প্রভাব ও মর্যাদা) প্রত্যক্ষ করল তখন তারা ধরে নিল যে, ফিক্‌হ (ইসলামী

আইন ও বিধি-বিধান) সম্পর্কিত জ্ঞানই হচ্ছে সম্মান ও পদমর্যাদা লাভের | সর্বোত্তম মাধ্যম। এর দ্বারা শাসকবর্গের নৈকট্য, ফতওয়া ও বিচার বিভাগীয়

পদ লাভ করা যায়। ব্যস! তারা সকলেই শুধু ফিকহশাস্ত্রের দিকে মনােনিবেশ করল এবং উচ্চ পদের লােভে নিজেদের শাসকবর্গের সামনে পেশ করল। এ প্রচেষ্টায় কতক লােক সফল হ’ল, আবার কতক লােক কিছুই পেল না। যারা কিছুই পেল না তারা তাে ইহলােক-পরলােকে ক্ষতিগ্রস্ত হ’ল। আর যারা কিছু পেল, সম্মান প্রার্থী হবার কারণে তারাও হীন হ’ল। ফল দাঁড়াল এই যে, যে ‘উলামা ছিলেন সকলের কাজিত, মুখাপেক্ষীহীনতার কারণে ছিলেন সম্মানিত। ও শ্রদ্ধেয়, দুনিয়াদারদের দিকে লক্ষ্য ও মনােযােগ দেবার কারণে হয়ে গেলেন। হেয় ও লাঞ্ছিত। অবশ্য এই সামগ্রিক অবস্থার মধ্যেও প্রতিটি যুগেই আল্লাহ্র কিছু সংখ্যক বান্দার মধ্যে এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম লক্ষ্য করা গেছে।

সেই সমস্ত যুগে সর্বাধিক গুরুত্ব ও মনােযােগ ছিল ইসলামী বিধি-বিধান ও ফতওয়ার দিকে। অবশ্য রাষ্ট্রীয়, সামাজিক ব্যবস্থাপনা ও মামলা-মােকদ্দমার ক্ষেত্রে এর প্রয়ােজনও ছিল। অতঃপর ইসলামী উসূল ও আকীদার প্রতিও কোন কোন শাসকের আকর্ষণ সৃষ্টি হয়। তাদের আগ্রহ জন্মে প্রতিটি পক্ষের দলীল-প্রমাণ ও পারস্পরিক আলােচনা শুনবার এবং তাদের বাহাছ-মুবাহাছার দৃশ্য দেখবার। মানুষ যখন শাসকদের এই রুচি ও স্বাদের ব্যাপারটা জানতে পারল তখন তারা “ইলমে কালামের প্রতিও ঝুঁকে পড়ল। গ্রন্থকাররা এ বিষয়ের ওপর ভূরি ভূরি কিতাব লিখলেন এবং পারস্পরিক বিতর্ক প্রতিযােগিতার মূলনীতি ও নিয়ম-কানুন প্রণয়ন করলেন, জন্ম দিলেন তারা যুক্তি-প্রমাণ রদকারী এবং প্রতিপক্ষের ওপর সমালােচনা বাণ নিক্ষেপকারীএকটি শাস্ত্রের। তাদের ভাষায়, এর দ্বারা তাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল, কর্মের অনুকলে প্রতিরােধ সৃষ্টি, সুন্নাহর সাহায্য ও সমর্থন এবং বিদ’আতের বিরােধিতা ও মুলােৎপাটন। তাদের এ বক্তব্য তাদের পূর্বসূরীদের বক্তব্যেরই অনুরূপ। পূর্বসূরীরা বলত, ফতওয়ার ক্ষেত্রে তাদের লিপ্ত হওয়ার উদ্দেশ্য কেবল দীন ও খালুকের খিদমত তথা ধর্ম ও সৃষ্টির সেবা ও কল্যাণ সাধন। অতঃপর দেখা গেল, কোন কোন শাসক ইলমে কালাম ও বিতর্ক অনুষ্ঠান পসন্দ করছেন না। তাঁদের মতে এর দ্বারা পক্ষপাতিত্ব, ঝগড়া-বিবাদ এবং কোন কোন সময় রক্তারক্তির ন্যায় অনেক অনাসৃষ্টি কাণ্ড ঘটে যায়। অবশ্য ফিকহী আলােচনা ও বিতর্কের প্রতি ঐ সব শাসকের অন্তরের টান ছিল, বিশেষ করে একটি ব্যাপারে তাদের আগ্রহের মাত্রা বেশী ছিল যে, ইমাম আবু হানীফা (র) ও ইমাম শাফিঈ (র)-এর মহাবই অধিকতর সঠিক। এতদৃষ্টে মানুষ কালাম ও ‘আকাইদশাস্ত্রের মাধ্যমে ইখতিলাফী মসলা-মাসাইল, বিশেষ করে ইমাম আবু হানীফা (র) ও ইমাম শাফিঈ (র)-এর মতভেদমূলক বিষয়গুলােকে আলাপ-আলােচনার বিষয়ে পরিণত করল এবং ইমাম মালিক (র), ইমাম সুফিয়ান ছাওরী ও ইমাম আহমদ (র) প্রমুখের মযহাব ও মতভেদগুলােকে উপেক্ষা করল এজন্য যে, এঁদের মতানৈক্যগুলাের প্রতি শাসকবর্গের কোন আকর্ষণ নেই। তাদের বক্তব্য ছিল, তাদের ভাষায় এ ক্ষেত্রেও তাদের উদ্দেশ্য শরীয়তের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিষয়গুলাের প্রকাশ, মযহাবের বিভিন্ন কার্যকারণ বর্ণনা এবং ফতওয়ার মূলনীতি প্রণয়ন ও সংকলন। এ বিষয়ে তারা প্রচুর বই-পুস্তক লেখেন, মসলা-মাসাইল খুঁজে বের করেন এবং তর্কশাস্ত্র ও পুস্তক প্রণয়নের ক্ষেত্রে উন্নতি সাধন করেন। এই ধারা এখনাে অব্যাহত আছে। সংক্ষেপে বলতে গেলে, মতবাদমূলক মসলা-মাসাইল ও পারস্পরিক বিতর্ক অনুষ্ঠানের প্রতি আলিমদের আকর্ষণ এবং এর প্রতি নিমগ্নতার কারণ তাই ছিল যার বর্ণনা আমরা এই মাত্র দিলাম। যদি দুনিয়াবাসী ও ক্ষমতাসীন ব্যক্তিবর্গ (ইমাম আবু হানীফা ও ইমাম শাফিঈ ভিন্ন) অন্য কোন ইমাম অথবা (ইখতিলাফী মসলা-মাসাইল ও বিতর্ক অনুষ্ঠান ভিন্ন) অন্য কোন বিদ্যার প্রতি আকর্ষণ বােধ করে তা হলে আমার বিশ্বাস ‘আলিমরাও সেদিকে ঝুঁকে পড়বে এবং পড়ার কারণ হিসাবে বলবে যে, তাদের উদ্দেশ্য ইলমে দীন ও আল্লাহর নৈকট্য লাভ ব্যতিরেকে অন্য কিছু নয়।

মনসুর হাল্লাজ এর কাহীনী পড়তে এখানে ক্লিক করুন।

অতঃপর ইমাম গাযালী (র) বিস্তারিতভাবে তর্ক-বিতর্ক ও আলােচনাসমালােচনার নৈতিক ও আধ্যাত্মিক ক্ষয়ক্ষতির দিকগুলাে বর্ণনা করেন। তিনি দীর্ঘ দিন এই ক্ষেত্রে একজন কৃতবিদ্য পুরুষ ছিলেন। তার বর্ণনা চাক্ষুষ সাক্ষ্যের মর্যাদা রাখে এবং তা ছিল প্রত্যক্ষ জ্ঞান ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ওপর প্রতিষ্ঠিত।

অবশ্য এ ব্যাপারে একটি বড় ভ্রম পরিলক্ষিত হ’ত এবং তা ছিল শব্দসম্পর্কিত। ইমাম গাযালী (র)-এর যুগের প্রচলিত জ্ঞান- সেগুলাের বিকৃত রূপ ও কাঠামাের জন্য যে সব শব্দ শিরােনামের কাজ দিত সেগুলাে ছিল ঐ সব প্রাচীন। বুযুর্গদের জীবন-চরিতে ব্যাপকভাবে প্রচলিত। দৃষ্টান্তস্বরূপ, ইখতিলাফী মসলামাসাইল ও ফিকহের ক্ষেত্রে কদাচিৎ ঘটে এমন সব খুঁটিনাটি ও সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিষয়ের জন্য বিনা দ্বিধায় “ফিক্হ” শব্দের ব্যবহার চলত আর সব ধরনের জ্ঞান সম্পর্কিত কায়কারবার এবং শরীয়তসম্মত ও শরীয়তবিরােধী “ইলমের জন্য। ঢালাওভাবে ব্যবহৃত হত “ইলম শব্দটি। ইলমে কালাম ও দার্শনিকসুলভ আলােচনাকে “তাওহীদ” নামে অভিহিত করা হত। আগা-মাথাহীন ভাসা ভাসা কথার ফুলঝুরি ছড়ানাে বর্ণনাকে “তায কীর” আখ্যা দেওয়া হত। সব ধরনের ঠিকানা-পরিচয়হীন পেঁচালাে রচনাভঙ্গিকে বলা হত “হিকমত”। অতঃপর ঐ সব স্বনির্মিত কার্যকলাপ ও কাজকারবারের ওপর সেই সব ফযীলতের ছাপ মারা হ’ত যা কুরআন ও হাদীছে ঐ সব শব্দ সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে। উদাহরণত, ফিকাহ-এর এই বিকৃত রূপ ও কাঠামাের (কেবল মতভেদ ও খুঁটিনাটি বিষয়গুলাের জন্য) ফযীলত বর্ণনায় কুরআন মজীদের আয়াত ।

এবং হাদীছ ৩১ ৩ul issu-এর দর্শন ও পঞ্চম শতাব্দীর ইলমে কালামের ফযীলত বর্ণনায় । ।

kils: -এর খােশ খবর, মূর্খ জাহিল ও আল্লাহভীতিহীন ওয়াইজ ও বক্তাদের সাধারণ ওয়াজ-নসীহতের ফযীলত বর্ণনায় ৫ i ka এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য আয়াত কারীমা ও হাদীছে রাসূল (সা) উদ্ধৃত করা হত। ইমাম গাযালী (র) এই বিভ্রান্তির পর্দা উন্মোচন করেন এবং বিস্তারিতভাবে বলেন যে, এই শব্দসমষ্টি তার আসল হাকীকত খুইয়েছে এবং তা প্রকৃত অর্থ ও মর্ম থেকে অনেক দূরে সরে পড়েছে। ইসলামের প্রথম যুগে এ সবের যে অর্থ ও মর্ম ছিল তার সাথে ‘আলিমদের বর্ণিত অর্থ ও মর্মের কোন সম্পর্ক নেই।

দ্বিতীয় যে কারণটি ইমাম গাযালী (র) -এর মতে এই পৃথিবীব্যাপী ফিতনা-ফাসাদ, নৈতিক ও চারিত্রিক অধঃপতন এবং ধর্মীয় অধঃগতির যিম্মাদার ছিল তা হচ্ছে সরকারী কর্মচারী, সুলতান ও তার আমীর-উমারার কার্যকলাপ। ইমাম গাযালী (র)-এর দু’শ’ বছর আগে হযরত আবদুল্লাহ ইবন মুবারক (র) উল্লিখিত দু’টি শ্রেণী (‘আলিম-উলামা তথা পণ্ডিতমণ্ডলী ও শাসকবর্গ)-কেই। ধর্মের বিকৃতি সাধনকারী হিসাবে অভিহিত করেছিলেন।

وهل افسد الدين الا الملوك واحبار سوء ورهبانها.

ইমাম গাযালী (র) এমন একটি যুগে উল্লিখিত দুটি শ্রেণীকে পরিপূর্ণ সাহসের সঙ্গে স্বাধীনভাবে সমালােচনার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেন যখন বাদশাহ ছিলেন একচ্ছত্র কর্তৃত্বের অধিকারী এবং সব ধরনের আইন-কানুন ও বিধি-নিষেধের উর্ধে। তখন বাদশাহর প্রতি সমালােচনা বাণ নিক্ষেপ করা ছিল মৃত্যুকে সাদর হাতছানি দেবারই নামান্তর। তার যুগে বাদশাহের উপহার, দান ও পেশকৃত লােভনীয় প্রস্তাব কবুল করাই ছিল সাধারণ রেওয়াজ। ইমাম গাযালী (র) বাদশাহ ও শাসকবর্গের ধন-সম্পদকে নাজায়েয ও হারাম বলে ঘােষণা করেন। এক স্থানে তিনি লিখেছেন :

اغلب اموال السلاطين حرام في هذه الاعمار والهلال في أيديهم معدوم او عزيز |

বাদশাহদের ধন-সম্পদ এ যুগে সাধারণভাবে হারাম। হালাল ধন-সম্পদ

তাদের নিকট হয়ই না আর হলেও পরিমাণে খুব কম। তিনি অন্যত্র লিখেছেন :

ان اموال السلاطين في عصرنا حرام كلها او اكثرها – وكيف لا والحلال هو الصدقات والتين والغنيمة ولا وجود لها وليس بدخل منها في بد السلطان ولم يبق الا الجزية وانهاتوخذ بانواع من الظلم لا يحل اخذها به فانهم بجاوزون حدود الشرع في المأخوذ والماخوذ منه والوفاء له بالشرط ثم اذا نسب اليهم من الخراج المضروب علي المسلمين ومن المصادرات و الرشاد صنوف الظلم لم يبلغ عشر معشار عشيرة .

সুলতান তথা শাসকদের ধন-সম্পদ আমাদের যুগে হয় সবটাই হারাম নতুবা এর বৃহত্তম অংশ। আর এর মধ্যে আশ্চর্যের কিছু নেই। কেননা তাদের হালাল মাল বলতে যাকাত, যুদ্ধলব্ধ সম্পদ (মালে গনীমত) অথবা বিনা যুদ্ধে লব্ধ সম্পদই বােঝাত, অথচ আজ কোথাও এর অস্তিত্ব নেই। এসবের কিছুই বাদশাহু পর্যন্ত পৌঁছে না। এখন বাকি থাকল শুধু জিয়া। আর জিয়ার অবস্থা

এই যে, তা নানান অত্যাচার ও নির্যাতনের মাধ্যম আদায় করা হয় যা আদৌ জায়েয নয়। সরকারী কর্মচারীরা শরীয়তের নির্ধারিত সীমা লংঘন করে থাকে। মালের পরিমাণের ক্ষেত্রে যেমন শরীয়তের বিধান মেনে চলা হয় না, তেমনি যিম্মী, যাদের থেকে জিযয়া উসুল করা হয়, তাদের ক্ষেত্রেও শরঈ বিধানের তােয়াক্কা করা হয় না। মুসলমানদের ওপর নির্ধারিত রাজস্বও

যবরদস্তিমূলকভাবে আদায় করা হয়। ইমাম গাযালী (র) আরও এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে লিখেছেন :

“যুগের সুলতান থেকে সেই অর্থ কবুল করাটাও সমীচীন নয়, যে অর্থ সম্পর্কে এই ধারণাই বেশী যে, তা সন্দেহমুক্ত ও জায়েয নয়। কেননা এর মধ্যে বহু ধর্মীয় বিপর্যয় (লুকিয়ে) রয়েছে। অবশ্য এক্ষেত্রে অতীত যুগের দৃষ্টান্ত পেশ করা হয়। এবং বলা হয় যে, প্রাচীন বুযুর্গদের মধ্য থেকে কোন কোন ‘আলিম ও সালিহ (জ্ঞানী, সৎ ও সত্যনিষ্ঠ) ব্যক্তি স্বীয় যুগের খলীফা ও সুলতানের পেশকৃত উপহার-উপঢৌকনের প্রস্তাব কোন কোন সময় কবুল করেছেন। তাই ইমাম গাযালী এ যুগ ও সে যুগের রাজা-বাদশাহ ও সুলতানদের অবস্থার পার্থক্য নিম্নভাবে বর্ণনা করেছেন :

প্রথম যুগের জালিম সুলতানদের অন্তরে খুলাফায়ে রাশেদীনের খিলাফত যুগের নৈকট্যের কারণে জুলুম ও নির্যাতনমূলক আচরণের কিছুটা অনুভূতি ছিল। উপরন্তু তারা সাহাবায়ে কিরাম ও তাবিঈদের অন্তর জয় ও নিজেদের দিকে তাদের দৃষ্টি আকৃষ্ট করবার চেষ্টা করত এবং এমন ধরনের ব্যবহার করত যাতে তারা কোন না কোনভাবে তাদের উপহার-উপঢৌকন ও পুরস্কারাদি গ্রহণ করেন। তারা তাদের নিকট এসব অর্থ ও নযরানা না চাইতেই এবং তাদের শান ও মর্যাদার ওপর কোনরূপ কটাক্ষ না করেই পাঠাত। শুধু তাই নয়, তারা তাদের প্রদত্ত উপহারাদি গ্রহণ করার কারণে কৃতজ্ঞও থাকত এবং আনন্দ প্রকাশ করত। ঐ সব বুযুর্গও এসব উপহার গ্রহণ করে সঙ্গে সঙ্গে তা সাধারণ্যে বণ্টন করে দিতেন। তাঁরা সুলতানদের নিয়ত ও লক্ষ্যের দিকে দৃকপাত করতেন না, তাদের সঙ্গে কোন অন্যায় কাজে সহযােগিতাও করতেন না এবং তাদের দরবারে মুলাকাতের উদ্দেশ্যে গমনও করতেন না। তারা দীর্ঘায়ু হােন, প্রকাশ্যে তারা এ ধরনের কোন কামনাও করতেন না, বরং তারা জালিম শাসকদের ব্যাপারে প্রকাশ্যে বদদু’আ করতেন। তাদের সম্পর্কে স্বাধীনভাবে মতামত ব্যক্ত করতেন এবং তাদের মুখের ওপর তাদের শরীয়তবিরুদ্ধ কাজের তারা সমালােচনা করতেন।তাই ঐ সব গ্রহণ তাঁদের জন্য অবৈধ ছিল না। অপর দিকে আজকের সুলতানগণ সেই সব লােককেই মুক্ত হস্তে দান করেন যাদের সম্পর্কে তাদের ধারণা যে, তাদের থেকে যে কোন ব্যাপারে সমর্থন আদায় করা যাবে, তাদের পৃষ্ঠপােষকতা পাওয়া যাবে, উপরন্তু তাদের দ্বারা দরবার ও মজলিসের রওনকও বৃদ্ধি পাবে। সর্বোপরি তারা সব সময় তাদের জন্য দু’আ করবে, | প্রশংসা কীর্তন করবে এবং সাক্ষাতে-অসাক্ষাতে তাদের তারীফ ও গুণপনা | বর্ণনায় মেতে থাকবে। অর্থাৎ এই ক্ষেত্রে প্রথম স্তর শাসকদের কাছে নিজেদের মর্যাদাকে হেয় করা; দ্বিতীয়, তাদের খেদমতের জন্য আনাগােনা; তৃতীয়, তাদের প্রশংসা কীর্তন ও তাদের জন্য দু’আ প্রার্থনা; চতুর্থ, তাদের ন্যায়-অন্যায় উদ্দেশ্য হাসিলে সহায়তা করা; পঞ্চম, তাদের ভাড়ামি করা, তাদের প্রতি ভালবাসা প্রকাশ এবং প্রতিদ্বন্দীর মুকাবিলায় তাদের সাহায্য-সহযােগিতা করা; ষষ্ঠ, তাদের জুলুম ও কুকর্ম ঢেকে রাখা। যদি কোন ব্যক্তি এগুলাের কোন একটি করতেও সম্মত না হন তাহলে তিনি ইমাম শাফিঈ (র)-এর ন্যায় মরতবা ও মর্যাদার অধিকারী হলেও এই সব সুলতান তার জন্য একটি পয়সাও ব্যয় করতে রাযী হবে না। এজন্যই বর্তমান যুগে এই সব বাদশাহর থেকে কোন ধন-সম্পদ গ্রহণ করা জায়েয হবে না। কেননা এর পরণতি তাই হবে যার উল্লেখ ওপরে করা হয়েছে। এখন যদি কেউ ঐ সব সুলতানের অর্থ-সম্পদ সাহসিকতার সংগে কবুল করে এবং নিজের পক্ষে সাহাবী ও তাবিঈদের নজীর পেশ করে তাহলে আসলে সে ফেরেশতাদেরকে একজন কর্মকারের সঙ্গে তুলনা করল। কেননা এই অর্থ সম্পদ কবুল করার পর সুলতানদের সঙ্গে তার মেলামেশার এবং পারস্পরিক ঘনিষ্ঠতা ও বন্ধুত্ব স্থাপনের প্রয়ােজনীয়তা দেখা দেবে, তাদেরকে তার সমীহ করে চলতে হবে, তাদের (নিয়ােজিত) কর্মকর্তা ও শাসনকর্তৃত্বে আসীন কর্মচারীদের সেবা করতে হবে এবং তাদের সম্মুখে মস্তকাবনত হয়ে চলতে হবে। অতঃপর তাদের প্রশংসা কীর্তন এবং তাদের দরবারে হাযিরা দেওয়া ছাড়া তার কোন গত্যন্তর থাকবে না। আর এ সবই পাপ ও অন্যায়। | হ্যা, যদি কেউ শাহী অর্থের ভেতর থেকে একটা অংশ কবুল করে যা হালাল এবং সে তার হকদার এবং ঐ অর্থ তার নিকট ঘরে বসে থাকা অবস্থায়ই আসে, কোন শাসক কিংবা অনুচরের সন্ধান ও খিদমত এবং ঐ সব সুলতান ও শাসকের প্রশংসা-কীর্তন ও সাক্ষ্য-প্রমাণেরও প্রয়ােজনীয়তা দেখা না দেয়, তাদেরকে সাহায্য ও সমর্থন দিতে হবে-এমন শর্তাদিও না থাকে, তাহলে