Select Page
আবু হামিদ আল-গাজ্জালী (রহঃ)

আবু হামিদ আল-গাজ্জালী (রহঃ)

আবু হামিদ আল-গাজ্জালীঃ ইমাম গাযালী (র)-এর নাম মুহাম্মাদ। ডাকনাম আবু হামেদ। পিতার নামও মুহাম্মাদ ছিল। তুস জেলায় ৪৫০ হিজরীতে তাহিরান নামক স্থানে জন্মগ্রহণ করেন। পিতার ওসিয়ত মুতাবেক তাঁর এক বন্ধু—যিনি একজন একনিষ্ঠ ‘ইলম-দোস্ত ও সূফী গরীব মুসলমান ছিলেন-তাঁর শিক্ষার বন্দোবস্ত করতে অক্ষমতা প্রকাশ করেন এবং তাকে কোন মাদরাসায় ভর্তি হবার পরামর্শ দেন। অনন্তর তিনি একটি মাদরাসায় ভর্তি হয়ে শিক্ষা অর্জনে আত্মনিয়ােগ করেন।

ইমাম গাযালী (র) স্বদেশে শায়খ আহমাদ আর-রাযেকানীর নিকট থেকে শাফিঈ মযহাবের ফিকাহশাস্ত্রে তা’লীম হাসিল করেন। এরপর জর্দানে ইমাম আবু নসর ইসমাঈলীর নিকট পড়াশুনা করেন। এরপর নিশাপুর গিয়ে ইমামুল হারামায়নের মাদরাসায় ভর্তি হন এবং অতি অল্পদিনেই তিনি তার ৪০০ সহপাঠীর মধ্যে একটি বিশিষ্ট আসন লাভ করেন। শেষ পর্যন্ত তিনি তাঁর খ্যাতিমান উস্তাদের সহযােগী (নায়েব)-তে পরিণত হন, এমন কি ইমামুল-হারামায়ন তার সম্পর্ক বলতেন, “গাযালী (র) হলেন গভীর সমুদ্র।” ইমামুল-হারামায়ন-এর ইনতিকালের পর তিনি নিশাপুর থেকে বহির্গত হন। সে সময় তাঁর বয়স ছিল ২৮ বছর, অথচ তখনাে তাকে বড় বড় বর্ষীয়ান ‘উলামা’র চেয়ে অধিকতর বিশিষ্ট ও কামালিয়তের অধিকারী মনে করা হত।

এর পর ইমাম গাযালী (র) নিজামুল-মুলকের দরবারে যান। তাঁর খ্যাতি ও বিশেষ যােগ্যতার কারণে নিজামুল-মুলক তাকে অত্যন্ত ভক্তি ও শ্রদ্ধা সহকারে দরবারে গ্রহণ করেন। এখানে ছিল দুর্লভ রত্নসম। জ্ঞানী-গুণীদের সমাবেশ। জ্ঞানের আলােচনা ও ধর্মীয় মুনাজারা (বিতর্ক) তখনকার দরবার, মজলিস, এমন কি বিবাহানুষ্ঠান ও শােক সভারও একটি অপরিহার্য অঙ্গ ছিল। ইমাম গাযালী (র) যাবতীয় বিতর্ক আলােচনায় সকলের ওপর জয়ী হতেন। তাঁর অতুলনীয় যােগ্যতাদৃষ্টে নিজামুল-মুলক তাঁকে নিজামিয়া মাদরাসার অধ্যক্ষ হিসাবে মনােনীত করেন, যা ছিল সে যুগে একজন ‘আলিমের জন্য সম্মান ও মর্যাদার সর্বোচ্চ সােপান। সে সময় গাযালীর বয়স ৩৪ বছরের বেশী ছিল না।Imam Ghazali

৪৮৪ হিজরীতে তিনি বিরাট শান-শওকতের সঙ্গে বাগদাদে প্রবেশ করেন এবং নিজামিয়ায় পাঠ দান শুরু করেন। অল্পদিনেই তাঁর যােগ্য শিক্ষকতা, উত্তম আলােচনা ও জ্ঞানের গভীরতার কথা সারা বাগদাদে ছড়িয়ে পড়ে। ছাত্র- শিক্ষক ও জ্ঞানী-গুণী তার বিদ্যাবত্তা থেকে উপকৃত হবার জন্য চতুর্দিক থেকে নিজামিয়ায় এসে ভীড় জমাতে লাগল। তার দরূস-মাহফিল গােটা মনুষ্যকুলের লক্ষ্যস্থলে পরিণত হয়। তিন শ’র মত সমাপ্ত পর্যায়ের ছাত্র, শত শত আমীর-উমারা’ ও রঈস এতে শরীক হতেন। ক্রমে ক্রমে তার উন্নত মস্তিষ্ক ও মেধা, ইলমী ফযীলত ও শক্তিশালী ব্যক্তিত্ব বাগদাদে এমন প্রভাব-প্রতিপত্তি সৃষ্টি করে যে, তিনি সাম্রাজ্যের নেতৃস্থানীয় সদস্যবর্গের সমমর্যাদা লাভ করেন।

তাঁর সম্পর্কে তাঁর সমসাময়িক শায়খ আবদুল গাফির ফারসী বলেন, “তার জাকজমক ও আড়ম্বরের সামনে আমীর-উমারা’, উযীর, এমন কি স্বয়ং দরবারে খিলাফতের শান-শওকত পর্যন্ত নিষ্প্রভ হয়ে যায়। এমনি সময়ে ৪৮৫ হিজরীতে তাকে ‘আব্বাসী খলীফা মুক ‘তাদী বিল্লাহ মালিক শাহ সালজুকীর বেগম তুর্কান খাতুনের নিকট (যিনি সে সময় সাম্রাজ্যের হর্তা-কর্তা ছিলেন) স্বীয় দূত বানিয়ে পাঠান। খলীফা মুক ‘তাদী বিল্লাহর স্থলাভিষিক্ত খলীফা মুস্তাজহির ইমাম গাযালী (র)-এর সঙ্গে বিশেষ সম্পর্ক রাখতেন এবং তার একনিষ্ঠ ভক্ত ও অনুরক্ত ছিলেন। তারই নির্দেশে ইমাম গাযালী (র) বাতেনী মতবাদের বিরুদ্বে কিতাব লিখেন এবং খলীফার সঙ্গে সম্পর্কিত করে এর নাম রাখেন ‘মুস্তাজহিরী।

এগার বছরের চলমান জীবন এবং এর অভিজ্ঞতা:

এই চরম উন্নতি ও উত্থানের স্বাভাবিক দাবি ছিল যে, ইমাম গাযালী (র) এতে তৃপ্তি লাভ করবেন এবং এই বৃত্তের মাঝেই তিনি তার গােটা জীবন কাটিয়ে দেবেন, যেমনটি তার কতক উস্তাদ করেছেন। কিন্তু তার অস্থির স্বভাব ও প্রকৃতি, উন্নত মনােবল, দুরন্ত সাহসিকতা উন্নতির এই চরম পর্যায়েও তাকে সন্তুষ্ট ও তৃপ্ত রাখতে পারেনি। প্রকৃতপক্ষে এই উন্নত মনােবল ও হিম্মতই তাঁকে ইমাম’ ও ‘হুজ্জাতুল-ইসলাম বানিয়েছিল। দুনিয়াতে জাঁকজমক, আড়ম্বর, সম্মান ও পদবীর কুরবানী এবং স্বীয় উদ্দেশ্যের প্রতি একাগ্রতা ও সত্যের প্রতি আকর্ষণের এমন দৃষ্টান্ত বিরল। ইমাম গাযালী (র) স্বয়ং সেসব অবস্থা ও কার্যকারণ বর্ণনা করেছেন যা তাকে এমন পদক্ষেপ গ্রহণে উৎসাহিত ও উদ্বুদ্ধ করেছিল এবং যা তাকে টেনে বের করেছিল শিক্ষা ও দরস প্রদানের কাজ থেকে। যা হােক, শেষ পর্যন্ত তিনি জ্ঞান রাজ্যের বাদশাহী ছেড়ে নিশ্চিত জ্ঞান ও ইন্দ্রিয়াতীত সম্পদের তালাশে বেরিয়ে পড়েন এবং স্বীয় লক্ষ্যে কামিয়াবী লাভ করেন। ‘Al-Munkiju Minaddalal” নামক গ্রন্থে তিনি এ সম্পর্কে লিখেছেন :- বিস্তারিত পড়তে এখানে ক্লিক করুন।

To read Imam Gazzali Biography in English CLICK here

মনসুর হাল্লাজ এর জীবনী-বানী-কারামত ও কালাম-হযরত-মানসুর আল–হাল্লাজ

মনসুর হাল্লাজ এর জীবনী-বানী-কারামত ও কালাম-হযরত-মানসুর আল–হাল্লাজ

হযরত হুসাইন মনসুর হাল্লাজ (রহ:)আধ্যাত্বিক জগতের আলোড়ণ সৃষ্টিকারী এক বিস্ময়কর মহাপুরুষ ছিলেন। তাঁর পাণ্ডিত্য ও বাগ্মিতা ছিল যেমন অসাধারণ, তার আধ্যাত্বিক চেতনাও তেমনি ছিল অপরিসীম। তিনি বহু গ্রন্থ রচনা করেছেন । কিন্তু বক্তব্য বিষয়ের গুঢ়ার্থ ছিল দুর্বোধ্য। এবাদতে তাে কথাই নেই। তাঁর আল্লাহ্ প্রেমেরও কোন তুলনা ছিল না। আল্লাহ প্রেমে তিনি ছিলেন নিয়ত অস্থির। আল্লাহর বিরহানলে তিনি দগ্ধ হয়েছেন দিন রাত। আর এজন্য জীবনে কষ্টও পেয়েছেন প্রচুর। শেষ পর্যন্ত নিজের অমূল্য প্রাণ উৎসর্গ করেছেন। আল্লাহর ওয়াস্তে মানুষের হাতে।

মনসুর হাল্লাজ

মানুষ তার কাজকর্মে বিরক্ত হতেন। তার বহু কাজে আপত্তি ছিল সুফী দরবেশগণেরও। তারা সে সবের প্রতিবাদ করতেন। তার চলাফেরা, কথাবার্তার মর্ম উপলদ্ধি করতে না পেরে তারা বলতেন, তাসাওউফে তাঁর কোন দখল নেই। অবশ্য হযরত আবদুল্লাহ খাফীফ রহমাতুল্লাহ, হযরত শিবলী রহমাতুল্লাহ, হযরত আবুল কাসেম নসরাবাদী রহমাতুল্লাহ, ইবনে আতা রহমাতুল্লাহ প্রমুখ প্রখ্যাত তাপসগণ তাকে উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন দরবেশ বলে মনে করতেন। আবার অনেকে তাঁকে কাফের বলেছেন। তাঁর ওপর অত্যাচার করেছেন। অনেকে বলেন, তিনি ছিলেন ইত্তেহাদী। সৃষ্টি ও স্রষ্টার মধ্যে কোন পার্থক্য দেখতে পেতেন না। মূলত এই গঢ়তত্ত্ব সাধারণ মানুষের বােধগম্য নয়। বাগদাদের কিছু লােক হাল্লাজী বা তাঁর অনুসারী বলে দাবী করতেন আর নানা অপকর্মে লিপ্ত হতেন।

‘আনাল হক’

তিনি একবার বলেছিলেন ‘আনাল হক’। অর্থাৎ আমিই আল্লাহ। তার ওপর যে অকথ্য জুলুম হয়, তার কারণই হল এ উক্তি। কিন্তু বর্তমান গ্রন্থকার হযরত ফরীদ উদ্দীন আত্তার রহমাতুল্লাহ বলেন, আমি এটাকেই অত্যন্ত আশ্চর্য মনে করি যে, হযরত মূসা (আঃ) যখন তুর পর্বতে আল্লাহর জ্যোতি দর্শন করেন, তখন গাছ থেকে ইন্নী আনাল্লাহ’ নিশ্চয় আমি আল্লাহ এই শব্দ শােনা গিয়েছিল। বলা হয়, এ আওয়াজ ছিল স্বয়ং আল্লাহর, গাছের নয় । তা হলে হযরত মানসুর হাল্লাজের রহমাতুল্লাহ মুখ থেকে যখন ‘আনাল হক’ কথাটি বের হয়, তখন কেন বলা হবে না তার মুখের বাণীটি আসলে আল্লাহর বাণী। হযরত হুসাইন মানসুর হাল্লাজের রহমাতুল্লাহ মুখের কথা নয়। হযরত ফরীদ উদ্দীন আত্তার রহমাতুল্লাহ আরও বলেন, তাঁর বেলায়ও তাে বলা যেতে পারে যে, তার জবানে খােদ আল্লাহই ‘আনাল হক” কথাটি উচ্চারণ করেছেন। এটি হযরত হাল্লাজ রহমাতুল্লাহ-এর কথা নয়। তিনি নিজে আল্লাহ হওয়ার দাবীও করেননি।

হযরত শায়খ ফরীদ উদ্দীন আত্তার রহমাতুল্লাহ বলেন, বাগদাদ শহরে হুসাইন মনসুর নামে এক জাদুকর ছিল, কেউ কেউ তার সঙ্গে তাপসকে গুলিয়ে ফেলেছেন। আসল ঘটনা কিন্তু অন্য রকম। জাদুকরের জন্ম ওয়াসেত শহরে আর মনসুর হাল্লাজ রহমাতুল্লাহ বাস করতেন বাগদাদে । যাই হােক, হযরত আবদুল্লাহ খফীফ বলেন, হুসাইন মনসুর রহমাতুল্লাহ আল্লাহর মারেফাতে জ্ঞানী ছিলেন। হযরত শিবলী রহমাতুল্লাহ বলেন, হযরত মনসুর হাল্লাজ রহমাতুল্লাহ ও আমি- আমরা দুজন একই অবস্থার লােক। পার্থক্যটুকু এই যে, আল্লাহর দাবীদার মনে করে মানুষ তাকে ধ্বংস করেছে, আর আমাকে পাগল মনে করে দূর করে দিয়েছে। | হযরত মনসুর হাল্লাজ রহমাতুল্লাহ-এর সঠিক জন্মস্থান জানা যায় না। তবে তার বাল্য ও কৈশাের অতিবাহিত হয় বাগদাদে। আঠারাে বছর বয়সে তিনি ততরে চলে যান। সেখানে হযরত আবদুল্লাহ তশতরী রহমাতুল্লাহ-এর সংস্পর্শে দু’বছর কাটান। তারপর বসরা। বসরা থেকে দাওহারকা। সেখানে হযরত আমর ইবনে ওসমান মক্কী রহমাতুল্লাহ-এর সাহচার্যে আসেন। আর এখানেই তিনি বিবাহ করেন। হযরত ইয়াকুব আতা রহমাতুল্লাহ-এর কন্যাকে। অতঃপর হযরত ইয়াকুব রহমাতুল্লাহ-এর সঙ্গে মনােমালিন্য হওয়ায় তিনি বাগদাদে হযরত জুনায়েদ রহমাতুল্লাহ-এর দরবারে চলে আসেন। এখানে বেশ কিছুদিন কাটিয়ে তিনি চলে যান মক্কায়। সেখানে এক বছর কাটান। তারপর একদল সুফী সাধকের সঙ্গে তিনি আবার বাগদাদে আসেন। এই সময় তিনি হযরত জুনায়েদ বাগদাদী রহমাতুল্লাহ-এর কাছে একটি জটিল মাসআলার উত্তর জানতে চান। কিন্তু হযরত জুনায়েদ রহমাতুল্লাহ তার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে বললেন, তুমি কুব শীঘ্রই ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলবে। হযরত মানসুর রহমাতুল্লাহ বলেন, আমি যেদিন ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলব, সেদিন আপনার অঙ্গেও এ সুফী পােশাকের পরিবর্তে মামুলী পােশাক দেখা যাবে।

দু’জনের ভবিষ্যদ্বাণীই সফল হয়। পরবর্তীকালে, তাঁর আপাতঃ শরীয় বিরােধী কার্যকলাপের জন্য দেশের সমগ্র আলেম সমাজ যখন তাঁকে হত্যা করার ফতোয়া দেন, তখন কেবল হযরত জুনায়েদ রহমাতুল্লাহ-ই ফতােয়ায় সই করেননি। কেননা, তখন পর্যন্ত তিনি প্রকৃত সুফীই ছিলেন। সুতরাং তার পক্ষে হযরত মনসুর হাল্লাজ রহমাতুল্লাহ-এর হত্যার সিদ্ধান্তে সম্মতি পােষণ করা সম্ভব ছিল না। দেশের খলীফা বললেন, মানসুর রহমাতুল্লাহ-এর বিরুদ্ধে এ ফতােয়াকে যদি শুদ্ধ প্রমাণ করতে হয়, তবে হযরত জুনায়েদ বাগদাদী রহমাতুল্লাহ-এর স্বাক্ষর একান্ত জরুরী। উপায়ান্তর না দেখে হযরত জুনায়েদ রহমাতুল্লাহ সুফীর পােশাক পরিত্যাগ করে খানকা থেকে মাদ্রাসায় চলে গেলেন। আর সেখানে প্রকাশ্য আলেমের পােশাক পরে ফতােয়ায় সই করলেন। তাতে তিনি মন্তব্যে লেখেন, প্রকাশ্য কাজকর্মের দিক থেকে মনসুর প্রাণদন্ডের উপযুক্ত। আর ফতােওয়া প্রদান করা হয় সাধারণতঃ বিচার বা ব্যবস্থা অনুসারেই। গুপ্ত অবস্থা মানুষের জন্য দেখা সব নয়। তার লি’র ব্যবস্থা আল্লাহই করে থাকেন।

হযরত জুনায়েদ রহমাতুল্লাহ-এর কাছে মাসআলার উত্তর না পেয়ে হযরত মনসুর হাল্লাজ রহমাতুল্লাহ মনে এত বেশী দুঃখ পান যে, তাকে কিছু না বলেই সস্ত্রীক তশতরে চলে যান। তশতরবাসী তাকে সাদরে গ্রহণ করেন এবং তিনি এক বছরেরও ওপর সেখানে সসম্মানে বাস করেন। কিন্তু তাদের সঙ্গে মতানৈক্য হতে খুব বেশী দেরী হল না। কারও মন যুগিয়ে চলা ছিল তার স্বভাব বিরুদ্ধ। বিশেষ করে আলেম সমাজকে তিনি তেমন আমল দিতেন না। তার ওপর ছিল হযরতের আমর ইবনে ওসমান মক্কী রহমাতুল্লাহ-এর প্ররোচনা। তিনি তার ওপর ক্ষুব্ধ ছিলেন। তিনি মক্কা থেকে তার বিরুদ্ধে খােরাসানবাসীদের উত্তেজিত করে তােলেন। ফলে মর্মাহত মানসুর রহমাতুল্লাহ দরবেশী পােশাক ছেড়ে সাধারণ বেশে সমাজের সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশে গেলেন। এ যেন এক অজ্ঞাতবাস। আর এভাবে কাটল পাঁচ বছর। তিনি কখনও খোরাসানে, কখনও মাওরান্নহরে, কখনও বা নীমরােজে, সিন্তানে, কেরমানে- ইত্যাদি নানা স্থানে ঘুরে বেড়ান। শেষে গেলেন পারস্যে। আর এখানে রচনা করলেন বহু মূল্যবান গ্রন্থ। তাছাড়া আহওয়াজবাসীদের উপদেশ দিয়ে তাদের অনুকূল্য লাভ করলেন। তাঁর বক্তৃতা, উপদেশ সব কিছুই ছিল গূঢ় রহস্যপূর্ণ। এ জন্য স্থানীয় জনগণ তার নাম দেন হাল্লাজুল আসরার। হাল্লাজ আরবী শব্দ যার অর্থ হল ধুনকার, ধানুকী, যে তুলা ধুনে। শােনা যায়, একবার তুলার স্তুপের দিকে ইশারা করামাত্র সেগুলি খুব সুন্দরভাবে ধুনা হয়ে যায়। আর তখন থেকেই তিনি হাল্লাজ নামে অভিহিত হন।

পাঁচ বছর আত্মগােপনের পর তিনি বসরায় ফিরে আসেন। আর আবারও সুফী পােশাক পরিধান করেন। সেখানে কিছুদিন থাকার পর তিনি যান মক্কায় । কিন্তু সেখানে উপস্থিত হওয়া মাত্রই হযরত ইয়াকুব নাহারজুরী রহমাতুল্লাহ তাকে জাদুকর বলে আখ্যা দেন। বাধ্য হয়ে তিনি আবার ফিরে এলেন বসরায়। ওখানে এক বছর কাটিয়ে আহওয়াজ হয়ে তিনি চলে আসেন হিন্দুস্থানে। হিন্দুস্থান থেকে খােরাসান, মাওরাউন্নহর প্রভৃতি দেশ ঘুরে ঘুরে চলে যান চীনে। তারপর আবার মক্কা শরীফে। এবার সেখানে দু’বছর কাটান। তারপর মক্কা থেকে বিদায় নেবার সময় তার মধ্যে দারুণ পরিবর্তন আসে। তখন তাঁর কথাবার্তা সম্পূর্ণ দুর্বোধ্য হয়ে পড়ে। কাজেই এরপর তিনি যখনই যে দেশে গেছেন তখনই মানুষের কাছে লাঞ্ছিত ও বিতাড়িত হয়েছেন। এক এক সময় তিনি এত বেশী দুঃখ-কষ্ট, যন্ত্রণা ও উৎপীড়ন সহ্য করেন যে, আর কোন সাধক-দরবেশকে তা কখনও সহ্য করতে হয়নি। শােনা যায়, তার পূঢ় রহস্যপূর্ণ, দুর্বোধ্য কথা ও আচরণের কারণে তিনি অন্তত পঞ্চাশটি দেশ থেকে বিতাড়িত হন। অথচ ইনিই যখন আগের দফায় বিভিন্ন দেশ পরিভ্রমণ করেন, তখন তার জ্ঞান মুগ্ধ মানুষ তাকে নানা সম্মানে ও উপাধিতে ভূষিত করেছেন। ভারতবাসী তাকে বলতেন আবুল মুগীস, চীনারা বলতেন, আবুল মুঈন, খােরাসানীরা বলতেন, আবুল মনীর, পারস্যবাসীরা বলতেন, আবু আবদুল্লাহ যাহিদ, খুজিস্তানবাসীরা বলতেন, হাল্লাজুল আসরার, বাগদাদ ও বসরার মানুষ তাঁকে মুগবের নামে সম্মানিত করেন।

শােনা যায়, তিনি দিনে-রাতে চারশ রাকয়াত নফল নামায পড়তেন। কিন্তু নিজের জন্য ঐ নফলকে তিনি ফরজ করে নেন। সবাই বলতেন, তিনি যে উচ্চ মর্যাদার অধিকারী তাতে এত কষ্ট করার কি দরকার? তিনি তার উত্তরে বলতেন, কষ্ট-ক্লেশ আল্লাহ-প্রেমীদের মনে ঠাই পায় না। কেননা, প্রকৃতপক্ষে তারা মৃত মানুষের মতাে হয়ে যান।

দীর্ঘ বিশ বছর ধরে তিনি একই পােশাকে উপাসনা করতেন। একবার লােকে জোর করে তা খুলে নেয়। তখন দেখা যায়, তার ভেতরে জমে আছে অসংখ্য উকুন । তার কোন কোনটির ওজন নাকি ছিল প্রায় তিন রতি। একজন একটি বিছে দেখতে পেয়ে মারতে যায়। তিনি নিষেধ করেন। বলেন, ওটি তার সঙ্গে রয়েছে প্রায় বারাে বছর।

তাঁর অলৌকিক ক্ষমতা সম্বন্ধে বর্ণনা দিয়েছেন হযরত রুশী খেরাদ সমরকন্দী। একবার হযরত মনসুর হাল্লাজ রহমাতুল্লাহ-এর চারশ সঙ্গী নিয়ে এক বিশাল প্রান্তর অতিক্রম করছিলেন। সঙ্গীরা ক্ষুধায় কাতর হয়ে তাঁকে বললেন, এখন যদি ভুনা মাথা (ছাগলের) ও রুটি খেতে পেতাম তাতে বড় তৃপ্তি হত। তিনি তাদের সারিবদ্ধ অবস্থায় বসিয়ে দিয়ে নিজের পেছনে হাত নিয়ে গিয়ে একটি মাথা ও রুটি এনে একজনকে দিলেন। আর এই ভঙ্গিতে চারশ জনকেই মাথা ও রুটি খাওয়ালেন। কিছুক্ষণ পরে সঙ্গীরা খেজুর খেতে চাইলে তিনি দাড়িয়ে সঙ্গীদের বললেন, তােমরা আমাকে ধরে নাড়া দাও। তারা নাড়া দিতেই প্রচুর পাকা খেজুর পড়তে লাগল। তারা বেশ মজা করে খেজুর খেলেন।

একবার তিনি চলেছেন এক বন্য পথে। সঙ্গে অনেক সঙ্গী। তারা আঙুর খেতে চাইলেন। তিনি তার ডান হাতখানা যেমনি ওপরে ওঠালেন অমনি হাত ভর্তি আঙুর এল। আর এভাবে বেশ কয়েকবার শুন্যে হাত তুলে তিনি পেট ভরে তাদের আঙুর খাওয়ালেন। কিছুক্ষণ পরে তাঁদের হালুয়া খাবার ইচ্ছা হলাে। আর অলৌকিক শক্তি বলে তিনি তাদের সে ইচ্ছাও পূরণ করলেন। একজন বলল, হালুয়ার স্বাদ হুবহু বাগদাদের হালুয়ার মতাে। তিনি বললেন, আল্লাহর রহমতে আমার জন্য বাগদাদের বাজার আর বন-জঙ্গল দুইই সমান। | ঐদিন বাগদাদের বাবে এনতাকিয়া বাজারের এক হালুয়ার দোকান থেকে হালুয়া ভর্তি একটি কড়াই হঠাৎ উধাও হয়। তিনি যখন সদলবলে বাগদাদে পৌছলেন, তখন এক মুরীদের কাছে কড়াইটি দেখতে পেয়ে দোকানদার তাকে জিজ্ঞেস করলেন, এটি আপনি কোথায় পেলেন? মুরীদ ঘটনাটি বললেন। আর হলুয়া বিক্রেতা অবাক হয়ে হযরত মনসুর হাল্লাজ রহমাতুল্লাহ-এর কাছে দীক্ষা নিলেন।

একবার হজ্জ যাত্রায় তাঁর সঙ্গে ছিলেন চার হাজার হজ্জযাত্রী। তাঁদের নিয়ে তিনি মক্কায় পেীছে কাবা ঘরের সামনে ঐ যে দাঁড়ালেন, পুরাে একবছর আর নড়লেন না। এভাবে দাঁড়িয়ে রইলেন। সূর্যের তাপে তার দেহ গলে গিয়ে চর্বি বেরােতে লাগল। গায়ের চামড়া গেল ফেটে। কিন্তু তিনি এক চুলও নড়লেন না। এ অবস্থায় এক লােক প্রতিদিন তাকে একটি রুটি এক কুঁজো পানি দিয়ে আসত। তার থেকে মাত্র ঢোক পানি আর এক টুকরাে রুটি খেয়ে বাকী সব রেখে দিতেন। | হযরত মনসুর হাল্লাজ রহমাতুল্লাহ আরাফাতের মাঠে গিয়ে আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করেন, প্রভু গাে আপনি পথ ভ্রষ্ট মানুষের পথপ্রদর্শক। আমি যদি সত্যিই কাফের হয়ে থাকি, তবে আমার কুফরীই বাড়িয়ে দিন। যখন লােকজন তার চারপাশ থেকে চলে যেত, তখন তিনি আবার দোয়া করতেন, প্রভু! আমি আপনার একত্ব স্বীকার ও বিশ্বাস করেই আপনি ছাড়া আর কারও এবাদত করি না। আর আপনার দেয়া দানের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে অক্ষম বলে তা প্রকাশ করতে পারি না। অতএব, আমার অনুরোধ, আমার বদলে আপনিই আপনার নেয়ামতসমূহের শােকর আদায় করুন। কেননা, আপনার প্রদত্ত নেয়ামতসমূহের সম্পূর্ণ শােকর আদায় আপনার কোন বান্দার দ্বারা সম্ভব নয়। সেটি কেবল আপনার দ্বারাই হতে পারে। | হযরত মানসুর রহমাতুল্লাহ হযরত মূসা (আঃ)-এর একটি ঘটনার উল্লেখ করে বলেন, হযরত মূসা (আঃ) একবার ইবলীসকে জিজ্ঞেস করেন, সে হযরত আদম (আঃ)-কে সেজদা করেনি কেন? ইবলীস বলল, সে আল্লাহর প্রত্যক্ষদর্শী ও সেজদাকারী ছিল। সুতরাং আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে সেজদা করার তার কাছে সঙ্গত নয় বলে মনে হয়েছিল। আল্লাহর দীদারের মূল্য ও গুরুত্ব কী অপরিসীম, হযরত মূসা (আঃ) তা জানেন। আল্লাহর দীদার লাভের প্রতি তার তীব্র বাসনার পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ হযরত মূসা (আঃ)-কে বললেন, পাহাড়টার দিকে তাকান। আর আপনিও প্রবল বাসনা নিয়ে পাহাড়টির দিকে দৃষ্টি দেন।

ধৈর্যের সংজ্ঞা কি? এ প্রশ্নের উত্তরে হযরত মনসুর রহমাতুল্লাহ বলেন, হাত-পা কেটে ফেললেও, শূলে চড়ালেও দুঃখ না করা এবং বিচলিত না হওয়ার নাম ধৈর্য। হযরত ফরীদ উদ্দীন আত্তার রহমাতুল্লাহ বলেন, আশ্চর্য লাগে, হযরত মানসুর হাল্লাজ রহমাতুল্লাহ-এর প্রতি শূলার যে ঘটনা ঘটল, তাতে এতটুকু দুঃখ বা আক্ষেপ প্রকাশ করলেন না। | হযরত শিবলী রহমাতুল্লাহ গেছেন হযরত হাল্লাজ রহমাতুল্লাহ-কে হত্যা করতে। হাল্লাজ রহমাতুল্লাহ বললেন, আমি এমন এক গুরুতর কাজ করার ইচ্ছা করেছি যার কারণে আমি পাগল প্রায় । আর আমি নিজেই তাে মৃত্যুকে আহবান করেছি। অতএব, আপনি আমাকে হত্যা করবেন না।

আগেই বলা হয়েছে, তার ‘আনাল হক’ মানুষের রােষ বৃদ্ধি করে। তাকে জিজ্ঞেস করা হয়, আপনার আল্লাহত্ত্বের দাবী কি কুফরী নয়? তিনি বললেন, আল্লাহর প্রকৃত পরিচয় হল, সবকিছুই তার । আর আপনাদেরই কথায়, তিনি কখনও বিলুপ্ত হন না। তবে কি হুসাইন মানসুর বিলীন হয়ে গেছে।

হযরত জুনায়েদ বাগদাদী রহমাতুল্লাহ-কে প্রশ্ন করা হয়েছিল, হযরত মনসুর রহমাতুল্লাহ-এর কথার অন্য অর্থ করা যায় কিনা। তিনি বললেন, আর সে চেষ্টা করাে না। কেননা, সময় পার হয়ে গেছে। এখন আলেম সমাজ ও খােদ খলীফা তার প্রতি বিরূপ হয়েছেন। তিনিও একবছর ধরে বন্দী। তাঁর অনুসারীরা তার কাছে যাতায়াত করতেন। তিনি তাদের কথার সন্তোষজনক জবাবও দিতেন। কিন্তু এখন লােকজনের যাতায়াত নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কয়েকজন বিদগ্ধ পণ্ডিত তার কাছে দু’জন লােককে এ কথা বলে পাঠান যে আনাল হক উচ্চারণ করে তিনি যে অপরাধ করেছেন তার জন্য তওবা করলে তাঁকে মুক্তি দেয়া হবে। তিনি জবাব দিয়েছিলেন, তিনি তা পারবেন না। হযরত আতা রহমাতুল্লাহও তাঁর কাছে গিয়েছিলেন। তার প্রস্তাবও ছিল ঐরকম। কিন্তু তাকেও তিনি একই জবাব দিয়েছেন।

কথিত আছে, প্রথম রাতে তাঁকে বন্দী করা হলে তিনি অদৃশ্য হয়ে যান। দ্বিতীয় রাতে দেখা যায় তিনিও নেই, জেলখানাও নেই। তৃতীয় রাত্রে অবশ্য তাকে এবং জেলখানাকেও দেখা যায়। এ ঘটনার মর্ম জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, প্রথম রাতে আমি আল্লাহর দরবারে চলে গিয়েছিলাম । দ্বিতীয় রাতে খােদ আল্লাহ এখানে উপস্থিত ছিলেন । তৃতীয় রাত্রে জেলখানা ও আমি আবার হাজির হলাম। কেননা, শরীয়তের বিধান রক্ষার জন্য আল্লাহ আবার আমাকে পাঠিয়ে দিয়েছেন। এখন তােমরা তােমাদের কর্তব্য পালন কর।

কথিত আছে, তিনি কারাগারে দৈনিক এক হাজার রাকাআত নফল নামায পড়তেন। তাকে প্রশ্ন করা হয়, আপনি যখন নিজেকে আল্লাহ্ বলে ঘোষণা করছেন, তখন এ নামায কার উদ্দেশ্যে? তিনি উত্তর দেন, আমার সম্বন্ধে আমিই ভালাে জানি।।

শােনা যায়, কারাগারে তখন তিনশ কয়েদী ছিল। তিনি তাদের মুক্তি দিতে পারেন বলে ঘােষনা করেন। কিভাবে তা সম্ভব বলে তাঁকে প্রশ্ন করা হল। কেননা তিনি নিজেও একজন বন্দী। পারলে আগে তিনি নিজেকেই মুক্ত করুন না? হযরত মনসুর রহমাতুল্লাহ বলেন, আমি যে আল্লাহর বন্দী। আর শরীয়তেরও অনুসরণ করি। না হলে ইচ্ছা করলে চোখের ইশরায় সব শৃঙ্খল ছিন্ন করতে পারি। এই বলে আঙুলের ইশরায় সত্যিই সব কয়েদীর শেকল ছিড়ে ফেললেন। কয়েদীরা বলল, আমরা এখন বেরােব কেমন করে? জেলের দরজা যে বন্ধ। তিনি তখন ইশরা করতেই দেয়ালে কয়েকটি জানালা তৈরী হয়ে গেল। কয়েদীদের বললেন, যাও, চলে যাও।

তারা বলল: আপনি আসবেন না?

তিনি বললেন, প্রভুর সঙ্গে আমার একটা গােপন ব্যাপার আছে। তার মীমাংসা হবে শূলে চড়ে। পরদিন প্রহরীরা দেখল, জেল শূন্য। একটিও কয়েদী নেই। তারা জিজ্ঞেস করল, কয়েদীরা কোথায়? তিনি বললেন, আমি সবাইকে ছেড়ে দিয়েছি।

তবে আপনি থেকে গেলেন কেন? তিনি বললেন। আমার ওপর মালিকের খেদ রয়েছে। সে জন্য অপেক্ষা করছি।

খলীফার কাছে এ সংবাদ পৌছালে তিনি হুকুম দিলেন, চাবুক মেরে তাকে কতল করা হােক। তা না হলে আরও বিপত্তি ঘটতে পারে। নির্দেশমত তাকে কারাগার থেকে বের করে এনে তিনশ ঘা চাবুক বসানাে হল। কিন্তু তাতেও তার আনাল হক উচ্চারণ বন্ধ হল না। বরং আরও জোরে তিনি তা করতে লাগলেন। যে লােকটি আঘাত করছিল, সে বলল, প্রতিটি আঘাতে শােনা গেছে, মানসুর ভয় পেও না।

এত আঘাত সত্ত্বেও তিনি নির্বিকার, অবিচল। তারপর তাঁকে শূলে চড়াবার জন্য নিয়ে যাওয়া হল। এই মর্মান্তিক দৃশ্য দেখার জন্য প্রায় লক্ষাধিক লােকের সমাবেশ ঘটে। সেই বিশাল জনতার দিকে তাকিয়ে তিনি বলে উঠলেন, হক, হক, আনাল হক। এমন সময় এক দরবেশ তাঁর সামনে এসে বললেন, প্রেম কি বস্তু? তিনি বললেন, আজ নিজের চোখেই তা দেখতে পাবেন। কাল এবং পরশুও দেখতে পাবেন। অর্থাৎ, প্রথম দিন তাঁকে হত্যা করা হবে। দ্বিতীয় দিন তার মরদেহ পুড়িয়ে ছাই করা হবে। তৃতীয় দিন সে ছাই বাতাসে উড়িয়ে দেয়া হবে। এগুলিই হল প্রেমের নিদর্শন।

তাঁকে যখন শূলে চড়ানাে হয়, তখন তাঁর সেবক এসে তাঁর শেষ উপদেশ প্রার্থনা করেন। তিনি বললেন, নিজেকে যেকোন সৎ কাজে নিয়ােজিত রেখাে। না হলে রিপু তােমাকে মন্দ কাজে লাগিয়ে দেবে। তার ছেলে এসে কিছু শুনতে চাইলেন। তিনি বললেন, দুনিয়ার সবাই পুণ্য কর্মের চেষ্টায় আছে। তুমি এমন একটি কাজের চেষ্টা কর, যার একটি কণা সারা বিশ্বের মানুষ ও জ্বিনের আমল হতেও উত্তম হয়। সেটি হল হাকীকতের একটি অণু। অতঃপর তিনি সানন্দে শূলকাঠের দিকে এগিয়ে গেলেন। আপনার এত খুশী কিসের? কেউ তাঁকে শুধাল। তিনি বললেন, কারণ, আমি আমার ডেরায় যাচ্ছি। এর চেয়ে বেশী আনন্দের সময় আর কখন হবে? এবার তিনি বিড়বিড় করে আবৃত্তি করতে লাগলেনঃ আমার বন্ধু আমার প্রতি মােটেই অবিচার করেননি। অতিথিকে যেমন পবিত্র ও উত্তম শরাব পান করানাে হয়, আমার প্রভুও আমাকে তেমনি পান করিয়েছেন। শরাবের পাত্র কয়েকবার পান করার পর কাপ ও তরবারি-সহ এগিয়ে যাবার জন্য বন্ধু আমাকে সাদরে আহ্বান জানালেন। আর এই হল ঐ ব্যক্তির উপযুক্ত আযাব যে গ্রীষ্মকালে অজগরের সঙ্গে বসে পুরাতন শরাব পান করে। তাকে নিয়ে যাওয়া হল শুলের তলায়। তিনি শুল চুম্বন করলেন। তারপর শূলের সিড়িতে পা রেখে বললেন, বীর পুরুষের মেরাজ হল শুলদণ্ড। এবার তিনি কিবলামুখী হয়ে আল্লাহর দরবারে মােনাজাত করলেন, প্রভু গাে! যা চেয়েছিলাম তাই পেলাম । যখন তাকে শূলে চড়ানাে হল, তখন তাঁর শিষ্যগণ বললেন, হুজুর! যারা আপনার ওপর নিষ্ঠুর ব্যবহার করল, আর আমরা যারা আপনার সমর্থক, তাদের প্রতি আপনার ধারণা কি? তিনি বললেন, যারা আমার প্রতি নিষ্ঠুর ব্যবহার দেখাল, তারা দ্বিগুণ পুণ্য অর্জন করবে। আর যারা আমাকে সমর্থন করেছে ও আমার প্রতি পবিত্র ধারণা পােষণ করেছে, তারা পাবে মাত্র একটি সওয়াব। কেননা, তােমরা আমার প্রতি কেবল ভালাে ধারণাই পােষণ করেছ। আর তারা একত্ববাদের শক্তি ও শরীয়তের কঠিন বিধান-এ দুইয়ের তাড়নায় তাড়িত। মনে রেখাে, ইসলামে তওহীদই আসল। আর ভালো ধারণা তার শাখা মাত্র।

তিনি নাকি যৌবনে এক তরুণীর প্রতি দৃষ্টিপাত করেন। সে কথা তার মনে এল। আর বললেন, এতদিন পর আজ তার প্রতিশােধ নেয়া হল। এবার হযরত শিবলী রহমাতুল্লাহ এসে তাঁকে তাসাওউফ বা সাধনা সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করলেন। তিনি বললেন, আপনি যা দেখেছেন তা তাসাওউফের নিম্ন শ্রেণী। তাহলে উচ্চ কোন্‌টি? শিবলী রহমাতুল্লাহ জিজ্ঞেস করলেন। তিনি বললেন, সেটি আপনার জ্ঞানের বাইরে। এবার তার ওপর পাথর ছোঁড়া শুরু হল। এমন কি হযরত শিবলী রহমাতুল্লাহ ও একটি ঢিল নিক্ষেপ করলেন। আর হযরত হাল্লাজ রহমাতুল্লাহ আর্তনাদ করে উঠলেন। লােকে তাকে বললেন, এত পাথর ছোঁড়া হচ্ছে, অথচ আপনি নির্বিকার। কিন্তু শিবলী রহমাতুল্লাহ-এর সামান্য ঢিলের আঘাতে আপনি অমন চিৎকার করলেন কেন? তিনি বললেন, যারা পাথর নিক্ষেপ করছে তারা রয়েছে অজ্ঞানতার আঁধারে । কিন্তু হযরত শিবলী রহমাতুল্লাহ-এর মতাে জানাশােনা লােক আমার ওপর ঢিল ছুঁড়ছেন, এ দুঃখ কি সহ্য করা যায়?

শূলে চড়িয়ে প্রথমে তার হাত কেটে দেয়া হয়। তিনি মন্তব্য করলেন, এ লেকটির এই হাত কাটা সহজ বটে, কিন্তু যে অদৃশ্য হাত দিয়ে সে আরশের ওপর থেকে গৌরবের মুকুট টেনে আনছে, তা কে কাটতে পারে? তারপর তাঁর পা কাটা হল । তখনও তার সহাস্য মন্তব্য; এই পায়ের সাহায্যে পৃথিবীতে চলাফেরা করেছি। আর এখন এই পা কেটে ফেলা হল। কিন্তু আমার যে অদৃশ্য পা আছে, জান্নাতে আমি তার সাহায্যেই বিচরণ করব। তােমাদের ক্ষমতা থাকলে সে পা কেটে নাও দেখি! বলে দু’হাতের রক্ত নিয়ে তিনি মুখে মাখতে লাগলেন। এ আপনি কি করছেন? তাকে সবাই বলে। তিনি বললেন, আমার শরীরের রক্ত ঝরছে প্রচুর। তাই মুখখানি সাদা হয়ে গেছে। তােমাদের মনে হতে পারে, বুঝি বা ভয়েই মুখখানি সাদা হয়ে গেছে। তাই মুখে রক্ত মেখে লাল করে নিলাম। | তারপর তিনি হাতে রক্ত মাখতে লাগলেন। বললেন, ওজু বানাচ্ছি। লােকে বলে কি রকম? তিনি বললেন, দু’রাকায়াত এশকের নামায আছে, যা রক্ত দ্বারা ওজু করে আদায় করতে হয়। | এরপর তাঁর চোখ উপড়ে ফেলা হল। আর এ দৃশ্য দেখতে না পেরে জনগণ কান্নায় ভেঙে পড়ল। অবশ্য কেউ কেউ তখনও তার দিকে পাথর ছুঁড়ছিল। এবার তার জিভ কাটতে উদ্যত হলে তিনি একটু থামতে বললেন। তারপর শূন্যে দৃষ্টি ছড়িয়ে বললেন, প্রভু! এরা যে আমাকে এত কষ্ট দিল এজন্য এদের আপনার অনুগ্রহ থেকে বঞ্চিত করবেন না। যদিও তারা আমার হাত পা কেটেছে, তবুও তারা সবাই রয়েছে আপনার পথে। তারা যদি আমার মাথাও কেটে নেয়, তবুও তাদের উদ্দেশ্য শুধু আপনারই দীদার লাভ করা।

এবার তার নাক ও কান কেটে দেয়া হল। তার ওপর প্রস্তর নিক্ষেপ তখনও বন্ধ হয়নি। তার শেষ কথা হলঃ আমি একত্ববাদের প্রেমিক। একত্বের প্রতি প্রেম হল, এককে একই জানা আর অন্য কাউকে সেখানে স্থান না দেয়া। তারপর তিনি এই আয়াতটি পাঠ করলেন; “যারা ঈমান আনে না এবং কিয়ামতকে অবিশ্বাস করে তা থেকে পালিয়ে যায়, অথচ তারা অন্তরে জানে যে, এ অবধারিত সত্য, তারাই সহাস্যে রাসূলে করীম রহমাতুল্লাহ-কে তাড়াতাড়ি কিয়ামত এনে দেখাতে বলে। আর যারা ঈমান আনে (সেই ভয়ঙ্কর দিনে নাম শুনে) ভয়ে ভীত হয় ও কুকর্ম থেকে বিরত থাকে, তারাই কিয়ামতকে সত্য বলে জানে ও মনে প্রাণে বিস্বাস করে।”

এটুকু বলার পরই তার জিভ কেটে নেয়া হল । তখন দিনের আলাে ফুরিয়ে এল । এল সন্ধ্যা। এবার খলীফার নির্দেশ দেহ থেকে তার মাথা বিচ্ছিন্ন করা হােক। এ আদেশ পালনে ঘাতকেরা প্রস্তুত। হঠাৎ মনসুর হাল্লাজ রহমাতুল্লাহ স-শব্দে হেসে উঠলেন কিন্তু জনতার মধ্যে জেগে উঠল কান্নার রােল। আর সেই হাসি কান্নার মধ্যেই তার শিরচ্ছেদ করা হল । আর সঙ্গে সঙ্গে তাঁর প্রতিটি অঙ্গ উচ্চারণ করতে শুরু করল আনাল হক, আনাল হক। তখন সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কেটে টুকরাে টুকরাে করা হল। বাকী রইল শুধু গলা আর পিঠ। কিন্তু তাঁর খণ্ডিত অঙ্গ থেকেও নিনাদিত হল আনাল হক আনাল হক। শরীরের প্রতিটি রক্তবিন্দু মাটিতে পড়ে আনাল হক বলতে শুরু করল। আর এমনিভাবে রাত কেটে গেল। দ্বিতীয় দিন সবাই স-বিস্ময়ে দেখল, আগে শুধু এক মুখে আনাল হক উচ্চারিত হচ্ছিল। এখন তা শতমুখে উচ্চারিত হচ্ছে। খলীফার লােকজন এবাৱ হতবুদ্ধি হয়ে গেল। তারা তার খণ্ডিত দেহাংশগুলি আগুনে পুড়ে ছাই করে ফেলল। কিন্তু তাতে বিপদ বেড়ে গেল সহস্র গুণ । প্রতিটি ভস্মকণা থেকে শব্দ উঠতে থাকল আনাল হক, আনাল হক।

বেগতিক বুঝে খলীফা নির্দেশ দিলেন, তার দেহ-ভস্ম দজলা নদীতে ফেলে দেয়া হােক। কিংকর্তব্যবিমূঢ় প্রশাসন কর্মীরা তাই করল। কিন্তু তার ফল হল আরও মারাত্মক। হঠাৎ দজলা নদী ফুঁসে উঠল বিপুল জলােচ্ছাসে । আর উৎক্ষিপ্ত তরঙ্গ আনাল হক আনাল হক বলতে বলতে প্রচণ্ড বেগে আছড়ে পড়ল নদী-তটে। জনগণের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হল। হয়ত ক্রুদ্ধ নদী বাগদাদ মহানগরী গ্রাস করে ফেলবে। সবাই তখন দিশেহারা।

হযরত মনসুর হাল্লাজ রহমাতুল্লাহ ঐ ক্ষমতাবলে ভবিষ্যতের কথা জেনে নিয়েছিলেন। তাই তিনি তাঁর এক শিষ্যকে বলে যান, তার দেহ ভস্ম দজলা বক্ষে নিপতিত হলে তা ভীষণ আকার ধারণ করবে। তখন তিনি যেন তার খিরকাটি নদীকে দেখিয়ে দেন। তা হলে সে শান্ত হয়ে যাবে। হঠাৎ কথাটি মনে পড়ল ঐ শিষ্যের। তিনি তাড়াতাড়ি তার খিরকাটি নিয়ে নদীর সামনে ধরলেন। আর সঙ্গে সঙ্গে নদী শান্ত হয়ে গেল। নিক্ষিপ্ত ভস্ম এসে জমা হল নদী-তীরে। আর তা তুলে নিয়ে লােকেরা কবর খুঁড়ে তাতে দাফন করল । ভয়ংকর এক বিপর্যয় থেকে দেশ ও জাতি রক্ষা পেল। অন্য কোন তাপসের মৃত্যুর পর মানুষ এমন বিপর্যয় প্রত্যক্ষ করেনি। একজন বিখ্যাত জ্ঞানী বলেন, যখনই হষরত মনসুর হাল্লাজ রহমাতুল্লাহ-এর প্রতি অমানবিক আচরণের মর্মান্তিক দৃশ্যটি মানস পটে ভেসে ওঠে, তখন আপনা থেকে আমার মনে একটি প্রশ্নের উদয় হয় যে, তার সাথে এরূপ ব্যবহার করা হল কেন? আর এ প্রশ্নও মনের মধ্যে নিয়ত ঘুরপাক খায়, যারা তাঁর প্রতি এ ধরনের নিষ্ঠুর আচরণ করল, রােজ কিয়ামতে তাদের অবস্থা কী দাঁড়াবে? হযরত আব্বাস তুসী রহমাতুল্লাহ বলেন, রােজ কিয়ামতে হাশরের মাঠে তাঁকে বেঁধে রাখা হবে, না হলে তার দ্বারা এক তুমুল কান্ড সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

কোন এক দরবেশ বলেন, যে রাতে হযরত মনসুর রহমাতুল্লাহ-কে শূলে দেয়া হয়, সে রাতে ভাের পর্যন্ত তিনি শূল কাঠের নিচে মােরাকাবায় কাটিয়ে দেন। ভােরের দিকে তিনি এক অদৃশ্য বাণী শুনতে পান। তাতে বলা হয়, আমি আমার গােপন রহস্যাবলীর একমাত্র রহস্য মানসুরের কাছে উন্মোচন করেছিলাম যা সে জনসমক্ষে প্রকাশ করে দিল। যার ফলে তাকে এরূপ কঠোর পরিণতির শিকার হতে হল। কোন শাহী রহস্য ফাঁস করে দিলে তার পরিণতি এরূপই হয়ে থাকে।

হযরত শিবলী রহমাতুল্লাহ বলেন, তার দেহ ভস্ম দাফন করার পর তিনি সেখানেই সারা রাত উপাসনায় কাটিয়ে দেন। ভােরবেলায় আল্লাহর দরবারে মােনাজাত করেন। হে প্রভু, মানসুর হাল্লাজ রহমাতুল্লাহ একজন মুমিন বান্দা ছিলেন। তিনি তত্ত্বজ্ঞানী, প্রেমিক, তওহীদবাদী। তা সত্ত্বেও আপনি তাঁকে এমন কঠিন অবস্থায় ফেলে দিলেন? তাঁর প্রার্থনা তখনও শেষ হয়নি। হঠাৎ তার ঘুম নামে দু’চোখে আর তিনি স্বপ্ন দেখেন, রােজ কিয়ামত উপস্থিত। আল্লাহ পাক ঘােষণা করছেন, আমি তার সঙ্গে এরূপ ব্যবহার এজন্য করেছি যে, সে আমার গােপন রহস্য মানুষের কাছে ফাস করে দিত। যে গােপন রহস্য দজলা নদীর ওপর প্রকাশ করা উচিত ছিল সে তা মানুষের কাছে প্রকাশ করে দিয়েছিল। হযরত শিবলী রহমাতুল্লাহ দ্বিতীয় রাতে পুনরায় তাঁকে স্বপ্নযােগে দেখেন। আর তার অবস্থা জানতে চান। তিনি উত্তর দেন, আল্লাহ তাকে অনুপম জান্নাতে জায়গা দিয়েছেন। তিনি আরও জানতে চান, তাঁর সমর্থক ও বিরােধী এই দু’দলের সঙ্গে আল্লাহ কিরূপ ব্যবহার করবেন। তিনি বললেন, দু’দলের ওপরই আল্লাহর অনুগ্রহ বর্ষিত হবে। একদল আমাকে বিশেষভাবে জানত ও আমার সম্বন্ধে ভালাে ধারণা করত। অন্য দল জানত না, কিন্তু আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্যই আমার বিরােধিতা করত । তাই উভয় দলই আল্লাহর প্রিয় ও করুণার পাত্র বলে বিবেচিত।

কোন এক দরবেশ স্বপ্ন দেখেন, হাশরের মাঠে হযরত মনসুর হাল্লাজ রহমাতুল্লাহ শরাবের পেয়ালা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। কিন্তু তার দেহের সঙ্গে মাথা যুক্ত নয়। এর কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, পৃথিবীতে যাদের শিরচ্ছেদ হয়েছে, তারাই হাশরের মাঠে শরাবের পেয়ালার অধিকারী হবে।

হযরত শিবলী রহমাতুল্লাহ বলেন, হযরত মনসুর হাল্লাজ রহমাতুল্লাহ-কে যখন শূলে তােলা হয়, তখন ইবলীস তাঁর সামনে এসে বলে, আপনি যা বলেছেন আমিও তাই বলেছিলাম। আপনি আনাল হক বলছেন, আমি বলতাম আনা খাইরুন (আমি সর্বোত্তম)। তবে কেন আপনার প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ আর আমার প্রতি অভিশাপ অবতীর্ণ হল? হযরত মনসুর হাল্লাজ রহমাতুল্লাহ জবাব দেন, তুমি তা বলেছিলে অহমিকা-প্রসূত হয়ে স্বেচ্চায়। আর আমি আনাল হক বলেছিলাম আমার আমিত্ব সম্পূর্ণ বিসর্জন দিয়ে আল্লাহরই ইচ্ছায় । এই হল অনুগ্রহ ও অভিশাপের কারণ। জেনে রেখাে, অহঙ্কার আল্লাহর দরবারে অত্যন্ত দৃণিত, নিকৃষ্ট। পক্ষান্তরে আমিত্ব বিসর্জন দেয়া হল আল্লাহর কাছে অত্যন্ত প্রিয় ও পছন্দনীয় কাজ। | হযরত মূসা (আঃ) সম্পর্কে তাঁর অভিমত জানতে চাওয়া হলে হযরত মানসুর হাল্লাজ রহমাতুল্লাহ বলেন, তিনি ছিলেন সর্বাবস্থায় সত্য ও ন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত। ফেরাউন সম্পর্কে তাঁর বক্তব্যঃ সে-ও খাঁটি ছিল। কেননা, আল্লাহ ‘খাস’ ও ‘আম” (বিশেষ ও সাধারণ) দুই শ্রেণীর মানুষ সৃষ্টি করেছেন। উভয় শ্রেণীই নিজ নিজ পথে চলে। আর উভয় শ্রেণীর পথ-প্রদর্শক হলেন আল্লাহ। তিনি বলেনঃ

১, আল্লাহর স্মরণে লিপ্ত হয়ে যারা ইহলােক-পরলােক সবকিছু ভুলে যায়, তারাই আল্লাহর নৈকট্য লাভ করে।

২. সুফী ব্যক্তি বড় একা এই কারণে যে, আল্লাহ ছাড়া তিনি কোন কিছুর খবর রাখেননা । অন্যরাও তার সম্বন্ধে কোন কিছু জানতে পারে না।

৩. ঈমানের আলােয় আল্লাহর অনুসন্ধান কর।

৪. হেকমত তীর সদৃশ। আল্লাহ তীরন্দাজ। আর তার নিশানা সৃষ্টিজগত।

৫. মুমিন তিনিই যিনি ধন-সম্পদকে দুষণীয় মনে করে স্বপ্নের রাজ্যে সন্তোষ অবলম্বন করেন।

৬. বিপর্যয়ে ধৈর্যধারণ করা ও আল্লাহকে ভালােভাবে জেনে নেয়াই হল সর্বোৎকৃষ্ট চরিত্র।

৭. আমলকে অসততা থেকে পবিত্র রাখাই হল আখলাক।

৮. সাধারণ মানুষের জ্ঞান, তত্ত্বজ্ঞানীর আধ্যাত্ম-চিন্তা, বিদ্বানগণের জ্যোতি এবং পূর্ববর্তী মুক্তিপ্রাপ্তদের পথই হল প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত একই আল্লাহর পথে সম্পৃক্ত ও জড়িত।

৯. বাদশাহ যেমন ভােগবিলাস, রাজ্য দখল প্রভৃতি কাজে ব্যস্ত, অনুরূপভাবে আমরাও সদা-সর্বদা বিপদ-আপদ আসায় ব্যস্ত থাকি।

১০. উপাসনার মঞ্জিল পার হবার পর মানুষ স্বাধীনতা লাভ করে।

১১. বেশী লম্বা হাত কী দোয়ার না এবাদতের? এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, কোন হাতই লক্ষ্যস্থলে পৌছাতে পারে না। কেননা, প্রার্থনার হাত পৌছাতে পারে স্বীকৃতির সীমা পর্যন্ত। আর এবাদতের হাত পৌছায় শরীয়তের দামান পর্যন্ত। খাটি দাসগণের কাছে এরা কোনটিই পছন্দনীয় নয়।

১২. আল্লাহর হাকীকত যার জন্য খুলে যায়, সামান্য কাজের মাধ্যমেই তা হয়ে যায়। পক্ষান্তরে যার প্রতি তা উন্মুক্ত হবার নয়, বহু সৎ কাজের বিনিময়েও তা কখনই হয় না।

১৩. যতক্ষণ পর্যন্ত বিপদ-আপদে ধৈর্য ধারণ করা না যাবে, আল্লাহর এনায়েত সে পর্যন্ত হাসিল করা সম্ভব হবে না।

সূত্রঃ-তাযকেরাতুল আউলিয়া

মনসুর হাল্লাজ এর জীবনী পড়তে এখানে ক্লিক করুন।

মসনবী শরীফ

মসনবী শরীফ

 

মসনবী শরীফ

২য় -খন্ড

হুদ গেরদে মােমেনানে খত্তে কাশীদ।

নরমে মী শােদ বাদে কাঁ জামী রছীদ।

হরকে বীরু বুদ জে আ খত্তে জুমলারা পারাহ্ পারাহ্ মীগাস্ত আন্দর হাওয়া।

হামচুনী শায়বানে রায়ী মী কাশীদ গেরদে বর গেরদে রমা খত্তে পেদীদ।।

টু ব জমায়া মী শােদ উ ওয়াক্তে নামাজ

তা নাইয়ারাদ গুরগে আঁ জাতর কাতাজ

হীচে গুরগে দর নাইয়ামদ আন্দর গােছ পান্দে হাম না গাস্তি জে আ নেশা।

বাদে হেরচে গােরগাে হেরচে গােচকান্দ।।

দায়েরাহ্ মরদে খােদা রা বুদে বন্দ।

মসনবী শরীফ

মসনবী শরীফ

মসনবী শরীফ

১ম -খন্ড

অধ্যায়-০১ বিষয়ঃ প্রেম-বিরহ

বিশনু আজ না এচু হেকাইযে মিকুনাদ,

ওয়াজ জুদাই হা শিকাইয়েত মীকুনাদ।

অর্থ: মাওলানা রুমী (রহ:) বলেন, বাঁশের বাঁশি যখন বাজে, তখন তােমরা মন দিয়া শােন, সে কী বলে। সে তাহার বিরহ বেদনায় অনুতপ্ত হইয়া ক্রন্দন করিতেছে।

কাজ নাইয়াছতান তা মরা ব বুরিদাহআন্দ,

আজ নফিরাম মরদো জন নালিদাহআন্দ।

অর্থ: বাঁশি বলে আমি বাঁশের ঝাড়ের মধ্যে আপন জনের সাথে সুখে শান্তিতে বসবাস করিতেছিলাম। সেখান থেকে আমাকে কাটিয়া পৃথককরিয়া আনা হইয়াছে। সেই জুদাইর কারণে আমি ব্যথিত হইয়া বিরহ যন্ত্রণায় ক্রন্দন করিতেছি। আমার বিরহ ব্যথায় মানবজাতি সহানুভূতির ক্রন্দন করিতেছে।

 জালাল উদ্দিন রুমি (রহঃ) এর জীবনী

নিজামুদ্দিন আউলিয়া জীবনী-এলো দিল্লীতে নিজামউদ্দিন আউলিয়া

নিজামুদ্দিন আউলিয়া জীবনী-এলো দিল্লীতে নিজামউদ্দিন আউলিয়া

নিজামুদ্দিন আউলিয়া রহমাতুল্লাহর জন্ম ও পরিচয় : মাহবুবে ইলাহী হযরত খাজা নিজামুদ্দিন আউলিয়া রহমাতুল্লাহ হিজরী ৬৩৬ সালে জন্মগ্রহণ করেছিলেন এবং হিজরী ৭২৫ সালে ইহ-ধাম ত্যাগ করেন। ঈসায়ী সালের হিসাব মতে তার জন্ম হয়েছিল ১২১৫ খ্রিস্টাব্দে এবং তিনি মৃত্যুবরণ করেছিলেন ১৩০৪ খ্রিস্টাব্দে। হিসেব করলে দেখা যায় যে, তিনি ৮৯ বছর এই জগতের ধুলায় অবস্থান করেছিলেন। এই ৮৯ বছরে তিনি রূহানী জগতে যে নবতর প্রাণ বন্যার জোয়ার এনেছিলেন এবং ধর্মসম্মত কার্যাবলী ও ঈমানের হেফাজতের লক্ষ্যে কাজ করেছিলেন, তা শুধু ভারতীয় উপমহাদেশে নয় বরং মুসলিম দুনিয়ার সর্বত্র নতুন অনুরাগের পথ রচনা করতে পেরেছিলেন। | খােদা প্রেমিক ও আশেকানে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর প্রতি তিনি এতই অনুরক্ত হয়েছিলেন যে, তিনি দিবারাত্রি আল্লাহ রাসূলের ধ্যানে মগ্ন থাকতেন এমন কি দ্বীন ও ইসলামের ব্যাপারেও জীবন উৎসর্গীকৃত করতে বিন্দুমাত্র অবহেলা করতেন না।

হযরত নিজামুদ্দিন আউলিয়া রহমাতুল্লাহ যে একজন নির্বাচিত জীবন সন্ধানীই ছিলেন তা নয়, তিনি এবাদত বন্দেগীর দ্বারা আল্লাহ রাবুল আলামীনের নৈকট্যও লাভ করতে সক্ষম হয়ে ছিলেন। শুধু তাই নয় তিনি জনসেবা ও ঐশী প্রেমর ক্ষেত্রে তৎকালীন জগতে ছিলেন এক বিশিষ্ট মর্যাদার অধিকারী। জাতি ধর্ম-গোত্র-নির্বিশেষে তিনি অগণিত মানুষের সেবায় অহরহ ব্যাপৃত থাকতেন। সুতরাং ভারতবাসীদের ইতিহাসে তার নাম স্বর্ণাক্ষরে লিখিত রয়েছে।

শিক্ষা গ্রহণঃ জনক জননী ও আত্মীয় স্বজনদের আদর স্নেহে প্রতিপালিত হতে লাগলেন তিনি। ছেলেবেলাই কিশাের নিজামুদ্দিন অন্য ছেলে পিলেদের চেয়ে একটু অন্য ধরণের বলে মনে হতে লাগল। শৈশব থেকে তার মন মানসিকতা থেকে পিতামাতা বুঝতে পেরেছিলেন এই ছেলে একদিন জগতের পুজনীয় ব্যক্তিরূপে পরিগণিত হবে। তিনি ছােটকাল থেকেই তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়েছিলেন। তাঁর পিতা হযরত সাইয়্যেদ আহমদ রহমাতুল্লাহ দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করে যখন চীর বিদায় নিলেন তখন নিজামুদ্দিন আউলিয়া-এর ৫ বৎসর বয়স।

তিনি পিতৃহারা বালক রূপে জীবন যাপন করিতে লাগলেন। মাতা জোলায়খা বিবি একটা সমস্যার মধ্যে পড়ে গেলেন। ঘর সংসারের কাজকর্ম সমাধা করা এবং প্রিয়পুত্রের লেখাপড়া নিয়ে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়লেন। যেভাবেই হউক তিনি পুত্রের এলমে দ্বীন শিক্ষা দিবেনই। তিনি ছেলেকে প্রাথমিক মক্তবে ভর্তি করে দিলেন।হযরত নিজামুদ্দিন আউলিয়া রহমাতুল্লাহ সর্ব প্রথমে পবিত্র কুরআন শরীফ খতম করলেন এবং হযরত মাওলানা আলাউদ্দিন উমুলীর নিকট ফিকাহ শাস্ত্রের প্রাথমিক কিতাবসমূহ অধ্যয়ন করেন। একই সাথে মক্তবের পাঠ্যক্রম অনুযায়ী আনুষাঙ্গিক অন্যান্য বিষয়সমূহের জ্ঞান অর্জন করেন।

নিজামুদ্দিন আউলিয়া

মুগল রাজকুমারী জাহানারা বেগমের সমাধি (বামে), নিজামুদ্দিনের মাজার(ডানে) এবংজামা’য়াত খানা মসজিদ কমপ্লেক্স।

মক্তবের লেখাপড়া সমাপ্তি করার পর মায়ের আদেশানুসারে তাকে পাঠানাে হল প্রখ্যাত কামিল ও শিক্ষাবিদ হযরত মাওলানা শামসুদ্দিন দামাগানী রহমাতুল্লাহ-এর শিষ্যত্ব গ্রহণ করার জন্য। প্রথম দর্শনেই মাওলানা শামসুদ্দীন রহমাতুল্লাহ সাহেব তার প্রতি কেমন যেন অনুপম ও আকর্ষণ অনুভব করলেন। তিনি প্রথম দেখাতে বুঝতে পারলেন যে উক্ত ছেলেটির মধ্যে বিরাট প্রতিভা লুকায়িত আছে। তিনি সানন্দে নিজাম উদ্দিনকে শিক্ষা দিয়ে মানুষ করলেন। তখন ছিল প্রাচীনকাল। আর সেই সময়টায় ছিল দিল্লীর অধিস্বর সুলতান গিয়াসউদ্দিন বলবন। তিনি মাওলানা শামসুদ্দিন দামগানী এর তার পাণ্ডিত্য, কামালিয়াত ও বুযুর্গীর প্রতি খুবই শ্রদ্ধাবান ছিলেন। তিনি তাঁর পাণ্ডিত্যের ন্যায্য মূল্য স্বরূপ তাঁকে ‘শামসুল মূলক’ উপাধিতে বিভূষিত করেছিলেন। ধর্মীয় শাস্ত্র ফিকাহ, উমমূল আকায়েদ, সাহিত্য ইত্যাদি বিষয়ে জ্ঞান লাভ করার পর হযরত নিজামউদ্দিন আউলিয়া রহমাতুল্লাহ হাদীস শরীফে উচ্চতর শিক্ষা লাভের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেন এবং তৎকালীন দিল্লীর সর্বশ্রেষ্ঠ বুজুর্গ ও হাদিস বিমারদ হযরত মাওলানা কামালউদ্দিন রহমাতুল্লাহ-এর খেদমতে হাজির হন এবং তাঁর সাহচর্যে হাদিস বিষয়ক কিতাবাদি অধ্যয়নে ব্রতী হন ও সুখ্যাতির সাথে জ্ঞানার্জন করেন। তখন হাদীস বিশারদ মাওলানা আহমদ তাবারিজির স্থানও ছিল অতি উচ্চে। তাঁর চেয়েও তিনি অধিক জ্ঞানী বলে সমধিক প্রসিদ্ধি লাভ করেছিলেন।

শুধুমাত্র হাদীস শরীফেই তার শিক্ষা সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি একাধারে যেমনি একজন সুপণ্ডিত ও শাস্ত্রকার ছিলেন তেমনি জ্যোতির্বিদ্যা, গণিত শাস্ত্র, তফসীর, বালাগত, উমূল, ফিকাহ, আকায়েদ, ইতিহাস ও সাহিত্য সম্পর্কেও বিভিন্ন মাশায়েখদের নিকট হতে প্রভুত জ্ঞান অর্জন করেছিলেন। একই সাথে তার তীক্ষ্ণ ধ্যান শক্তি তাকে প্রতুৎপন্নমতি, অসাধারণ ধৈর্য ও সহনশীলতা মনজিলে মকসুদে পৌছে দিল। তাঁর মধ্যে কোনরূপ আড়ম্বর প্রিয়তা ছিল না। সবসময়ই তিনি সহজ সরল জীবন যাপন করতেন। তার পাণ্ডিত্য সকলকেই বিমুগ্ধ করে তুলেছিল।

তরিকতে বিশেষ বুৎপত্তি লাভ ? মহান খােদা প্রিয় বান্দা মাহবুবে ইলাহী হযরত নিজাম উদ্দিন আউলিয়া রহমাতুল্লাহ এলমে জাহেরের সাথে সাথে এলমে বাতেনের প্রতিও আকৃষ্ট হয়ে পড়ে ছিলেন। তিনি মনে করেছিলেন, কিতাবী জ্ঞান কেমন যেন অপূর্ণ রয়ে গেল। জাহেরী ভাবে ধর্ম পুরােপুরি লাভ হয় না। তাই একমাত্র বাতেনের মাধ্যমেই কিছু আধ্যাত্ম সাধনায় গভীর মনােযোগের সাথে আত্মনিয়ােগ করেন।

তিনি ভাবতেন কিভাবে এলমে বাতেনের পরিপূর্ণতা লাভ করা যায়, তজ্জন্য তিনি তৎকালী বাতেনের শিক্ষা লাভ করার জন্য শায়খ নাজিমউদ্দিন মুতাওয়াকিল রহমাতুল্লাহ দিল্লীর বিখ্যাত তাশতদার মসজিদের হুজরাখানায় অবস্থান করতেন। তিনি ছিলেন তদাস্তীন সর্বশ্রেষ্ঠ অলিয়ে কামেল হযরত বাবা ফরিদ উদ্দি গঞ্জেশকর রহমাতুল্লাহ-এর ছােট ভাই। তরিকতের ক্ষেত্রে তিনি গঞ্জেশকর রহমাতুল্লহ-এর পথই অনুসরণ করে চলতেন। | অয্যোধ্যার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়ে তিনি হিজরী ৬৫৫ সালের ১০ই রজব তিনি শায়খ ফরিদ উদ্দীন গঞ্জেশকর রহমাতুল্লাহ খানকায় উপস্থিত হন। তাঁর খানকা শরীফ ছিল অয্যোধ্যায় । নিজামুদ্দিন আউলিয়া রহমাতুল্লাহ হযরত শায়খ ফরিদ গঞ্জেশকর রহমাতুল্লাহ-কে পরম শ্রদ্ধাভরে কদমবুসি করলেন। প্রথম পর্বেই যেন সােনার সােহাগার মিলন ঘটল। গঞ্জেশকর রহমাতুল্লাহ-এর যা কিছু দেবার ছিল, এর সবই মাহবুবে ইলাহী রহমাতুল্লাহ কে দান করলেন। তিনি স্বীয় চারতফি টুপী পরিয়ে দিলেন। স্বীয় খড়ম জোড়া ও খেরকাত তাকে দান করলেন।

উক্ত যে সমস্ত চাৱতফিওয়ালা টুপি খড়ম তাঁর ছিল, ঐগুলাে যে তার কাছে অমূল্য রতন রূপে মনে হলাে, তার পর তিনি বললেন, আল্লাহর যে নেয়ামত আমার কাছে ছিল তা কাউকে দান করার কথা আমি ভাবছিলাম। পরক্ষণেই তিনি ভাবছিলেন হিন্দুস্থানের বেলায়েত কাকে দেয়া যায়, এ নিয়েও চিন্তা ভাবনার অন্ত ছিল না। এমন সময় গায়েৰী আওয়াজের মাধ্যমে তাকে জানানাে হল ধৈয্য ধর, নিজামউদ্দিন আসছে, হিন্দুস্থানের বেলায়েত তাকেই দান কর। এই রূপ ভাবেই হযরত নিজামুদ্দিন তার ওস্তাদের কাছ থেকে এলমে মারেফাতের, বেলায়েত লাভ করে ইসলাম প্রচার ও প্রসারের কাজে নিজেকে মনােনিবেশ করিলেন।

মুর্শিদের দরবারে গিয়ে আধ্যাত্মিকতা শিক্ষা নিলেনঃ মুর্শিদের দরবারে তিনি মারেফাতের কামিলিয়্যাত হাসিলের বিশেষ সুযােগ পেয়েছিলেন। তিনি যে দরবারে উপস্থিত হয়েছিলেন তা ছিল সেকালের বিখ্যাত দরবার শরীফ। যার কথা পূর্বেই বর্ণনা করেছি। যে হযরত শায়খ ফরিদ উদ্দিন গঞ্জেশকর রহমাতুল্লাহ-এর দরবারে সদা সর্বদাই বিখ্যাত সাধক ও আউলিয়াদের পদাচারণে অলংকৃত ছিল এবং তাদের সকলেই সাধ্যত পবিত্র দরবারের কাজে থাকতেন, আর দরবারের কাজেই তারা নিজেদের আধ্যাত্মিক উন্নতির মূল প্রেরণ বলে মনে করতেন। সেখানে অত্যন্ত দীনহীন বেশে সামান্য পানাহার গ্রহণ করে তারা এলমে মারেফাতের তালীম ও তরবিয়তি দ্বিধাহীন চিত্তে গ্রহণ করতেন এবং আল্লাহ ও রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পবিত্র মুহব্বত লাভের দিকে ধাপে ধাপে এগিয়ে যেতেন, মারেফাত আয়ত্ব করার জন্যে।

কথিত আছে যে, হযরত গঞ্জেশকর রহমাতুল্লহ-এর মুরীদগণের মাঝে বেশি সংবেদন ছিলেন মাহবুবে ইলাহী রহমাতুল্লাহ । একদিনের ঘটনা। তার সেদিন বাজার করার কথা, এমনকি নিজের কাছেও পয়সা ছিল না, হযরত নিজামউদ্দীন ভাবলেন সামান্য লবণ বা লবণ ছাড়া কোন ক্রমেই খাওয়া যাবে না। সেই জন্য তিনি অপর এক পীর ভাইয়ের কাছ হতে কিছু পয়সা ধার গ্রহণ করে লবণ খরিদ করে তরকারী পাক করে, হযরত গঙ্গেশকর রহমাতুল্লাহ-এর সামনে পরিবেশন করলেন।

উক্ত ঘটনা কিন্তু পীর সাহেবের অগােচরে সংঘটিত হয়েছিল। যখন খাদ্য পরিবেশনের সময় হল, তিনি পীর কেবলা হযরত গঞ্জেশকর এর সামনে খাদ্য পরিবেশন করা মাত্রই তিনি বলে উঠলেন, আহাৰ্য্য বস্তু প্রত্যক্ষ করে আমি জানতে পারলাম যে উক্ত আহাৰ্য্য বস্তুতে অপচয়ের গন্ধ মিশে আছে। এই তরকারীতে ব্যবহৃত লবণ কোথা হতে সংগ্রহ করা হয়েছে?

মাহবুবে খােদা হযরত নিজামউদ্দীন রহমাতুল্লাহ বিপাক পড়ে গেলেন, তিনি বিনীত ভাবে বললেন হুজুর লঙ্গর থানায় লবণ ছিল না। এমনকি আমার কাছেও কোন পয়সা। কড়ি ছিল না, ঋণ গ্রহণ করে সামান্য লবণ কিনে তরকারী পাক করলে হযরত আপনি তরকারী খেতে পারবেন এই মনে করে লবণ কিনেছি, হুজুর বললেন, ঋণ করা তরকারী কিছুতেই খাওয়া যাবে না। বরং এর চেয়ে মৃত্যুবরণ করাই শ্রেয়। তিনি বললেন, এ তরকারী সবগুলাে গরীব মিসকিনদের মধ্যে দান করে দাও।

মাহবুবে খােদা হযরত নিজামুদ্দিন রহমাতুল্লাহ তৎক্ষণাৎ উক্ত তরকারীগুলাে ফকির মিসকিনদের মধ্যে বিতরণ করে দিলেন। তিনি জীবনে এরূপ কাজ আর করবেন না বলে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হলেন। এবং আল্লাহর দরবারে তওবা করে মুনাজাত করলেন। এই তওবার কথা শুনে পীর, কেবলা খুশী হয়ে স্বীয় আসনের কম্বল খানি হযরত মাহবুবে ইলাহী রহমাতুল্লাহ কে দান করলেন।

হিজরী ৬৫৫ সালের ১০ই রজব হতে পরবর্তী সালের ২রা রবিউল আউয়াল পর্যন্ত তিনি তালিম, তারবিয়াত ও তাওয়াজ্জ্বত গ্রহণ করে ছিলেন। ১০ই রজব হতে পরবর্তী সালের ২রা রবিউল আউয়াল পর্যন্ত একটি বছর পর্যন্ত হযরত নিজামুদ্দিন আউলিয়া রহমাতুল্লাহ স্বীয় পীর ও মাের্শদে কামেল হযরত শায়িখ ফরিদ উদ্দীন গঞ্জেশকর রহমাতুল্লাহ এর দরবারে অতিবাহিত করেছিলেন। ঐ সময়ে তিনি রিয়াজত ও মােজাহাদার মাধ্যমে উত্তরােত্তর উন্নত স্তরে সমুন্নতু হয়েছিলেন।

ওয়াদা পালনে তিনি ছিলেন আদর্শের মূর্ত প্রতীক ও মহান রাব্বল আলামীনের অলীগণ কৃত অঙ্গিকারের প্রতি সর্বদাই ছিলেন সতর্ক। কারণ তারা এ জগতকে উপেক্ষার দৃষ্টিতে দেখেন এবং এ জগতকেই একমাত্র মুক্তির পথ বলে স্বীকার করেন না। এ জগতকে তারা সাধারণ জীবনে অর্থাৎ জীৰ আত্মার আবাস স্থান হিসেবে মনে করেন, কিন্তু সাধক জীবন আরম্ভ হবে মৃত্যুর পরে এ বিশ্বাসে তারা বিশ্বাসী। কাজেই প্রথমতঃ ব্যক্তি কেন্দ্রিক দায়িত্ব ও কর্তব্য। এখানে বলা হয়েছে জীবনকে দুই ভাগে ভাগ করার কথা। প্রথম ভাগ বলতে ব্যক্তি কেন্দ্রিক দায়িত্ব কুর্তব্য। এবং দ্বিতীয়তঃ সমষ্টিগত বা সামগ্রিক দায়িত্ব। ওয়াদা পালন ব্যক্তি দায়িত্ববান ও সমষ্টি উভয় ক্ষেত্রেই সমভাবে প্রযােজ্য। ওয়াদার বরখেলাপ, জীবনে যেমন নানা রকম অসুবিধা দেখা দেয়। তেমনি সমষ্টিগত সমাজ ও জাতীয় জীবন এর ক্ষতিকর প্রভাব কোন অংশেই কম হয় না। সুতরাং এর পরিপ্রেক্ষিতে আল কুরআনে ও সহী হাদিসে ওয়াদা পালনের প্রতি জোর তাগিদ দেয়া হয়েছে। এমন কি ওয়াদা ভঙ্গ করার কুফল সুস্পষ্ট ভাবে তুলে ধরা হয়েছে। তিনি সর্বাগ্রে ওয়াদা পালনের পথ বেছে নিতেন অন্যথায় প্রয়ােজনবােধে অন্যান্য কাজকর্মে মনােনিবেশ করতেন।

নিজামুদ্দিন আউলিয়ার চিল্লা, নিজামুদ্দিন আউলিয়ার বাসস্থান, হুমায়ুন এর সমাধির উত্তর-পুর্ব দিকে

নিজামুদ্দিন আউলিয়ার চিল্লা, নিজামুদ্দিন আউলিয়ার বাসস্থান, হুমায়ুন এর সমাধির উত্তর-পুর্ব দিকে-দিল্লি

দিল্লীর সম্রাটদের অনেকেই মাহবুবে ইলাহী হযরত খাজা নিজামউদ্দীনের মুরিদ ছিলেন। সম্রাটের পুত্র শাহাজাদা খেজেরখাও হযরতনিজামুদ্দিন রহমাতুল্লাহ এর নিকট বয়াত গ্রহণ করেন। এ সকল আমীর শাহাজাদাদের সাথে মাহবুব ইলাহী রহমাতুল্লাহ যেমন ব্যবহার করতেন ঠিক তেমনি ব্যবহার, একজন গরীব দুঃখীর সাথেও তিনি করতেন। ধনী গরীব উচু নীচুর কোন প্রভেদ তার দরবারে ছিলাে না। | বিশ্ববিখ্যাত সম্রাট এ যুগবরেণ্য আউলিয়া, নিজামউদ্দীন আউলিয়ার খানকাহর জন্য পঞ্চাশ হাজার রৌপ্য মুদ্রা সুনির্দিষ্ট করেন এবং আমীর কাশেফ হাজের এর মাধ্যমে এ মহান আউলিয়ার নিকট প্রেরণ করলেন। আমীর কাশেফ হাজের উক্ত মুদ্রা নিয়ে হযরত নিজামউদ্দীন আউলিয়া রহমাতুল্লাহ এর সন্দিধানে উপস্থিত হলেন। কিন্তু হযরত নিজামউদ্দীন আউলিয়া রহমাতুল্লাহ পূর্বকৃত ওয়াদার কারনে আমীর কর্তৃক প্রদত্ত রৌপ্য মুদ্রার প্রতি মােটেও তাকালেন না। বরং পূর্ব ওয়াদা পালনের যাবতীয় উপক্রম তিনি গ্রহণ করলেন।

হযরত মাহবুবে ইলাহি রহমাতুল্লাহ বললেন, আমি পূর্বকৃত ওয়াদা সংক্রান্ত কাজে খুবই ব্যস্ত আছি এ সময় অন্য কিছুর প্রতি নজর দেয়া আমার পক্ষে মােটেই সম্ভব নয়। পঞ্চাশ হাজার রৌপ্য মুদ্রা অপেক্ষা ওয়াদা, পালনের মূল্য আমার নিকট বেশি আমি মনে করি, ওয়াদা পালন করা আটটি বেহেশত হতেও উত্তম। বাদশাহের আমীর প্রদত্ত টাকা নিয়ে ফিরে গেলেন এবং টাকা পয়সা ও অর্থ কড়ির প্রতি হযরত নিজামুদ্দিন আউলিয়ার রহমাতুল্লাহ এর বীতশ্রদ্ধ ভাবের ভূয়সী প্রশংসা করলেন। দিল্লীর সম্রাট এতে মােটেও বিরক্ত ভাব প্রকাশ করলেন না। বরং সহাস্য আনন্দে প্রেরিত রৌপ্য মুদ্রার তােড়া সযত্নে তুলে রাখলেন।

মাহবুবে খােদা হযরত নিজামুদ্দিন রহমাতুল্লাহ এর উপদেশাবলী :

(ক) অহংকার ধ্বংসের মূলঃ এ বিশ্ব জগতেযতগুলাে ধ্বংসকারী উপাদান আছে তন্মধ্যে অহংকার ও গর্ব সবচেয়ে ক্ষতিকর। তার কারণ স্বরূপ মহান রাব্বল আলামীন পবিত্র কোরআনে অহংকার বর্জনের জন্য বার বার তাকীদ করেছেন। আল-কুরাআনে ঘােষণা করা হয়েছে, “আল্লাহ পাক অহঙ্কারীকে পছন্দ করে না।” হাদীস শরীপে আছে , নবী করীম (সঃ) এরশাদ করেছেন, “অহংকার মানুষকে ধ্বংসের পথে পরিচালিত করে। কাজেই এ অহংকার ও গর্ব করা থেকে নিজেকে রক্ষা করতে না পারলে কোন ব্যক্তি আধ্যত্ম সাধনায় যেমন উন্নতি লাভ করা যায় না তেমনি তার পতনও হয় অনিবার্য। আল্লাহপাকের আজাব এবং গজৰ অহংকারীর উপর অবশ্যই পতিত হয়ে থাকে। ফেরাউনের কাহিনী নমরূদ ও সাদ্দাদের কাহিনী এবং তাঁদের সমূলে বিনাশ হওয়ার যে কারণ লক্ষ্য করা যায় তা ছিল অহঙ্কার। | একান্ত ভাবেই মানুষের পক্ষে অহংকার ও অহমিকা নানা ভাৰে প্রকাশ পেতে পারে। ধন, জনবল, বাহুবল এবং বুদ্ধি চাতুরতার তীক্ষ্ণতা অধিকাংশ সময় মানুষকে অহংকারী করে তােলে। যাহা হউক, অহংকার এর ছোঁয়া’ হতে বেঁচে থাকা বড়ই দুঃসাধ্য ব্যাপার। | (খ) আল্লাহকে পাওয়া খুবই কঠিন, অথচ আবার একেবারেই সােজা । এখন বান্দা শব্দের শাব্দিক অর্থ হচ্ছে দাস বা গােলাম। গােলামের উচিত স্বীয় মনিবের প্রতি পূর্ণ আস্থা ও আনুগত্য প্রদর্শন করা এবং বিনিময়ের মাধ্যমে বান্দার প্রতি আল্লাহ পাকের অশেষ বরকত ও রহমতের ধারা বর্ষিত হতে থাকে। ফলে বিনয়ী বান্দাহ তার মহামানব আল্লাহ পাকের রহমত ও বরকত লাভে ধন্য হয়। রসূলে পাক (সঃ) বলেছিলেন, তােমরা বিনয় ও নম্রতা অবলম্বন কর। কেননা, বিনয় এবং তার মাঝে পরিপূর্ণ সফলতা বিদ্যমান। দুনিয়ার জীবনে আমরা যে সকল লক্ষ্য উদ্দেশ্য সাধন করার জন্য মনস্থ করে থাকি এগুলাে যতখানি সহায়তা স্থান করতে পারে, তার চেয়ে সঠিক উপকারী সহায়ক উপাদান হল বিনয় ও নম্রতা। বিনয়ী লােকের কোন শত্রু থাকে না। কারণ তার সহজাত বিনয় শক্রতা সাধনের পথকে চিরতরে রুদ্ধ করে দেয়। সুতরাং ইহলৌকিক ও পরলৌকক যাবতীয় কর্মকান্ডে সফলতা অর্জন করতে হলে বিনয় ও নম্রতা দৃঢ়ভাবে ধারণ করা একান্ত দরকার।

(গ) অনিষ্টের মূল কারণ সমূহ হচ্ছে রিপুর তাড়নায় গর্হিত কাজের ভিত্তমূর রচনায় কাম, ক্রোধ, মােহ, লোেভ ও মাৎসর্য্যঃ এ বিশ্ব ভ্রামাণ্ডের মাঝে মানব দেহের যে সকল ইন্দ্রিয় রয়েছে তন্মধ্যে ছয়টি ইন্দ্রিয় খুবই কার্যকরী ভূমিকা পালন করে থাকে, ইন্দ্রিয়গুলাে হচ্ছেঃ (১) চোখের দৃষ্টি শক্তি (২) কানে শ্রবণ শক্তি (৩) নাকের ঘ্রাণ শক্তি (৪) জিহবার আস্বাদন শক্তি (৫) ত্বকের স্পর্শ শক্তি ও (৬) দেহের জৈবিক তাড়না শক্তি।

উপরােক্ত ছয়টি শক্তি হতে যে সকল কু-রিপু মানুষের মাঝে আত্ম প্রকাশ করে তা হলাে কাম, ক্রোধ, লোভ, মােহ, মৎস্য। এ রিপুগুলাে যখন কোনও মানুষের মাঝে শাখা প্রশাখা ও পত্রপল্লবে পরিব্যক্ত হয়ে উঠে, তখন তার স্বাভাবিক মানবীয় গুনাবলী লােপ পায় এবং সে ক্রমে ক্রমে পশু স্বভাৰ ধারণ করে। তজ্জন্য মানুষ রূপে জন্মগ্রহণ করেও সে আর মানবীয় সত্তারূপে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পার না। এ জন্য কাম, ক্রোধ, লােভ, মােহ, মদ এবং মাৎসর্য্যকে কঠোর সাধনার মাধ্যম অবদমিত করে তুলতে পায়। তা না হলে সমূহ ক্ষতির সম্ভাবনা দেখা দেয়া মােটেই বিচিত্র নয়। | এ আধুনিক ধরার বুকে মানুষ উছিলা স্বর রাজ্য ও রাজা কিংবা কোনও নেতার সংস্পর্শহীন ভাবে কোন ক্রমেই টিকে থাকতে পারে না। প্রতিটি মানুষের জন্য একটি আবাসভূমির দরকার এবং ভূখন্ডের শান্তি, শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তার রক্ষার জন্য একজন সুদক্ষ রাজা ৰা প্রশাসক থাকা একান্ত অপরিহার্য। তা না হলে রাজ্যে বিশলা ও অশান্তি দেখা দেয়া স্বাভাবিক।

আধ্যাত্মিকতার ভাষায় রাজ্য বলতে এখানে বুঝায় দেহকে এবং মন হল তার রাজা বা শাসক। মনের কার্য প্রতিক্রিয়া অনুসারে দেহের যাবতীয় অঙ্গ প্রতঙ্গ পরিচালিত হয়। তাই দেহ রাজ্যকে নিয়ন্ত্রণ করতে হলে মনকে কঠোর সাধনার বা সংযমের মাধ্যমে, শয়ন্ত্রণ করতে হবে। অতএব, মানুষের চিত্তবৃত্তিকে আল্লাহর পথে পরিচালিত করার জন্য যে কঠোর প্ররিশ্রম ও সাধনার দরকার, তাকেই জেহাদে আকবার হিসেবে ধরে নেয়া হয়।

ইন্তেকালঃ- ঐতিহাসিকের মতে হিজরী সাতশ পঁচিশ সালের ১১ই রবিউল আওয়াল মাসে দিল্লীর আকাশে বাতাসে দেখা গিয়েছে কাল মেঘের ঘনঘটা। দীর্ঘ ৮৯ বছর দ্বীন ও ইসলামের খেদমতে অতিবাহিত করে খাজা মাহবুবে ইলাহী সুলতানুল আউলিয়া হযরত নিজামুদ্দিন রহমাতুল্লাহ মহান প্রভুর চূড়ান্ত সান্নিধ্যে উপস্থি হলেন। তার মৃতুল পর দিল্লী তথা মুসলিম জাহানের ভাগ্যকাশে নেমে এল মহাদুর্যোগ। | মাহবুবে এলাহি খাজা নিজামুদ্দিন আউলিয়া রহমাতুল্লাহ এর ইন্তেকালের পর অগণিত লােকের ঢল নেমে আসল গিয়াসপুরে। সকলের মাঝেই কেমন যেন এক শােকের ছায়া, বেদনার সুর। কি যেন ছিল কি যেন নাই, কেমন যেন এক শােকার্ত হাহাকারের দিল্লীর আকাশ বাতাস ভারী হয়ে উঠল। দিল্লীর আনাচে কানাচে একই ক্রন্দন রােল। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইল্লাহি রাজিউন। * হযরত খাজা নিজামুদ্দিন আউলিয়া রহমাতুল্লাহ যতদিন এ পৃথিবীর বুকে জীবিত ছিলেন, ততদিন কেউ তার মর্যাদা, ফযিলত ও রূহানী জগতের অবস্থা সম্পর্কে পুরােপুরি এয়াকেবহাল ছিল না। তবে যারা তার সত্যিকারে মর্যাদা ও ফযিলত সম্পর্কে সচেতন ছিলেন, তাদের মােঝেই তার বিরােধ বেদনার সুর প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছিল। যে দিকেই তাকানাে যায়, সে দিকেই শুধু হাহাকারের বেদনার একান্ত বিলাপ। কবি প্রকৃতই বলেছিলেন, তােমার হৃদয়ে যে কি সুর ছিল । কাঁদিছে তাই মাের হিয়া, পাষাণ ভেদিয়া প্রবাহিত ধারা চির জনমের তরে ব্যথিত করিলে মােরে।

উপরােক্ত কবিতার ছন্দে অবশ্যই করুণ সুর এর আভাস পাওয়া যায়। সেই শােকের হায়া নেমে এসেছিল সারা দিল্লীর বুকে, জনমনে আজ আর কোন শান্তি নেই, আনন্দ নেই, নেই কোন সাচ্ছন্দ্য, তার তুলনা করা যায় না।

কোন কোন বর্ননায় জানা যায় হযরত নিজামুদ্দিন আউলিয়া রহমাতুল্লাহ ৮৯ বছর বয়সে রবিউল আখের চান্দের আঠার তারিখে হিজরী ৭২৫ সালে মৃত্যুবরণ করেছিলেন। মৃত্যু তারিখ সংক্রান্ত বর্ণনাগুলাে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, ১১ তারিখ এবং ১৮ আরিখের মাঝে প্রভেদ পাওয়া যায় তবে যাই হােক, তিনি যে তারিখেই মৃত্যুবরণ করুন না কেন তার মহা প্রস্থানে সারা ভারতীয় উপমহাদেশে জাতি-ধর্ম-বর্ণ গােত্র নির্বিশেষে কলের মাঝেই যে শােকের ছায়া এবং বেদনার ধরা নেমে এসেছিল একথা বলার অবকাশ রাখে না। মাহবুব ইলাহি হযরত নিজামুদ্দিন আউলিয়া রহমাতুল্লাহ এর মৃত্যুকষ্ট বা যাতনা প্রকাশ পাওয়ার পর দিল্লীর সুলতান তুঘলােক শাহ এবং বহু গুণগ্রাহী ব্যক্তি তার চিকিৎসার জন্য অধীর হয়ে উঠলেন। কিন্তু হযরত সুলতানুল আউলিয়া রহমাতুল্লাহ আর্থিব কোন চিকিৎসা কিংবা ওষুধের প্রতি মােটেই আগ্রহী ছিলেন না। তিনি সর্বদাই আল্লাহ পাকের জিকির এবং স্বরণে নিমগ্ন থাকতেন। জীবনের সকল অবস্থায় আল্লাহর ইবাদত বন্দেগী এবং হুকুম আহকাম পালন করার জন্য তিনি তৎপর থাকতেন। পৃথিবীরকোন বস্তুর প্রতিই তার কোন আকর্ষণ ছিল না। এ জন্য সম্রাট কর্তৃক প্রেরিত রাজ হেকিম যখন তার নিকট চিকিৎসার জন্য উপস্থিত হল তখন তিনি বললেন, ভালবাসার ব্যথায় পীড়িত ব্যক্তির একমাত্র ওষুধ হলাে আশেকের দিদার লাভ করা। এ ছাড়া কোন কিছুই তাকে সান্তনা দিতে পারে না। একথা বলার পর রাজ হেকিম চলে গেলেন। এর কিছুক্ষণ পরই হযরত নিজামউদ্দীন আউলিয়া রহমাতুল্লাহ এর প্রাণ বায়ু দেহ পিঞ্জর ছেড়ে অমর ধামে প্রস্থান করল। * এই মৃত্যুর ঘটনা মুহূর্তের মধ্যে চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ল। সম্রাট মােহাম্মদ তুঘলক এবং হযরত রুকুনুদ্দিন সােহরাওয়ার্দী গিয়াসপুরে ছুটে আসলেন। হযরত মাহবুবে এলাহি রহমাতুল্লাহ এর জীবদ্দশায় সম্রাট মােহাম্মদ তুঘলক কখনও তার দরবারে হাজির হওয়ার অনুমতি পান নাই। ফলে এ মহাপুরুষের মৃত্যুর পর তার অন্তিম ক্রিয়ার অংশগ্রহণ করতে সুযােগ লাভ করে নিজকে ধন্য মনে করেছিলেন। এবং তার চেহারা মােবারক এক নজর দেখে পরম স্বস্তি লাভ করেছিলেন। অসিয়ত অনুসারে তিনি তাকে যেন খানকায়ে সম্মুখে যে একটি বিরাট পুকুর বিদ্যমান ছিল সেই পুকুরের মাঝখানে যেন মৃত্যুর পরে দাফন করা হয়। ফলে ম্রাটের নির্দেশে অগণিত লােক পুকুর ভরাট করার কাজে যােগদান করল। অল্প সময়ের মধ্যেই সুচারু রূপে উক্ত পুকুরটি ভরাট হয়ে গেল এবং হযরত নিজামুদ্দিন আউলিয়া রহমাতুল্লাহ এর অন্তিম জানাযা স্বয়ং ম্রাটসহ দিল্লীর এবং আশপাশের সকল শ্রেণীর নাগরিকগণ অংশগ্রহণ করে রূহে মাগফেরাত কামনা করে তাকে চির বিদায়ে সমাহিত করলেন।

মনসুর হাল্লাজ এর জীবনী পড়তে এখানে ক্লিক করুন।

আব্দুল কাদের জিলানী-প্রেরণার উৎস বড় পীর আবদুল কাদের জিলানী (রহ.)

আব্দুল কাদের জিলানী-প্রেরণার উৎস বড় পীর আবদুল কাদের জিলানী (রহ.)

আব্দুল কাদের জিলানী রহমাতুল্লাহ।

বড়পীর আব্দুল কাদের জিলানীর নাম ও উপাধি-ঃ ইতিহাস পাঠে জানা যায়, রুহানী জগতের খাটি প্রজ্ঞাদাতা আউলিয়া কুলের শিরােমণি হযরত আবদুল কাদের জিলানী রহমাতুল্লাহ-এর কুনিয়াত আবু মােহাম্মদ। তার উপাধি মুহিউদ্দীন। ইতিহাসবিদদের দৃষ্টিকোণ থেকে জানা যায় পবিত্র ইরাকের অন্তর্গত ঝিলান নামক স্থানে জন্মগ্রহণ করেছেন বলে তাকে জিলানী বলা হত। সত্যি কথা বলতে হয়, তিনি সারা বিশ্বের সর্বসাধারণের নিকট এই আবু মুহাম্মদ মুহিউদ্দীন আবদুল কাদের জিলানী নামে পরিচিত হলেও ধরাধামের বিভিন্ন অঞ্চলে তাকে বিভিন্ন গুণবাচক লকবে ভূষিত করা হয়ে থাকে। আমাদের এতদঞ্চলে সাধারণতঃ তিনি কুতবুল আফতাব, গাওসুল আযম এবং বড় পীর নামেই প্রসিদ্ধ।

ইতিহাসের দৃষ্টিকোণ থেকে এ কথাও জানা যায় গাওসুল আযম বড় পীর আবদুল কাদের জিলানী রহমাতুল্লাহ-কে কোন কোন মহলের জনসাধারণ তাকে কুতুবে রাব্বানী নামেও অভিহিত করে থাকে। কোন কোন স্থানের লােকেরা তাকে পীরানে পীর দস্তেগীর আফযালুল আউলিয়া উপাধিতে ভূষিত করে থাকে। ঐতিহাসিকদের দৃষ্টিকোণ থেকে একথাও জানা যায়, কোন কোন স্থানে তিনি নূরে ইয়াযদানী নামেও পরিচিত। এমনি ভাবে তার আরও বহু গুণবাচক উপাধি রয়েছে। মুমীর লাখ নবী কর্তৃক রচিত সাওয়ানেহে ওমরী হযরত গাওসুল আযম নামক কিতাবে বহু কিতাবের হাওলা দিয়ে লিখিত হয়েছে। যে একদা সত্যের সৈনিক আউলিয়া কুলের শিরমণি রুহানী জগতের খাটি প্রজ্ঞাদাতা হযরত আব্দুল কাদের জিলানী ভ্রমণের উদ্দেশ্যে ঐতিহাসিক বাগদান শহরের বাইরে গমন করলেন। যাবার পথে পথিমধ্যে জনৈক ব্যক্তিকে দেখতে পেলেন, কৃশতা ও দুর্বলতাবশতঃ সম্পূর্ণ অক্ষম হয়ে পথের পাশে পড়ে আছে। পরিতাপের বিষয় হল জনৈক ব্যক্তি উঠবার জন্য পুনঃপুন আপ্রাণ চেষ্টা করছে কিন্তু দুর্বলতার কারণে পড়ে যাচ্ছে।

বিশ্ব নিয়ন্ত্ৰা আল্লাহ রাব্দুল আলামীনের অসীম রহমতে সে ব্যক্তি আকস্মাৎ মাহবুবে সােবহানী সাধক কুলে শিরমণি বড়পীর হযরত গাওসুল আযমের নুরানী চেহারা মােবারকের প্রতি দৃষ্টিপাত করে কাকুতি মিনতি সহকারে আরয করল, “হে ব্যথিতজনের পৃষ্ঠপােষক আল্লাহর ওয়াস্তে আমার দিকে দৃষ্টিপাত করুন এবং আপনার ঈর্ষা তুল্য ফু দ্বারা আমার মৃতপ্রায় দেহে নবজীবন দান করুন। যাই হােক তার কাকুতি মিনতী শুনে হযরত আব্দুল কাদের জিলানী রহমাতুল্লাহ দয়াপরবশ হয়ে পড়লেন এবং তার হস্ত ধারণপূর্বক-ইল্লাল্লাহ বলে তাকে জমিন হতে উঠায়ে দিলেন।

সত্যি কথা বলতে হয় মহান করুণার আধার আল্লাহ জাল্লাহ শাননুহর অসীম রহমতে হযরত গাসুল আযম বড়পীর আব্দুর কাদের জিলানী রহমাতুল্লাহ সাহেবের পবিত্র হস্তের পরশ লাগামাত্র সেই মরণােন্মুখ বৃদ্ধ সবুজ খােরমা বৃক্ষের ন্যায় সতেজ ও সবল হয়ে উঠে দাঁড়াইল এবং বলতে লাগল“হে মুহিউদ্দিন, আল্লাহর অসীম রহমতে আপনি আমাকে স্থায়ী জীবন দান করলেন। আপনি কি আমাকে চিনতে পেরেছেন? আমি আম্বিয়াকুল শিরমণি হযরত মুহাম্মদ (সঃ)এর ইসলাম ধর্ম। দুর্বলতাবশতঃ আমার এই মৃতপ্রায় অবস্থা হয়ে গিয়াছিল। বিশ্ব নিয়ন্ত্রা আল্লাহ রাব্দুল আলামীনের লাখ লাখ শোেকর তিনি আপনাকে সৃষ্টি করে আমাকে নবজীবন দান করেছেন। মহান করুণার আঁধার আল্লাহ জাল্লাহ শানুহুর তরফ হতে তাই আপনার উপাধি হল মুহিউদ্দিন, ধর্মকে সজীবকারী ।

যাই হােক তথা হতে বড়পীর গাওসুল আযম আব্দুল কাদের জিলানী রহমাতুল্লাহ বাগদাদে এসে মসজিদে প্রবেশ করলে তাকে দেখা মাত্রই একব্যক্তি হঠাৎ বলে উঠল-আসসালামু আলাইকুম ইয়া মুহিউদ্দিন। এরপর হতেই কেহ তাকে দেখলে মুহিউদ্দিন উপাধিতে সম্বােধন করতেন। ইতিহাস পাঠে এ কথাও জানা যায়-বড়পীর সাহেব মসজিদ থেকে নামাজ শেষ করে উঠলে সারা মসজিদে মহিউদ্দিন নামে উপাধি উচ্চারণে ধুম পড়ে গেল। সত্যি, আস্তে আস্তে তিনি সকলের নিকট মুহিউদ্দিন পথিত্বে পরিচিতি হয়ে গেলেন। ইতিহাসবেত্তা ও ইসলামী জ্ঞান তাপসগণ বলেন ইতিপূর্বে তার বহুল প্রচলিত উপাধি কেহই জানত না।

বংশ পরিচয় ও ইতিহাসের দৃষ্টিকোণ থেকে আমরা দেখতে পাই-মাহবুবে সােবহানী রুহানী জগতের খাটি প্রজ্ঞাদাতা বড়পীর হযরত আব্দুল কাদের জিলানী রহমাতুল্লাহ পিতা ও মাতার উভয় দিক হতে সাইয়্যেদ খানদানের সহিত সম্পর্কিত ছিলেন। ইতিহাস বেত্তারা বলেন, পড়পীর সাহেবের পিতার নাম হযরত সাইয়েদ আবু ছালেহ মুসা জঙ্গী দোস্ত। প্রিয় পাঠক পাঠিকার সুপ্ত হৃদয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে নামের শেষে কেন “জঙ্গী-দোস্ত” লাকবে ভূষিত করার কারণ ছিল, তিনি খুব আল্লাহ ওয়ালা, পরহেজগার লােক ছিলেন। ইসলামী জ্ঞানবীদগণ বলেন, তিনি ধর্মীয় জিহাদে অংশগ্রহণ করা খুবই পছন্দ করতেন। তাঁর মাতার নাম ছিল ফাতেমা। তার কুনিয়াত ছিল উম্মুল খায়ের। তিনি বিশ্বনিয়ন্তা আল্লাহ রাম্বুল আলামীনের খাছবান্দা ছিলেন।

ইতিহাস পর্যালােচনা করলে আমরা এ কথা দেখতে পাই তিনি একজন সুফী সাধক শ্রেষ্ঠ বুযুর্গ লােক-আবদুল্লাহ ছাওমাঙ্গের অতি আদরের কন্যা ছিলেন। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় আওলিয়া জগতের উজ্জ্বল নক্ষত্র তরীকত, হাকীকত, এবং শরীয়তে মােহাম্মদীয়া দিশারী হযরত বড়পীর সাহেব-এর পিতার উর্ধ্বতন বংশপরম্পরা সাইয়্যেদ কুলের শিরমণি হযরত ইমাম হাসান রাযিয়াল্লাহু আনহুর সহিত। এবং মাতার উর্ধতন বংশপরম্পরা সাইয়্যেদ কুলের গৌরব হযরত ইমাম হুসাইন ছিলেন, এই কারণে তাকে আলহাসানী ওয়াল’ হুসাইনী বলা হত। |

পিতৃবংশঃ রুহানী জগতের খাটি প্রজ্ঞাদাতা সুফী সাধক হযরত আব্দুল কাদের জিলানী রহমাতুল্লাহ ইবনে’ সাইেয়্যেদ আবু ছালে মুসা জঙ্গী-দোস্ত রহমাতুল্লাহ ইবনে সাইয়্যেদ আবু আবদুল্লাহ আলজিবিল্লী রহমাতুল্লাহ ইবনে সাইয়্যেদ ইয়াহইয়া যাহেদ রহমাতুল্লাহ ইবনে সাইয়্যেদ মােহাম্মদ রহমাতুল্লাহ ইবনে সাইয়্যেদ দাউদ রহমাতুল্লাহ ইবনে আবদুল্লাহ সানী রহমাতুল্লাহ ইবনে সাইয়্যেদ মুসালজুন রহমাতুল্লাহ ইবনে সাইয়্যেদ দাউদ রহমাতুল্লাহ আবদুল্লাহ আর মাহাস রহমাতুল্লাহ ইবনে সাইয়্যেদ হাসানুল মুসান্না রহমাতুল্লাহ ইবনে আমীরুল মু’মেনীন হযরত আলী ইবনে আবু তালে কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহু অর্থাৎ বেলায়েত জগতের সম্রাটের একাদশ ঔরসে সত্যের সেনানী সূফী সাধক হযরত বড়পীর ছাহেব রহমাতুল্লাহ আবির্ভূত হন।

মাতবংশ? গাওসুল আযম হযরত বড়পীর সাহেবের রহমাতুল্লাহ মাতা হযরত সাইয়্যেদা উম্মুল খায়ের আমাতুল জাবদর ফাতেমা বিনতে হযরত সাইয়্যেদ আবদুল্লাহ ছামাদ যাহেদ রহমাতুল্লাহ ইবনে সাইয়্যেদ আবু জামাল রহমাতুল্লাহ ইবনে সাইয়্যেদ মােহাম্মদ রহমাতুল্লাহ ইবনে সাইয়্যেদ মাহমুদ রহমাতুল্লাহ ইবনে সাইয়্যেদ আবুল আতা আবদুল্লাহ ইবনে সাইয়্যেদ কামালুদ্দীন ঈসা রহমাতুল্লাহ ইবনে সাইয়্যেদ আবু আলাউদ্দীন মােহম্মাদুল জাউয়াদ রহমাতুল্লাহ ইবনে সাইয়্যেদ আলীউররেযা রহমাতুল্লাহ ইবনে সাইয়্যেদ মুসা আল কাসেম রহমাতুল্লাহ ইবনে সাইয়্যেদুনা ইমাম জাফর সাদেক রহমাতুল্লাহ ইবনে সাইয়্যেদুনা ইমাম যাকের রহমাতুল্লাহ ইবনে সাইয়্যেদেনা যাইনুল আবেদীন রহমাতুল্লাহ ইবনে সাইয়্যেদুনা আমিরুল মু’মেনীন হযরত হুসাইন রাজিয়াল্লাহু আনহু ইবনে সাইয়্যেদুনা হযরত আলী কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহুর অষ্টাদশ ঔরসে জন্যগ্রহণ করেন। ঐতিহাসিকগণ বলেন, উপরােক্ত উভয় নসবনামার প্ররিপ্রেক্ষিতে তিনি হাসানী এবং হুসাইনী সাইয়্যেদ। |

জন্ম ইতিহাস পাঠে জানা যায়, হযরত গাওসুল আযম মহীউদ্দীন আব্দুল কাদের জিলানী রহমাতুল্লাহ চারশত সত্তর মতন্তরে চারশত একাত্তর হিজরী সনের পবিত্র রমজান মাসের পহেলা কিংবা ২১শে প্রসিদ্ধ জিলান শহরে সুবিখ্যাত সাইয়্যেদ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে জানা যায় প্রসিদ্ধ জিলান শহরটি পারস্য রাজ্যের অধীন পবিত্র ইরাক প্রদেশের অন্তর্গত একটি ক্ষুদ্র শহর যারা ইতিহাসের পাতায় সীলান নামেও পরিচিত। প্রিয় পাঠক পাঠিকার সুপ্ত হৃদয়ে প্রশ্ন হতে পারে যে হযরত আব্দুল কাদের জিলানী সাহেবের রহমাতুল্লাহ নামের শেষে কেন জিলানী সংযােগ করা হল জবাবে বলা যেতেপারে যে জিলানের সহিত সম্বন্ধযুক্ত বলে তাকে জিলানী অর্থাৎ জিলান দেশীয় বলা হয়। ইতিহাস বেত্তারা বলেন প্রসিদ্ধ জিলান শহরটি বাগদাদ হতে ওয়াসেতের পথে একদিনের পথ। কোন কোন ইতিহাস বেত্তারা বলেন ৪০০ মাইল দূরে অবস্থিত। | নামকরণ ইসলামী জআনবীদদের দৃষ্টিকোণ থেকে জানা যায়, আওলীয়াকুলের শিরমণি সুফী সাধক হযরত গাওসাল আযম আব্দুল কাদের জিলানী সাহেবের রহমাতুল্লাহ শুভ জন্মের কিছু সময় পরই নিখিল বিশ্বের ত্রাণকর্তা সুপারিশের কাণ্ডারী নবীয়ে সােজাহান হযরত মােহাম্মদ রহমাতুল্লাহ স্বীয় প্রধান সাহাবায়ে কেরামকে সাথে লয়ে সূফী সাধক সাইয়্যেদ আবু সালেহ মূসার বাসগৃহে তাশরীফ আনলেন এবং সাইয়্যেদ আবু সালেহকে লক্ষ্য করে অদৃশ্য জগত হতে বললেন, হে আবু সালেহ। এ পার্থিব জগতে তুমিই অধিক ভাগ্যবান। যেহেতু তােমার গৃহে, আওলীয়াকুলের শিরমণি রুহানী জগতের খাটি প্রজ্ঞাদাতা আল্লাহর ওলী আজ জন্মগ্রহণ করেছেন। তােমার ভাগ্যবান শিশুটির নাম রাখ মাহবুবে সোবহীন। সে পার্থিব জগতের মানুষের কাছে আব্দুল কাদের নামে অর্থাৎ মহাশক্তিমান আল্লাহতায়ালার বান্দা নামে। আমি খাস করে তােমার শিশুর জন্য দোয়া করিতেছি। তােমার শিশু যেন জগত মাঝে সুনাম সুখ্যাতি ছড়ায়ে অমর কীর্তি স্থাপন পূর্বক চিরস্মরণীয় হয়। এহেন কথা শুনে কার হৃদয়ে আনন্দ না হয়। দ্রুপই সত্যের সৈনিক সূফী সাধক আবু সালেহ, রহমাতুল্লাহ এই বিস্ময়কর অদৃশ্য বাণী শ্রবণ করে অতি মাত্রায় আনন্দিত হলেন এবং তখনই দুই রাকাত শােকরানার নামাজ আদায় করলেন। অতঃপর মহা করুণার আধার আল্লাহ জাল্লা শানহুর শাহী দরবারে অনেকক্ষণ যাবৎ মােনাজাত করলেন। | ফাযায়েলে গাওসিয়্যাহ নামক কিতাবে ইসলামের বীর সেনানী হযরত আলী রহমাতুল্লাহ হতে একটি রেওয়াতে বর্ণনা করা হয়েছে যে, সাইয়্যেদুর মুরসালিন হযরত মােহাম্মদ রহমাতুল্লাহ, তার জীবনকালে মাহবুবে সােবহানী আওলীয়াকুলের শিরমণি হযরত আব্দুল কাদের জিলানী রহমাতুল্লাহ সম্বন্ধে এরূপ দোয়া করেছিলেনঃ হে পরওয়ারদিগার আপনি আমার সেই নায়েবের প্রতি রহমত বর্ষিত করুন, যে আমার পরে ধরাধামে আনিভূত হবে সেই সাধক কুলের শিরমণি আমার হাদীসমূহ বর্ণনা করে আমার ধন শরীয়তের পথে পরিচালিত করবে।

ছেলে বেলার একটি কাহিনী ও ইতিহাস পাঠে জানা যায়, শাবান মাসের শেষ দিন। সন্ধ্যাবেলা আকাশে পবিত্র মাহে রমজানের চাঁদ উঠবে চাঁদ দেখার জন্য সবাই ভীড় ইমালেন। চাঁদ দেখে সকলে রােযা রাখবে, কিন্তু পরিতাপের বিষয় হল সেদিনের আকাশ ছিল মেঘলা। আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হওয়ার কারণে জিলানী অধিবাসীরা কেহই চাঁদ দেখিতে পারল না। যাই হােক পরের দিন রােযা রাখতে হবে কিনা এ নিয়ে জিলানী অধিবাসীরা তার পিতা যিনি হযরত আবদুল কাদের জিলানী রহমাতুল্লাহ সাহেবের বাবা ছিলেন সেকালে মশহুর আলেম, জিলান অধিবাসীরা সমস্যা সমাধানের নিরসন কল্পে হযরত আব্দুল কাদের জিলানী সাহেবের রহমাতুল্লাহ সনামধন্য পিতার কাছে এলেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় হল-এ সময় তিনি বাড়ী ছিলেন না। যাই হােক জিলান অধিবাসীদের সব কথাগুলাে হযরত সাইয়্যেদা ফাতেমা শুনলেন। তাদের কথা শুনে কিছুক্ষণ পরই সাইয়্যেদা ফাতেমা বললেন এটা তাে বাস্তব কথা যে চাদ দেখে রােযা রাখা উচিত। তবে আমার মনে হয় চাঁদ দেখা না গেলেও আজ পহেলা রমযান। জিলান অধিবাসীরা অনেকেই তার কথা মেনে নিলেন না। তারা সাইয়্যেদা ফাতেমাকে প্রশ্ন করলেন আপনি কিভাবে অনুধাবন করলেন যে আজ পয়লা রমযান। তিনি কিছু সময় ভাববার পর বললেন আজ আমার শিশু সন্তান-সেহরীর পর হতে আর দুধ পান করেনি। সত্যি শুনলে আপনাদের অবাক লাগবে, মুখে কিছু দিলেও সে খাচ্ছে না তাই আমার মনে হয় সে রােযা রেখেছে। তার আচরণ থেকে বুঝা যায় আজই প্রথম রােষা-সত্যি সাইয়্যেদা ফাতেমার পবিত্র মুখের কথাগুলাে শুনে সবাই অবাক হয়ে গেলেন বরং কেউ কোন প্রতিবাদ করল। ইতিহাস বেত্তারা বলেন পরদিনই অনেকেই মাহে রমযানের রােযা রাখলেন। | ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে এ কথাও জানা যায় যে হযরত সাইয়্যেদা ফাতেমার কথাই ঠিক।’ গতকালই ছিল মাহে রমযানের প্রথম দিন। একথা দিবালােকের ন্যায় সমুজ্জ্বল যে কতৰে কৰানী পীরে দাস্তেগীর হযরত শাহ মুহিউদ্দিন সাইয়্যেদ আবু মােহাম্মদ আব্দুল কাদের জিলানী রহমাতুল্লাহ ছােটবেলা হতেই একটু ভিন্ন প্রকৃতির ছিলেন। বর্তমান যুগের ছেলেদের মত হৈ হুল্লার মধ্যে দিয়ে তিনি কাটাতেন না। তাকে দেখা যেত চুপচাপ বসে কি যেন ভাৰতেন। ইতিহাস পর্যালােচনা করলে দেখা যায় তিনি নিরিবিলি থাকা পছন্দ করতেন। পূর্বেই আলােচিত হয়েছে যে, রুহানী জগতের খাটি প্রদাতা হযরত আব্দুল কাদের জিলানী সাহেবের রহমাতুল্লাহ, মাতা খুবই পরহেজগার ছিলেন। তার মাতা সর্বদা কোরআন শরীফ তেলওয়াত করতেন। এমন দেখা গেছে একটু সময় পেলেই তিনি কারআন শরীফ তেলাওয়াত করতেন তখন সত্যের সৈনিক আওলীয়াকুলের শিরমণি হযরত আব্দুল কাদের জিলানী রহমাতুল্লাহ, পাশে বসে শুনতেন। প্রিয় পাঠক-পাঠিকাগণ শুনলে অবাক হবেন, হ্যা অবাক হবার কথাও। মায়ের কোরআন তেলাওয়াত শুনেই তিনি পাৰ বছর বয়সের সময়ই মহাগ্রন্থ আল কোরানের আঠারাে পারা মুখস্ত করে ফেলেন। | একথা বাস্তব সত্য কথা যে হযরত আব্দুল কাদের জিলানী রহমাতুল্লাহ যে আল্লাহর প্রিয় বান্দা হলেন, আশং মাঝে যে তার নাম। তার নাম সােনালী অক্ষরে লিখা থাকবে-এইসব আলামত তার শিশু জীবন হতেই প্রকাশ পেয়েছিল। প্রিয় পাঠক-পাঠিকাগণ। একটু চিন্তা করে দেখুন আওলিয়া জগতের উজ্জ্বল নক্ষএ আব্দুল কাদের জিলানী রহমাতুল্লাহ যে আল্লাহর প্রিয় বান্দা হবেন তা উক্ত কাহিনীতেই সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ পেয়েছিল।

প্রাথমিক শিক্ষাঃ সত্যের সেনানী আওলিয়াকুলের উজ্জ্বল নক্ষত্র বড়পীর আব্দুল কাদের জিলানী রহমাতুল্লাহ সাহেবকে তার যােগ্য পিতা জিলান নগরীর একটি মক্তবে বিদ্যা শিক্ষা করার জন্য ভর্তি করান। মক্তবে ভর্তি হবার আগেই মাতার মুখে কোরআন তেলাওয়াত শুনে আল কোরানের বিরাট অংশ মুখস্ত করে ফেলেছিলেন। ইসলামী আনৰীদদের দৃষ্টিকোন থেকে একথাও জানা যায় যে, গাওসুল আযম হযরত বড়পীর সাহেবকে রহমাতুল্লাহ প্রথমে শিক্ষার উদ্দেশ্যে মক্তৰ্বের পাঠানাে হলে যাত্রাপথে পথিমধ্যে শেল ফেরেশতা এসে তাকে বেষ্টন করে রইলেন এবং তাকে তারা বেষ্টন করে শিক্ষা কেন্দ্রে নিয়ে গেলেন। ইতিহাস পাঠে একথাও জানা যায় হযরত বড়পীর সাহেবকে রহমাতুল্লাহ যখন মক্তবে নিয়ে যাওয়া হল তখন মক্তবে ছাত্রদের সংখ্যা অনেক ছিল। সবার কোন গান ছিল না, তখন হঠাৎ তার সঙ্গী ফেরেশতাগণ গায়েব হতে আওয়াজ দিলেন তােমরা বিশ্বনিয়া আল্লাহ রাব্দুল আলামীনের প্রিয় বান্দার জন্য স্থান প্রশস্ত করে দাও। সত্যি এহেন অদৃশ্য বাণী শুনে শিক্ষক-ছাত্রবৃন্দ চমকিয়ে উঠলেন। যাই হােক সাথে সাথে শিক্ষক ছাত্রগণ আগন্তুকের জন্য জায়গা করে দিতে নির্দেশ প্রদান করলেন। যাইহােক ছাত্রগণ তৎক্ষণাৎ পাশ্বেরর দিকে চেপে বসে মাহবুবে সােবহানী রুহানী জগতের খাটি প্রজ্ঞাদাতা হযরত আব্দুল কাদের জিলানী সাহেবের রহমাতুল্লাহ জন্য জায়গা করে [দিলেন। ইতিহাসে বেত্তাদের দৃষ্টিকোণ থেকে একথাও জানা যায় মক্তবে ভর্তি করার পর ওস্তাদজী আওলীয়াকুলের শিরমণি সূফী সাধক হযরত বড়পীর সাহেবকে রহমাতুল্লাহ একেবারে প্রাথমিক স্তরে পড়তে বললেন সত্যি, মাথার তাজ সমতুল্য ওস্তাদজীর নির্দেশ মােতাবেক তিনি সর্বপ্রথম আউযুবিল্লাহ এবং বিসমিল্লাহ পাঠ করলেন প্রিয় পাঠকপাঠিকাগণ শুনলে অবশ্যই অবাক হবেন। হ্যা অবাক হবারই কথাও। আউযুবিল্লহ এবং বিসমিল্লাহ পাঠ করতঃ আলিফ-লাম-মীম হতে আরম্ভ করে মহাগ্রন্থ আল কোরান কারীমের পনের পারার শেষ পর্যন্ত মুখস্ত পড়ে ফেললেন। শুধু মুখস্ত নয় বরং তারতীব তাজভীদ সহকারে পড়েছিলেন। তার পড়া শুনে ওস্তাদজী অবাক হয়ে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কিভাবে কার নিকট হতে এত সুন্দরভাবে কোরান পড়া শিখেছ এবং কি ভাবে পনের পারা কোরান শরীফ মুখস্ত করলে? ওস্তাদজীর কথাৰ জৰাৰে সত্যের সেনানী মাহবুবে সােবহানী হযরত বড়পীর সাহেব উত্তর করলেন-আমার মাতা পনের পারা কোরআন শরীফের হাফেজ, তিনি তাহা প্রত্যহ তেলওয়াত করে থাকেন। তার তেলয়াত শুনে আমারও মুখস্ত হয়ে গেছে। ইতিহাস বেত্তারা বলেন, হযরত বড়পীর সাহে রহমাতুল্লাহ সেই পনের পারার হাফেজ হয়ে দুনিয়ায় আসেন। তিনি যখন গায়ের মক্তবে পড়াশুনার জন্য ভর্তি হন, তখন তার বয়স ছিল মাত্র পাঁচ বছর। তবে বয়সের দিক দিয়ে কম হলেও পড়াশুনায় ছিলেন খুবই মনােযােগী। অল্পলিনের মধ্যে তিনি অনেক কিছু শিখে ফেললেন। এমনও দেখা গেছে অন্য ছাত্ররা সাতদিনে যতােটুকু পড়া আয়ত্ত করতে পারে নাই রুহানী জগতের খাটি প্রদাতা মাহবুবে সােবহানী হযরত আব্দুল কাদের জিলানী রহমাতুল্লাহ তা দু’এক দিনেই আয়ত্ব করে ফেলতেন। ভাল ছাত্র হিসাবে তার সুনাম সুখ্যাতি মক্তবের বাইরেও ছড়ায়ে পড়লাে। সত্যি, ওস্তাদগণ বড়পীর সাহেবের মেধার অবস্থা দেখে লােকমুখে বলতে লাগলেন আব্দুল কাদের ভবিষ্যতে নামকরা আলেম হবেন। রুহানী জগতের খাটি প্রজ্ঞাদাতা সত্যের সৈনিক বড়পীর সাহেব রহমাতুল্লাহ শুধু পড়েই সন্তুষ্টি ছিলেন না, জীবন জগৎ ও প্রকৃতি সম্পর্কে গভীরভাবে চিন্তা করতেন। তাকে এমনও দেখা গেছে যখন যে বিষয়ে পড়াশুনা করতেন তা শেষ না করে ক্ষান্ত হতেন না, ওস্তাদগণকে আদৰ সহকারে নানারকম প্রশ্ন করতেন, যে প্রশ্নগুলাে ছিল অনেক উচ্চস্তরের। শিক্ষকগণ বড়পীর সাহেবের অদম্য জ্ঞান-পিপাসা ও বুদ্ধির তীক্ষ্ণতা দেখে অবাক হয়ে যেতেন। আর দুহাত তুলে মহান করুণার আধার আল্লাহ জাল্লাহ শানুহুর শাহী দরবারে তার জীবনের উন্নতির জন্য দোয়া করতেন। ঐতিহাসি দৃষ্টিকোণ থেকে জানা যায় পরিতাপের বিষয় হল মক্তব্যের শিক্ষা সমাপ্ত হতে না হতেই তার পিতা দুনিয়া থেকে বিদায় নেন। পিতার ইহধাম ত্যাগের পর থেকে সংসারের যাবতীয় ভার পরে মাহবুবে সােবহানী হযরত আব্দুল কাদের রহমাতুল্লাহ-এর উপর। সাংসারিক অবস্থা তাদের তেমন ভাল না থাকায় নিজ হাতে অনেক কাজ করতে হয়। কিন্তু আল্লাহর অসীম রহমতে সাংসারিক ঝামেলার মধ্যে পড়া সত্ত্বেও তার বিদ্যাশিক্ষার আগ্রহকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। সাংসারিকত কাজ সমাধা করেই লেখাপড়ায় মনােযােগ দিতেন। এমনও দেখা গেছে-যেদিন পড়াশুনা না করতে পারতেন সেদিন তার মন খুব খারাপ থাকত। একথা সর্বজনবিদিত যে ছােট বেলা তেকেই মাহবুবে সােবহানী সুফী সাধক হযরত

আব্দুল কাদের জিলানী রহমাতুল্লাহ একটু ভিন্ন প্রকত্তির ছিলেন। ধর্মের প্রতি ঝোক ছিল। ধর্মের প্রতিটি হুকুম আহকাম মেনে চলতেন। ছােটবেলা হতেই তিনি বেশি কাত বলা পছন্দ করতেন না। তার সহপাঠীদের সাথেও কোনদিন একটু বাজে আলাপ করেননি। সর্বদা তার খেয়াল ছিল পড়াশুনার দিকে, কিভাবে জ্ঞান অর্জন করা যায়।

ইতিহাস পর্যালােচনা করলে দেখা যায় হিজরী ৪৮৮ সালে যবন তার বয়স ১৮ বৎসর, তখন তিনি মুসলিম বিশ্বের শ্রেষ্ঠতম রাজধানী ঐতিহাসিক বাগদাদে পদার্পণ করেন । উচ্চশিক্ষা অর্জন করতে হলে সে সময় বাগদাদে যেতেই হত। রাজধানীর বাগদাদের সনদই সে কালে উচ্চস্তরের সনদ বলে গণ্য হত। মাহবুবে সােবহানী সূফী সাধক হযরত আব্দুল কাদের জিলানী রহমাতুল্লাহ যে বসর বাগদাদ নগরীতে পদার্পণ করেন, সেই বৎসরই খলীফা আলমুস্তাহের বিল্লাহ, খেলাফতের আসন গ্রহণ করেন। ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে একাথাও সুস্পষ্টভাবে জানা যায় এই খলিফাও সেই ৪৭০ হিজরী সনেই জন, লাভ করেছিলেন। সে বৎসর রুহানী জগতের খাটি প্রজ্ঞাদাতা মাহবুবে সােবহানী হযরত বড়পীর আব্দুল কাদের জিলানী রহমাতুল্লাহ জন্মগ্রহণ করেন। বড়পীর সাহেব গ্রামের পাঠশালার পড়াশুনা শেষ করে বাগদাদের বিশ্ববিখ্যাত মাদ্রাসায়ে নিয়ামিয়তেই ভর্তি হলেন। এই নিযামিয়া মাদ্রাসার শিক্ষা ব্যবস্থা ছিল অনেক উন্নতমানের। এ সময় বাগদাদ নগরীতে ছানি এলেমের নামকরা প্রতিষ্ঠান ছিল। নুি তার মধ্যেও মাদ্রাসায়ে নিযামিয়া ছিল উর্ধ্বে। এই মাদ্রাসা থেকে পাশ করা ছাত্র সমাজের সকলের কাছে উচ্চ শিক্ষিত বলে পরিচিত ছিল। একথা বাস্তব সত্য কথা যে বিশ্বের সেরা ওবাছাই করা নামকরা ওলামায়ে কেরাম নিযামিয়া মাদ্রাসায়ে অধ্যাপনা করতেন। এই মাদ্রাসার শিক্ষকগণ আদ্যাত্মিক বিদ্যায়ও শ্রেষ্ঠ স্থান অধিকার করেছিলেন।

গাওসুল আযম বড়পীর আব্দুল কাদের জিলানী রহমাতুল্লাহ বাগদাদ এসেই কুরানের তাফসী ও কেতাৰ প্রভৃতি বিষয়ে পারদর্শিতা লাভ করেন। ইতিহাস পাঠে জানা যায়। সাহিত্যে তার ওস্তাদ ছিলেন সাহিত্য জগতের অন্যতম লেখক আৰু যাকারিয়া তিৰবিয়া। ইলমে ফেকাহ এবং উসুল শাস্ত্রের ওস্তাদ ছিলেন সেকালের নামকরা মুফল শেখ আকুল ওফা আলী বিন আৰুৱ। হাদীস পাঠে জানা যায় মাহবুবে সােবহানী সাধক স্কুলের শিরমণি হযরত আব্দুল কাদের জিলানী রহমাতুল্লাহ হাদীস শাস্ত্রের জ্ঞান অর্জন করেন শ্রেষ্ঠ হাদীসৰী আবুল বরকত তালহা আল আকুলী। আল্লাহর অসীম রহমতে হযরত আব্দুল কাদের জিলানী সাহেব রহমাতুল্লাহ অল্প বয়সেই সুমনা সুখ্যাতি নিয়ে নিযামিয়া মাদ্রাসার সর্বশ্রেষ্ঠ পরীক্ষা কামেল ক্লাশের সনদ লাভ করেন। এ বিদ্যা শিক্ষকালে সত্যের সৈনিক হযরত বড়পীর সাহেব অসীম। কষ্ট সহিষ্ণুতার পরিচয় দিয়েছেন। সে সম্পর্কে তিনি নিজেই বলেন, ‘আমার মনে যখন দুঃখ-কষ্ট বেশির ভাগ অনুভব হত তখন আমি মাটিতে শুয়ে ব্যাশ বাণী আল কোরানের এই আয়াতটি পড়াতাম- “ইন্নামাল উসরি ইউসরা” অবশ্যই দুঃখ-কষ্ট বিনে সুখ হয় না যাই হােক নানা দুঃখ-কষ্টের মধ্যে দিয়ে শিক্ষা জীবনের ৯টি বছর কেটে গেল।

ইতিহাস পাঠে একথাও জানা যায় সত্যের দিশারী আওলীয়া জগতের উজ্জ্বল তারকা হয়রত বড়পীর আব্দুল কাদের জিলানী সাহেব রহমাতুল্লাহ না করে সুনাম সুখ্যাতি নিয়ে তেরােটি বিষয়ে সনদ লাভ করেন। আরবী ভাষায় তার প্রচুর আন ছিল। অনলি আরবীতে কথা বলতে পারতেন, আরবী ভাষায় সুন্দর সুন্দর কবিতা লিখে কৰি ৰলেও পরিচিত ছিলেন। এক কথায় বলতে গেলে সেকালে মাহবুবে সােবহানী হযরত গাওসুল আযম পড়পীর সাহেবের মত সেরা ছাত্র ছিল না। ছাত্র হিসাবে তিনি যে অধিক মেধাবী ছিলেন উহা একটা ঘটনার মাধ্যমেই অনুধাবন করা যাবে। হাদীস শাস্ত্ৰেণয় সাফল্য অর্জন করার পর

তাকে যখন সাটিফিকেট দেওয়া হল, ঐ সময় তার ওস্তাদ তাকে বললেন হে আব্দুল কাদির, হাদীস শাস্ত্রে তােমাকে আজ আমরা যে সনদ দিচ্ছি, এটা একটা প্রচলিত নিয়ম মাত্র। তোমার মেধার এ নিয়ে পরিমাপ করা সম্ভব না। কেননা হাদীসের অনেক ব্যাখ্যা ও মর্মার্থ আ ই সময় তােমার সাথে আলােতনা করেই জানতে পেরেছি। সত্যের অগ্রনায়ক আওলীয়াকুলের শিরমণি বড়পীর সাহেব উচ্চশিক্ষা সমাপ্ত করে বসে রইলেই না। বিশ্ব নিয়া আল্লাহ রাব্দুল আলামীনের সান্নিধ্য লাভের জন্য তার ছিল দারুণ ইচ্ছা। শিক্ষা জীবন সমাপ্ত হবার পর থেকে দয়াময় আল্লাহর মহব্বত থাকে পাগল করে তুললাে।

সূফী সাধক হযরত আব্দুল কাদের জিলানী রহমাতুল্লাহ সাহেব সর্বদা ভাবতেন কিভাবে মহান করুণার আধার আল্লাহ জাল্লাহ শানহুর নৈকট্য লাভ করা যায়। আস্তে আস্ত দেখা গেল বড়পীর সাহেবের দুনিয়ার প্রতি কোন খেয়াল নেই। বড় বড় অলী আবদালের সােহবতে কাটালেন অনেকদিন। যাই হােক উন্নতি সাধনে গভীরভাবে মনােনিবেশ দিলেন। পার্থিব যাবতীয় সম্পর্ক ছিন্ন করে একনিষ্ট চিত্রে মহান করুণার অপার আপ্তাহ-জাল্লাহ শানহুর নৈকট্য লাভে ব্রতী হলেন। দুনিয়ার সকল প্রকার আরাম আয়শ ত্যাগ করে এমন কি মানুষের স্বাভাবিক খাদ্য ও ব্যবহার্য দ্রবাশি ত্যাগ করে বনে ফলমূল ও শাক-সবজি ইত্যাদি দ্বারা ক্ষুধা নিবারণ করতে লাগলেন। মানুষের সাথে মেলামেশা বাদ দিয়ে নিরবে নির্জনে বসবাস করতে লাগলেন। নিজের সম্পূর্ণ সময়টুকু বিগ নিয়ন্ত্র। আল্লাহ রাব্দুল আলামীনের সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য ব্যয় করলেন। রাত্রের ন্দ্রিা নিজের জন্য হারাম করে সারারাত্রি ইবাদত বন্দেগীতে কাটাতেন। ইসলামী জ্ঞানীদের দৃষ্টিকোণ থেকে একথাও জানা যায় যে মাহবুবে সােবহানী বড়পীর আব্দুল কাদের জিলানী রহমতুল্লাহ সাহেব প্রতি রায়ে নফল নামাজ কোরান শরীফ খতম করতেন। অনেক সময় দেখা গেছে যে বিশ্ব নিয়ন্ত্র আল্লাহ রাব্দুল আলামীনের জিকির ও ধ্যান করতে করতে তিনি নিস্পন্দ অবস্থায় সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়ে রয়েছে না জীবিত আছেন বলে কোন লক্ষণই

যাই হােক এমনিভাবে কঠোর সাধনার ফলে রুহানী জগতের আঁটি প্রজ্ঞাদাত সূফীকুলের শিরমণি হযরত আব্দুল কাদের জিলানী রহমাতুল্লাহ, একজন কামেল ওলীতে পরিণত হয়েছেন। প্রিয় পাঠক-পাঠিকাগণ একটু চিন্তা করে দেখুন বড়পীর সাহেব কত সাধনার মধ্যে দিয়ে বিশ্ব নিয়া আল্লাহ রাব্দুল আলামীনের নৈকট্য অর্জন করেছিলেন। বড়পীর সাহেব তার মনে লােভ লালসা, রাগ-হিংসা সম্পূর্ণ দমন করতে সক্ষম হলেন লাভ করলেন মহান করুণার আধার আল্লাহ জাল্লা শানহুর নৈকট্য অর্জন করলেন আল্লার পিয়ারা বান্দা হওয়ার সৌভাগ্য। | মধোসার অধ্যক্ষ পদ ! ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় হযরত আবু সাঈদ মাখদুমী রাহেমাহুল্লাহ কুর্তৃক তার মাদ্রাসার অধ্যক্ষ পদে অধিষ্ঠিত হয়ে মাহবুবে সােবহানী হযরত আব্দুল কাদের জিলানী রহমাতুল্লাহ উচ্চ পর্যায়ের যােগ্যতার সহিত শিক্ষা প্রদান করতে লাগলেন। অল্পদিনের মধ্যেই তার সুযােগ্য শিক্ষ পদ্ধতির খ্যাতি সারা বাগদাদ শহরে ছড়িয়ে পড়ল। বহু দূর-দূরান্ত থেকে দলে দলে ছাত্র পঙ্গপালের মতাে ফুটে আসতে লাগল এবং তার নিকট হতে শিক্ষা এবং ফায়েজ লাভ করতে লাগল। আস্তে আস্তে মাদ্রাসায় ছাত্র সংখ্যা অনুপাতে স্থান খুবই সংকীর্ণ হয়ে পড়ল। বড়পীর সাহেব সর্বদা তাফসীর, হাদীস, এলমে নাহ এলমে ছরফ এবং উসুলে ফেকাহর তালীম প্রদানে মসগুল থাকতেন। যাই হােক সুনাম সুখ্যাতির সাথে মাদ্রাসার শিক্ষকতা কাজ করেন। আল্লাহ রাসুল আলামীনের অসীম রহমতে অল্পদিনের মধ্যেই মাদ্রাসাটির সুনাম চারদিকে ছড়িয়ে পড়লাে। বহু দূরের জাত্ররা এসে ৰতি হতে লাগলো এখানে। সত্যি। আস্তে আস্তে ছাত্র সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়াতে

বড়পীর সাহেবের সুনাম সুখ্যাতি আরও ছড়িয়ে পড়ল। মাদ্রাসার ছাত্রদের জায়গা দেওয়াই কঠি হয়ে পড়লাে। বড়পীর সাহেব চিন্তার মধ্যে পড়ে গেলেন কিভাবে মাদ্রসার ঘর বৃদ্ধি করা যায়। ইন্দে করলেই তাে আর বাড়ানাে যায় না, এ জন্যে অর্থের প্রয়োজন ॥ মাহবুবে সােবহানী গসুল আজম হ্যরত বড়পীর সাহেব একটিদন এক বিরাট মজলিসে ব্যাপারটা তুলে ধরে সাহায্যের আবেদন জানালেন সত্যি কথা বলতে কি তার কথায় সকলের সাড়া দিল ধনী ‘গরীব সকল স্তরের লােক অংশ গ্রহণ করলেন।

মাদ্রাসি-ই- কাদেরিয়া ! মহান করুণার আঁধার আল্লাহ আল্লাহ শানহুর অসীম রহমতে জনসাধারণের মিলিত সহযােগীতায় দ্বীনি প্রতিষ্ঠানের নতুন ঘর তৈরি হলাে। সকলে বহুদিনের আশা পূর্ণ হল। তৈরি হল নতুন পরিবেশ। ইতিহাস পাঠে জানা যায় মাদ্রাসার নাম দেয়া হল মাদ্রাসা-ই-কাদেরিয়া মাহবুবে সােবহানী সত্যেই সৈনিক আওলিয়াকুলের শিরমণি হযরত আব্দুল কাদের জিলানী রহমাতুল্লাহ-এর সুযােগ্য পরিচালনার মাদ্রাসা যেন নতুন জীবন লাভ করলাে।। | বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী এ কথা দিবালােকের মত সমুজ্জ্বল যে সত্যের সৈনিক রুহানী জগতের আঁটি প্রজ্ঞাদাতা মাহবুবে সােবহানী বড়পীর আব্দুল কাদের জিলানী রহমাতুল্লাহ শুধুমাত্র ইলমে শরীয়ত ও মারেফতের পন্ডিত ছিলেন না। বরং তিনি কাব্য, সাহিত্য, দর্শন, ইতিহাস, ভূগােল প্রভৃতি শাস্ত্রের সুপন্ডিত ছিলেন। সত্যি কথা বলতে কি তাঁর প্রণীত বহু, কিতাৰ অদ্যাবধি এ কথার সাক্ষ্য বহন করছে। এসব কিতাবের মধ্যে ফুত গীয়ৰ, গুনিয়াতুত তালেবিন, ফতহুর রব্বানী, কাসীদায়ে গাওসিয়া সমধিক প্রসিদ্ধ। আল্লাহর অসীম রহমতে এই সকল কিতাবের বাংলা ওজুমাও হয়েছে। যার দ্বারা অসংখ্য লােক সিরাতুল মুস্তাকিমের সঠিক সন্ধান পেয়েছে। প্রিয় পাঠক-পাঠিকাগণ হযরত বড়পীর সাহেব কেবল শরীয়ত মারেফাত বিদ্যায়ই পান্ডিত্য অর্থন করেছিলেন তা নয়, তিনি বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী ছিলেন। এক কথায় বলতে গেলে যাবতীয় ইসলামী আখলাখের অপূর্ব সমাবেশ ও বিকাশ ঘটেছিল হযরত বড়পীর সাহেবের জীবনে। | বড়পীর রহমাতুল্লাহ-এর কয়েকটি উপদেশাবলীঃ একথা সর্বজন বিদিত যে রুহানী জগতের আঁটি প্রজ্ঞাদাতা আওলীয়াকুলের শিরমণি হযরত আব্দুল কাদের জিলানী রহমাতুল্লাহ গােটা জীবনের সাধনাই ছিল মানব কল্যাণ। মানুষের কল্যাণের জন্য তিনি আজীবন চেষ্টা করে গেছেন। সােনালী ইসলামের নির্মল আদর্শ প্রতিষ্ঠা করাই ছিল সত্যের সৈনিক গাওসুল আযম হযরত বড়পীর সাহেবের রহমাতুল্লাহ প্রধান ও একমাত্র জীবনের লক্ষ্য ও কর্তব্য। তিনি শিক্ষকতা, পুস্তক প্রণেতা, ওয়াজ নসীহতের মাধ্যমে মানুষদেরকে ইসলামের পথে আনার চেষ্টা করে গেছেন। মােট কথা মাহবুবে সােবহানী গাওসুল আযম হযরত বড়পীর রহমতুল্লাহ ছিলেন ইসলামে একনিষ্ঠ খাদেম। বিশ্ব নিয়স্তা আল্লাহ রাব্দুল আলামীনের ইচ্ছায় তিনি তার উপর নির্দিষ্ট দায়িত্ব সযত্নে পূর্ণাঙ্গরূপে আদায় করেছেন। ইসলামী জ্ঞান তাপসদের দৃষ্টিকোণ থেকে জানা যায় হযরত বড়পীর সাহেব রহমাতুল্লাহ ইসলামের শরীয়ত ও মারফতের জ্ঞান সাধনা ও বিতরণকরে অন্তরে বাইরে তিনি ইসলাম প্রতিষ্ঠার সত্যিকার প্রশস্ত রাজপথ নির্মাণ করে গিয়েছেন, যাহা বিশ্বের সকল মুসলমানদের পাথেয় সত্যের সেনানী বড়পীর সাহেব যাহা বলেছেন তাহাই মানবজাতীয় কল্যাণের জন্য করেছেন। তিনি ইসলাম প্রচার করতে যেয়ে যে ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন তা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। হযরত বড়পীর সাহেব রহমাতুল্লাহ পরহেজগার ব্যক্তিবর্গের জন্য কয়েকটি মূল্যবান নির্দেশ রেখে গেছেন যা নিম্নে দেওয়া হল

১। শপথ ও প্রতিক্ষা করা উচিত নহে। তবে শপথ বা প্রতিজ্ঞা করে বসলে তাহা পালন করবেন।

২। মিথ্যা কথা বলিও না। কোনভাবেই মিথ্যা বলতে নাই। উপহাস, ঠাট্টা, হাস্যকৌতুক করেও মিথ্যা বলও না। সদা সর্বদা সত্য কথা বলবে।

৩। কখনও বিশ্বনিয় আল্লাহ রাব্দুল আলামীনের নাম শপথ করাে না।

৪। কোন মুসলমানকে নিশ্চিতভাবে মুনাফিক কাফের কল না। মহান করুণার আঁধার আল্লাহ জাল্লাহ শানহু ছাড়া কে জানে না কে মুনাফিক, কে মুশরিক।

৫। কোন মানুষের নিকট কোন আশা-আকাক্সক্ষা কর না।

৬। বিনয়ী হও। আদব-কায়দা, নম্রতা ও শিষ্টাচারের মধ্যে ধর্মভিরুতা রয়েছে। তোমার সৎ আচরণগুলি ইবাদতের সহিত সংশ্লিষ্ট।

৭। কাকেও অভিসম্পাত কর না। ধৈর্যধারণ পূর্বক যে কোন আপদ বিপদ দুঃখ-কষ্ট, অভাব-অনটন মুকাবিলা করবে।

৮, নিজের মর্তবা অর্জনের জন্য কারও উপর কার্যদায়িত্ব চাপাইয়া দিওনা। ইহা | পুরাপুরিভাবে বিশ্বনিয়া আল্লাহ রাব্বল আলামিনের দায়িত্ব। তিনিই তােমার | রিজিকদাতা।

ইন্তেকাল । একথা সর্বজন বিদিত যে মানুষ মরণশীল। প্রত্যেক মানুষেরই মৃত্যুর | শরবত পান করতে হবে। পার্থিব জগতের কেহই মৃত্যুর হাত থেকে রেহাই পানে না | পই মাহবুবে সােবহানী আওলীয়াকুলের উজ্জ্বল নক্ষত্র সূফী সাধক গাওসুল আযম

হযরত আব্দুল কাদের জিলানী রহমাতুল্লাহ ও মতর হাত থেকে রেহাই পাননি। তাকেও | পার্থিব জগতের মায়া মমতা ছিন্ন করে পরপারে যাত্রা করতে হয়েছে। ইসলামী জগতে বড়পীর হযরত আঙ্গুল কাদের জিলানীকে না জানে এমন লােক বিৱল। সারা পৃথবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছড়িয়ে রয়েছে তা অনুসারীরা। বাংলাদেশের ঘরে ঘরে রয়েছে ‘ তার অগণিত ভক্ত অনুরক্তের দল। এই কুতুবুল আফতাৰ মুসলিম মিল্লাতকে এমিত করে। | হিজরী ৬৬২ সালের ১১ই রবিউসসানী তার মাশুকের আলার নিকট গমন করেন। | ইন্নালিল্লাহ or rever.। ইন্তেকালের সময় তার বয়স হয়েছিল ৯১ বছর। এটা বাস্তব সত্য

কথা যে জাগতিক মৃত্যুর তুহিন শীতল সংস্পর্শে তার কর্মজীবনের অবসান ঘটলেও তার | প্রতিষ্ঠিত সংস্কার ও আদর্শ পৃথিবী প্রলয় পর্যন্ত অম্লান থাকৰে। ইসলামের খিদমতের জন্য তিনি যেমন কাজ করেছেন সারা দুনিয়ায় মুসলমানদের জন্য অনন্ত কাল ধরে প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। বড়পীর সাহেবের ইহধাম ত্যাগের দিন ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম মুসলমানদের জাতীয় পর্বে পরিণত হয়েছে। তার ইন্তেকালের বার্ষিকীতে সারা বিশ্বের | মুসলিমগণ বিশেষ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে মিলাদ মাহফীল, কোরান খতম করে তার আত্মার মাগফেরাত কামনা করে। আল্লাহ পাক আমাদেরকে তার রুহানী ফায়েজ হাসিল করার তুকি দান করুন।

কাফন দাফন । সত্যের দিশারী রুহানী জগতের অন্যতম সাধক হযরত বড়পীর সাহেবের রহমাতুল্লাহ, ইহধাম ত্যাগের সংবাদ মুহূর্তের মধ্যে চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ল। সংবাদ শোনা মাত্রই মানুষ পঙ্গপাল পাখীর মত তার বাসভবনে ঘটে আসলেন। ঐতিহাসিক বাগদাদ শহরের সকল শ্রেণীর লােকেরা তাদের প্রিয় ও শ্রদ্ধেয় শিক্ষক ওস্তাদ পীর সাহেব কেবলা রহমাতুল্লাহ-কে শেষ দেখা দেখতে বন্যার হাতের মত এসে ভীড় জমাইলেন। সমস্ত দিন চলল শেষ দেখা লােকের সমামে আর দিনের বেলায় তাকে দাফন করা গেল না। তার আদরের সুযােগ্য পুত্র শেখ আবদুল ওয়াহহাব তাকে শেষবারের মত গােসল করালেন এবং কাফন পরালেন। বড়পীর সাহেবের ভক্তবৃন্দের শেষ দেখা সমাপ্ত হলে তার পবিত্র মরদেহ তারই আজীবনের কর্মক্ষেত্রে সর্বশ্রেষ্ঠ জনি প্রতিষ্ঠান মাদ্রাসায়ে কাদেরিয়ার বারান্দায় চিরজীবনের জন্য শায়িত করা হল।

মনসুর হাল্লাজ এর জীবনী পড়তে এখানে ক্লিক করুন।