Select Page
আবু হামিদ আল-গাজ্জালী (রহঃ)

আবু হামিদ আল-গাজ্জালী (রহঃ)

আবু হামিদ আল-গাজ্জালীঃ ইমাম গাযালী (র)-এর নাম মুহাম্মাদ। ডাকনাম আবু হামেদ। পিতার নামও মুহাম্মাদ ছিল। তুস জেলায় ৪৫০ হিজরীতে তাহিরান নামক স্থানে জন্মগ্রহণ করেন। পিতার ওসিয়ত মুতাবেক তাঁর এক বন্ধু—যিনি একজন একনিষ্ঠ ‘ইলম-দোস্ত ও সূফী গরীব মুসলমান ছিলেন-তাঁর শিক্ষার বন্দোবস্ত করতে অক্ষমতা প্রকাশ করেন এবং তাকে কোন মাদরাসায় ভর্তি হবার পরামর্শ দেন। অনন্তর তিনি একটি মাদরাসায় ভর্তি হয়ে শিক্ষা অর্জনে আত্মনিয়ােগ করেন।

ইমাম গাযালী (র) স্বদেশে শায়খ আহমাদ আর-রাযেকানীর নিকট থেকে শাফিঈ মযহাবের ফিকাহশাস্ত্রে তা’লীম হাসিল করেন। এরপর জর্দানে ইমাম আবু নসর ইসমাঈলীর নিকট পড়াশুনা করেন। এরপর নিশাপুর গিয়ে ইমামুল হারামায়নের মাদরাসায় ভর্তি হন এবং অতি অল্পদিনেই তিনি তার ৪০০ সহপাঠীর মধ্যে একটি বিশিষ্ট আসন লাভ করেন। শেষ পর্যন্ত তিনি তাঁর খ্যাতিমান উস্তাদের সহযােগী (নায়েব)-তে পরিণত হন, এমন কি ইমামুল-হারামায়ন তার সম্পর্ক বলতেন, “গাযালী (র) হলেন গভীর সমুদ্র।” ইমামুল-হারামায়ন-এর ইনতিকালের পর তিনি নিশাপুর থেকে বহির্গত হন। সে সময় তাঁর বয়স ছিল ২৮ বছর, অথচ তখনাে তাকে বড় বড় বর্ষীয়ান ‘উলামা’র চেয়ে অধিকতর বিশিষ্ট ও কামালিয়তের অধিকারী মনে করা হত।

এর পর ইমাম গাযালী (র) নিজামুল-মুলকের দরবারে যান। তাঁর খ্যাতি ও বিশেষ যােগ্যতার কারণে নিজামুল-মুলক তাকে অত্যন্ত ভক্তি ও শ্রদ্ধা সহকারে দরবারে গ্রহণ করেন। এখানে ছিল দুর্লভ রত্নসম। জ্ঞানী-গুণীদের সমাবেশ। জ্ঞানের আলােচনা ও ধর্মীয় মুনাজারা (বিতর্ক) তখনকার দরবার, মজলিস, এমন কি বিবাহানুষ্ঠান ও শােক সভারও একটি অপরিহার্য অঙ্গ ছিল। ইমাম গাযালী (র) যাবতীয় বিতর্ক আলােচনায় সকলের ওপর জয়ী হতেন। তাঁর অতুলনীয় যােগ্যতাদৃষ্টে নিজামুল-মুলক তাঁকে নিজামিয়া মাদরাসার অধ্যক্ষ হিসাবে মনােনীত করেন, যা ছিল সে যুগে একজন ‘আলিমের জন্য সম্মান ও মর্যাদার সর্বোচ্চ সােপান। সে সময় গাযালীর বয়স ৩৪ বছরের বেশী ছিল না।Imam Ghazali

৪৮৪ হিজরীতে তিনি বিরাট শান-শওকতের সঙ্গে বাগদাদে প্রবেশ করেন এবং নিজামিয়ায় পাঠ দান শুরু করেন। অল্পদিনেই তাঁর যােগ্য শিক্ষকতা, উত্তম আলােচনা ও জ্ঞানের গভীরতার কথা সারা বাগদাদে ছড়িয়ে পড়ে। ছাত্র- শিক্ষক ও জ্ঞানী-গুণী তার বিদ্যাবত্তা থেকে উপকৃত হবার জন্য চতুর্দিক থেকে নিজামিয়ায় এসে ভীড় জমাতে লাগল। তার দরূস-মাহফিল গােটা মনুষ্যকুলের লক্ষ্যস্থলে পরিণত হয়। তিন শ’র মত সমাপ্ত পর্যায়ের ছাত্র, শত শত আমীর-উমারা’ ও রঈস এতে শরীক হতেন। ক্রমে ক্রমে তার উন্নত মস্তিষ্ক ও মেধা, ইলমী ফযীলত ও শক্তিশালী ব্যক্তিত্ব বাগদাদে এমন প্রভাব-প্রতিপত্তি সৃষ্টি করে যে, তিনি সাম্রাজ্যের নেতৃস্থানীয় সদস্যবর্গের সমমর্যাদা লাভ করেন।

তাঁর সম্পর্কে তাঁর সমসাময়িক শায়খ আবদুল গাফির ফারসী বলেন, “তার জাকজমক ও আড়ম্বরের সামনে আমীর-উমারা’, উযীর, এমন কি স্বয়ং দরবারে খিলাফতের শান-শওকত পর্যন্ত নিষ্প্রভ হয়ে যায়। এমনি সময়ে ৪৮৫ হিজরীতে তাকে ‘আব্বাসী খলীফা মুক ‘তাদী বিল্লাহ মালিক শাহ সালজুকীর বেগম তুর্কান খাতুনের নিকট (যিনি সে সময় সাম্রাজ্যের হর্তা-কর্তা ছিলেন) স্বীয় দূত বানিয়ে পাঠান। খলীফা মুক ‘তাদী বিল্লাহর স্থলাভিষিক্ত খলীফা মুস্তাজহির ইমাম গাযালী (র)-এর সঙ্গে বিশেষ সম্পর্ক রাখতেন এবং তার একনিষ্ঠ ভক্ত ও অনুরক্ত ছিলেন। তারই নির্দেশে ইমাম গাযালী (র) বাতেনী মতবাদের বিরুদ্বে কিতাব লিখেন এবং খলীফার সঙ্গে সম্পর্কিত করে এর নাম রাখেন ‘মুস্তাজহিরী।

এগার বছরের চলমান জীবন এবং এর অভিজ্ঞতা:

এই চরম উন্নতি ও উত্থানের স্বাভাবিক দাবি ছিল যে, ইমাম গাযালী (র) এতে তৃপ্তি লাভ করবেন এবং এই বৃত্তের মাঝেই তিনি তার গােটা জীবন কাটিয়ে দেবেন, যেমনটি তার কতক উস্তাদ করেছেন। কিন্তু তার অস্থির স্বভাব ও প্রকৃতি, উন্নত মনােবল, দুরন্ত সাহসিকতা উন্নতির এই চরম পর্যায়েও তাকে সন্তুষ্ট ও তৃপ্ত রাখতে পারেনি। প্রকৃতপক্ষে এই উন্নত মনােবল ও হিম্মতই তাঁকে ইমাম’ ও ‘হুজ্জাতুল-ইসলাম বানিয়েছিল। দুনিয়াতে জাঁকজমক, আড়ম্বর, সম্মান ও পদবীর কুরবানী এবং স্বীয় উদ্দেশ্যের প্রতি একাগ্রতা ও সত্যের প্রতি আকর্ষণের এমন দৃষ্টান্ত বিরল। ইমাম গাযালী (র) স্বয়ং সেসব অবস্থা ও কার্যকারণ বর্ণনা করেছেন যা তাকে এমন পদক্ষেপ গ্রহণে উৎসাহিত ও উদ্বুদ্ধ করেছিল এবং যা তাকে টেনে বের করেছিল শিক্ষা ও দরস প্রদানের কাজ থেকে। যা হােক, শেষ পর্যন্ত তিনি জ্ঞান রাজ্যের বাদশাহী ছেড়ে নিশ্চিত জ্ঞান ও ইন্দ্রিয়াতীত সম্পদের তালাশে বেরিয়ে পড়েন এবং স্বীয় লক্ষ্যে কামিয়াবী লাভ করেন। ‘Al-Munkiju Minaddalal” নামক গ্রন্থে তিনি এ সম্পর্কে লিখেছেন :- বিস্তারিত পড়তে এখানে ক্লিক করুন।

To read Imam Gazzali Biography in English CLICK here

মনসুর হাল্লাজ এর জীবনী-বানী-কারামত ও কালাম-হযরত-মানসুর আল–হাল্লাজ

মনসুর হাল্লাজ এর জীবনী-বানী-কারামত ও কালাম-হযরত-মানসুর আল–হাল্লাজ

হযরত হুসাইন মনসুর হাল্লাজ (রহ:)আধ্যাত্বিক জগতের আলোড়ণ সৃষ্টিকারী এক বিস্ময়কর মহাপুরুষ ছিলেন। তাঁর পাণ্ডিত্য ও বাগ্মিতা ছিল যেমন অসাধারণ, তার আধ্যাত্বিক চেতনাও তেমনি ছিল অপরিসীম। তিনি বহু গ্রন্থ রচনা করেছেন । কিন্তু বক্তব্য বিষয়ের গুঢ়ার্থ ছিল দুর্বোধ্য। এবাদতে তাে কথাই নেই। তাঁর আল্লাহ্ প্রেমেরও কোন তুলনা ছিল না। আল্লাহ প্রেমে তিনি ছিলেন নিয়ত অস্থির। আল্লাহর বিরহানলে তিনি দগ্ধ হয়েছেন দিন রাত। আর এজন্য জীবনে কষ্টও পেয়েছেন প্রচুর। শেষ পর্যন্ত নিজের অমূল্য প্রাণ উৎসর্গ করেছেন। আল্লাহর ওয়াস্তে মানুষের হাতে।

মনসুর হাল্লাজ

মানুষ তার কাজকর্মে বিরক্ত হতেন। তার বহু কাজে আপত্তি ছিল সুফী দরবেশগণেরও। তারা সে সবের প্রতিবাদ করতেন। তার চলাফেরা, কথাবার্তার মর্ম উপলদ্ধি করতে না পেরে তারা বলতেন, তাসাওউফে তাঁর কোন দখল নেই। অবশ্য হযরত আবদুল্লাহ খাফীফ রহমাতুল্লাহ, হযরত শিবলী রহমাতুল্লাহ, হযরত আবুল কাসেম নসরাবাদী রহমাতুল্লাহ, ইবনে আতা রহমাতুল্লাহ প্রমুখ প্রখ্যাত তাপসগণ তাকে উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন দরবেশ বলে মনে করতেন। আবার অনেকে তাঁকে কাফের বলেছেন। তাঁর ওপর অত্যাচার করেছেন। অনেকে বলেন, তিনি ছিলেন ইত্তেহাদী। সৃষ্টি ও স্রষ্টার মধ্যে কোন পার্থক্য দেখতে পেতেন না। মূলত এই গঢ়তত্ত্ব সাধারণ মানুষের বােধগম্য নয়। বাগদাদের কিছু লােক হাল্লাজী বা তাঁর অনুসারী বলে দাবী করতেন আর নানা অপকর্মে লিপ্ত হতেন।

‘আনাল হক’

তিনি একবার বলেছিলেন ‘আনাল হক’। অর্থাৎ আমিই আল্লাহ। তার ওপর যে অকথ্য জুলুম হয়, তার কারণই হল এ উক্তি। কিন্তু বর্তমান গ্রন্থকার হযরত ফরীদ উদ্দীন আত্তার রহমাতুল্লাহ বলেন, আমি এটাকেই অত্যন্ত আশ্চর্য মনে করি যে, হযরত মূসা (আঃ) যখন তুর পর্বতে আল্লাহর জ্যোতি দর্শন করেন, তখন গাছ থেকে ইন্নী আনাল্লাহ’ নিশ্চয় আমি আল্লাহ এই শব্দ শােনা গিয়েছিল। বলা হয়, এ আওয়াজ ছিল স্বয়ং আল্লাহর, গাছের নয় । তা হলে হযরত মানসুর হাল্লাজের রহমাতুল্লাহ মুখ থেকে যখন ‘আনাল হক’ কথাটি বের হয়, তখন কেন বলা হবে না তার মুখের বাণীটি আসলে আল্লাহর বাণী। হযরত হুসাইন মানসুর হাল্লাজের রহমাতুল্লাহ মুখের কথা নয়। হযরত ফরীদ উদ্দীন আত্তার রহমাতুল্লাহ আরও বলেন, তাঁর বেলায়ও তাে বলা যেতে পারে যে, তার জবানে খােদ আল্লাহই ‘আনাল হক” কথাটি উচ্চারণ করেছেন। এটি হযরত হাল্লাজ রহমাতুল্লাহ-এর কথা নয়। তিনি নিজে আল্লাহ হওয়ার দাবীও করেননি।

হযরত শায়খ ফরীদ উদ্দীন আত্তার রহমাতুল্লাহ বলেন, বাগদাদ শহরে হুসাইন মনসুর নামে এক জাদুকর ছিল, কেউ কেউ তার সঙ্গে তাপসকে গুলিয়ে ফেলেছেন। আসল ঘটনা কিন্তু অন্য রকম। জাদুকরের জন্ম ওয়াসেত শহরে আর মনসুর হাল্লাজ রহমাতুল্লাহ বাস করতেন বাগদাদে । যাই হােক, হযরত আবদুল্লাহ খফীফ বলেন, হুসাইন মনসুর রহমাতুল্লাহ আল্লাহর মারেফাতে জ্ঞানী ছিলেন। হযরত শিবলী রহমাতুল্লাহ বলেন, হযরত মনসুর হাল্লাজ রহমাতুল্লাহ ও আমি- আমরা দুজন একই অবস্থার লােক। পার্থক্যটুকু এই যে, আল্লাহর দাবীদার মনে করে মানুষ তাকে ধ্বংস করেছে, আর আমাকে পাগল মনে করে দূর করে দিয়েছে। | হযরত মনসুর হাল্লাজ রহমাতুল্লাহ-এর সঠিক জন্মস্থান জানা যায় না। তবে তার বাল্য ও কৈশাের অতিবাহিত হয় বাগদাদে। আঠারাে বছর বয়সে তিনি ততরে চলে যান। সেখানে হযরত আবদুল্লাহ তশতরী রহমাতুল্লাহ-এর সংস্পর্শে দু’বছর কাটান। তারপর বসরা। বসরা থেকে দাওহারকা। সেখানে হযরত আমর ইবনে ওসমান মক্কী রহমাতুল্লাহ-এর সাহচার্যে আসেন। আর এখানেই তিনি বিবাহ করেন। হযরত ইয়াকুব আতা রহমাতুল্লাহ-এর কন্যাকে। অতঃপর হযরত ইয়াকুব রহমাতুল্লাহ-এর সঙ্গে মনােমালিন্য হওয়ায় তিনি বাগদাদে হযরত জুনায়েদ রহমাতুল্লাহ-এর দরবারে চলে আসেন। এখানে বেশ কিছুদিন কাটিয়ে তিনি চলে যান মক্কায়। সেখানে এক বছর কাটান। তারপর একদল সুফী সাধকের সঙ্গে তিনি আবার বাগদাদে আসেন। এই সময় তিনি হযরত জুনায়েদ বাগদাদী রহমাতুল্লাহ-এর কাছে একটি জটিল মাসআলার উত্তর জানতে চান। কিন্তু হযরত জুনায়েদ রহমাতুল্লাহ তার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে বললেন, তুমি কুব শীঘ্রই ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলবে। হযরত মানসুর রহমাতুল্লাহ বলেন, আমি যেদিন ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলব, সেদিন আপনার অঙ্গেও এ সুফী পােশাকের পরিবর্তে মামুলী পােশাক দেখা যাবে।

দু’জনের ভবিষ্যদ্বাণীই সফল হয়। পরবর্তীকালে, তাঁর আপাতঃ শরীয় বিরােধী কার্যকলাপের জন্য দেশের সমগ্র আলেম সমাজ যখন তাঁকে হত্যা করার ফতোয়া দেন, তখন কেবল হযরত জুনায়েদ রহমাতুল্লাহ-ই ফতােয়ায় সই করেননি। কেননা, তখন পর্যন্ত তিনি প্রকৃত সুফীই ছিলেন। সুতরাং তার পক্ষে হযরত মনসুর হাল্লাজ রহমাতুল্লাহ-এর হত্যার সিদ্ধান্তে সম্মতি পােষণ করা সম্ভব ছিল না। দেশের খলীফা বললেন, মানসুর রহমাতুল্লাহ-এর বিরুদ্ধে এ ফতােয়াকে যদি শুদ্ধ প্রমাণ করতে হয়, তবে হযরত জুনায়েদ বাগদাদী রহমাতুল্লাহ-এর স্বাক্ষর একান্ত জরুরী। উপায়ান্তর না দেখে হযরত জুনায়েদ রহমাতুল্লাহ সুফীর পােশাক পরিত্যাগ করে খানকা থেকে মাদ্রাসায় চলে গেলেন। আর সেখানে প্রকাশ্য আলেমের পােশাক পরে ফতােয়ায় সই করলেন। তাতে তিনি মন্তব্যে লেখেন, প্রকাশ্য কাজকর্মের দিক থেকে মনসুর প্রাণদন্ডের উপযুক্ত। আর ফতােওয়া প্রদান করা হয় সাধারণতঃ বিচার বা ব্যবস্থা অনুসারেই। গুপ্ত অবস্থা মানুষের জন্য দেখা সব নয়। তার লি’র ব্যবস্থা আল্লাহই করে থাকেন।

হযরত জুনায়েদ রহমাতুল্লাহ-এর কাছে মাসআলার উত্তর না পেয়ে হযরত মনসুর হাল্লাজ রহমাতুল্লাহ মনে এত বেশী দুঃখ পান যে, তাকে কিছু না বলেই সস্ত্রীক তশতরে চলে যান। তশতরবাসী তাকে সাদরে গ্রহণ করেন এবং তিনি এক বছরেরও ওপর সেখানে সসম্মানে বাস করেন। কিন্তু তাদের সঙ্গে মতানৈক্য হতে খুব বেশী দেরী হল না। কারও মন যুগিয়ে চলা ছিল তার স্বভাব বিরুদ্ধ। বিশেষ করে আলেম সমাজকে তিনি তেমন আমল দিতেন না। তার ওপর ছিল হযরতের আমর ইবনে ওসমান মক্কী রহমাতুল্লাহ-এর প্ররোচনা। তিনি তার ওপর ক্ষুব্ধ ছিলেন। তিনি মক্কা থেকে তার বিরুদ্ধে খােরাসানবাসীদের উত্তেজিত করে তােলেন। ফলে মর্মাহত মানসুর রহমাতুল্লাহ দরবেশী পােশাক ছেড়ে সাধারণ বেশে সমাজের সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশে গেলেন। এ যেন এক অজ্ঞাতবাস। আর এভাবে কাটল পাঁচ বছর। তিনি কখনও খোরাসানে, কখনও মাওরান্নহরে, কখনও বা নীমরােজে, সিন্তানে, কেরমানে- ইত্যাদি নানা স্থানে ঘুরে বেড়ান। শেষে গেলেন পারস্যে। আর এখানে রচনা করলেন বহু মূল্যবান গ্রন্থ। তাছাড়া আহওয়াজবাসীদের উপদেশ দিয়ে তাদের অনুকূল্য লাভ করলেন। তাঁর বক্তৃতা, উপদেশ সব কিছুই ছিল গূঢ় রহস্যপূর্ণ। এ জন্য স্থানীয় জনগণ তার নাম দেন হাল্লাজুল আসরার। হাল্লাজ আরবী শব্দ যার অর্থ হল ধুনকার, ধানুকী, যে তুলা ধুনে। শােনা যায়, একবার তুলার স্তুপের দিকে ইশারা করামাত্র সেগুলি খুব সুন্দরভাবে ধুনা হয়ে যায়। আর তখন থেকেই তিনি হাল্লাজ নামে অভিহিত হন।

পাঁচ বছর আত্মগােপনের পর তিনি বসরায় ফিরে আসেন। আর আবারও সুফী পােশাক পরিধান করেন। সেখানে কিছুদিন থাকার পর তিনি যান মক্কায় । কিন্তু সেখানে উপস্থিত হওয়া মাত্রই হযরত ইয়াকুব নাহারজুরী রহমাতুল্লাহ তাকে জাদুকর বলে আখ্যা দেন। বাধ্য হয়ে তিনি আবার ফিরে এলেন বসরায়। ওখানে এক বছর কাটিয়ে আহওয়াজ হয়ে তিনি চলে আসেন হিন্দুস্থানে। হিন্দুস্থান থেকে খােরাসান, মাওরাউন্নহর প্রভৃতি দেশ ঘুরে ঘুরে চলে যান চীনে। তারপর আবার মক্কা শরীফে। এবার সেখানে দু’বছর কাটান। তারপর মক্কা থেকে বিদায় নেবার সময় তার মধ্যে দারুণ পরিবর্তন আসে। তখন তাঁর কথাবার্তা সম্পূর্ণ দুর্বোধ্য হয়ে পড়ে। কাজেই এরপর তিনি যখনই যে দেশে গেছেন তখনই মানুষের কাছে লাঞ্ছিত ও বিতাড়িত হয়েছেন। এক এক সময় তিনি এত বেশী দুঃখ-কষ্ট, যন্ত্রণা ও উৎপীড়ন সহ্য করেন যে, আর কোন সাধক-দরবেশকে তা কখনও সহ্য করতে হয়নি। শােনা যায়, তার পূঢ় রহস্যপূর্ণ, দুর্বোধ্য কথা ও আচরণের কারণে তিনি অন্তত পঞ্চাশটি দেশ থেকে বিতাড়িত হন। অথচ ইনিই যখন আগের দফায় বিভিন্ন দেশ পরিভ্রমণ করেন, তখন তার জ্ঞান মুগ্ধ মানুষ তাকে নানা সম্মানে ও উপাধিতে ভূষিত করেছেন। ভারতবাসী তাকে বলতেন আবুল মুগীস, চীনারা বলতেন, আবুল মুঈন, খােরাসানীরা বলতেন, আবুল মনীর, পারস্যবাসীরা বলতেন, আবু আবদুল্লাহ যাহিদ, খুজিস্তানবাসীরা বলতেন, হাল্লাজুল আসরার, বাগদাদ ও বসরার মানুষ তাঁকে মুগবের নামে সম্মানিত করেন।

শােনা যায়, তিনি দিনে-রাতে চারশ রাকয়াত নফল নামায পড়তেন। কিন্তু নিজের জন্য ঐ নফলকে তিনি ফরজ করে নেন। সবাই বলতেন, তিনি যে উচ্চ মর্যাদার অধিকারী তাতে এত কষ্ট করার কি দরকার? তিনি তার উত্তরে বলতেন, কষ্ট-ক্লেশ আল্লাহ-প্রেমীদের মনে ঠাই পায় না। কেননা, প্রকৃতপক্ষে তারা মৃত মানুষের মতাে হয়ে যান।

দীর্ঘ বিশ বছর ধরে তিনি একই পােশাকে উপাসনা করতেন। একবার লােকে জোর করে তা খুলে নেয়। তখন দেখা যায়, তার ভেতরে জমে আছে অসংখ্য উকুন । তার কোন কোনটির ওজন নাকি ছিল প্রায় তিন রতি। একজন একটি বিছে দেখতে পেয়ে মারতে যায়। তিনি নিষেধ করেন। বলেন, ওটি তার সঙ্গে রয়েছে প্রায় বারাে বছর।

তাঁর অলৌকিক ক্ষমতা সম্বন্ধে বর্ণনা দিয়েছেন হযরত রুশী খেরাদ সমরকন্দী। একবার হযরত মনসুর হাল্লাজ রহমাতুল্লাহ-এর চারশ সঙ্গী নিয়ে এক বিশাল প্রান্তর অতিক্রম করছিলেন। সঙ্গীরা ক্ষুধায় কাতর হয়ে তাঁকে বললেন, এখন যদি ভুনা মাথা (ছাগলের) ও রুটি খেতে পেতাম তাতে বড় তৃপ্তি হত। তিনি তাদের সারিবদ্ধ অবস্থায় বসিয়ে দিয়ে নিজের পেছনে হাত নিয়ে গিয়ে একটি মাথা ও রুটি এনে একজনকে দিলেন। আর এই ভঙ্গিতে চারশ জনকেই মাথা ও রুটি খাওয়ালেন। কিছুক্ষণ পরে সঙ্গীরা খেজুর খেতে চাইলে তিনি দাড়িয়ে সঙ্গীদের বললেন, তােমরা আমাকে ধরে নাড়া দাও। তারা নাড়া দিতেই প্রচুর পাকা খেজুর পড়তে লাগল। তারা বেশ মজা করে খেজুর খেলেন।

একবার তিনি চলেছেন এক বন্য পথে। সঙ্গে অনেক সঙ্গী। তারা আঙুর খেতে চাইলেন। তিনি তার ডান হাতখানা যেমনি ওপরে ওঠালেন অমনি হাত ভর্তি আঙুর এল। আর এভাবে বেশ কয়েকবার শুন্যে হাত তুলে তিনি পেট ভরে তাদের আঙুর খাওয়ালেন। কিছুক্ষণ পরে তাঁদের হালুয়া খাবার ইচ্ছা হলাে। আর অলৌকিক শক্তি বলে তিনি তাদের সে ইচ্ছাও পূরণ করলেন। একজন বলল, হালুয়ার স্বাদ হুবহু বাগদাদের হালুয়ার মতাে। তিনি বললেন, আল্লাহর রহমতে আমার জন্য বাগদাদের বাজার আর বন-জঙ্গল দুইই সমান। | ঐদিন বাগদাদের বাবে এনতাকিয়া বাজারের এক হালুয়ার দোকান থেকে হালুয়া ভর্তি একটি কড়াই হঠাৎ উধাও হয়। তিনি যখন সদলবলে বাগদাদে পৌছলেন, তখন এক মুরীদের কাছে কড়াইটি দেখতে পেয়ে দোকানদার তাকে জিজ্ঞেস করলেন, এটি আপনি কোথায় পেলেন? মুরীদ ঘটনাটি বললেন। আর হলুয়া বিক্রেতা অবাক হয়ে হযরত মনসুর হাল্লাজ রহমাতুল্লাহ-এর কাছে দীক্ষা নিলেন।

একবার হজ্জ যাত্রায় তাঁর সঙ্গে ছিলেন চার হাজার হজ্জযাত্রী। তাঁদের নিয়ে তিনি মক্কায় পেীছে কাবা ঘরের সামনে ঐ যে দাঁড়ালেন, পুরাে একবছর আর নড়লেন না। এভাবে দাঁড়িয়ে রইলেন। সূর্যের তাপে তার দেহ গলে গিয়ে চর্বি বেরােতে লাগল। গায়ের চামড়া গেল ফেটে। কিন্তু তিনি এক চুলও নড়লেন না। এ অবস্থায় এক লােক প্রতিদিন তাকে একটি রুটি এক কুঁজো পানি দিয়ে আসত। তার থেকে মাত্র ঢোক পানি আর এক টুকরাে রুটি খেয়ে বাকী সব রেখে দিতেন। | হযরত মনসুর হাল্লাজ রহমাতুল্লাহ আরাফাতের মাঠে গিয়ে আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করেন, প্রভু গাে আপনি পথ ভ্রষ্ট মানুষের পথপ্রদর্শক। আমি যদি সত্যিই কাফের হয়ে থাকি, তবে আমার কুফরীই বাড়িয়ে দিন। যখন লােকজন তার চারপাশ থেকে চলে যেত, তখন তিনি আবার দোয়া করতেন, প্রভু! আমি আপনার একত্ব স্বীকার ও বিশ্বাস করেই আপনি ছাড়া আর কারও এবাদত করি না। আর আপনার দেয়া দানের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে অক্ষম বলে তা প্রকাশ করতে পারি না। অতএব, আমার অনুরোধ, আমার বদলে আপনিই আপনার নেয়ামতসমূহের শােকর আদায় করুন। কেননা, আপনার প্রদত্ত নেয়ামতসমূহের সম্পূর্ণ শােকর আদায় আপনার কোন বান্দার দ্বারা সম্ভব নয়। সেটি কেবল আপনার দ্বারাই হতে পারে। | হযরত মানসুর রহমাতুল্লাহ হযরত মূসা (আঃ)-এর একটি ঘটনার উল্লেখ করে বলেন, হযরত মূসা (আঃ) একবার ইবলীসকে জিজ্ঞেস করেন, সে হযরত আদম (আঃ)-কে সেজদা করেনি কেন? ইবলীস বলল, সে আল্লাহর প্রত্যক্ষদর্শী ও সেজদাকারী ছিল। সুতরাং আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে সেজদা করার তার কাছে সঙ্গত নয় বলে মনে হয়েছিল। আল্লাহর দীদারের মূল্য ও গুরুত্ব কী অপরিসীম, হযরত মূসা (আঃ) তা জানেন। আল্লাহর দীদার লাভের প্রতি তার তীব্র বাসনার পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ হযরত মূসা (আঃ)-কে বললেন, পাহাড়টার দিকে তাকান। আর আপনিও প্রবল বাসনা নিয়ে পাহাড়টির দিকে দৃষ্টি দেন।

ধৈর্যের সংজ্ঞা কি? এ প্রশ্নের উত্তরে হযরত মনসুর রহমাতুল্লাহ বলেন, হাত-পা কেটে ফেললেও, শূলে চড়ালেও দুঃখ না করা এবং বিচলিত না হওয়ার নাম ধৈর্য। হযরত ফরীদ উদ্দীন আত্তার রহমাতুল্লাহ বলেন, আশ্চর্য লাগে, হযরত মানসুর হাল্লাজ রহমাতুল্লাহ-এর প্রতি শূলার যে ঘটনা ঘটল, তাতে এতটুকু দুঃখ বা আক্ষেপ প্রকাশ করলেন না। | হযরত শিবলী রহমাতুল্লাহ গেছেন হযরত হাল্লাজ রহমাতুল্লাহ-কে হত্যা করতে। হাল্লাজ রহমাতুল্লাহ বললেন, আমি এমন এক গুরুতর কাজ করার ইচ্ছা করেছি যার কারণে আমি পাগল প্রায় । আর আমি নিজেই তাে মৃত্যুকে আহবান করেছি। অতএব, আপনি আমাকে হত্যা করবেন না।

আগেই বলা হয়েছে, তার ‘আনাল হক’ মানুষের রােষ বৃদ্ধি করে। তাকে জিজ্ঞেস করা হয়, আপনার আল্লাহত্ত্বের দাবী কি কুফরী নয়? তিনি বললেন, আল্লাহর প্রকৃত পরিচয় হল, সবকিছুই তার । আর আপনাদেরই কথায়, তিনি কখনও বিলুপ্ত হন না। তবে কি হুসাইন মানসুর বিলীন হয়ে গেছে।

হযরত জুনায়েদ বাগদাদী রহমাতুল্লাহ-কে প্রশ্ন করা হয়েছিল, হযরত মনসুর রহমাতুল্লাহ-এর কথার অন্য অর্থ করা যায় কিনা। তিনি বললেন, আর সে চেষ্টা করাে না। কেননা, সময় পার হয়ে গেছে। এখন আলেম সমাজ ও খােদ খলীফা তার প্রতি বিরূপ হয়েছেন। তিনিও একবছর ধরে বন্দী। তাঁর অনুসারীরা তার কাছে যাতায়াত করতেন। তিনি তাদের কথার সন্তোষজনক জবাবও দিতেন। কিন্তু এখন লােকজনের যাতায়াত নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কয়েকজন বিদগ্ধ পণ্ডিত তার কাছে দু’জন লােককে এ কথা বলে পাঠান যে আনাল হক উচ্চারণ করে তিনি যে অপরাধ করেছেন তার জন্য তওবা করলে তাঁকে মুক্তি দেয়া হবে। তিনি জবাব দিয়েছিলেন, তিনি তা পারবেন না। হযরত আতা রহমাতুল্লাহও তাঁর কাছে গিয়েছিলেন। তার প্রস্তাবও ছিল ঐরকম। কিন্তু তাকেও তিনি একই জবাব দিয়েছেন।

কথিত আছে, প্রথম রাতে তাঁকে বন্দী করা হলে তিনি অদৃশ্য হয়ে যান। দ্বিতীয় রাতে দেখা যায় তিনিও নেই, জেলখানাও নেই। তৃতীয় রাত্রে অবশ্য তাকে এবং জেলখানাকেও দেখা যায়। এ ঘটনার মর্ম জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, প্রথম রাতে আমি আল্লাহর দরবারে চলে গিয়েছিলাম । দ্বিতীয় রাতে খােদ আল্লাহ এখানে উপস্থিত ছিলেন । তৃতীয় রাত্রে জেলখানা ও আমি আবার হাজির হলাম। কেননা, শরীয়তের বিধান রক্ষার জন্য আল্লাহ আবার আমাকে পাঠিয়ে দিয়েছেন। এখন তােমরা তােমাদের কর্তব্য পালন কর।

কথিত আছে, তিনি কারাগারে দৈনিক এক হাজার রাকাআত নফল নামায পড়তেন। তাকে প্রশ্ন করা হয়, আপনি যখন নিজেকে আল্লাহ্ বলে ঘোষণা করছেন, তখন এ নামায কার উদ্দেশ্যে? তিনি উত্তর দেন, আমার সম্বন্ধে আমিই ভালাে জানি।।

শােনা যায়, কারাগারে তখন তিনশ কয়েদী ছিল। তিনি তাদের মুক্তি দিতে পারেন বলে ঘােষনা করেন। কিভাবে তা সম্ভব বলে তাঁকে প্রশ্ন করা হল। কেননা তিনি নিজেও একজন বন্দী। পারলে আগে তিনি নিজেকেই মুক্ত করুন না? হযরত মনসুর রহমাতুল্লাহ বলেন, আমি যে আল্লাহর বন্দী। আর শরীয়তেরও অনুসরণ করি। না হলে ইচ্ছা করলে চোখের ইশরায় সব শৃঙ্খল ছিন্ন করতে পারি। এই বলে আঙুলের ইশরায় সত্যিই সব কয়েদীর শেকল ছিড়ে ফেললেন। কয়েদীরা বলল, আমরা এখন বেরােব কেমন করে? জেলের দরজা যে বন্ধ। তিনি তখন ইশরা করতেই দেয়ালে কয়েকটি জানালা তৈরী হয়ে গেল। কয়েদীদের বললেন, যাও, চলে যাও।

তারা বলল: আপনি আসবেন না?

তিনি বললেন, প্রভুর সঙ্গে আমার একটা গােপন ব্যাপার আছে। তার মীমাংসা হবে শূলে চড়ে। পরদিন প্রহরীরা দেখল, জেল শূন্য। একটিও কয়েদী নেই। তারা জিজ্ঞেস করল, কয়েদীরা কোথায়? তিনি বললেন, আমি সবাইকে ছেড়ে দিয়েছি।

তবে আপনি থেকে গেলেন কেন? তিনি বললেন। আমার ওপর মালিকের খেদ রয়েছে। সে জন্য অপেক্ষা করছি।

খলীফার কাছে এ সংবাদ পৌছালে তিনি হুকুম দিলেন, চাবুক মেরে তাকে কতল করা হােক। তা না হলে আরও বিপত্তি ঘটতে পারে। নির্দেশমত তাকে কারাগার থেকে বের করে এনে তিনশ ঘা চাবুক বসানাে হল। কিন্তু তাতেও তার আনাল হক উচ্চারণ বন্ধ হল না। বরং আরও জোরে তিনি তা করতে লাগলেন। যে লােকটি আঘাত করছিল, সে বলল, প্রতিটি আঘাতে শােনা গেছে, মানসুর ভয় পেও না।

এত আঘাত সত্ত্বেও তিনি নির্বিকার, অবিচল। তারপর তাঁকে শূলে চড়াবার জন্য নিয়ে যাওয়া হল। এই মর্মান্তিক দৃশ্য দেখার জন্য প্রায় লক্ষাধিক লােকের সমাবেশ ঘটে। সেই বিশাল জনতার দিকে তাকিয়ে তিনি বলে উঠলেন, হক, হক, আনাল হক। এমন সময় এক দরবেশ তাঁর সামনে এসে বললেন, প্রেম কি বস্তু? তিনি বললেন, আজ নিজের চোখেই তা দেখতে পাবেন। কাল এবং পরশুও দেখতে পাবেন। অর্থাৎ, প্রথম দিন তাঁকে হত্যা করা হবে। দ্বিতীয় দিন তার মরদেহ পুড়িয়ে ছাই করা হবে। তৃতীয় দিন সে ছাই বাতাসে উড়িয়ে দেয়া হবে। এগুলিই হল প্রেমের নিদর্শন।

তাঁকে যখন শূলে চড়ানাে হয়, তখন তাঁর সেবক এসে তাঁর শেষ উপদেশ প্রার্থনা করেন। তিনি বললেন, নিজেকে যেকোন সৎ কাজে নিয়ােজিত রেখাে। না হলে রিপু তােমাকে মন্দ কাজে লাগিয়ে দেবে। তার ছেলে এসে কিছু শুনতে চাইলেন। তিনি বললেন, দুনিয়ার সবাই পুণ্য কর্মের চেষ্টায় আছে। তুমি এমন একটি কাজের চেষ্টা কর, যার একটি কণা সারা বিশ্বের মানুষ ও জ্বিনের আমল হতেও উত্তম হয়। সেটি হল হাকীকতের একটি অণু। অতঃপর তিনি সানন্দে শূলকাঠের দিকে এগিয়ে গেলেন। আপনার এত খুশী কিসের? কেউ তাঁকে শুধাল। তিনি বললেন, কারণ, আমি আমার ডেরায় যাচ্ছি। এর চেয়ে বেশী আনন্দের সময় আর কখন হবে? এবার তিনি বিড়বিড় করে আবৃত্তি করতে লাগলেনঃ আমার বন্ধু আমার প্রতি মােটেই অবিচার করেননি। অতিথিকে যেমন পবিত্র ও উত্তম শরাব পান করানাে হয়, আমার প্রভুও আমাকে তেমনি পান করিয়েছেন। শরাবের পাত্র কয়েকবার পান করার পর কাপ ও তরবারি-সহ এগিয়ে যাবার জন্য বন্ধু আমাকে সাদরে আহ্বান জানালেন। আর এই হল ঐ ব্যক্তির উপযুক্ত আযাব যে গ্রীষ্মকালে অজগরের সঙ্গে বসে পুরাতন শরাব পান করে। তাকে নিয়ে যাওয়া হল শুলের তলায়। তিনি শুল চুম্বন করলেন। তারপর শূলের সিড়িতে পা রেখে বললেন, বীর পুরুষের মেরাজ হল শুলদণ্ড। এবার তিনি কিবলামুখী হয়ে আল্লাহর দরবারে মােনাজাত করলেন, প্রভু গাে! যা চেয়েছিলাম তাই পেলাম । যখন তাকে শূলে চড়ানাে হল, তখন তাঁর শিষ্যগণ বললেন, হুজুর! যারা আপনার ওপর নিষ্ঠুর ব্যবহার করল, আর আমরা যারা আপনার সমর্থক, তাদের প্রতি আপনার ধারণা কি? তিনি বললেন, যারা আমার প্রতি নিষ্ঠুর ব্যবহার দেখাল, তারা দ্বিগুণ পুণ্য অর্জন করবে। আর যারা আমাকে সমর্থন করেছে ও আমার প্রতি পবিত্র ধারণা পােষণ করেছে, তারা পাবে মাত্র একটি সওয়াব। কেননা, তােমরা আমার প্রতি কেবল ভালাে ধারণাই পােষণ করেছ। আর তারা একত্ববাদের শক্তি ও শরীয়তের কঠিন বিধান-এ দুইয়ের তাড়নায় তাড়িত। মনে রেখাে, ইসলামে তওহীদই আসল। আর ভালো ধারণা তার শাখা মাত্র।

তিনি নাকি যৌবনে এক তরুণীর প্রতি দৃষ্টিপাত করেন। সে কথা তার মনে এল। আর বললেন, এতদিন পর আজ তার প্রতিশােধ নেয়া হল। এবার হযরত শিবলী রহমাতুল্লাহ এসে তাঁকে তাসাওউফ বা সাধনা সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করলেন। তিনি বললেন, আপনি যা দেখেছেন তা তাসাওউফের নিম্ন শ্রেণী। তাহলে উচ্চ কোন্‌টি? শিবলী রহমাতুল্লাহ জিজ্ঞেস করলেন। তিনি বললেন, সেটি আপনার জ্ঞানের বাইরে। এবার তার ওপর পাথর ছোঁড়া শুরু হল। এমন কি হযরত শিবলী রহমাতুল্লাহ ও একটি ঢিল নিক্ষেপ করলেন। আর হযরত হাল্লাজ রহমাতুল্লাহ আর্তনাদ করে উঠলেন। লােকে তাকে বললেন, এত পাথর ছোঁড়া হচ্ছে, অথচ আপনি নির্বিকার। কিন্তু শিবলী রহমাতুল্লাহ-এর সামান্য ঢিলের আঘাতে আপনি অমন চিৎকার করলেন কেন? তিনি বললেন, যারা পাথর নিক্ষেপ করছে তারা রয়েছে অজ্ঞানতার আঁধারে । কিন্তু হযরত শিবলী রহমাতুল্লাহ-এর মতাে জানাশােনা লােক আমার ওপর ঢিল ছুঁড়ছেন, এ দুঃখ কি সহ্য করা যায়?

শূলে চড়িয়ে প্রথমে তার হাত কেটে দেয়া হয়। তিনি মন্তব্য করলেন, এ লেকটির এই হাত কাটা সহজ বটে, কিন্তু যে অদৃশ্য হাত দিয়ে সে আরশের ওপর থেকে গৌরবের মুকুট টেনে আনছে, তা কে কাটতে পারে? তারপর তাঁর পা কাটা হল । তখনও তার সহাস্য মন্তব্য; এই পায়ের সাহায্যে পৃথিবীতে চলাফেরা করেছি। আর এখন এই পা কেটে ফেলা হল। কিন্তু আমার যে অদৃশ্য পা আছে, জান্নাতে আমি তার সাহায্যেই বিচরণ করব। তােমাদের ক্ষমতা থাকলে সে পা কেটে নাও দেখি! বলে দু’হাতের রক্ত নিয়ে তিনি মুখে মাখতে লাগলেন। এ আপনি কি করছেন? তাকে সবাই বলে। তিনি বললেন, আমার শরীরের রক্ত ঝরছে প্রচুর। তাই মুখখানি সাদা হয়ে গেছে। তােমাদের মনে হতে পারে, বুঝি বা ভয়েই মুখখানি সাদা হয়ে গেছে। তাই মুখে রক্ত মেখে লাল করে নিলাম। | তারপর তিনি হাতে রক্ত মাখতে লাগলেন। বললেন, ওজু বানাচ্ছি। লােকে বলে কি রকম? তিনি বললেন, দু’রাকায়াত এশকের নামায আছে, যা রক্ত দ্বারা ওজু করে আদায় করতে হয়। | এরপর তাঁর চোখ উপড়ে ফেলা হল। আর এ দৃশ্য দেখতে না পেরে জনগণ কান্নায় ভেঙে পড়ল। অবশ্য কেউ কেউ তখনও তার দিকে পাথর ছুঁড়ছিল। এবার তার জিভ কাটতে উদ্যত হলে তিনি একটু থামতে বললেন। তারপর শূন্যে দৃষ্টি ছড়িয়ে বললেন, প্রভু! এরা যে আমাকে এত কষ্ট দিল এজন্য এদের আপনার অনুগ্রহ থেকে বঞ্চিত করবেন না। যদিও তারা আমার হাত পা কেটেছে, তবুও তারা সবাই রয়েছে আপনার পথে। তারা যদি আমার মাথাও কেটে নেয়, তবুও তাদের উদ্দেশ্য শুধু আপনারই দীদার লাভ করা।

এবার তার নাক ও কান কেটে দেয়া হল। তার ওপর প্রস্তর নিক্ষেপ তখনও বন্ধ হয়নি। তার শেষ কথা হলঃ আমি একত্ববাদের প্রেমিক। একত্বের প্রতি প্রেম হল, এককে একই জানা আর অন্য কাউকে সেখানে স্থান না দেয়া। তারপর তিনি এই আয়াতটি পাঠ করলেন; “যারা ঈমান আনে না এবং কিয়ামতকে অবিশ্বাস করে তা থেকে পালিয়ে যায়, অথচ তারা অন্তরে জানে যে, এ অবধারিত সত্য, তারাই সহাস্যে রাসূলে করীম রহমাতুল্লাহ-কে তাড়াতাড়ি কিয়ামত এনে দেখাতে বলে। আর যারা ঈমান আনে (সেই ভয়ঙ্কর দিনে নাম শুনে) ভয়ে ভীত হয় ও কুকর্ম থেকে বিরত থাকে, তারাই কিয়ামতকে সত্য বলে জানে ও মনে প্রাণে বিস্বাস করে।”

এটুকু বলার পরই তার জিভ কেটে নেয়া হল । তখন দিনের আলাে ফুরিয়ে এল । এল সন্ধ্যা। এবার খলীফার নির্দেশ দেহ থেকে তার মাথা বিচ্ছিন্ন করা হােক। এ আদেশ পালনে ঘাতকেরা প্রস্তুত। হঠাৎ মনসুর হাল্লাজ রহমাতুল্লাহ স-শব্দে হেসে উঠলেন কিন্তু জনতার মধ্যে জেগে উঠল কান্নার রােল। আর সেই হাসি কান্নার মধ্যেই তার শিরচ্ছেদ করা হল । আর সঙ্গে সঙ্গে তাঁর প্রতিটি অঙ্গ উচ্চারণ করতে শুরু করল আনাল হক, আনাল হক। তখন সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কেটে টুকরাে টুকরাে করা হল। বাকী রইল শুধু গলা আর পিঠ। কিন্তু তাঁর খণ্ডিত অঙ্গ থেকেও নিনাদিত হল আনাল হক আনাল হক। শরীরের প্রতিটি রক্তবিন্দু মাটিতে পড়ে আনাল হক বলতে শুরু করল। আর এমনিভাবে রাত কেটে গেল। দ্বিতীয় দিন সবাই স-বিস্ময়ে দেখল, আগে শুধু এক মুখে আনাল হক উচ্চারিত হচ্ছিল। এখন তা শতমুখে উচ্চারিত হচ্ছে। খলীফার লােকজন এবাৱ হতবুদ্ধি হয়ে গেল। তারা তার খণ্ডিত দেহাংশগুলি আগুনে পুড়ে ছাই করে ফেলল। কিন্তু তাতে বিপদ বেড়ে গেল সহস্র গুণ । প্রতিটি ভস্মকণা থেকে শব্দ উঠতে থাকল আনাল হক, আনাল হক।

বেগতিক বুঝে খলীফা নির্দেশ দিলেন, তার দেহ-ভস্ম দজলা নদীতে ফেলে দেয়া হােক। কিংকর্তব্যবিমূঢ় প্রশাসন কর্মীরা তাই করল। কিন্তু তার ফল হল আরও মারাত্মক। হঠাৎ দজলা নদী ফুঁসে উঠল বিপুল জলােচ্ছাসে । আর উৎক্ষিপ্ত তরঙ্গ আনাল হক আনাল হক বলতে বলতে প্রচণ্ড বেগে আছড়ে পড়ল নদী-তটে। জনগণের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হল। হয়ত ক্রুদ্ধ নদী বাগদাদ মহানগরী গ্রাস করে ফেলবে। সবাই তখন দিশেহারা।

হযরত মনসুর হাল্লাজ রহমাতুল্লাহ ঐ ক্ষমতাবলে ভবিষ্যতের কথা জেনে নিয়েছিলেন। তাই তিনি তাঁর এক শিষ্যকে বলে যান, তার দেহ ভস্ম দজলা বক্ষে নিপতিত হলে তা ভীষণ আকার ধারণ করবে। তখন তিনি যেন তার খিরকাটি নদীকে দেখিয়ে দেন। তা হলে সে শান্ত হয়ে যাবে। হঠাৎ কথাটি মনে পড়ল ঐ শিষ্যের। তিনি তাড়াতাড়ি তার খিরকাটি নিয়ে নদীর সামনে ধরলেন। আর সঙ্গে সঙ্গে নদী শান্ত হয়ে গেল। নিক্ষিপ্ত ভস্ম এসে জমা হল নদী-তীরে। আর তা তুলে নিয়ে লােকেরা কবর খুঁড়ে তাতে দাফন করল । ভয়ংকর এক বিপর্যয় থেকে দেশ ও জাতি রক্ষা পেল। অন্য কোন তাপসের মৃত্যুর পর মানুষ এমন বিপর্যয় প্রত্যক্ষ করেনি। একজন বিখ্যাত জ্ঞানী বলেন, যখনই হষরত মনসুর হাল্লাজ রহমাতুল্লাহ-এর প্রতি অমানবিক আচরণের মর্মান্তিক দৃশ্যটি মানস পটে ভেসে ওঠে, তখন আপনা থেকে আমার মনে একটি প্রশ্নের উদয় হয় যে, তার সাথে এরূপ ব্যবহার করা হল কেন? আর এ প্রশ্নও মনের মধ্যে নিয়ত ঘুরপাক খায়, যারা তাঁর প্রতি এ ধরনের নিষ্ঠুর আচরণ করল, রােজ কিয়ামতে তাদের অবস্থা কী দাঁড়াবে? হযরত আব্বাস তুসী রহমাতুল্লাহ বলেন, রােজ কিয়ামতে হাশরের মাঠে তাঁকে বেঁধে রাখা হবে, না হলে তার দ্বারা এক তুমুল কান্ড সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

কোন এক দরবেশ বলেন, যে রাতে হযরত মনসুর রহমাতুল্লাহ-কে শূলে দেয়া হয়, সে রাতে ভাের পর্যন্ত তিনি শূল কাঠের নিচে মােরাকাবায় কাটিয়ে দেন। ভােরের দিকে তিনি এক অদৃশ্য বাণী শুনতে পান। তাতে বলা হয়, আমি আমার গােপন রহস্যাবলীর একমাত্র রহস্য মানসুরের কাছে উন্মোচন করেছিলাম যা সে জনসমক্ষে প্রকাশ করে দিল। যার ফলে তাকে এরূপ কঠোর পরিণতির শিকার হতে হল। কোন শাহী রহস্য ফাঁস করে দিলে তার পরিণতি এরূপই হয়ে থাকে।

হযরত শিবলী রহমাতুল্লাহ বলেন, তার দেহ ভস্ম দাফন করার পর তিনি সেখানেই সারা রাত উপাসনায় কাটিয়ে দেন। ভােরবেলায় আল্লাহর দরবারে মােনাজাত করেন। হে প্রভু, মানসুর হাল্লাজ রহমাতুল্লাহ একজন মুমিন বান্দা ছিলেন। তিনি তত্ত্বজ্ঞানী, প্রেমিক, তওহীদবাদী। তা সত্ত্বেও আপনি তাঁকে এমন কঠিন অবস্থায় ফেলে দিলেন? তাঁর প্রার্থনা তখনও শেষ হয়নি। হঠাৎ তার ঘুম নামে দু’চোখে আর তিনি স্বপ্ন দেখেন, রােজ কিয়ামত উপস্থিত। আল্লাহ পাক ঘােষণা করছেন, আমি তার সঙ্গে এরূপ ব্যবহার এজন্য করেছি যে, সে আমার গােপন রহস্য মানুষের কাছে ফাস করে দিত। যে গােপন রহস্য দজলা নদীর ওপর প্রকাশ করা উচিত ছিল সে তা মানুষের কাছে প্রকাশ করে দিয়েছিল। হযরত শিবলী রহমাতুল্লাহ দ্বিতীয় রাতে পুনরায় তাঁকে স্বপ্নযােগে দেখেন। আর তার অবস্থা জানতে চান। তিনি উত্তর দেন, আল্লাহ তাকে অনুপম জান্নাতে জায়গা দিয়েছেন। তিনি আরও জানতে চান, তাঁর সমর্থক ও বিরােধী এই দু’দলের সঙ্গে আল্লাহ কিরূপ ব্যবহার করবেন। তিনি বললেন, দু’দলের ওপরই আল্লাহর অনুগ্রহ বর্ষিত হবে। একদল আমাকে বিশেষভাবে জানত ও আমার সম্বন্ধে ভালাে ধারণা করত। অন্য দল জানত না, কিন্তু আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্যই আমার বিরােধিতা করত । তাই উভয় দলই আল্লাহর প্রিয় ও করুণার পাত্র বলে বিবেচিত।

কোন এক দরবেশ স্বপ্ন দেখেন, হাশরের মাঠে হযরত মনসুর হাল্লাজ রহমাতুল্লাহ শরাবের পেয়ালা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। কিন্তু তার দেহের সঙ্গে মাথা যুক্ত নয়। এর কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, পৃথিবীতে যাদের শিরচ্ছেদ হয়েছে, তারাই হাশরের মাঠে শরাবের পেয়ালার অধিকারী হবে।

হযরত শিবলী রহমাতুল্লাহ বলেন, হযরত মনসুর হাল্লাজ রহমাতুল্লাহ-কে যখন শূলে তােলা হয়, তখন ইবলীস তাঁর সামনে এসে বলে, আপনি যা বলেছেন আমিও তাই বলেছিলাম। আপনি আনাল হক বলছেন, আমি বলতাম আনা খাইরুন (আমি সর্বোত্তম)। তবে কেন আপনার প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ আর আমার প্রতি অভিশাপ অবতীর্ণ হল? হযরত মনসুর হাল্লাজ রহমাতুল্লাহ জবাব দেন, তুমি তা বলেছিলে অহমিকা-প্রসূত হয়ে স্বেচ্চায়। আর আমি আনাল হক বলেছিলাম আমার আমিত্ব সম্পূর্ণ বিসর্জন দিয়ে আল্লাহরই ইচ্ছায় । এই হল অনুগ্রহ ও অভিশাপের কারণ। জেনে রেখাে, অহঙ্কার আল্লাহর দরবারে অত্যন্ত দৃণিত, নিকৃষ্ট। পক্ষান্তরে আমিত্ব বিসর্জন দেয়া হল আল্লাহর কাছে অত্যন্ত প্রিয় ও পছন্দনীয় কাজ। | হযরত মূসা (আঃ) সম্পর্কে তাঁর অভিমত জানতে চাওয়া হলে হযরত মানসুর হাল্লাজ রহমাতুল্লাহ বলেন, তিনি ছিলেন সর্বাবস্থায় সত্য ও ন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত। ফেরাউন সম্পর্কে তাঁর বক্তব্যঃ সে-ও খাঁটি ছিল। কেননা, আল্লাহ ‘খাস’ ও ‘আম” (বিশেষ ও সাধারণ) দুই শ্রেণীর মানুষ সৃষ্টি করেছেন। উভয় শ্রেণীই নিজ নিজ পথে চলে। আর উভয় শ্রেণীর পথ-প্রদর্শক হলেন আল্লাহ। তিনি বলেনঃ

১, আল্লাহর স্মরণে লিপ্ত হয়ে যারা ইহলােক-পরলােক সবকিছু ভুলে যায়, তারাই আল্লাহর নৈকট্য লাভ করে।

২. সুফী ব্যক্তি বড় একা এই কারণে যে, আল্লাহ ছাড়া তিনি কোন কিছুর খবর রাখেননা । অন্যরাও তার সম্বন্ধে কোন কিছু জানতে পারে না।

৩. ঈমানের আলােয় আল্লাহর অনুসন্ধান কর।

৪. হেকমত তীর সদৃশ। আল্লাহ তীরন্দাজ। আর তার নিশানা সৃষ্টিজগত।

৫. মুমিন তিনিই যিনি ধন-সম্পদকে দুষণীয় মনে করে স্বপ্নের রাজ্যে সন্তোষ অবলম্বন করেন।

৬. বিপর্যয়ে ধৈর্যধারণ করা ও আল্লাহকে ভালােভাবে জেনে নেয়াই হল সর্বোৎকৃষ্ট চরিত্র।

৭. আমলকে অসততা থেকে পবিত্র রাখাই হল আখলাক।

৮. সাধারণ মানুষের জ্ঞান, তত্ত্বজ্ঞানীর আধ্যাত্ম-চিন্তা, বিদ্বানগণের জ্যোতি এবং পূর্ববর্তী মুক্তিপ্রাপ্তদের পথই হল প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত একই আল্লাহর পথে সম্পৃক্ত ও জড়িত।

৯. বাদশাহ যেমন ভােগবিলাস, রাজ্য দখল প্রভৃতি কাজে ব্যস্ত, অনুরূপভাবে আমরাও সদা-সর্বদা বিপদ-আপদ আসায় ব্যস্ত থাকি।

১০. উপাসনার মঞ্জিল পার হবার পর মানুষ স্বাধীনতা লাভ করে।

১১. বেশী লম্বা হাত কী দোয়ার না এবাদতের? এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, কোন হাতই লক্ষ্যস্থলে পৌছাতে পারে না। কেননা, প্রার্থনার হাত পৌছাতে পারে স্বীকৃতির সীমা পর্যন্ত। আর এবাদতের হাত পৌছায় শরীয়তের দামান পর্যন্ত। খাটি দাসগণের কাছে এরা কোনটিই পছন্দনীয় নয়।

১২. আল্লাহর হাকীকত যার জন্য খুলে যায়, সামান্য কাজের মাধ্যমেই তা হয়ে যায়। পক্ষান্তরে যার প্রতি তা উন্মুক্ত হবার নয়, বহু সৎ কাজের বিনিময়েও তা কখনই হয় না।

১৩. যতক্ষণ পর্যন্ত বিপদ-আপদে ধৈর্য ধারণ করা না যাবে, আল্লাহর এনায়েত সে পর্যন্ত হাসিল করা সম্ভব হবে না।

সূত্রঃ-তাযকেরাতুল আউলিয়া

মনসুর হাল্লাজ এর জীবনী পড়তে এখানে ক্লিক করুন।

নিজামুদ্দিন আউলিয়া জীবনী-এলো দিল্লীতে নিজামউদ্দিন আউলিয়া

নিজামুদ্দিন আউলিয়া জীবনী-এলো দিল্লীতে নিজামউদ্দিন আউলিয়া

নিজামুদ্দিন আউলিয়া রহমাতুল্লাহর জন্ম ও পরিচয় : মাহবুবে ইলাহী হযরত খাজা নিজামুদ্দিন আউলিয়া রহমাতুল্লাহ হিজরী ৬৩৬ সালে জন্মগ্রহণ করেছিলেন এবং হিজরী ৭২৫ সালে ইহ-ধাম ত্যাগ করেন। ঈসায়ী সালের হিসাব মতে তার জন্ম হয়েছিল ১২১৫ খ্রিস্টাব্দে এবং তিনি মৃত্যুবরণ করেছিলেন ১৩০৪ খ্রিস্টাব্দে। হিসেব করলে দেখা যায় যে, তিনি ৮৯ বছর এই জগতের ধুলায় অবস্থান করেছিলেন। এই ৮৯ বছরে তিনি রূহানী জগতে যে নবতর প্রাণ বন্যার জোয়ার এনেছিলেন এবং ধর্মসম্মত কার্যাবলী ও ঈমানের হেফাজতের লক্ষ্যে কাজ করেছিলেন, তা শুধু ভারতীয় উপমহাদেশে নয় বরং মুসলিম দুনিয়ার সর্বত্র নতুন অনুরাগের পথ রচনা করতে পেরেছিলেন। | খােদা প্রেমিক ও আশেকানে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর প্রতি তিনি এতই অনুরক্ত হয়েছিলেন যে, তিনি দিবারাত্রি আল্লাহ রাসূলের ধ্যানে মগ্ন থাকতেন এমন কি দ্বীন ও ইসলামের ব্যাপারেও জীবন উৎসর্গীকৃত করতে বিন্দুমাত্র অবহেলা করতেন না।

হযরত নিজামুদ্দিন আউলিয়া রহমাতুল্লাহ যে একজন নির্বাচিত জীবন সন্ধানীই ছিলেন তা নয়, তিনি এবাদত বন্দেগীর দ্বারা আল্লাহ রাবুল আলামীনের নৈকট্যও লাভ করতে সক্ষম হয়ে ছিলেন। শুধু তাই নয় তিনি জনসেবা ও ঐশী প্রেমর ক্ষেত্রে তৎকালীন জগতে ছিলেন এক বিশিষ্ট মর্যাদার অধিকারী। জাতি ধর্ম-গোত্র-নির্বিশেষে তিনি অগণিত মানুষের সেবায় অহরহ ব্যাপৃত থাকতেন। সুতরাং ভারতবাসীদের ইতিহাসে তার নাম স্বর্ণাক্ষরে লিখিত রয়েছে।

শিক্ষা গ্রহণঃ জনক জননী ও আত্মীয় স্বজনদের আদর স্নেহে প্রতিপালিত হতে লাগলেন তিনি। ছেলেবেলাই কিশাের নিজামুদ্দিন অন্য ছেলে পিলেদের চেয়ে একটু অন্য ধরণের বলে মনে হতে লাগল। শৈশব থেকে তার মন মানসিকতা থেকে পিতামাতা বুঝতে পেরেছিলেন এই ছেলে একদিন জগতের পুজনীয় ব্যক্তিরূপে পরিগণিত হবে। তিনি ছােটকাল থেকেই তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়েছিলেন। তাঁর পিতা হযরত সাইয়্যেদ আহমদ রহমাতুল্লাহ দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করে যখন চীর বিদায় নিলেন তখন নিজামুদ্দিন আউলিয়া-এর ৫ বৎসর বয়স।

তিনি পিতৃহারা বালক রূপে জীবন যাপন করিতে লাগলেন। মাতা জোলায়খা বিবি একটা সমস্যার মধ্যে পড়ে গেলেন। ঘর সংসারের কাজকর্ম সমাধা করা এবং প্রিয়পুত্রের লেখাপড়া নিয়ে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়লেন। যেভাবেই হউক তিনি পুত্রের এলমে দ্বীন শিক্ষা দিবেনই। তিনি ছেলেকে প্রাথমিক মক্তবে ভর্তি করে দিলেন।হযরত নিজামুদ্দিন আউলিয়া রহমাতুল্লাহ সর্ব প্রথমে পবিত্র কুরআন শরীফ খতম করলেন এবং হযরত মাওলানা আলাউদ্দিন উমুলীর নিকট ফিকাহ শাস্ত্রের প্রাথমিক কিতাবসমূহ অধ্যয়ন করেন। একই সাথে মক্তবের পাঠ্যক্রম অনুযায়ী আনুষাঙ্গিক অন্যান্য বিষয়সমূহের জ্ঞান অর্জন করেন।

নিজামুদ্দিন আউলিয়া

মুগল রাজকুমারী জাহানারা বেগমের সমাধি (বামে), নিজামুদ্দিনের মাজার(ডানে) এবংজামা’য়াত খানা মসজিদ কমপ্লেক্স।

মক্তবের লেখাপড়া সমাপ্তি করার পর মায়ের আদেশানুসারে তাকে পাঠানাে হল প্রখ্যাত কামিল ও শিক্ষাবিদ হযরত মাওলানা শামসুদ্দিন দামাগানী রহমাতুল্লাহ-এর শিষ্যত্ব গ্রহণ করার জন্য। প্রথম দর্শনেই মাওলানা শামসুদ্দীন রহমাতুল্লাহ সাহেব তার প্রতি কেমন যেন অনুপম ও আকর্ষণ অনুভব করলেন। তিনি প্রথম দেখাতে বুঝতে পারলেন যে উক্ত ছেলেটির মধ্যে বিরাট প্রতিভা লুকায়িত আছে। তিনি সানন্দে নিজাম উদ্দিনকে শিক্ষা দিয়ে মানুষ করলেন। তখন ছিল প্রাচীনকাল। আর সেই সময়টায় ছিল দিল্লীর অধিস্বর সুলতান গিয়াসউদ্দিন বলবন। তিনি মাওলানা শামসুদ্দিন দামগানী এর তার পাণ্ডিত্য, কামালিয়াত ও বুযুর্গীর প্রতি খুবই শ্রদ্ধাবান ছিলেন। তিনি তাঁর পাণ্ডিত্যের ন্যায্য মূল্য স্বরূপ তাঁকে ‘শামসুল মূলক’ উপাধিতে বিভূষিত করেছিলেন। ধর্মীয় শাস্ত্র ফিকাহ, উমমূল আকায়েদ, সাহিত্য ইত্যাদি বিষয়ে জ্ঞান লাভ করার পর হযরত নিজামউদ্দিন আউলিয়া রহমাতুল্লাহ হাদীস শরীফে উচ্চতর শিক্ষা লাভের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেন এবং তৎকালীন দিল্লীর সর্বশ্রেষ্ঠ বুজুর্গ ও হাদিস বিমারদ হযরত মাওলানা কামালউদ্দিন রহমাতুল্লাহ-এর খেদমতে হাজির হন এবং তাঁর সাহচর্যে হাদিস বিষয়ক কিতাবাদি অধ্যয়নে ব্রতী হন ও সুখ্যাতির সাথে জ্ঞানার্জন করেন। তখন হাদীস বিশারদ মাওলানা আহমদ তাবারিজির স্থানও ছিল অতি উচ্চে। তাঁর চেয়েও তিনি অধিক জ্ঞানী বলে সমধিক প্রসিদ্ধি লাভ করেছিলেন।

শুধুমাত্র হাদীস শরীফেই তার শিক্ষা সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি একাধারে যেমনি একজন সুপণ্ডিত ও শাস্ত্রকার ছিলেন তেমনি জ্যোতির্বিদ্যা, গণিত শাস্ত্র, তফসীর, বালাগত, উমূল, ফিকাহ, আকায়েদ, ইতিহাস ও সাহিত্য সম্পর্কেও বিভিন্ন মাশায়েখদের নিকট হতে প্রভুত জ্ঞান অর্জন করেছিলেন। একই সাথে তার তীক্ষ্ণ ধ্যান শক্তি তাকে প্রতুৎপন্নমতি, অসাধারণ ধৈর্য ও সহনশীলতা মনজিলে মকসুদে পৌছে দিল। তাঁর মধ্যে কোনরূপ আড়ম্বর প্রিয়তা ছিল না। সবসময়ই তিনি সহজ সরল জীবন যাপন করতেন। তার পাণ্ডিত্য সকলকেই বিমুগ্ধ করে তুলেছিল।

তরিকতে বিশেষ বুৎপত্তি লাভ ? মহান খােদা প্রিয় বান্দা মাহবুবে ইলাহী হযরত নিজাম উদ্দিন আউলিয়া রহমাতুল্লাহ এলমে জাহেরের সাথে সাথে এলমে বাতেনের প্রতিও আকৃষ্ট হয়ে পড়ে ছিলেন। তিনি মনে করেছিলেন, কিতাবী জ্ঞান কেমন যেন অপূর্ণ রয়ে গেল। জাহেরী ভাবে ধর্ম পুরােপুরি লাভ হয় না। তাই একমাত্র বাতেনের মাধ্যমেই কিছু আধ্যাত্ম সাধনায় গভীর মনােযোগের সাথে আত্মনিয়ােগ করেন।

তিনি ভাবতেন কিভাবে এলমে বাতেনের পরিপূর্ণতা লাভ করা যায়, তজ্জন্য তিনি তৎকালী বাতেনের শিক্ষা লাভ করার জন্য শায়খ নাজিমউদ্দিন মুতাওয়াকিল রহমাতুল্লাহ দিল্লীর বিখ্যাত তাশতদার মসজিদের হুজরাখানায় অবস্থান করতেন। তিনি ছিলেন তদাস্তীন সর্বশ্রেষ্ঠ অলিয়ে কামেল হযরত বাবা ফরিদ উদ্দি গঞ্জেশকর রহমাতুল্লাহ-এর ছােট ভাই। তরিকতের ক্ষেত্রে তিনি গঞ্জেশকর রহমাতুল্লহ-এর পথই অনুসরণ করে চলতেন। | অয্যোধ্যার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়ে তিনি হিজরী ৬৫৫ সালের ১০ই রজব তিনি শায়খ ফরিদ উদ্দীন গঞ্জেশকর রহমাতুল্লাহ খানকায় উপস্থিত হন। তাঁর খানকা শরীফ ছিল অয্যোধ্যায় । নিজামুদ্দিন আউলিয়া রহমাতুল্লাহ হযরত শায়খ ফরিদ গঞ্জেশকর রহমাতুল্লাহ-কে পরম শ্রদ্ধাভরে কদমবুসি করলেন। প্রথম পর্বেই যেন সােনার সােহাগার মিলন ঘটল। গঞ্জেশকর রহমাতুল্লাহ-এর যা কিছু দেবার ছিল, এর সবই মাহবুবে ইলাহী রহমাতুল্লাহ কে দান করলেন। তিনি স্বীয় চারতফি টুপী পরিয়ে দিলেন। স্বীয় খড়ম জোড়া ও খেরকাত তাকে দান করলেন।

উক্ত যে সমস্ত চাৱতফিওয়ালা টুপি খড়ম তাঁর ছিল, ঐগুলাে যে তার কাছে অমূল্য রতন রূপে মনে হলাে, তার পর তিনি বললেন, আল্লাহর যে নেয়ামত আমার কাছে ছিল তা কাউকে দান করার কথা আমি ভাবছিলাম। পরক্ষণেই তিনি ভাবছিলেন হিন্দুস্থানের বেলায়েত কাকে দেয়া যায়, এ নিয়েও চিন্তা ভাবনার অন্ত ছিল না। এমন সময় গায়েৰী আওয়াজের মাধ্যমে তাকে জানানাে হল ধৈয্য ধর, নিজামউদ্দিন আসছে, হিন্দুস্থানের বেলায়েত তাকেই দান কর। এই রূপ ভাবেই হযরত নিজামুদ্দিন তার ওস্তাদের কাছ থেকে এলমে মারেফাতের, বেলায়েত লাভ করে ইসলাম প্রচার ও প্রসারের কাজে নিজেকে মনােনিবেশ করিলেন।

মুর্শিদের দরবারে গিয়ে আধ্যাত্মিকতা শিক্ষা নিলেনঃ মুর্শিদের দরবারে তিনি মারেফাতের কামিলিয়্যাত হাসিলের বিশেষ সুযােগ পেয়েছিলেন। তিনি যে দরবারে উপস্থিত হয়েছিলেন তা ছিল সেকালের বিখ্যাত দরবার শরীফ। যার কথা পূর্বেই বর্ণনা করেছি। যে হযরত শায়খ ফরিদ উদ্দিন গঞ্জেশকর রহমাতুল্লাহ-এর দরবারে সদা সর্বদাই বিখ্যাত সাধক ও আউলিয়াদের পদাচারণে অলংকৃত ছিল এবং তাদের সকলেই সাধ্যত পবিত্র দরবারের কাজে থাকতেন, আর দরবারের কাজেই তারা নিজেদের আধ্যাত্মিক উন্নতির মূল প্রেরণ বলে মনে করতেন। সেখানে অত্যন্ত দীনহীন বেশে সামান্য পানাহার গ্রহণ করে তারা এলমে মারেফাতের তালীম ও তরবিয়তি দ্বিধাহীন চিত্তে গ্রহণ করতেন এবং আল্লাহ ও রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পবিত্র মুহব্বত লাভের দিকে ধাপে ধাপে এগিয়ে যেতেন, মারেফাত আয়ত্ব করার জন্যে।

কথিত আছে যে, হযরত গঞ্জেশকর রহমাতুল্লহ-এর মুরীদগণের মাঝে বেশি সংবেদন ছিলেন মাহবুবে ইলাহী রহমাতুল্লাহ । একদিনের ঘটনা। তার সেদিন বাজার করার কথা, এমনকি নিজের কাছেও পয়সা ছিল না, হযরত নিজামউদ্দীন ভাবলেন সামান্য লবণ বা লবণ ছাড়া কোন ক্রমেই খাওয়া যাবে না। সেই জন্য তিনি অপর এক পীর ভাইয়ের কাছ হতে কিছু পয়সা ধার গ্রহণ করে লবণ খরিদ করে তরকারী পাক করে, হযরত গঙ্গেশকর রহমাতুল্লাহ-এর সামনে পরিবেশন করলেন।

উক্ত ঘটনা কিন্তু পীর সাহেবের অগােচরে সংঘটিত হয়েছিল। যখন খাদ্য পরিবেশনের সময় হল, তিনি পীর কেবলা হযরত গঞ্জেশকর এর সামনে খাদ্য পরিবেশন করা মাত্রই তিনি বলে উঠলেন, আহাৰ্য্য বস্তু প্রত্যক্ষ করে আমি জানতে পারলাম যে উক্ত আহাৰ্য্য বস্তুতে অপচয়ের গন্ধ মিশে আছে। এই তরকারীতে ব্যবহৃত লবণ কোথা হতে সংগ্রহ করা হয়েছে?

মাহবুবে খােদা হযরত নিজামউদ্দীন রহমাতুল্লাহ বিপাক পড়ে গেলেন, তিনি বিনীত ভাবে বললেন হুজুর লঙ্গর থানায় লবণ ছিল না। এমনকি আমার কাছেও কোন পয়সা। কড়ি ছিল না, ঋণ গ্রহণ করে সামান্য লবণ কিনে তরকারী পাক করলে হযরত আপনি তরকারী খেতে পারবেন এই মনে করে লবণ কিনেছি, হুজুর বললেন, ঋণ করা তরকারী কিছুতেই খাওয়া যাবে না। বরং এর চেয়ে মৃত্যুবরণ করাই শ্রেয়। তিনি বললেন, এ তরকারী সবগুলাে গরীব মিসকিনদের মধ্যে দান করে দাও।

মাহবুবে খােদা হযরত নিজামুদ্দিন রহমাতুল্লাহ তৎক্ষণাৎ উক্ত তরকারীগুলাে ফকির মিসকিনদের মধ্যে বিতরণ করে দিলেন। তিনি জীবনে এরূপ কাজ আর করবেন না বলে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হলেন। এবং আল্লাহর দরবারে তওবা করে মুনাজাত করলেন। এই তওবার কথা শুনে পীর, কেবলা খুশী হয়ে স্বীয় আসনের কম্বল খানি হযরত মাহবুবে ইলাহী রহমাতুল্লাহ কে দান করলেন।

হিজরী ৬৫৫ সালের ১০ই রজব হতে পরবর্তী সালের ২রা রবিউল আউয়াল পর্যন্ত তিনি তালিম, তারবিয়াত ও তাওয়াজ্জ্বত গ্রহণ করে ছিলেন। ১০ই রজব হতে পরবর্তী সালের ২রা রবিউল আউয়াল পর্যন্ত একটি বছর পর্যন্ত হযরত নিজামুদ্দিন আউলিয়া রহমাতুল্লাহ স্বীয় পীর ও মাের্শদে কামেল হযরত শায়িখ ফরিদ উদ্দীন গঞ্জেশকর রহমাতুল্লাহ এর দরবারে অতিবাহিত করেছিলেন। ঐ সময়ে তিনি রিয়াজত ও মােজাহাদার মাধ্যমে উত্তরােত্তর উন্নত স্তরে সমুন্নতু হয়েছিলেন।

ওয়াদা পালনে তিনি ছিলেন আদর্শের মূর্ত প্রতীক ও মহান রাব্বল আলামীনের অলীগণ কৃত অঙ্গিকারের প্রতি সর্বদাই ছিলেন সতর্ক। কারণ তারা এ জগতকে উপেক্ষার দৃষ্টিতে দেখেন এবং এ জগতকেই একমাত্র মুক্তির পথ বলে স্বীকার করেন না। এ জগতকে তারা সাধারণ জীবনে অর্থাৎ জীৰ আত্মার আবাস স্থান হিসেবে মনে করেন, কিন্তু সাধক জীবন আরম্ভ হবে মৃত্যুর পরে এ বিশ্বাসে তারা বিশ্বাসী। কাজেই প্রথমতঃ ব্যক্তি কেন্দ্রিক দায়িত্ব ও কর্তব্য। এখানে বলা হয়েছে জীবনকে দুই ভাগে ভাগ করার কথা। প্রথম ভাগ বলতে ব্যক্তি কেন্দ্রিক দায়িত্ব কুর্তব্য। এবং দ্বিতীয়তঃ সমষ্টিগত বা সামগ্রিক দায়িত্ব। ওয়াদা পালন ব্যক্তি দায়িত্ববান ও সমষ্টি উভয় ক্ষেত্রেই সমভাবে প্রযােজ্য। ওয়াদার বরখেলাপ, জীবনে যেমন নানা রকম অসুবিধা দেখা দেয়। তেমনি সমষ্টিগত সমাজ ও জাতীয় জীবন এর ক্ষতিকর প্রভাব কোন অংশেই কম হয় না। সুতরাং এর পরিপ্রেক্ষিতে আল কুরআনে ও সহী হাদিসে ওয়াদা পালনের প্রতি জোর তাগিদ দেয়া হয়েছে। এমন কি ওয়াদা ভঙ্গ করার কুফল সুস্পষ্ট ভাবে তুলে ধরা হয়েছে। তিনি সর্বাগ্রে ওয়াদা পালনের পথ বেছে নিতেন অন্যথায় প্রয়ােজনবােধে অন্যান্য কাজকর্মে মনােনিবেশ করতেন।

নিজামুদ্দিন আউলিয়ার চিল্লা, নিজামুদ্দিন আউলিয়ার বাসস্থান, হুমায়ুন এর সমাধির উত্তর-পুর্ব দিকে

নিজামুদ্দিন আউলিয়ার চিল্লা, নিজামুদ্দিন আউলিয়ার বাসস্থান, হুমায়ুন এর সমাধির উত্তর-পুর্ব দিকে-দিল্লি

দিল্লীর সম্রাটদের অনেকেই মাহবুবে ইলাহী হযরত খাজা নিজামউদ্দীনের মুরিদ ছিলেন। সম্রাটের পুত্র শাহাজাদা খেজেরখাও হযরতনিজামুদ্দিন রহমাতুল্লাহ এর নিকট বয়াত গ্রহণ করেন। এ সকল আমীর শাহাজাদাদের সাথে মাহবুব ইলাহী রহমাতুল্লাহ যেমন ব্যবহার করতেন ঠিক তেমনি ব্যবহার, একজন গরীব দুঃখীর সাথেও তিনি করতেন। ধনী গরীব উচু নীচুর কোন প্রভেদ তার দরবারে ছিলাে না। | বিশ্ববিখ্যাত সম্রাট এ যুগবরেণ্য আউলিয়া, নিজামউদ্দীন আউলিয়ার খানকাহর জন্য পঞ্চাশ হাজার রৌপ্য মুদ্রা সুনির্দিষ্ট করেন এবং আমীর কাশেফ হাজের এর মাধ্যমে এ মহান আউলিয়ার নিকট প্রেরণ করলেন। আমীর কাশেফ হাজের উক্ত মুদ্রা নিয়ে হযরত নিজামউদ্দীন আউলিয়া রহমাতুল্লাহ এর সন্দিধানে উপস্থিত হলেন। কিন্তু হযরত নিজামউদ্দীন আউলিয়া রহমাতুল্লাহ পূর্বকৃত ওয়াদার কারনে আমীর কর্তৃক প্রদত্ত রৌপ্য মুদ্রার প্রতি মােটেও তাকালেন না। বরং পূর্ব ওয়াদা পালনের যাবতীয় উপক্রম তিনি গ্রহণ করলেন।

হযরত মাহবুবে ইলাহি রহমাতুল্লাহ বললেন, আমি পূর্বকৃত ওয়াদা সংক্রান্ত কাজে খুবই ব্যস্ত আছি এ সময় অন্য কিছুর প্রতি নজর দেয়া আমার পক্ষে মােটেই সম্ভব নয়। পঞ্চাশ হাজার রৌপ্য মুদ্রা অপেক্ষা ওয়াদা, পালনের মূল্য আমার নিকট বেশি আমি মনে করি, ওয়াদা পালন করা আটটি বেহেশত হতেও উত্তম। বাদশাহের আমীর প্রদত্ত টাকা নিয়ে ফিরে গেলেন এবং টাকা পয়সা ও অর্থ কড়ির প্রতি হযরত নিজামুদ্দিন আউলিয়ার রহমাতুল্লাহ এর বীতশ্রদ্ধ ভাবের ভূয়সী প্রশংসা করলেন। দিল্লীর সম্রাট এতে মােটেও বিরক্ত ভাব প্রকাশ করলেন না। বরং সহাস্য আনন্দে প্রেরিত রৌপ্য মুদ্রার তােড়া সযত্নে তুলে রাখলেন।

মাহবুবে খােদা হযরত নিজামুদ্দিন রহমাতুল্লাহ এর উপদেশাবলী :

(ক) অহংকার ধ্বংসের মূলঃ এ বিশ্ব জগতেযতগুলাে ধ্বংসকারী উপাদান আছে তন্মধ্যে অহংকার ও গর্ব সবচেয়ে ক্ষতিকর। তার কারণ স্বরূপ মহান রাব্বল আলামীন পবিত্র কোরআনে অহংকার বর্জনের জন্য বার বার তাকীদ করেছেন। আল-কুরাআনে ঘােষণা করা হয়েছে, “আল্লাহ পাক অহঙ্কারীকে পছন্দ করে না।” হাদীস শরীপে আছে , নবী করীম (সঃ) এরশাদ করেছেন, “অহংকার মানুষকে ধ্বংসের পথে পরিচালিত করে। কাজেই এ অহংকার ও গর্ব করা থেকে নিজেকে রক্ষা করতে না পারলে কোন ব্যক্তি আধ্যত্ম সাধনায় যেমন উন্নতি লাভ করা যায় না তেমনি তার পতনও হয় অনিবার্য। আল্লাহপাকের আজাব এবং গজৰ অহংকারীর উপর অবশ্যই পতিত হয়ে থাকে। ফেরাউনের কাহিনী নমরূদ ও সাদ্দাদের কাহিনী এবং তাঁদের সমূলে বিনাশ হওয়ার যে কারণ লক্ষ্য করা যায় তা ছিল অহঙ্কার। | একান্ত ভাবেই মানুষের পক্ষে অহংকার ও অহমিকা নানা ভাৰে প্রকাশ পেতে পারে। ধন, জনবল, বাহুবল এবং বুদ্ধি চাতুরতার তীক্ষ্ণতা অধিকাংশ সময় মানুষকে অহংকারী করে তােলে। যাহা হউক, অহংকার এর ছোঁয়া’ হতে বেঁচে থাকা বড়ই দুঃসাধ্য ব্যাপার। | (খ) আল্লাহকে পাওয়া খুবই কঠিন, অথচ আবার একেবারেই সােজা । এখন বান্দা শব্দের শাব্দিক অর্থ হচ্ছে দাস বা গােলাম। গােলামের উচিত স্বীয় মনিবের প্রতি পূর্ণ আস্থা ও আনুগত্য প্রদর্শন করা এবং বিনিময়ের মাধ্যমে বান্দার প্রতি আল্লাহ পাকের অশেষ বরকত ও রহমতের ধারা বর্ষিত হতে থাকে। ফলে বিনয়ী বান্দাহ তার মহামানব আল্লাহ পাকের রহমত ও বরকত লাভে ধন্য হয়। রসূলে পাক (সঃ) বলেছিলেন, তােমরা বিনয় ও নম্রতা অবলম্বন কর। কেননা, বিনয় এবং তার মাঝে পরিপূর্ণ সফলতা বিদ্যমান। দুনিয়ার জীবনে আমরা যে সকল লক্ষ্য উদ্দেশ্য সাধন করার জন্য মনস্থ করে থাকি এগুলাে যতখানি সহায়তা স্থান করতে পারে, তার চেয়ে সঠিক উপকারী সহায়ক উপাদান হল বিনয় ও নম্রতা। বিনয়ী লােকের কোন শত্রু থাকে না। কারণ তার সহজাত বিনয় শক্রতা সাধনের পথকে চিরতরে রুদ্ধ করে দেয়। সুতরাং ইহলৌকিক ও পরলৌকক যাবতীয় কর্মকান্ডে সফলতা অর্জন করতে হলে বিনয় ও নম্রতা দৃঢ়ভাবে ধারণ করা একান্ত দরকার।

(গ) অনিষ্টের মূল কারণ সমূহ হচ্ছে রিপুর তাড়নায় গর্হিত কাজের ভিত্তমূর রচনায় কাম, ক্রোধ, মােহ, লোেভ ও মাৎসর্য্যঃ এ বিশ্ব ভ্রামাণ্ডের মাঝে মানব দেহের যে সকল ইন্দ্রিয় রয়েছে তন্মধ্যে ছয়টি ইন্দ্রিয় খুবই কার্যকরী ভূমিকা পালন করে থাকে, ইন্দ্রিয়গুলাে হচ্ছেঃ (১) চোখের দৃষ্টি শক্তি (২) কানে শ্রবণ শক্তি (৩) নাকের ঘ্রাণ শক্তি (৪) জিহবার আস্বাদন শক্তি (৫) ত্বকের স্পর্শ শক্তি ও (৬) দেহের জৈবিক তাড়না শক্তি।

উপরােক্ত ছয়টি শক্তি হতে যে সকল কু-রিপু মানুষের মাঝে আত্ম প্রকাশ করে তা হলাে কাম, ক্রোধ, লোভ, মােহ, মৎস্য। এ রিপুগুলাে যখন কোনও মানুষের মাঝে শাখা প্রশাখা ও পত্রপল্লবে পরিব্যক্ত হয়ে উঠে, তখন তার স্বাভাবিক মানবীয় গুনাবলী লােপ পায় এবং সে ক্রমে ক্রমে পশু স্বভাৰ ধারণ করে। তজ্জন্য মানুষ রূপে জন্মগ্রহণ করেও সে আর মানবীয় সত্তারূপে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পার না। এ জন্য কাম, ক্রোধ, লােভ, মােহ, মদ এবং মাৎসর্য্যকে কঠোর সাধনার মাধ্যম অবদমিত করে তুলতে পায়। তা না হলে সমূহ ক্ষতির সম্ভাবনা দেখা দেয়া মােটেই বিচিত্র নয়। | এ আধুনিক ধরার বুকে মানুষ উছিলা স্বর রাজ্য ও রাজা কিংবা কোনও নেতার সংস্পর্শহীন ভাবে কোন ক্রমেই টিকে থাকতে পারে না। প্রতিটি মানুষের জন্য একটি আবাসভূমির দরকার এবং ভূখন্ডের শান্তি, শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তার রক্ষার জন্য একজন সুদক্ষ রাজা ৰা প্রশাসক থাকা একান্ত অপরিহার্য। তা না হলে রাজ্যে বিশলা ও অশান্তি দেখা দেয়া স্বাভাবিক।

আধ্যাত্মিকতার ভাষায় রাজ্য বলতে এখানে বুঝায় দেহকে এবং মন হল তার রাজা বা শাসক। মনের কার্য প্রতিক্রিয়া অনুসারে দেহের যাবতীয় অঙ্গ প্রতঙ্গ পরিচালিত হয়। তাই দেহ রাজ্যকে নিয়ন্ত্রণ করতে হলে মনকে কঠোর সাধনার বা সংযমের মাধ্যমে, শয়ন্ত্রণ করতে হবে। অতএব, মানুষের চিত্তবৃত্তিকে আল্লাহর পথে পরিচালিত করার জন্য যে কঠোর প্ররিশ্রম ও সাধনার দরকার, তাকেই জেহাদে আকবার হিসেবে ধরে নেয়া হয়।

ইন্তেকালঃ- ঐতিহাসিকের মতে হিজরী সাতশ পঁচিশ সালের ১১ই রবিউল আওয়াল মাসে দিল্লীর আকাশে বাতাসে দেখা গিয়েছে কাল মেঘের ঘনঘটা। দীর্ঘ ৮৯ বছর দ্বীন ও ইসলামের খেদমতে অতিবাহিত করে খাজা মাহবুবে ইলাহী সুলতানুল আউলিয়া হযরত নিজামুদ্দিন রহমাতুল্লাহ মহান প্রভুর চূড়ান্ত সান্নিধ্যে উপস্থি হলেন। তার মৃতুল পর দিল্লী তথা মুসলিম জাহানের ভাগ্যকাশে নেমে এল মহাদুর্যোগ। | মাহবুবে এলাহি খাজা নিজামুদ্দিন আউলিয়া রহমাতুল্লাহ এর ইন্তেকালের পর অগণিত লােকের ঢল নেমে আসল গিয়াসপুরে। সকলের মাঝেই কেমন যেন এক শােকের ছায়া, বেদনার সুর। কি যেন ছিল কি যেন নাই, কেমন যেন এক শােকার্ত হাহাকারের দিল্লীর আকাশ বাতাস ভারী হয়ে উঠল। দিল্লীর আনাচে কানাচে একই ক্রন্দন রােল। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইল্লাহি রাজিউন। * হযরত খাজা নিজামুদ্দিন আউলিয়া রহমাতুল্লাহ যতদিন এ পৃথিবীর বুকে জীবিত ছিলেন, ততদিন কেউ তার মর্যাদা, ফযিলত ও রূহানী জগতের অবস্থা সম্পর্কে পুরােপুরি এয়াকেবহাল ছিল না। তবে যারা তার সত্যিকারে মর্যাদা ও ফযিলত সম্পর্কে সচেতন ছিলেন, তাদের মােঝেই তার বিরােধ বেদনার সুর প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছিল। যে দিকেই তাকানাে যায়, সে দিকেই শুধু হাহাকারের বেদনার একান্ত বিলাপ। কবি প্রকৃতই বলেছিলেন, তােমার হৃদয়ে যে কি সুর ছিল । কাঁদিছে তাই মাের হিয়া, পাষাণ ভেদিয়া প্রবাহিত ধারা চির জনমের তরে ব্যথিত করিলে মােরে।

উপরােক্ত কবিতার ছন্দে অবশ্যই করুণ সুর এর আভাস পাওয়া যায়। সেই শােকের হায়া নেমে এসেছিল সারা দিল্লীর বুকে, জনমনে আজ আর কোন শান্তি নেই, আনন্দ নেই, নেই কোন সাচ্ছন্দ্য, তার তুলনা করা যায় না।

কোন কোন বর্ননায় জানা যায় হযরত নিজামুদ্দিন আউলিয়া রহমাতুল্লাহ ৮৯ বছর বয়সে রবিউল আখের চান্দের আঠার তারিখে হিজরী ৭২৫ সালে মৃত্যুবরণ করেছিলেন। মৃত্যু তারিখ সংক্রান্ত বর্ণনাগুলাে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, ১১ তারিখ এবং ১৮ আরিখের মাঝে প্রভেদ পাওয়া যায় তবে যাই হােক, তিনি যে তারিখেই মৃত্যুবরণ করুন না কেন তার মহা প্রস্থানে সারা ভারতীয় উপমহাদেশে জাতি-ধর্ম-বর্ণ গােত্র নির্বিশেষে কলের মাঝেই যে শােকের ছায়া এবং বেদনার ধরা নেমে এসেছিল একথা বলার অবকাশ রাখে না। মাহবুব ইলাহি হযরত নিজামুদ্দিন আউলিয়া রহমাতুল্লাহ এর মৃত্যুকষ্ট বা যাতনা প্রকাশ পাওয়ার পর দিল্লীর সুলতান তুঘলােক শাহ এবং বহু গুণগ্রাহী ব্যক্তি তার চিকিৎসার জন্য অধীর হয়ে উঠলেন। কিন্তু হযরত সুলতানুল আউলিয়া রহমাতুল্লাহ আর্থিব কোন চিকিৎসা কিংবা ওষুধের প্রতি মােটেই আগ্রহী ছিলেন না। তিনি সর্বদাই আল্লাহ পাকের জিকির এবং স্বরণে নিমগ্ন থাকতেন। জীবনের সকল অবস্থায় আল্লাহর ইবাদত বন্দেগী এবং হুকুম আহকাম পালন করার জন্য তিনি তৎপর থাকতেন। পৃথিবীরকোন বস্তুর প্রতিই তার কোন আকর্ষণ ছিল না। এ জন্য সম্রাট কর্তৃক প্রেরিত রাজ হেকিম যখন তার নিকট চিকিৎসার জন্য উপস্থিত হল তখন তিনি বললেন, ভালবাসার ব্যথায় পীড়িত ব্যক্তির একমাত্র ওষুধ হলাে আশেকের দিদার লাভ করা। এ ছাড়া কোন কিছুই তাকে সান্তনা দিতে পারে না। একথা বলার পর রাজ হেকিম চলে গেলেন। এর কিছুক্ষণ পরই হযরত নিজামউদ্দীন আউলিয়া রহমাতুল্লাহ এর প্রাণ বায়ু দেহ পিঞ্জর ছেড়ে অমর ধামে প্রস্থান করল। * এই মৃত্যুর ঘটনা মুহূর্তের মধ্যে চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ল। সম্রাট মােহাম্মদ তুঘলক এবং হযরত রুকুনুদ্দিন সােহরাওয়ার্দী গিয়াসপুরে ছুটে আসলেন। হযরত মাহবুবে এলাহি রহমাতুল্লাহ এর জীবদ্দশায় সম্রাট মােহাম্মদ তুঘলক কখনও তার দরবারে হাজির হওয়ার অনুমতি পান নাই। ফলে এ মহাপুরুষের মৃত্যুর পর তার অন্তিম ক্রিয়ার অংশগ্রহণ করতে সুযােগ লাভ করে নিজকে ধন্য মনে করেছিলেন। এবং তার চেহারা মােবারক এক নজর দেখে পরম স্বস্তি লাভ করেছিলেন। অসিয়ত অনুসারে তিনি তাকে যেন খানকায়ে সম্মুখে যে একটি বিরাট পুকুর বিদ্যমান ছিল সেই পুকুরের মাঝখানে যেন মৃত্যুর পরে দাফন করা হয়। ফলে ম্রাটের নির্দেশে অগণিত লােক পুকুর ভরাট করার কাজে যােগদান করল। অল্প সময়ের মধ্যেই সুচারু রূপে উক্ত পুকুরটি ভরাট হয়ে গেল এবং হযরত নিজামুদ্দিন আউলিয়া রহমাতুল্লাহ এর অন্তিম জানাযা স্বয়ং ম্রাটসহ দিল্লীর এবং আশপাশের সকল শ্রেণীর নাগরিকগণ অংশগ্রহণ করে রূহে মাগফেরাত কামনা করে তাকে চির বিদায়ে সমাহিত করলেন।

মনসুর হাল্লাজ এর জীবনী পড়তে এখানে ক্লিক করুন।

হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর পূর্ণাঙ্গ জীবনী

হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর পূর্ণাঙ্গ জীবনী

হযরত শাহজালাল রহমাতুল্লাহ জন্ম ও বংশ পরিচয়ঃ ওলি কুলের শিরােমণি হযরত শাহজালাল রহমাতুল্লাহ আল সম্রাজ্যের হেজাজ প্রদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে অবস্থিত ইয়েমেনে ১৩২২ খৃষ্টাব্দে সুপ্রসিদ্ধ শেখ বংশে মাহমুদ কোরাইশীর গৃহে জন্ম গ্রহণ করেন। তার পিতার নাম ছিল মাহমুদ কোরায়শী। তিনিও একজন মহাক্ষমতাশালী বীর পুরুষ ছিলেন। শুধু বীর পুরুষই ছিলেন না বরং তিনি একজন খাঁটি ঈমানদার ও ইসলামের একজন মহান সেবকও ছিলেন। কোন মানুষ কষ্ট ক্লেশ ছাড়া উন্নতির শীর্ষ চূড়ায় আরােহণ করতে পারে না। হযরত শাহজালাল রহমাতুল্লাহ-এর জীবনেও ইহার ব্যতিক্রম ঘটেনি।

প্রথমে তার শিশু জীবনের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেই অন্তরে দুঃখের ঝড় বয়ে যায় । শিহরে উঠে সমস্ত শরীর। | শিশু শাহজালাল মাত্র তিন মাস বয়সের সময় তার মা জননী দুনিয়া থেকে চির নিদ্রায় শায়িত হন। এর পর তার লালন-পালনের ভার স্বীয় পিতা মাহমুদ কোরাইশী গ্রহণ করে, মাহমুদ কোরায়শী সৈয়দ বংশের পূন্যবান একজন স্ত্রীকে পেয়ে খুবই সুখী হয়েছিলেন তাঁর স্ত্রীর মৃত্যুতে তিনি অত্যন্ত ব্যথিত হন।

হযরত শাহজালাল

তিনি আর অন্য কোন নারীকে গ্রহণ না করে বাকী জীবন সংগীহীন অবস্থায়ই কাটিয়েছেন। বর্তমানেও দেখা যায় কোন মলে গৃহিণী না থাকলে সংসার চালাতে হয়। তাই তাে হযরত শাহজালালের মা জননী মারা যাওয়ার পর পিতা মাহমুদ কোরাইশী খুব কষ্ট করেই সংসার চালাতেন এবং শাহ জালালকে লালন-পালন করতেন। অন্য দিকে বীর মাহমুদ কোরাইশী ইসলাম প্রচারের জন্য অসংখ্য যুদ্ধ করেছেন এবং প্রত্যেকটি যুদ্ধে তিনি জয়লাভ করেছেন। অন্যদিকে তিনি ধন সম্পদেও ছিলেন প্রাচুর্যশীল। কিন্তু তিনি ধন সম্পদের উপর কখনও আসক্ত হননি। ইসলাম প্রচারের যুদ্ধ করেই তিনি জীবন কাটিয়েছেন।

এদিকে আস্তে আস্তে শাহ জালালের জীবনেও নেমে আসে শােকের তুফান। কারণ পিতার স্নেহও বেশী দিন তার ভাগ্যে জোটেনি। মা জননীর মৃত্যুর কিছু দিন পরে দেশের সীমান্তে যখন মুসলমানদের সংগে বিধর্মীদের বিরাট যুদ্ধ শুরু হয়। সে যুদ্ধে তখন বীর যােদ্ধা মাহমুদ কোরায়শীর ডাক পড়ে যায়। যখন মাহমুদ এই যুদ্ধের সংবাদ পেলেন তখনই তাঁর মন চিন্তিত হয়ে পড়ল। না জানি যুদ্ধ থেকে আর ফিরে নাও আসতে পারি । অপর দিকে শিশু শাহাজালালের কথাও ভাবতে লাগলেন যে আমি যদি এ যুদ্ধে থেকে ফিরে আসতে না পারি তখন মাতৃ হারা শিশু শাহজালালের অবস্থাটা কি হবে। অন্য দিকে যুদ্ধেও যেতে মন চায়, তখন তিনি উভয় সংকটে পড়ে গেলেন। সে যাই হােক তিনি ঈমানী শক্তিতে ছিলেন শক্তিমান। আল্লাহর উপর ছিল তার অগাধ বিশ্বাস। তাই তিনি শিশু শাহজালালের প্রতিপালনের ভরসা একমাত্র সৃষ্টিকর্তা পালনকারী মহান আল্লাহর উপর রেখেই ধর্ম যুদ্ধের ডাকে সাড়া দিয়ে দেশের সীমান্তে কাফেরদের বিরুদ্ধে বীর বিক্রমে ছুটে চললেন।

যুদ্ধের ময়দানে গিয়ে অনেক শত্রু তার হাতে নিহত হল। যুদ্ধ করতে করতে এক সময় তিনিও শক্রর হাতে শাহাদাত বরণ করেন। আর তিনি যুদ্ধ ময়দান থেকে ফিরে এলেন না। শােক সাগরে ভাসতে লাগলেন শিশু শাহজালাল। এবার তিনি এ ধরায় এতিম হয়ে গেলেন। আল্লাহর লীলা বুঝবার শক্তি কার আছে? তিনি নদীর মাঝে পাহাড় গড়েন আবার পাহাড় ভেংগে নদী করেন। যেমন কোন মানুষ কষ্ট ব্যতিরেখে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করতে পারেন না সেই কষ্টের নমুনা নেমে আসতে লাগল ইয়াতিম শাহজালাল-এর জীবনে।

এদিকে মাহমুদ কোরায়শী গৃহত্যাগের সময় শিশু শাহজালাল রহমাতুল্লাহ ভরসা এক মাত্র আল্লাহর উপরই রেখেছেন। আল্লাহও তেমনি অসহায় শাহজালালকে তার মাতুলের মাধ্যমে আরাম আয়াশ ও সুখের মধ্যই লালন-পালন করিয়েছেন। এ কথা সর্ব বিদিত যে, যে ব্যক্তি আল্লাহকে আপন করে নিয়েছেন। তেমনি আল্লাহও তাকে সেইভাবে আপন করে নেন এই সুযােগই অসহায় শাহজালাল তা মামার সংসারে খুব সুখেই প্রতি পালিত হন।

তার পিতা শহীদ হবার পর তার মামা সৈয়দ কবির আহম্মদ অসহায় ভাগীনাটির লালন-পালনের ভার গ্রহণ করেন। হযরত শাহজালাল রহমাতুল্লাহ তার মামার সংসারে গিয়ে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হতে লাগলেন। সাথে সাথে ইবাদত বন্দেগীর মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্যও লাভ করলেন। তিনি তার জীবনকে ধর্ম প্রচারের জন্যই বিলীন করে দিয়েছিলেন।

মামার আশ্রয় দান ও শিক্ষা দীক্ষাঃ

একথা দিবা লােকের ন্যায় উজ্জ্বল যে, সকল মনীষী ধরার বুকে উচ্চ মর্যাদা লাভ করেছে হযরত শাহজালাল রহমাতুল্লাহ ছিলেন তারে মধ্যে অন্যতম। অতি অল্প বয়সে পিতামাতা হারালে মামা সৈয়দ কবির আহম্মদ তার লালন-পালনের ভার গ্রহণ করেন এবং নিজের সন্তানের মতােই লালন পালন করেন। কোন দিন থেকে কোন অভাব অনুভব করতে হয়নি। তার কারণ তার মামা এই মনােভাব নিয়ে ভাগীনার প্রতিপালন করেছেন যেন কোন সময়ই পিতামাতার কথা তার মনে না উঠে বা পিতামাতার অভাব অনুভব না করতে পারে অর্থাৎ সৈয়দ আহম্মদ কবির তার আপন সন্তাদের চেয়ে বেশী স্নেহ করতেন। আবার শুধু স্নেহ ভালাবাসা দিয়েই বড় করেননি বরং সাথে সাথে উপযুক্ত শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তুলেছিলেন। তার মামা আহম্মদ কবিরও ছিলেন একজন ত্যাগী তাপস ও ধর্ম প্রাণ ব্যক্তি। এক দিকে যেমন ছিলেন বিদ্যোৎসাহী অন্য দিকে ছিলেন কামেল অলি। ফকির বা সুফীলােকদের রীতিনীতি অনুযায়ী তিনিও অতি সাধারণ ভাবে জীবন যাপন করতেন। সকল খারাবিয়াত পরিহার করে একজন ত্যাগী পুরুষে পরিণত হয়েছিলেন।

যারা আল্লাহর প্রেমের সুধা পান করে করেছেন তারা নির্জনতাকেই পছন্দ করতেন। হযরত শাহজালাল রহমাতুল্লাহ-এর জীবনেও ইহার ব্যতিক্রম ঘটেনি। তিনিও নির্জনতাকে পছন্দ করতেন এবং নির্জনে বসে দিন রাত মহা প্রভুর আরাধনা করে জগতের বুকে সিদ্ধ পুরুষ হয়েছিলেন। নামাজ, রােজা, হজ্জ, যাকাৎ যথা নিয়মে আদায় করতেন। সাথে সাথে ওয়াজ নছিহতের কাজও চালাতেন। অর্থাৎ ধর্ম বিরােধি মানুষের মাঝে ওয়াজ নসিহত করে তাদেরকে ধর্মের দিকে আকৃষ্ট করতেন।

শিশু শাহজালাল তার শিশুকাল থেকেই কঠোর সাধনায় আল্লাহর নৈকট্য লাভের আশায় উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন। আর অতি সযত্নের সাথেই নানাবিধ শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে গড়ে উঠতে লাগলেন। হযরত শাহজালাল বাল্যকাল থেকেই ছিলেন বিদ্যোৎসাহী তেমনি ছিলেন আবার ধীর-শক্তিসম্পন্ন। সেহেতু অল্প সময়ে বিভিন্ন শিক্ষায় পারদর্শী হয়েছিলেন। সৈয়দ আহাম্মদ কবির তার ভাগীনাকে শুধু পার্থিব শিক্ষায় শিক্ষিত করলেন না বরং পার্থিব শিক্ষার সাথে সাথে আধ্যাত্মিক শিক্ষা ইবাদত সংযম ও নৈতিক শিক্ষার ভেতর দিয়ে যথা-শরীয়ত ও মারেফত শিক্ষা করে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করতে পারেন সে শিক্ষাও তাকে তার মামা দিয়েছিলেন। এইজন্য তার মামা তাকে প্রথমে আরবী ভাষা শিক্ষা দেন। এক সময় আদরের ভাগনাকে নিয়ে মক্কা শরীফও সফর করেছিলেন।

একথা না বলে পারা যায় না যে, একজন ভাল ছাত্রের মধ্যে যে সকল গুণ থাকা প্রয়ােজন তা এক শাহাজালাল রহমাতুল্লাহ-এর মধ্যে বিদ্যমান ছিল। তার ধীর-শক্তির প্রমাণ হিসেবে একথা বলা যায় যে, তিনি মাত্র সাত বছর বয়সের সময় ৩০ পারা কুরআন শরীফ মুখস্ত করেন। এরপর তিনি তার মামাকে শিক্ষাগুরু হিসেবে গ্রহণ করে তাঁর কাছ থেকে কোরআন, হাদিস তাফসির, ফেকাহ, তাসউফ ও বালগাত, মানতেক ইত্যাদি বিষয়ের উপর গভীর জ্ঞান লাভ করেন।

এক সময় তার মামা সৈয়দ আহম্মদ কবির একার পক্ষে এতগুলি বিষয়ের অধ্যাপনা করা কষ্ট অনুভব করলেন। তখনই তার মামা উচ্চ শ্রেণীর আলেমকে বালক শাহজালালের গৃহশিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত করেন। এবারে তারা উভয়ে বালক শাহজালাল কে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তুলতে লাগলেন।

তিনি শুধু জাহেরী ইলেমই শিক্ষা করেননি বরং বাতেনী ইলেমও শিক্ষা করেছিলেন। তাইতাে দেখা যায় বালকেরা যে বয়সে দুষ্টমী খেলাধুলার মধ্যে কাটায় সে বয়সে বালক শাহজালাল রহমাতুল্লাহ জ্ঞান অর্জনের জন্য নিজেকে মনােনিবেশ করেছিলেন। জ্ঞানের সাধক হযরত শাহজালাল বাল্যকাল থেকে সকল আরাম আয়েশ আনন্দ উৎসব পরিহার করে গভীর জ্ঞান সাগরে সাধনায় মত্ত হয়েছিলেন। তার মামা তাকে শুধু জ্ঞানই শিক্ষা, দেননি জ্ঞান শিক্ষার সংগে সংগে সার্বিক বিষয়ে প্রয়ােজনীয় শিক্ষা দিয়েছিলেন। উত্তম চরিত্র গঠনের জন্য যা কিছুর দরকার তাও তাকে শিক্ষা দিয়েছিলেন। যার কারণে মানুষ তার সংযম, সততা, সরলতা, বিনয় কোমলতা প্রভৃতি মহৎ গুণ দেখে তার প্রতি মুগ্ধ হয়েছিল।

তার মামা সৈয়দ আহম্মদ কবির ছিলেন একজন বিচক্ষণপূর্ণ লােক, সেহেতু তার বিচক্ষণতার দ্বারা তার ভাগীনার পূর্ণ পরিচয় পেয়েছিলেন। সে অতি সহজেই বুঝতে পেরেছিলেন যে বালক শাহজালাল একজন জগৎ বরেণ্য ব্যক্তি হবেন। বালক শাহজালাল এর অন্তরখানা ছিল আয়নার মত স্বচ্ছ ও নির্মল। তাইতাে ঐতিহাসিকরা তাকে ইসলামের দর্পন বলেও আখ্যা দিয়েছেন। শৈশব হতেই কোন খারাপ কাজ করাতাে দূরের কথা কোন দিন তার মধ্যে খারাপ কাজের রেখাপাতও ঘটেনি। ভবঘুরে লাগামহীন বালকদের মত এখানে সেখানে ঘােরা ফেরা করে কখনই সময় কাটাননি। মামা সৈয়দ আহম্মদ কবির তার দিকে কড়া দৃষ্টি রাখতেন, যাতে করে কোন খারাপ কাজে যেন শাহজালালকে স্পর্শ করতে না পারে। এদিকে বালক শাহ জালাল তার মামার ও গৃহশিক্ষকের নিকট থেকে সবক লয়ে আদায় করতে লাগলেন। তার মামাও তাকে উচ্চ হতে উচ্চ স্তরের ফয়েজ দিতে লাগলেন।

আল্লাহ পাকের অপর মহিমায় বালক শাহজালাল এলেমের সিঁড়ি বেয়ে ধাপে ধাপে উচ্চ হতে উচ্চ স্তরে পৌছাতে লাগলেন। আল্লাহর খেলা বুঝা ভার-যাকে তিনি দান করেন অতি অল্প সময়েই মাযিলে মাকছুদে পৌছাতে পারেন। বালক শাহজালালের উপরও আল্লাহর অপর করুণার ধারা প্রবাহিত হল, সেহেতু তিনি মাযিলে মাকছুদে পৌছে ছিলেন। মামা সৈয়দ আহাম্মদ কবীরের অকৃত্রিম প্রচেষ্টা ও বালক শাহ জালালের আগ্রহে তিনি কামেলে ওলির স্তর লাভ করে ছিলেন। তাইতাে তাকে আমরা ভক্তি ভরে স্মরণ করি। শুধু তাই নয় ইতিহাসের পাতায় আজ তার নামটি অমর হয়ে আছে।

মামার পরীক্ষায় উত্তীর্ণঃ

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় হযরত শাহজালাল-এর বাল্যকাল থেকেই তার চরিত্রের মাধুর্যতা ভিন্ন আভার ন্যায় প্রকাশ পেয়েছিল। অতি অল্প বয়সেই পূর্ণ আত্মা মানুষের যে সকল গুণ থাকা দরকার সে সব গুনের বিকাশ ঘটেছিল তার মধ্যে। আর সে সকল ঘুনগরিমার দ্বারাই তিনি অলিত্বের শীর্ষে স্থান দখল করেছিলেন।

বাল্যকাল থেকেই তার চলচলন, আচার-ব্যবহার ছিল সাধারণ মানুষের থেকে ব্যতিক্রম। মাঝে মাঝে বালক শাহ জালালের বিচক্ষণতা দেখে আশ্চর্য না হয়ে পারতেন না। তখন থেকেই তার মামার বুঝতে বাকী রইল না। সে যাই হােক শাহজালাল রহমাতুল্লাহ-এর বয়স যখন বাড়তে লাগল তার মামাও তাকে নানা পরীক্ষা করতে থাকে। এক সময় | ভাগীনাকে একটি কঠোর পরীক্ষা করার মনস্থ করলেন কিন্তু পরীক্ষা করার কোন পন্থা পাচ্ছেন না। এমনই এক সময় একটা তাড়া খাওয়া পাগলা হরিণী এসে সৈয়দ আহাম্মদ কবীরের সম্মুকে হাজির হল। বলল, হুজুর আমার একটা দুঃখের নালিশ করার কাকেও পেলাম না তাই আপনার দরবারে হাজির হলাম। দয়া করে আমার এই বিচারটি আপনি করবেন।

এবারে সকল প্রাণীর ভাষাবিদ সৈয়দ আহম্মদ হরিণীর কথা বুঝতে পেরে বললেন, হে-হরিণী এবারে তােমার ঘটনা খুলে বল। দুঃখিণী হরিণটির চোখের পানি ফেলে বলতে লাগল, হুজুর আমার একটি মাত্র দুগ্ধ সন্তান সেটিকে একটি ক্ষুধার্ত বাঘে নিয়ে হত্যা করে খেয়ে ফেলেছে। এখন আপনি ইহার বিচার করেন। সৈয়দ আহম্মদ কবির এবারে ভাগীনাকে পরীক্ষা করবার একটি পথ পেলেন। অনেক চিন্তা-ভাবনা করে ভাগীনাকে ডাক দিয়ে বললেন, যাও তুমি গিয়ে এই বাঘটিকে খুঁজে বিচার করে এস।

হযরত শাহ জালাল বললেন, বাঘটি ক্ষুধার্ত হয়েইতাে হরিণ ছানা খেয়েছে, এর আবার কি বিচার করা যায়। সে যাই হােক শুরুর আদেশ শিরােধার্য করে গভীর বনের দিকে ছুটে চললেন। গিয়ে অনেক সন্ধানের পর বাঘটির সন্ধান পেলেন। বাঘটি দেখে তাঁর কাছে আসার জন্য ইশারা করলেন। বাঘটি তার হিংস্রত্ব পরিহার করে তার দিকে এগিয়ে আসল। | এদিকে তার মামা ভাগীনাকে বিচার করতে পাঠিয়ে ভাবতে লাগলেন যে, বাঘটির কি বিচার করা যায়; বাঘতাে অন্য প্রাণী শিকার করেই জীবিকা নির্বাহ করে থাকে। তবে বাঘটিকে একটি চপেটাঘাত করে এই বলে দিলেই হয় যে, যেন এভাবে কোন প্রাণীর দুগ্ধ ছানাকে আহার না করে।

হযরত শাহজালাল রহমাতুল্লাহ ছিলেন একজন অগাধ আধ্যাত্মিক জ্ঞানের অধিকারী। তাই তিনি আধ্যাত্মিক জ্ঞানের মাধ্যমে তার মামার মনােভাব জানতে পারলেন এবং সেই অনুসারে বাঘটিকে কাছে ডেকে ভীষণ এক চড় লাগিয়ে বললেন, যা এভাবে আর কখনও কোন দুগ্ধ ছানাকে খাসনে যা বনে চলে যা। আর যেন তাদের বিরুদ্ধে কোন নালিশ না আসে।

আধ্যাত্মিক জ্ঞানের শিরােমণি হযরত শাহজালাল রহমাতুল্লাহ বাঘের বিচার করে মামার কাছে চললেন। গিয়ে হাস্যবদনে বললেন মামা ওদের আর কি বিচার করা যায়? বনের পশু শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করাই তাে ওদের ধর্ম। তবে আপনার আদেশ পেয়ে আমি এই ভাবে বাঘটির বিচার করেছি যে, বাঘটিকে কাছে ডেকে এক চপেটাঘাত করে বলে দিয়েছি যেন এভাবে দুগ্ধছানা কখনও শিকার করিসনে।

মামা ভাগীনার মুখে সে একথা শুনে অতি আশ্চর্য হয়ে গেলেন। ভাবলেন আমি ধারণা করেছি সেটাই করেছে? আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেলেন। তার আর বুঝার বাকী রইল না যে, এ ছেলে পূর্ণ আধ্যাত্মিক জ্ঞান লাভ করেছে। তার মামার শত কষ্টের প্রতিফলন ঘটল সেখানে। তার অন্তরে বিন্দু মাত্র কষ্ট রইল না। আনন্দে ভরে উঠল তার অন্তর। ভাগীনাকে সজোরে জড়িয়ে ধরে বললেন, বৎস! তুমি ধন্য, আমার জীবনে সকল আশা আকাংখা তুমিই পূর্ণ করতে সক্ষম হয়েছ। শুধু তাই নয় তুমিতাে সফলতার শীর্ষ চুড়ায় আরােহণ করেছ। তুমি পূর্ণ ব্যক্তিত্বের অধিকারী হয়েছ। উত্তীর্ণ হয়েছ আমার সকল পরীক্ষায়। এবার তুমি কর্ম ব্যস্ত ঝাপিয়ে পড়। শাহজালালের শ্রদ্ধেয় মামা তথা শিক্ষা গুরু ধর্ম গুরু ছিলেন গভীর জ্ঞানের অধিকারী সেহেতু তিনি ভাবতে পারলেন যে অধিক জ্ঞানীদের এক স্থানে জড়াে হওয়া ঠিক নয়।

তাই তার আদুরে ভাগীনাকে আদরের গভির ভিতরে না রেখে বললেন, বাবা তুমি অন্যত্র চলে যাও। গিয়ে ইসলাম প্রচার শুরু কর। এখানে আর আবদ্ধ হয়ে থাকার দরকার নেই। শত শত পথ ভােলা পথিককে সৎ পথে আনতে পারলেই তুমি হবে ধন্য। ইহ জগতে লাভ করতে পারবে আল্লাহর অশেষ করুণা। পর জগতেও লাভ করতে পারবে জান্নাতের অগণিত সুখ শান্তি। | প্রত্যাদেশ লাভ ও দেশ ত্যাগ ও প্রকাশ থাকে যে সৈয়দ কবির আহম্মেদ তার স্নেহের ভাগীনাকে যে সকল পরীক্ষা করেছেন হযরত শাহজালাল রহমাতুল্লাহ তার মামার প্রত্যেকটি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন। এতে তার কোন বেগ পেতে হয়নি। এবার তার শিক্ষাগুরু তাকে যে দেশ ত্যাগের ইংগিত দিয়েছেন তখন থেকেই তার মনে কি যেন নব অধ্যায়ের সূচনা তিনি দেখতে লাগলেন। কি যেন অদম্য আকাংখায় অস্থির হয়ে উঠলেন।

তিনি বুঝতে পারলেন তার জীবনেও রয়েছে অনেক অনেক দায়িত্ব ও কর্তব্য। আল্লাহর পেমে যখন তিনি অধীর হয়েছেন, তখন আল্লাহ তাওয়ালাও তাকে এমন জ্ঞান দান করলেন যাতে সকল বিষয় বুঝতে পারেন। সেহেতু তিনি একথাও বুঝতে পারলেন যে আমার উপর যে সব দায়িত্ব কর্তব্য রয়েছে এগুলাে শুধু আমার ব্যক্তিগত মঙ্গলের জন্য নয়। আল্লাহর সৃষ্ট জীব আশরাফুল মাক্লুকাতের মঙ্গলের জন্য আমাকে অনেক দায়িত্ব পালন করতে হবে। কিন্তু সে দায়িত্ব কর্তব্যটা যে কি, সেটা তিনি বুঝতে পারতেছেন না। শুধু রাত দিন ভাবতেছেন কি সে দায়িত্ব? এখন তিনি গুরুর সেবায়ে নিজেকে বিলীন করে দিতে লাগলেন। শুধু তাই নয় আল্লাহর ইবাদতে মশগুল থাকতেন।

এক দিন গভীর রাত্রে আল্লাহ আল্লাহ করতে করতে তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়লেন। এমন সময় তিনি স্বপ্নে দেখলেন, কে যেন তাকে ডেকে বলছে, “হে শাহজালাল! তুমি যে কঠোর সাধনা ও তপস্যার দ্বারা আধ্যাত্মিক জ্ঞান ও সংযমতা অর্জন করেছ, এসব তােমার নিজের জন্য নয়। এবার তুমি মানব জাতির কল্যাণের জন্য নিজেকে নিয়ােগ কর। পাপপাচার ধর্মান্ধ মানুষকে আহবান কর ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় দান কর। ইসলাম প্রায় অর্ধ বিলীনের পথে, তাই সকল মানুষকে ইসলামের দাওয়াত দিয়ে ইসলামের পতাকা পূর্ণ উত্তোলন কর। বিপথগামী মানুষকে আশ্রয় দিয়ে মুক্তির দিশা দাও। আর বসার সময় নয়। ইসলাম জগতের মহান আদর্শকে আবার পূর্ণ প্রতিষ্ঠিত করে তার দীপ্ত রশ্মিকে কুআচারে নিমগ্ন পাপী তাপীকে কলুষিত আত্মার থেকে আলােকিত করে তােল।

ইসলাম আবার দুনিয়ার বুকে পূর্ণ জাগরুক হােক এটাই তাে প্রতিপালকের পরম ইচ্ছা। সে ইচ্ছা পূরণের জন্যই আল্লাহ তােমাকে প্রয়ােজনীয় জ্ঞান দান করেছেন। আর বিলম্ব করার সময় নেই। ধর্ম প্রচারের জন্য উদ্বুদ্ধ হয়ে দায়িত্ব পালনে তৎপর হও। যে স্থান থেকে ইসলাম বিলীনের পথে। মানুষ নানা অনাচরি কুআচারে লিপ্ত সেখানে গিয়ে দায়িত্ব পালন কর। এবারে তার নিদ্রা ভাঙ্গল, মনে পড়ল স্বপ্নে পাওয়া প্রত্যাদেশের কথা। সাথে সাথে ভীত হলেন, আবার আনন্দিতও হলেন। কারণ যে বিষয়টা নিয়ে তিনি চিন্তা ভাবনা করতে ছিলেন সে সমস্যার সমাধান হয়ে গেল। তাই তাে তিনি আনন্দিত হয়ে পরের দিন ভােরে শিক্ষা গুরুর নিকট জানালেন।

কিন্তু তিনি বুঝতে পারলেন না কোথায় সে জায়গাটি। কিন্তু মনােবল হালালেন না বরং আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়লেন ভাবলেন তাহলে সেই মহান দায়িত্ব পালনের জন্য কি আমাকে পাঠিয়েছেন? এই প্রত্যাদেশও কি একই উদ্দেশ্যে দিয়েছেন? আবার ভাবতে লাগলেন আল্লাহর এ প্রত্যাদেশও কি উপেক্ষা করা যায়? কখনই না। আমাকে এ পুণ্য দায়িত্ব পালন করতেই হবে। কিন্তু শত চিন্তা ভাবনার পরেও নির্দিষ্ট স্থানটি নির্বাচন করতে পারলেন না। এদিকে তার গুরু সৈয়দ আহম্মদ কবির, তার প্রিয় ভাগীনার স্বপ্ন শুনে অত্যন্ত আনন্দিত হলেন। বললেন এ মহান দায়িত্ব তােমাকে পালন করতেই হবে।

আমিও তােমাকে অনুমতি দিলাম। যাও তুমি গিয়ে তােমার দায়িত্ব পালন কর। এবারে হযরত শাহজালাল রহমাতুল্লাহ তার মামার অনুমতি পেয়ে দেশ ত্যাগের জন্য প্রস্তুত হলেন। পরের দিন ভােরে তার মামা সৈয়দ আহম্মদ কবির এক মুষ্টি মাটি ভাগীনার হাতে দিয়ে বললেন, যাও বাবা এখান থেকে পূর্ব দিকে চলে যাও। এবং যাত্রা পথে যেখানে রাত্রি যাপন করবে সেখানের মাটি পরীক্ষা করে দেখবে। এই মাটির সাথে যে স্থানের মাটির মিল হবে সেখানেই তুমি তােমার আস্তানা তৈরি করে বসবাস শুরু কর। এবং সেখানেই তােমাকে আল্লাহর কর্তব্য পালনে ব্যপ্ত হবে।

দেশ ত্যাগের পূর্বে মামার এ আদেশ পেয়ে স্থান নির্বাচনের ব্যাপারে যে চিন্তা তার মনে দোলা দিতে ছিল সে চিন্তাও বিদূরীত হল। এবার তিনি ১২ জন শিষ্য সহচর নিযে ভারত বর্ষের দিকে রওয়ানা হলেন। অজানা অচেনা পথ ধরে চলতে লাগলেন। কিন্তু কোনরূপ বাঁধা বিঘ্নের কথা অন্তরে স্থান দিলেন না। আল্লাহর দেওয়া প্রত্যাদেশ পালনের জন্যই মানব সেবায় নিজেকে বিলীন করার উদ্দেশ্যেই নতুন পথ ধরে চলতে লাগলেন।

একথা সু-উজ্জ্বল যে আলেম কুলের শিরােমণি হযরত শাহজালাল রহমাতুল্লাহ, বেশি দিন ইয়েমেন থাকলেন না। ইয়েমেন থেকে তিনি পূর্ব বঙ্গ রওয়ানা হলেন। পথিমধ্যে তিনি দিল্লীতেও কিছু সময় অবস্থান করেছিলেন। তখন দিল্লীর বাদশাহ ছিলেন আলাউদ্দীন খলজী। দিল্লীতে তৎকালে একজন প্রখ্যাত আওলিয়া বাস করতেন। তার নাম ছিল হযরত নিজামউদ্দিন আওলিয়া। তার সুনামও সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ল। হযরত শাহজালাল রহমাতুল্লাহ দিল্লীতে এসে তার নাম শুনে তার সাথে সাক্ষাৎ করার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন।

যেই ইচ্ছা সেই কাজ। হযরত শাহজালাল রহমাতুল্লাহ নিজাম উদ্দিন আওলিয়ার সাথে সাক্ষাৎ করলেন। তিনি শাহজালালকে সাধ্যানুযায়ী মেহমানদারী করালেন এবং ওখানে রাত্রি যাপনের জন্য অনুরােধ করলেন। শাহজালাল রহমাতুল্লাহ, ওখানেই রাত্র কাটালেন।

রাত্রে হযরত নিজাম উদ্দিন আওলিয়া হযরত শাহজালালকে তার অলিত্বের ব্যাপারে পরীক্ষা করতে চাইলেন। নিজাম উদ্দিন আওলিয়া একটি কৌটায় কিছু আগুন ও তুলা ভরে কৌটার মুখ বন্ধ করে তার কাছে পাঠালেন। আধ্যাত্মিক জ্ঞানের মহা সাধক হযরত শাহজালাল নিজামউদ্দিন আওলিয়ার মনোভাব বুঝতে পেরে বিসমিল্লাহ বলে কৌটার মুখ খুললেন। দেখা গেল তুলাকে আগুন স্পর্শ করেনি। ইহা দেখে নিজাম উদ্দিন বুঝতে পারলেন শাহজালালের ব্যাপারে। এবং তার পায়ে পড়ে কান্না শুরু করে দিলেন ও তার কাছে ক্ষমা চাইলেন। দয়াল চিত্তের মহা মানব হযরত শাহজালাল তাকে ক্ষমা করে দিলেন।

এবারে হযরত নিজাম উদ্দিন আওলিয়া শাহজালাল রহমাতুল্লাহ-কে চিনতে পেরে অত্যন্ত আনন্দিত হলেন এবং পরের দিন ওখান থেকে হযরত শাহজালাল রহমাতুল্লাহ বাংলাদেশের দিকে রওয়ানা হলেন। তখন নিজাম উদ্দিন আওলিয়া তাকে ধূসর বর্ণের এক জোড়া কবুতর উপহার দিলেন।

সিলেট যে হাজার হাজার জালালী কবুতর দেখা যায়, ইহাদের আদি কবুতর সেই উপহার দেওয়া কবুতর দুটির বংশধর। এখনও সিলেটের দরগাহ শরীফে অসংখ্য কবুতর দেখা যায়। শুধু সিলেটে নয় সারা বাংলাদেশে এই কবুতর দুটির বংশধর বিস্তার লাভ করেছে। বাঙ্গালী মানুষ তাকে এমন ভাবে শ্রদ্ধা ভক্তি করে যেটা তার কবুতরের মধ্যেও কিছুটা বিদ্যমান রয়েছে। এমনকি এই কবুতরের মাধ্যমে অনেকে ভাগ্য নির্ধারণ করে থাকেন। যেমন কোন বাড়ীতে বা ঘরে এই জালালী কবুতর এসে বাসা বাঁধলে মঙ্গলের নিদর্শন হিসেবে ধরে নেয়।

পক্ষান্তরে কোন বাড়ীতে বসবাসকারী জালালী কবুতর যদি বাড়ী থেকে অন্যত্র চলে যায়, আর ফিরে না আসে, তাহলে সেটা অমঙ্গল হিসেবে ধরে নেয়া হয়। বাংলাদেশের কোন সম্প্রদায়ের লােকই এই কবুতরের গােস্ত ভক্ষণ করে না। এ কবুতরের নামও হযরত শাহজালাল রহমাতুল্লাহ-এ নামানুসারে নাম রাখা হয় জালালী কবুতর।

এদিকে হযরত শাহজালাল সকল স্থানেই তার মামার দেওয়া মাটি সহচর বৃন্দের দ্বারা পরীক্ষা করালেন কিন্তু এখন পর্যন্ত মিলাতে পারলেন না। তাই তার যাত্রাও রুদ্ধ হল না। তাই তিনি সামনের দিকেই অগ্রসর হলেন। এবারে তিনি বাংলাদেশের দিকে মনােনিবেশ করেন এবং এই দেশেই তিনি চলে আসেন।

গৌর গােবিন্দের পরিচয় ও তার অত্যাচার।

প্রকাশ থাকে যে গৌর গােবিন্দের পূর্ব পুরুষ সম্পর্ক তেমন কোন তথ্য পাওয়া যায় না। তবে ঐতিহাসিকদের মতে জানা যায় তিনি এক মহিয়সী মহিলার জারজ সন্তান ছিলেন। কোন ঐতিহাসিক বলেন, গােবিন্দ সমুদ্রের বড় পুত্র। একদিন ত্রিপুরা রাজ্যের এক মহীয়সী রাজার অজান্তে সমুদ্র দেবতার সংগে অবৈধ মেলামেশা করে সেই মিলন সমুদ্র দেবতার গর্ভধারণ করে যে বাচ্চা প্রসব করে তিনিই হল গৌর গােবিন্দ। তার দেহের আকৃতি এমন ভয়ানক ছিল যে তাকে দেখলেই মনে ঘৃণা আসত ও ভয় পেত। সে যাই হােক এক সময় সে তার বুদ্ধির চালে কূটনীতির মাধ্যমে গেীর রাজ্যের অধিপতি হয়ে বসে।

সিলেটের উত্তর অঞ্চলে পাহাড়িয়া উচু টিলার উপর ছিল তার রাজ প্রাসাদ। তার রাজ প্রাসাদ এমন ভাবে নির্মাণ করেছিলেন সেখানে বাইরের কোন শত্রু প্রবেশ করতে পারত না। সে এমন অত্যাচারী ছিল যে এক সময় অনুভব করতে পারলে যে আমার অসংখ্য শত্রু হয়েছে। তখন থেকে প্রসাদের চার পাশে পাহাড়ের গুহায় একদল অস্ত্রধারী প্রহরী নিযুক্ত করল যাতে করে কোন শত্রু রাজার উপর আক্রমণ না করতে পারে। গৌর গােবিন্দের রাজ্যের এখানে সেখানে অসংখ্য মূর্তি ছিল। রাজা মন্ত্রী সভার সদস্যগন সকলেই সর্বদা উহার পূজা করিত। রাজা এমন ভ্রমের মধ্য নিপতিত ছিল যে সেই মাটির তৈরী মূর্তির আদেশ উপদেশ অনুযায়ী নিজেকে পরিচালিত করত এবং রাজ্যও সেই অনুপাতে চালাত। তিনি এমন মনগড়া সংবিধানের উপর প্রতিষ্টিত ছিল যে, তার অস্ত্রগারে একটি বৃহাদাকারের ধনুক ছিল। ভ্রান্ত রাজা উহার মাধ্যমে ভাগ্য নির্ধারণ করত।

এবার আসা যাক তার অত্যাচারের দিকে। গেীর রাজা অত্যাচারের দিক থেকেই বেশী খ্যাতি লাভ করেছিল। সমস্ত সিলেট তিন ভাগে বিভক্ত করে তিনজন রাজা শাসন করত। তার মধ্য গৌর রাজ্যের শাসক ছিল গােবিন্ত। তাইতাে তার নাম হয় গৌর গােবিন্দ । তখন তার মতন অত্যাচারী উৎপীড়নকারী শাসক অন্য কোথাও দৃষ্টিমান হত না। তার অত্যাচারের বিক্রমে সকল স্তরের জনগণ সর্বদা ভয়ে কম্পমান থাকত। তার অত্যাচারের কথা পাশ্ববর্তী দেশগুলাের কারাে অজানা ছিল না। এক সময় তিনি পার্শ্ববর্তী রাজ্যের উপর তার অত্যাচারের হাত বাড়াল। তারাও রক্ষা পেল না। রাজা গােবিন্দ শাসকনীতি পরিহার করে পশুত্বের আচরণের দ্বারা পার্শ্ববর্তী রাজ্য দখল করে নিজ রাজ্যকে বিস্তার করেন। শুধু তাই নয় এক সময় তার রাজ্যকে একটি শক্তিশালী রাজ্যে পরিণত করেছিল।

ওলিয়ে কামেল হযরত শাহজালাল রহমাতুল্লাহ-এর সিলেট আগমনের পূর্বে সারা শ্রীহট্টকে(সিলেট) বিধর্মীরা দখল করেছিল। মুসলমানদের কোন অধিকার ছিল না। সকল শ্রেণীর জনগণকে অত্যাচারী রাজা মূর্তি পূজায় বাধ্য করত। এই কুআচরণ থেকে কেউই রক্ষা পেত না। সকলে ঘরে ঘরে গৃহ, দেবী নির্মাণ করে উহার পূজা অর্চনা করত। সেখানে ১২ মাসে ১৩ পূজার সমরোহ ঘটত। যারা রাজার পায়রুণী করত তারা বেশ সুখে-শান্তিতেই বসবাস করতে পারত।

কিন্তু মুসলমানরা তার অত্যাচারের কারণে তাদের ধর্ম পালনে সকলে ব্যর্থ ছিল। গােবিন্দের শাসনামলে সিলেট মুসলমানদের সংখ্যাও ছিল কম। মাঝে মধ্যে যারা দু’চার জন ছিল তাদের দুঃখ যাতনার সীমা ছিল না। কোন মুসলমান স্বীয় ধর্ম পালনে প্রকাশ্যে কোন কাজ করলে বা গােপনেও কিছু করলে তাকে রাজ দরবারে হাজির করে তার উপর নানা নির্যাতন উৎপীড়ন করত।

কোন স্থানে কোন মুসলান আযান দিলে কুকুরের মত লালায়িত হিন্দু গােষ্ঠীরা তাকে ধরে নিয়ে অত্যাচারী গােবিন্দের কাছে নিয়ে যেত। এক কথায় মুসলমানরা স্বাধীনভাবে তাদের ধর্ম পালন করতে পারতেন না। এমন কি কোন মুসলমান গরু জবাই করতে পারতেন না বা কোরবানীও করতে পারত না।

গােবিন্দের অত্যাচারে সকল মুসলমান অতিষ্ঠিত হয়ে উঠল। সকলেই একা একা ভাবতে লাগল যে আমার শক্তি থাকলে গোবিন্দের বিরুদ্ধে সংগ্রাম জারী করতাম। ঈমানী চেতনা তাদের মধ্যে কম ছিল না, কিন্তু কারাে একার পক্ষে রাজার বিরুদ্ধে কিছু বলার ক্ষমতা ছিল না। এমনকি কোন স্থানে রাজ সভায় হাজির করে নানা উপায়ে শাস্তি দিয়ে মারধর করে পাঠিয়ে দিত।

উচ্চস্বরে আযান একামত দিতে পারত না। নামাজের সূরা বা কোরআন তেলওয়াত করতে পারত না। যারা ধর্মে আগ্রহী ছিল তারা সকলেই চায় যে স্বীয় ধর্ম পালন করি তারই মুসলমানরাও এদের থেকে ব্যতিক্রমধর্মী ছিল না। সকল মুসলমানদের মনেই ধর্ম পালনের আগ্রহ ছিল কিন্তু অত্যাচারী শাসক গোবিন্দের কারণে কোন মুসলমান তাদের ধর্ম পালন করতে পারও না।

বুরহান উদ্দিনের ফরিয়াদঃ

রাজা গৌর গােবিন্দের শাসনামলে শ্রীহট্টের এক পাদদেশে পুন্যাত্মার অধিকারী শেখ বুরহান উদ্দিন নামে একজন লােক ছিলেন। তিনি আল্লাহর উপর বিশ্বাসী ছিলেন। তার দানও ছিল অটল। তিনি যখন যুবক বয়সে উপনীত হলেন তখন অনেক জায়গা থেকে বিয়ের প্রস্তাব আসল। কিন্তু বুরহান উদ্দিন যেমন পাকা ঈমানদার ছিলেন তার বুদ্ধি বিবেচনাও ছিল অনুরূপ। অন্য কোন ব্যক্তির ঈমান সম্পর্কে না জানলেও কতগুলাে নিদর্শন তার জানা ছিল তাই সে সেই নিদর্শন খুঁজে তার মত একটি পূর্ণবান মেয়েকে স্ত্রী-রুপে বরণ করলেন। বেশ সুখে-শান্তিতেই কয়েকটি বছর কেটে গেল। বুরহান উদ্দিন ঈমানে যেমন ছিলেন পরিপূর্ণ ধনে-জনে-মানেও তেমনি ছিলেন পরিপূর্ণ। সেহেতু স্ত্রীকে নিয়ে মহা শান্তিতেই দাম্পত্য জীবন যাপন করতে লাগলেন। কিন্তু বুরহান উদ্দিনের যখন যুবক জীবন কেটে গিয়ে বৃদ্ধ অবস্থায় পৌঁছলেন তখনও কোন সন্তানের মুখ দেখার সৌভাগ্য হল না। এতদিন বেশ সুখেই কাটল। যখন সন্তানের চিন্তা মাথায় ঢুকল তখন কে যেন তাদের সুখের ঘরে দুঃখের আগুন জ্বালালাে। এখন আর মনে শান্তি নেই। নানা জনে নানা কথা বলতে লাগল। অনেকেই বন্ধ্যা বলে আখ্যা দিল। এছাড়া অনেক কটূক্তি দ্বারা তাদের মন ও মগজ খারাপ করে তুলল। তিনিও চিন্তায় অধীর হলেন, আল্লাহ যদি আমাদের কোন পুত্র সন্তান দান না করেন, তাহলে আমার বংশ এখানেই শেষ। কারণ সংসারে সন্ধ্যা-বাতি জালালনোর কেউ থাকবে না। তাই চিন্তায় তিনি অধীর হয়ে উঠলেন সন্তান লাভের কোন চেতনাই ছিল না। আল্লাহর লীলা বােঝা ভার। প্রায় বৃদ্ধাবস্থায় তাদের মনে সন্তানের আকাঙ্ক্ষা থামল না।

বুরহান উদ্দিন ছিলেন খাটি ঈমানদার তাই সন্তান লাভের জন্য কৃএিম কোন পদ্ধতি না নিয়ে আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করতে লাগলেন। তাদের উভয়ের মন থেকেই কে যেন শান্তি কেড়ে নিল । এমন অবস্থায় তারা পেীছল যে খাওয়া দাওয়ার প্রতি তাদের তেমন মনযোগ নেই। দিন রাত শুধু সন্তানের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে আল্লাহর শাহী দরবারে ফরিয়াদ করতে লাগলেন। “হে আল্লাহ! তুমি অসীম। তােমার গুণ, মাগফেরাত, দয়া সব কিছুই অসীম। তােমার ধন ভান্ডার সব সময় পরিপূর্ণ। তুমি যাকে ইচ্ছা তাকেই দান করতে পার। তাই আমি তােমার কাছে কোন ধন সম্পদ চাই না। যে উদ্দেশ্যে এই গভীর রাত্রে আমরা তোমার দরবারে হাত তুলেছি তােমার কাছে তা অজানা নয়। “হে মাবুদ! তােমার কাছেই আকুল আবেদন তুমি আমাদের মনের আশা পূর্ণ করে দাও।”

বুরহান উদ্দিন ও তার স্ত্রী দিনের পর রাত আবার রাতের পর দিন আল্লাহর দরবারে ফরিয়াদ করতে লাগলেন। মহান দানশীল আল্লাহর কাছে মন খুলে কিছু চাইতে পারলে আল্লাহ তাকে তা দান করেন। এক সময় দেখতে পেলেন তার স্ত্রী গর্ভধারণ করেছে। কিন্তু তিনি ফরিয়াদ থেকে বিরত হলেন না। এক সময় তিনি ফরিয়াদ করতে গিয়ে বললেন, “হে মাবুদ তুমি আমাকে একটি পুত্র সন্তান দান কর। জানি তােমার দানের হাত খাট নয়। হে প্রভু! তুমি আমাকে একটি পুত্র সন্তান দান করিলে আমি একটি গুরু কোরবানী করব তােমার রাস্তায় বিলিয়ে দিতে। আল্লাহ তার প্রার্থনা কবুল করে একটি পুত্র সন্তান দান করলেন। |

এ কথা দিবালােকের ন্যায় সত্য যে বুরহান উদ্দিনের যুবক জীবনে কোন সন্তানাদি হয়নি। পরিশেষে তার প্রার্থনা আর্তনাদ ও মান্নতের ফলে তাদের উপর আল্লাহর রহমত নাযিল হল। এক সময় দেখা গেল পুন্যবর্তী স্ত্রী গর্ভধারণ করেছেন। এখন আর মনে আনন্দ ধরে না। কে দেখে সে আনন্দ? আনন্দে তারা উভয়ে চাতক পাখীর ন্যায় আশ্বস্ত ছিল, আজ সে আশা পূরণের পথে। তিনি দান সদকার হাতকে প্রসার করলেন। গরীব-দুঃখী তার কাছে এসে খুশি মনে ফিরে যায়। কারণ সে সকল ভিক্ষুককেই বেশী বেশী দান করতেন। ক্রমশঃ দীন পেরিয়ে যায় আনন্দও বাড়তে থাকে, আর আকাঙ্ক্ষাও বাড়তে থাকে, কোন দিন দেখবে সন্তানের মুখ।

অন্য দিকে আল্লাহর দরবারে প্রার্থনাও করতে থাকলেন হে প্রভু! তুমি আমাকে একটি নেক সন্তান দান কর। এদিকে তার স্ত্রীর নির্দিষ্ট সময়ও ঘনিয়ে আসল। রাত্রে তার স্ত্রী প্রসব বেদনায় অস্থির হয়ে পড়লেন। কিন্তু মনে ছিল তার অপার আনন্দ। সে যাই হােক কিছুক্ষণ পরে বুরহান উদ্দিনের অন্ধকার ঘরকে আলােকিত করে এক নবজাত পুত্রসন্তান পদার্পণ করল। তাদের উভয়ের মনে আনন্দের সীমা রইল না। সকলকে তিনি মিষ্টি মুখ করালেন। যারা তাকে কটুক্তি করেছিল তাদেরকেও ডেকে মিষ্টি মুখ করালেন।

বাচ্চার চতুর্দশ দিবসে তার অঙ্গীকার পালনের জন্য তার নিজের পালিত মােটা তাজা গরুটিই আল্লাহর নামে কোরবানী করে দিলেন। সমস্ত গােন্ত গরীব মিসকিনদের মধ্যে বন্টন করে দিলেন। শুধু তাই নয় গরীব মিসকিনদের জন্য এক প্রীতি ভােজের আয়ােজন করেছিলেন। খুব আনন্দের সাথেই কোরবানীর কাজ সমাধা করেছিলেন।

গৌর গােবিন্দের ক্রোধঃ মহান আল্লাহ তায়ালা ১৭০৯৯৯ টি মাখলুকাতকে মানুষের কল্যাণের জন্যই সৃষ্টি করেছেন। কারও থেকে শ্রম নিয়ে কারও গােস্ত ভক্ষণ করে মানুষ উপকৃত হয়। গরু এমন একটি প্রাণী যেটার দ্বারা মানুষ শ্রম ও ভােগ করে এবং ইহার গােস্তও ভক্ষণ করে। যে সব প্রাণীর গােস্ত আল্লাহ হালাল করে দিয়েছেন তাদের মধ্যে গরুর গােস্ত ছিল অন্যতম। তবে বামপন্থী দু একটা ধর্মে গরুকে ভগবতীর ন্যায় মনে করে উহাকে পূজা করে থাকে। সেহেতু তাদের নিকট গরু জবেহ করে হার গােস্ত ভক্ষণ করা খুবই জঘন্য অপরাধ মনে করে। আবার অনেকে গাে প্রাণীকে মায়ের সমান মনে করে খুব ভক্তি শ্রদ্ধা করে থাকে।

দুর্ধর্ষ পৌত্তলিক ও আচারনিষ্ঠ হিন্দু রাজা গৌর গােবিন্দও ছিল বাম পন্থী ভ্রান্ত দলের শামীল। তিনি স্বাভাবিক ভাবেই খুৰ অত্যাচারী লােক তার উপর আবার এহেন জঘন্যতম অপরাধে যে কত পরিবর্তন হয়েছে সেটা বলাবাহুল্য। তিনি এক বার গাে হত্যাকে রাষ্ট্রবিরােধি কাজ বলে ঘােষণা করেছিল যাতে করে কোন মুসলমান স্বীয় ধর্ম ঠিকভাবে পালন করতে না পারেন।

সে যাই হােক আল্লহর খেলা বোঝা ভার। ধর্ম প্রাণ বােরহান উদ্দিন একটি পুত্র সন্তান লাভ করে মহান প্রভুর কাছে কৃত প্রতিজ্ঞা পালন করার জন্য তার গৃহে পালিত সবচেয়ে সুন্দর ও সবচেয়ে হৃষ্টপুষ্ট গরুটাই আল্লাহর নামে কোরবানী করে উহার গােস্ত গরীব দুখীদের মধ্যে বন্টন করে দিলেন। এদিকে যখন গােস্ত বন্টন করতে ছিলেন তখন একটি পাখি এসে ছোঁ মেরে এক টুকরা গােস্ত নিয়ে গেল। আল্লাহর লীলা কে বুঝতে পারে? হতভাগা সে পাখিটি গােস্ত টুকরা খেতে পারল না। যখন গৌর গােবিন্দের রাজপুরীর উপর দিয়ে পাখিটি গােস্ত টুকরা নিয়ে উড়ে যাচ্ছিল তখন রাজপুরীর পূজামন্দিরের আঙ্গিনায় গােস্ত টুকরা পড়ে গেল।

কথায় বলে যেখানে বাঘের ভয় সেখানে রাত হয়। শেখ বােরহান উদ্দিনের পালাও তাই। খুব গােপন সতর্কের সাথে গাে জবাই করে গােস্ত বন্টন করেছিল। তারপরও তার সুখের সংসার তাসের ঘরের ন্যায় বালুর বাধের ন্যায় ফসকে গেল। তার জীবনে নেমে আসে অশাস্তির হাহাকার।

মহান আল্লাহ যে বােরহান উদ্দিনের কষ্টের মাধ্যমে এ বাংলার মুসলমান জাতিকে মুক্তি দেবেন তা কে জানত? গৌর গােবিন্দ যখন শিব পূজায় রত ছিল, ঠিক সেই সময় মন্দিরের সেবায়রত পূজারী দৌড়ে এসে কাপতে কাপতে বলে উঠল, মহারাজ সর্বনাশ হয়েছে, জাত, ধর্ম আচার-অনুষ্টান সব কিছুর সর্বনাশ হয়েছে। বেঁচে থেকে আর কি লাভ? বামন ঠাকুরের চেহারা বিকৃত হয়ে গেল। এবার গৌর গােবিন্দ বামন ঠাকুরকে লক্ষ্য করে বলল তুমি অমন কর না, কি হয়েছে বামন ঠাকুর খুলে বল। বামন ঠাকুর তখন কম্পিত কণ্ঠে বলল, মহারাজ আমরা যাকে ধর্মে মা বলে শ্রদ্ধা নিবেদন করি সেই গো মাংস মন্দিরের আঙ্গিনায়। একথা মুখে আনলেও নরকে যেতে হবে।

ঠাকুরের কথা শেষ না হতেই গৌর গােবিন্দ গর্জে উঠে বলল, অসম্ভব আমার রাজ্যে এমন কাজ করার সাহস কে পেল? তখন বামন তাকে সেখানে নিয়ে পড়ে থাকা গোস্তের টুকরাটি দেখাল। সাথে সাথে তেলে বেগুনে জ্বলে উঠল। বামন ঠাকুর বলল, নিশ্চয়ই কোন মুসলমানই এ কাজ করার সাহস পেয়েছে। গৌর গােবিন্দ রেগে বলল, মােসলমান? কোথায় সে মুসলমান আমার রাজ্যে বসে এতবড় জঘন্য অপরাধ করছে। কোন মুসলমানের বাচ্চায় এত বড় সাহস পেল? তখনই রাজা তার লােক লস্করকে ডেকে পাঠাল কে সেই অপরাধী মুসলমান। মুহুর্তের ভিতরে আমার সম্মুকে হাজির কর। নিজ হাতে আমি তাকে শায়েস্তা করব।

যেই কথা সেই কাজ। রাজার লােক লস্কর সকলে রাজ্যের অলি গলিতে ছড়িয়ে পড়ে। অনেক খোঁজাখুঁজির পর সংবাদ পেল যে শেখ বােরহান উদ্দিনই এই কাজ করেছে। এবারে সেখানে গিয়ে কয়েকজন লােক বােরহান উদ্দিনকে ধরে নিয়ে রাজ দরবারে হাজির করল।

গৌর গােবিন্দ গর্জে উঠে বােরহান উদ্দিনকে জিজ্ঞেস করল, কেন তুমি এহেন কাজ করেছ? কে তোমাকে এমন কাজ করার সাহস দিল। তখন বােরহান উদ্দিন তার সমস্ত ঘটনা খুলে বললেন। অত্যাচারী গােবিন্দ ইহা শুনে আরো ক্রোধে ফেটে পড়ল। বলল একটি ছােট শিশুর মঙ্গলের জন্য এহেন জঘন্যতর অপরাধ করতে সাহস পেলে? আজ আর তােমার রক্ষা নেই। এদিকে পাপিষ্ঠ গৌর গােবিন্দ বােরহান উদ্দিনের সেই অনেক দিনের চাওয়া পাওয়া আকাংখিত নবজাত শিশুকে রাজ দরবারে আনার জন্য আদেশ করল।

নিষ্ঠুর লােক গিয়ে বােরহান উদ্দিনের ঘরে হাজির হল। নির্দয় লােক গুলাে গিয়ে বােরহান উদ্দিনের স্ত্রীর কোল থেকে মায়ের বুকের ধন সেই নবজাত শিশুটাকে কেড়ে নিয়ে এল। এবারে রাজার হুকুম জারী হল। বােরহান উদ্দিন যে ভাবে আমাদের ধর্মের অবমাননা করে গো জবাই করে মাংস টুকরা টুকরা করেছে সেই ভাবে তার সন্তানকে হত্যা করে টুকরা টুকরা করে পশুদের আহার বানিয়ে দাও।

জল্লাদ আগে এসেই রাজ দরবারে হাজির হয়েছে। যখনই গৌর গােবিন্দ এই হুকুম করল জল্লাদও সংগে সংগে প্রস্তুতি নিয়ে সেই বােরহান উদ্দিনের আকাংখিত বন্ধু তথা নবজাত সন্তানকে হত্যা করে ফেলল। এদিকে বােরহান উদ্দিনের উপর যখন এরূপ কঠোর নির্দেশ জারী হল, তখনই তিনি জ্ঞান বুদ্ধি হারা অচেতন নির্বাক হয়ে কাঠের পুতুলের ন্যায় দাড়িয়ে রইলেন। তিনি ভাল মন্দ বিচার করার শক্তিও হারিয়ে ফেললেন। তার সম্মুখে সেই আদরের সন্তানকে হত্যা করা হলেও কিছুই বলার শক্তি তার ছিল না। এখানেই অত্যাচারী রাজার অত্যাচারের হাত ক্ষান্ত হল না। আরাে সম্মুখ দিকে অগ্রসর হল।

এবার রাজা বলল, হে-বােরহান উদ্দিন তুমি যে হাতে গাে-জবেহ করেছ সে হাতিটিও কাটা যাবে। রাজার যেই কথা জল্লাদের সেই কাজ। সাথে সাথে নিষ্ঠুর জল্লাদ বােরহান উদ্দিনের হাত খানও কেটে দিল। উ! কি সে হত্যা কান্ড। সে কি বিভীষিকাময় মুহুর্ত। বােরহান উদ্দিনের অন্তরে দুঃখের ঝড় বয়ে গেল। দুঃখের অন্ত রইল না। তবুও অটল বিশ্বাসী বােরহান উদ্দিন দ্বীন থেকে বিচলিত হলেন না। তিনি হাত তুলে আল্লাহর দরবারে ফরিয়াদ করলেন, হে প্রভু! তোমার আশাই পূর্ণ হােক। তবে সকল অবস্থায় যেন তােমার উপর অটল বিশ্বাস রাখতে পারি সে তাওফিক আমাকে দান কর।

বােরহান উদ্দিনের গােবিন্দের উপর আক্রোশ! ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় গােবিন্দ যেমন ছিল অত্যাচারী তেমন ছিল নিষ্ঠুর। এবারে তার নিষ্ঠুর খেলার নিপাত হল। মাসুম অবুঝ শিশুকে হত্যা করার সময় শিশুর কান্নায় আসমান জমিন স্তম্বিত হল। বাতাস নদীর স্রোত থমকে দাড়াল। পশুর কলগান রুদ্ধ হয়ে গেল। গাছ পালা সব ঝিমুতে লাগল । পৃথিবীর দিকে তাকালে মনে হত, সারাবিশ্ব যেন শিশুর কান্নায় করুণ সুরে সুর মিলিয়ে কান্না জুড়ে দিল। বৃক্ষের পাতা ঝরে পড়ল। শিশুহারা মায়ের হৃদয় ফেটে চৌচির হয়ে গেল। মায়ের কান্না আসমান জমি এমনি আরশ পর্যন্ত কেঁপে উঠল। | কিন্তু পাপিষ্ঠ নরাধম গােবিন্দের সুরে মােটেই ব্যথার উদ্রেক হল না। বরং আনন্দই পেল।

আল্লাহর লিলা বােঝ ভার। বােরহান উদ্দিনের আনন্দ যে ভাবে গােবিন্দ নষ্ট করে দিল। আল্লাহ পাক রাব্বল আলামীনও গােবিন্দের আনন্দকে নস্যাৎ সেভাবে করে দিলেন। বােরহান উদ্দিন তার পুত্র শােকে ভীষণ ভাবে মর্মাহত হলেন। তিনি যেন একেবারেই নির্বাক হয়ে গেলেন। তার অন্তরও যেন ভেংগে চুরে চুরমার হয়ে গেল। এক সময় শেখ বােরহান উদ্দিনের চেতনা ফিরে এল। এবারে মানসিক চিন্তা ছেড়ে ঈমানী, বলে বলিয়ান হয়ে মাথা চাড়া দিয়ে উঠলেন। ধর্ম পালনের জন্যই যদি নবজাত শিশুর মৃত্যুদণ্ড হয় তাহলে আমাকে এর প্রতিশােধ নিতেই হবে। শিশুকে উদ্দেশ্য করে বললেন, বাবা তুমি সুখে ঘুমাও আমি তােমার প্রতি ফোটা রক্তের প্রতিশােধ নিব ইনশাল্লাহ। এক সময় তিনি প্রতিশােধের পথ বের করে সে পথে চলতে লাগলেন। |

গােবিন্দের বিরুদ্ধে অভিযান ॥ গৌর গােবিন্দ বােরহান উদ্দিনের পুত্র হত্যা করায় শেখ বােরহান উদ্দিন পুত্র শােকে শােকাতুর হয়ে পথ চলতেছেন আর গােবিন্দের প্রতিশােধ নেওয়ার পথ খুঁজতেছেন। এক সময় বুদ্ধি আটলেন গােবিন্দের প্রতিশােধ নিতে হলে কোন মুসলমান বাদশার সাহায্য নিতে হবে। নচেৎ একের পক্ষে কিছুতে তা সম্ভব হবে না।

তখন বাংলার রাজধানী ছিল সুকর্ণ গমে। তখন বাংলার সুলতান ছিলেন সামসউদ্দিন আহমেল। বােরহান উদ্দিন সুলতানের দরবারে হাজির হয়ে তার কাছে বােরহান উদ্দিনের পুত্র শােক ও সকল মনের দুঃখ বললেন। শামস উদ্দিন বােৰহান উদ্দিনের দুঃখের কথা শুনে কষ্টে ফেটে পড়লেন। গজে উঠে বললেন, গােবিন্দের প্রতিশােধ নিতেই হবে।

নরাধম পাপিষ্ঠ গৌর গােবিন্দকে সমুচিত শিক্ষা দেওয়ার জন্য তার সুযােগ্য পুত্র সিকান্দার শাহকে সেনাপতি করে একদল সৈন্য বাহিনী পাঠালেন। শ্রীহটের পাহাড়িয়া গিরিপথ ধরে গেীর রাজধানীর দিকে চলতে লাগলেন। এদিকে দুরাত্য গৌর গােবিন্দ সিকান্দার শাহের কবল থেকে মুক্তির জন্য একদল তিরান্দাজ বাহিনীকে গিরি পথের পাশে পাঠালেন।

যখন মুসলিম সেনারা পথ চলতে ছিলেন হঠাৎ দুর্বত্তরা তাদের উপর আকস্মাৎ হামলা চালিয়ে সেনাদলকে চিন্ন ভিন্ন করে দিল। এর পর সেকান্দার ব্যর্থ হয়ে রাজধানীতে ফিরে এলেন। কিন্তু গৌর গােবিন্দের প্রতিশােধ নেবার মনােবল হারাননি। উহার জন্য তিনি পুনরায় বিরাট এক বাহিনী তৈরী করলেন। এর মধ্যে তার পিতা ইন্তেকাল করেন। হলেও তিনি প্রতিশোধ নেবার ইচ্ছা বাদ দিলেন না। এদিকে গৌর গােবিন্দ গােয়েন্দর দ্বারা জানতে পেল যে তার বিরুদ্ধে আবার অভিযান শুরু হবে। এবারে বাঁচার কোন পথ খুঁজে পেল না।

অবশেষে গৌর গােবিন্দ এ কৌশল এঁটে সেকান্দার শাহের কাছে দূত পাঠালেন যে আমি মুসলমানদের সাথে সন্ধি চুক্তিতে আবদ্ধ হতে চাই। এই প্রস্তাবে সিকান্দার শাহ সম্মত হলেন। তার সন্ধির শর্ত ছিল যে আমি মুসলমানদের উপর কোন অত্যচার-অবিচার করিব না। তাদের ধর্ম কর্মের উপর হস্তক্ষেপ করব না। বরং তাদের ধর্ম পালনের জন্য রাজ দরবারে একখানা মসজিদ নির্মাণ করে দিব যাতে করে মুসলমানরা ঠিকভাবে তাদের ধর্ম পালন করতে পারে।

ধর্ম পরায়ণ সিকান্দার শাহ তার প্রস্তাবে রাজী হয়ে তার অভিযান ক্ষান্ত রাখলেন। এতে বােরহান উদ্দিনের মনে শান্তি ছিল না। বােরহান উদ্দিনের অন্তরে প্রতিশােধের আগুন দাউদ করে জ্বলতে লাগল। তিনি সেকান্দার শাহের দ্বারা তেমন ফল না পেয়ে অন্য উপায় খুঁজতে লাগলেন। কিভাবে গােবিন্দের প্রতিশােধ নেয়া যায়।

এর পর দ্বিতীয় পথ ধরে চলতে লাগলেন। তিনি ধর্ম পরায়ণ সুলতান ফিরােজ শাহ-এর দরবারে গিয়ে হাজির হলেন। তিনি তার মনের সকল দুঃখ ব্যাথা সুলতানের কাছে খুলে বললেন। তিনি বােরহান উদ্দিনের মুখে এমন কথা শুনে অত্যন্ত মর্মাহত হলেন। যে মুসলমানদের উপর এমন অত্যাচার। তিনি ব্যথিত হবেনই বা না কেন? পাঠান আমলে তার মত ন্যায়পরায়ণ বাদশাহ, অন্য কেউ ছিলেন না।

এবারে তিনিও গৌর গােবিন্দের প্রতিশােধ নিতে সম্মত হলেন। অপর দিকে পরগণার শাসন কর্তা নারায়নও মুসলমানদের উপর নানা উৎপিড়ন করত। তাই তার অত্যাচার অতিষ্টিত হয়ে সেখানের একজন মুসলমান ফিরােজ শাহের নিকট নালিশ করলেন। এবারে দুই দেশের অত্যাচারী হিন্দু দু’শাসকের বিরুদ্ধে অভিযান করার জন্য সৈন্য বাহিনী গঠন করলেন।

তিনি তাদের উভয়কে সমুচিত শিক্ষা দেবার জন্য তার ভাগীনে সিকান্দার কে গােবিন্দের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার জন্য নির্দেশ দিলেন। সিকান্দর গাজী মামার নির্দেশ পেয়ে সৈন্য বাহানী নিয়ে শ্রীহট্টের দিক যাত্রা করলেন। বােরহান উদ্দিনও ওদের সংগী হলেন, বড়ই পরিতাপের বিষয় যে তিনি গন্তব্য স্থানে পৌছাতে পারলেন না। পথিমধ্যে তিনি বাধার সম্মুখীন হলেন। তখন ছিল বর্ষাকাল তাইতাে সহসা ভীষণ ঝড় শুরু হল। এই ঝড়ের ঠান্ডায় অনেক সৈন্যই রােগাক্রান্ত হয়ে পড়ল। সিকান্দার গাজী তার অভিযানে সামনের দিকে আর আসর হতে পারলেন না।

অনেক সৈন্য পথিমধ্যে রােগাক্রান্ত হয়ে মারাও গিয়েছেন। এ অবস্থা দেখে হতাশায় পড়ে তিনি রােগাক্রান্ত হয়ে পড়লেন। অনেকে এখন মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ল, তখন মৃত্যুর ভয়ে অনেক সৈন্য তাবু থেকে পলায়ন করে চলে গেল । যারা বেঁচে রইল তারাও শক্তিহীন হয়ে পড়লেন।এত বিপদের পরও তিনি নিরাশ হলেন না। তিনি পুনরায় দিল্লীর শাসন কর্তার নিকট লোক মারফতে তার বিপদের কথা জানালেন ও আরাে কিছু সংখ্যক সৈন্য চাইলেন যাতে করে তার যাত্রাকে সফল করে তােলা যায়।

সিকান্দার গাজীর বিফল মনোরথের সংবাদ দিল্লীর সম্রাট আলাউদ্দীন খিলজীর নিকট পৌছায়। সম্রাট এ সংবাদে শুনে খুবই মর্মাহত হন। সম্রাট আলাউদ্দীন খিলজী রাজ দরবারে আলেম উলামাসহ জ্যোতিষীদের নিয়ে আলোচনায় বসেন। মজলিসের আলোচনায় জানতে পারেন সুলতানের সেনাবাহিনীতে আধ্যাত্বিক গুনাবলী সম্পন্ন এক মহান ব্যাক্তি রয়েছেন। যদি ঐ ব্যাক্তির নেতৃত্বে অভিযান প্রেরণ করা হয় তাহলে গৌড় গোবিন্দের যাদু বিদ্যার মোকাবেলা করে সিলেট বা শ্রীহট্ট জয় কারা সম্ভব হতে পারে। আর সেই আধ্যাত্বিক ব্যাক্তি হলেন সৈয়দ নাসির উদ্দীন সিপাসালার। সৈয়দ নাসির উদ্দীন সম্রাট আলাউদ্দীন খিলজীর আদেশে সম্মত হলে সম্রাট তাঁকে সিপাহসালার সনদ প্রদানের মাধ্যেমে সিকান্দর গাজীর কাছে প্রেরণ করেন।

হযরত শাহজালাল রহ এর সাথে বুরহান উদ্দীনের দেখাঃ

আর বুরহান উদ্দীন তখন দিল্লীতে অবস্থান করতেছেন। ঐতিহাসিক আজহার উদ্দীন ধরণা করেন, বুরহান উদ্দীনের সাথে দিল্লীতেই শাহ জালালের সাক্ষাত হয় এবং এখানেই বুরহান উদ্দীন নিজের দুঃখময় কাহিনী তাঁর নিকট বর্ণনা করেন ।

সিপাহশালার নাসির উদ্দীনের সাথে হযরত শাহজালাল রহ এর দেখাঃ

হযরত শাহ জালাল(রহ:) দিল্লী হতে বুরহান উদ্দীনকে সঙ্গে নিয়ে ২৪০ জন সঙ্গীসহচর শ্রীহট্রের উদ্দেশ্য রওয়ানা দেন। হযরত শাহ জালাল সাতগাও এসে ত্রিবেণীর কাছে দিল্লীর সম্রাট প্রেরিত অগ্রবাহিনী সেনাপতি সৈয়দ নাসির উদ্দীন সিপাহসালার এর সাথে মিলিত হন। সৈয়দ নাসির উদ্দীন সিপাহসালার হযরত শাহ জালাল সম্পর্কে অবগত হয়ে তার শিষ্যত্ব গ্রহন করেন। পথে পথে হযরত শাহ জালালের শিষ্য বর্ধিত হতে লাগল । ত্রিবেনী থেকে বিহার প্রদেশে আসার পর আরো কয়েকজন ধর্ম যুদ্ধা সঙ্গী হলেন, যাদের মধ্যে হিসাম উদ্দীন, আবু মোজাফর উল্লেখযোগ্য। এখান থেকে সিপাহসালার সৈয়দ নাসির উদ্দীন সিপাহসালার আনিত একহাজার অশ্বারোহী ও তিন হাজার পদাতিক সৈন্য সহ হযরত শাহ জালাল (রহ:) নিজ সঙ্গীদের নিয়ে সোনার গাঁ অভিমুখে সিকান্দর গাজীর সাথে মিলিত হওয়ার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন।

হযরত শাহ জালাল (রহ:) এর সাথে সিকান্দর গাজীর দেখা ও ব্রহ্মপুত্র পার:
সোনার গাঁ আসা মাত্রই হযরত শাহ জালাল (রহ:) এর সাথে শাহ সিকান্দর গাজীর সাক্ষাত হল। সিকান্দর গাজী হযরত শাহ জালাল (রহ:) কে সসম্মানে গ্রহন করলেন । সিকান্দরের শিবিরে সমাগত হয়ে হযরত শাহ জালাল (রহ:) তাঁর সঙ্গী অনুচর ও সৈন্য সহ শাহ সিকান্দর হতে যুদ্ধ বিষয়ে সব বিষয় অবগত হন। সিকান্দর হযরত শাহ জালাল (রহ:) এর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে শিষ্যত্ব গ্রহন পুর্বক সিলেটের দিকে যাত্রা করলেন । এভাবে হযরত শাহ জালাল (রহ:) এর শিষ্য সংখ্যা ৩৬০ জনে পৌছে।

ঐ দিকে গৌড় গৌবিন্দ নিজেস্ব চরদ্বারা হযরত শাহ জালাল (রহ:) এর সমাগম সংবাদ পেয়ে ঐ দল যাতে ব্রহ্মপুত্র নদী পার না হতে পারেন সেজন্য নদীর সমস্ত নৌ চলা-চল বন্ধ করে দেয় । হযরত শাহ জালাল (রহ:)তাঁর শিষ্যদের নিয়ে বিনা বাধায় জায়নামাজের সাহয্যে ব্রহ্মপুত্র নদী অতিক্রম করেন।

সিলেটে প্রবেশ:
খ্রিস্টিয় দশম শতকে শ্রীহট্ট ভুমী লাউড়, জয়ন্তীয়া ও গৌড় নামে তিনটি স্বাধীন রাজ্যে বিভক্ত ছিল। ঐ রাজ্য গুলোর মধ্যে গৌড় ছিল অন্যতম রাজ্য। ঐ রাজ্যের প্রাচীন সীমা রেখা বর্তমান মৌলভীবাজার জেলা সহ হবিগঞ্জ জেলার কিছু অংশ নিয়ে বিস্তৃত থাকায় গৌড় রাজ্যের দহ্মিণ সীমাভুমী নবীগঞ্জের দিনারপুর পরগণার পাশে গৌড় গৌবিন্দ এর চৌকি ছিল।

হযরত শাহ জালাল (রহ:) তাঁরসঙ্গীদের নিয়ে ব্রহ্মপুত্র নদী পার হয়ে প্রথমত ঐ স্তানে অবস্থান করেন। এখানে গৌড় গৌবিন্দ এর সীমান্ত রক্ষীরা অগ্নীবাণ প্রয়োগ করে তাদেরকে প্রতিহত করার চেষ্টা চালায় । তবে মুসলমান সৈন্যের কোন ক্ষতি করতে পারেনি। গৌড় গৌবিন্দ সমস্ত বিষয় অবগত হয়ে উপায় না পেয়ে বরাক নদীতে নৌকা চলাচল নিষিদ্ধ বলে ঘোষনা জারি করে দেয়। হযরত শাহ জালাল (রহ:) আগের মত জায়নামাজের দ্বারা বরাক নদী পার হন। বরাক নদী পার হওয়ার পর বাহাদুরপুর হয়ে বর্তমান সিলেট জেলার বালাগঞ্জ উপজেলায় ফতেহ পুর নামক স্থানে রাত যাপন করেন।

উল্লেখিত তথ্য সম্মেলিত প্রাচীন গ্রন্থ তোয়ারিখে জালালীতে উল্লেখ আছে।

সকল প্রকার কলা-কৌশল অবলম্বন করার পর রাজা গৌড় গৌবিন্দ যখন দেখলেন সব প্রয়াসই বিফল হইতেছে , তখন শেষ চেষ্টা করার জন্য যাদু মন্ত্র সহ এক প্রকাণ্ড লৌহ ধুনুক হযরত শাহ জালাল (রহ:)কাছে পাঠালেন যার শর্ত ছিল যদি কোন লোক একা উক্ত ধনুকের জ্যা ছিন্ন করতে পারে তখন গৌড় গৌবিন্দ রাজ্য ছেড়ে চলে যাবে। হযরত শাহ জালাল (রহ:) তাঁর দলের লোকদের ডেকে বললেন; যার সারা জীবনের কোনসময় ফজরের নামাজ খাজা হয় নাই বা বাদ পরে নাই কেবল মাত্র সেই লোকই পারবে গৌড় গৌবিন্দ এর লৌহ ধনুক “জ্যা” করতে। অতপর মুসলমান সৈন্য দলের মধ্য থেকে অনুসন্ধান করে সৈয়দ নাসির উদ্দীন সিপাহসালারকে উপযুক্ত পাওয়া গেল আর তিনিই ধনুক জ্যা করলেন।

সুরমা নদী পারাপারঃ
উত্তর পূর্ব ভারতের বরাক নদী বাংলাদেশে প্রবেশ করার সময় সুরমা ও কুশিয়ারা নদীতে বিভক্ত হয়ে গেছে। এ নদী গুলোকে সিলেট বিভাগের বেষ্টনী হিসেবে ধরা হয়। প্রাচীন কালে এ নদী গুলো প্রবল স্রোতে প্রবাহিত হত এবং বর্ষাকালের দৃশ্য প্রায় সাগরের মত দেখা যেত। ঐতিহাসিক পর্যটক ইবন বতুতা সুরমা নদীকে নহরি আজরফ বলে আখ্যায়িত করেছেন । হযরত শাহ জালাল (রহ:) ফতেপুর হতে যাত্রা করে যখন সুরমা নদীর তীরে অবস্থান নিয়েছিলেন। এ নদী পার হয়েই গৌড় গৌবিন্দ এর রাজধানী। শাহ জালাল আউলিয়ার কেরামতি ও আলৌকিক বিভিন্ন ঘটনার কারনে গৌড় গৌবিন্দ বীতশ্রদ্ধ হয়ে পরল। গৌড় গৌবিন্দ শক্রবাহিনীকে কিছু সময় ঠেকিয়ে রাখার জন্য সুরমা নদীতে নৌকা চলাচল নিষিদ্ধ করল। তা সত্ত্বেও হযরত শাহ জালাল (রহ:) নদী পার হলেন।
হযরত শাহ জালাল (রহ:) বিসমিল্লাহ বলে সকল মুরিদকে নিয়ে জায়নামাজে করে অনায়াসে গেলেন চলে নদীর ওপারে।

গৌড় গৌবিন্দ গড়দুয়ারস্থিত রাজবাড়ি পরিত্যাগ করে পেচাগড়ের গুপ্ত গিরি দুর্গে আশ্রয় নেন। এরপর থেকে তার আর কোন হদিস মেলেনি। হযরত শাহ জালাল (রহ:) তিন দিন সিলেটে অবস্থান করার পর মিনারের টিলায় অবস্থিত রাজবাড়ি প্রথমে দখলে নিলেন।

চিরকুমার শাহজালাল। যে সকল মহামানব ধরার বুকে থেকে আল্লাহর প্রেম ও নৈকট্য লাভ করতে সক্ষম হয়েছেন তাদের মধ্যে হযরত শাহজালাল রহমাতুল্লাহ ছিলেন অন্যতম। আল্লাহর প্রেম ও নৈকট্য লাভকারী বান্দারা কোন দিন এই নশ্বর জগতে সংসার পাতাবার ইচ্ছা করেননি। হযরত শাহজালাল রহমাতুল্লাহ-এর জীবন ও ইহার বিন্দুমাত্র ব্যতিক্রম ঘটেনি। তবুও রক্ত মাংসে গড়া মানুষের সংগীনী নিয়ে জীবন চালাতে কার না ইচ্ছে হয়? কিন্তু শুধু আল্লাহর প্রেমে মুদ্ব হয়েই তিনি জীবনের এ দিকটার প্রতি ছিলেন সম্পূর্ণ উদাসীন। অনেক সময় খুব সুন্দরী ও ধনাঢ্য ব্যক্তিদের প্রস্তাব আসত। কিন্তু কোন ক্রমেই তা জনি গ্রহণ করেনি।

কোন কোন সময় তার শিষ্যরা তার কাছে বিয়ে না করার কারণ জিজ্ঞেস করত। তাদের উত্তরে তিনি একথাই বলতেন যে মহান আল্লাহ যে উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করেছেন তার দায়িত্বই ঠিক ভাবে আদায় করতে পারিনি। সেহেতু আবার একটি বিয়ে করে সংসারের ঝামেলা মাথায় নেয়া উচিত মনে করি না। আবার তিনি শিখ শাগরেদরকে বলতেন তােমরা তাে আমার বিয়ের জন্য বল, আসলে যার শরীর আছে, রক্ত আছে তার বিয়ে ও প্রয়ােজন আছে। কিন্তু আমার সে শরীরই নেই, এই যে সেই দেহ খানা দেখ এটাতাে সম্পূর্ণ আল্লাতেই বিলীন করে দিয়েছি। অতএব, আমার বিয়ের দরকার হয় না। আর একবার হযরতের কাছে বিয়ের প্রস্তাব আসলে উহার উত্তরে তিনি বলেন, দুনিয়ার সকল অশাস্তির মূল কারণ হলে নারীরা তাই আমি সেই অমাপ্তির অতল গহবরে ডুবতে চাই না। চাই শুধু আল্লাহর প্রেম ও নৈকট্য। কোন মানুষের কাছে ঋণীহীন জীবন যাপন করা খুবই কষ্টসাধ্য তাই বলে হযরত শাহজালালের বেলায় সেটা হয়ে ওঠেনি। কারণ তিনি সদা সর্বদা আল্লাহকেই প্রকৃত সংগী রূপে গ্রহণ করেছিলেন।

সেহেতু বলা যায় বাহ্যিক দৃষ্টিতে সংহীহীন দেখলেও প্রকৃত পক্ষে তিনি সংগীহীন ছিলেন না। তিনি বিবাহ করেননি বলে সমাজে মােঙ্গাররদি নামেও পরিচিত ছিলেন। ইহার এ হল “চিরকুমার” তিনি দুনিয়ার লােভ-লালসা, ধন-সম্পদ, আরাম-আয়েশের প্রতি খনােই মত্ত হননি। তার জীবনের প্রধান কাজই ছিল জাহেলিয়াতের মধ্যে সুন্দর ও সত্য ধর্ম প্রতিষ্ঠিত করা। যারা অসৎ পথে চলে গেছেতা দেরকে সৎপথে আনা।

আল্লাহর দেয়া এই মহান দায়িত্ব পালনের জন্যই তিনি স্বীয় মায়ামমতায় বিজড়িত ভুমি ত্যাগ করেছেন এবং তার প্রচারের সঠিক জায়গাটা বেছে নেয়ার জন্য এশিয়া বিভিন্ন দেশে ভ্রমণ করেছেন। পরিশেষে শ্রীহট্টেই হলাে তার প্রকৃত ধর্ম প্রচারের স্থান। কৈান এক সময় শীতের মৌসুমে হযরত শাহজালাল রহমাতুল্লাহ শীতে আক্রান্ত হয়ে বারংবার মুসলিম শাসক সেকান্দার গাজীকে জানালেন আমার জন্য শীতের একটা ব্যবস্থা করুন।

এর জবাবে মুসলিম শাসক সেকান্দার গাজী বললেন শাহজালাল শীতের দিনে শরীর গরমের জন্য একজন সুন্দরী নারী চান। রাজার যেই কথা উজিরদের সেই কাজ। সেকান্দার গাজীর হুকুমে একজন সুন্দরী নারীকে পালকিতে করে হযরত এর কাছে পাঠিয়ে দিলেন।সংসার ত্যাগী হযরত শাহজালাল রহমাতুল্লাহ বললেন, হে সংসাসক্ত সেকান্দার গাজী! তুমি নিজেও এ নশ্বর জগতের মায়ায় অতল গহবরে ডুবেছ আর আমাকে ডুবাতে চাও। সেকান্দার গাজীর কারুকার্যে শাহজালাল বিস্মিত হয়ে বললেন, তুমি আমাকে এই নশ্বর জগতের মায়ায় ডুবাতে চাও এর চেয়ে তুমি একাই মর। আল্লাহর ওলির মুখে কথা কি আর বিফল যায়? এদিকে সেকান্দার গাজী পরমা সুন্দরীকে হুজুরের কাছ পাঠিয়ে নদীর ঘাটে বড়শি নিয়ে মাছ ধরতে গেলেন। এদিকে হযরত যখন তাকে একাকী ডুবে মরার জন্য বললেন, সাথে সাথে সেকান্দার গাজী হোঁচট খেয়ে নদীতে পড়ে মারা গেলেন ।

এটা আল্লাহর ওলির অলৌকিক ক্ষমতা ছাড়া কিছুই নয়। “মহাসাধক হযরত শাহজালাল রহমাতুল্লাহঃ নারী সংসর্গকে পছন্দ না করলেও তিনি নারীত্বের অবমাননা হতে দিতেন না। সে যাই হােক তিনি তার একনিষ্ট শিষ্য হাজি ইউসুফকে বললেন হে ইউসুফ! তুমি এই সুন্দরীকে বিয়ে করে নাও। হাজী ইউসুফও ছিলেন সংসার ত্যাগী, তাই তিনি কোমল কন্ঠে বললেন, ওহে হযরত! নিজের ভরণ পােষণের জন্য আল্লাহর উপর নির্ভরশীল তাই একে বিয়ে করে আবার কোন ঝামেলায় পড়ব? সে যাই হােক শুরুর কথা তিনি অমান্য না কর সেই পরমা সুন্দরীকে বিয়ে করলেন।

বর্তমানে সেই শ্রীহট্টে শাহজালালের দরবার যার পরিচালনা করেছেন তারা সেই হাজী ইউসুফেরই বংশধর। পরিশেষে একথা বলা যায় যে, হযরত শাহজালাল চিরকুমার থেকেই আল্লাহর প্রেম লাভ করে জীবনকে ধন্য করেছেন।

হযরত শাহজালাল রহমাতুল্লাহ এর শেষ জীবনঃ

ওলিকুলের শ্রেষ্ঠতম সত্যের মহাসাধক হযরত শাহজালাল রহমাতুল্লাহ মহাসাধনার মাধ্যমে অর্জন করেছিলেন আল্লাহর প্রেম। তাইতাে মানুষ আজ তাকে স্মরণ করে ভক্তি করে। তিনি যেমন ছিলেন ওলিকুলের শিরোমণি সত্যের মহাসাধক ও ইসলাম প্রচারক তেমনি তিনি ছিলেন একজন জনদরদী সমাজ সেবক মহামানব। জনকল্যাণমূলক কাজের জন্যই তিনি আজ সকল শ্রেণীর মানুষের কাছে স্বরনীয় ও বরণীয় হয়ে আছেন। তিনি একথা জানতেন আল্লাহর সেবা করা মানেই তার সৃষ্ট জীব মানুষের সেবা করা। তাইতাে তার সারাটি জীবনই জনসেবার লক্ষ্যে উৎসর্গ করেছেন। এমনভাবে তিনি জনগণের কল্যাণের জন্য নিজেকে বিলীন করেছেন যে তিনি নিজের খাওয়া দাওয়ার কথাও ভুলে যেতেন। কিন্তু দুনিয়ার কোন সুখশান্তি তার অন্তরে স্থান পায়নি। তিনি সর্বদা এ নশ্বর জগতের মতিয়া মোহ-লোভ-লালসা, সুখ-শান্তি থেকে নিজেকে দূরে রাখতেন। যাতে করে আল্লাহর প্রেমর কোন ব্যাঘাত ঘটে। তিনি এমন কোন কাজ করতেন না যাতে আল্লাহ নারাজ হয়ে যান। দিনের বেলায় তিনি অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে ইসলাম প্রচার করতেন এবং মানুষের দ্বারে দ্বারে গিয়ে তাদের সুখ সুবিধা দেখে তাদের মঙ্গলের জন্য উন্নয়নমূলক কাজ করতেন। অবসর পেতেন একটু রাত্রে।

তাও তিনি বিছানায় শুয়ে আরামে নিদ্রা যাননি। সে অবসর সময়টুকুও তিনি আল্লাহর ইবাদতের মাধ্যমে কাটাতেন। তাইতাে তিনি সকল প্রকার জ্ঞান লাভ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তিনি যখন ধর্মের ব্যাপারে আলােচনা করতেন তখন জনগন বুঝত তিনিই একজন শ্রেষ্ঠ সমাজ সংস্কার ও রাজনীতিবিদ ও সুদক্ষ রাষ্ট্র পরিচালক। আবার যখন তিনি অর্থনীতির দিকে আলােকপাত করতেন, তখন সকলের মনে হত হযরত শাহজালাল রহমাতুল্লাহ একজন অন্যতম অর্থনীতিবিদ কারণ তার ঐকান্তিক ইচ্ছা ছিল ধর্ম নীতির সাথে রাজনীতি, অর্থনীতির সমাজনীতির সমন্বয়ে রাষ্ট্রকে সাধন ও প্রতিষ্টিত করা। ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান তাই জীবন চলার পথে সর্বক্ষেত্রের প্রয়ােজন মেটাতেই ইসলাম সক্ষম। আর এ আদর্শের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিলেন হযরত রাসূলে করীম (সঃ) ও খােলাফায়ে রাশেদিন।

হযরত শাহজালাল রহমাতুল্লাহ ছিলেন রাসূলের সুন্দরতম পূর্ণ আদর্শের উপর প্রতিষ্ঠিত। সেহেতু তিনি রাসূলের ন্যায়ই সকল কাজ করার চেষ্টা করতেন। ইসলাম যেমন ব্যাপক তিনি তেমনি ব্যাপক ভাবেই প্রচার করতেন। ইসলামকে কোন প্রতিষ্ঠান বা সংগঠনের মধ্যে সীমিত রাখেননি। শুধু কেবল কলেমা, নামাজ, রােজা হজ্জ, যাকাত, তাসবীহ তাহলিল, মসজিদ ও খনকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখেনি। তিনি ইসলামের সকল নীতির উপর কড়া নজর রেখে সঠিক নীতির গুরুত্ব দান সহকারে ইসলাম প্রচার করেছেন।ইসলাম শব্দের অর্থ ব্যাপক ভাবে পর্যালােচনা করে সেই ভাবেই প্রচার করতেন। তিনি সমস্ত জীবন একেবারেই সাদাসিদের মধ্যে কাটিয়েছেন। বৃদ্ধাবস্থায়ও তার কোন পরিবর্তন ঘটেনি। শুধু মানুষ হিসেবে দেহিক অবস্থা একটু দুর্বল হয়েছিল। তিনি তার জীবনে যাই কিছু করতেন আল্লাহর রেজামন্দি হাসেলের জন্যই করতেন। তাইতাে তিনি লাভ করেছিলেন আল্লাহর সন্তুষ্টি।

হযরত শাহজালালের বিদায়ী ভাষণঃ

একথা দিবালােকের ন্যায় উজ্জ্বল যে সকল ওলি আওলিয়ার ভবিষ্যৎ বাণী সম্পর্কে কিছু না জানলেও ইশারা ইংগীতের মাধ্যমেও নিদের্শনের মাধ্যমে ভবিষৎ সম্পর্কে কিছু অবগত হতে পারতেন। তাইতাে হযরত শাহজালাল রহমাতুল্লাহ এক সময় বুঝতে পারলেন যে তার সময় শেষ হয়ে আসছে। সেজন্য তিনি সকল শিষ্য সাগরেদ, ভক্তবৃন্দ সকল অমুসলিম মুসলিমদেরকে ডেকে একত্র করে তাদের উদ্দেশ্যে বিদায়ী ভাষণ দান করলেন।

তিনি তার ভাষণে সকলকে উদ্দেশ্য করে বললেন, হে মানব সমাজ! তােমরা মনে প্রাণে বিশ্বাস কর যে আল্লাহ এক অদ্বিতীয় তার কোন শরীক নেই। তিনি কাকেও জন্ম দেননি বা কারাে থেকে জন্ম নেননি। তিনি কারাে মুখাপেক্ষী নন। তিনি সারা বিশ্বকে সুন্দর করে সৃষ্টি করেছেন এবং তিনিই প্রতিপালন করেন। তিনিই আমাদের একমাত্র উপাস্য। আল্লাহ যখন ১৮ হাজার মাখলুকাত সৃষ্টি করে মানব জাতিকে আশরাফুল মাখলুকাত বলে আখ্যা দিলেন সে ভাবেই তাে আমাদের জীবন যাপন করতে হবে। তােমরা মনে রাখবে মানুষ সকলের চেয়ে সম্মানিত। তাই কোন মানুষকে ঘৃণার চোখে দেখবে না। এ সম্পর্কে আল্লাহ রাব্বধূল আলামীন পবিত্র কোরআনে বলেন, এরশাদ হচ্ছে, যে ব্যক্তি কোন মানুষকে হিংসা করে ও মনে ব্যথা দিবে তার ইবাদত আল্লাহ কবুল করেন না।

একথাও তােমরা স্মরণ রেখ পৃথিবীর মানুষ পাপ পুণ্যে মিশ্রীত। সেহেতু কোন মানুষকে পাপী বলে ডাকবে না। কারণ গভীর রাতের অন্ধকার যেমন আলাের পরশে বিদূরীত হতে পারে, তেমনি পাপী লােকেরাও পূণ্যবান লােকদের সংস্পর্শে এসে পূণ্যবান হতে পারেন। কোন মানুষের সাথে খারাপ ব্যবহার, মানুষে মানুষে বিবাদ ও ভেদাভেদ সৃষ্টি করা ইসলামে অমার্জনীয় অধরাধ আর এসবের মূলে হল নিজের জিহবা। এ সম্পক্যে রাসূলে মকবুল (সঃ) বলেছেন যে ব্যক্তি স্বীয় জিহবা ও লজ্জাস্থান সংবরণ করবে আমি তার বেহেস্তের জামিন হব।

অতএব, বুঝা যায় যে, মানুষের জীবন চলার পথে লজ্জাস্থান ও জিহবাকে সংবরণনচেৎ জীবনে উন্নতির শিখরে আরােহন করা সম্ভব নয়। কোন দুঃখী গরীব দুঃখীদের সাথে কখনও কঠোর ব্যবহার করাে না।তাদের সাথে সৎ ব্যবহার করবে। এবং তাদের সাহায্যের জন্য নিজেকে আত্ম নিয়ােগ কর। প্রতিবেশী অনাহারে, অনিদ্রায় আর তুমি পেটপুরে খাবে এটা ইসলামে গর্হিত কাজ। কখনও ইসলাম তা পছন্দ করে না। সব সময় গরীবদের প্রতি খেয়াল রাখবে।পাপ ছােট হলেও তাকে বড় মনে করে তা থেকে বিরত থাকবে। পক্ষান্তরে পুন্য ছোট হলেও তাকে বড় মনে করে তা আকড়িয়ে ধরবে। হাশরের ময়দানে তােমরা দেখবে সামান্য পাপের কারণেও মানুষ দোযখে যাবে আবার সামান্য সওয়াবের কারণে মানুষ বেহেস্তে যাবে। অতএব, খবরদার পাপের কাজ করাতাে দূরের কথা পাপের পথেও, পা ফেলবে না।

উপস্থিত জনগণ হযরতের বাণী শুনে দুঃখে কান্নায় ঢলে পড়লেন বুঝতে পারলেন যে হযরত শাহজালাল অতি শীঘ্রই আমাদের থেকে চির বিদায় নিবেন। শ্রীহট্টের জনগণ এবারে শােক সাগরে ভাসতে শুরু করলেন। সে যাই হােক পরিশেষে সকলকে নিয়ে হাতে তুলে দোয়া করলেন আয় আল্লাহ! আমি চলে যাচ্ছি তুমি আমার ভক্ত বৃন্দদেরকে সৎপথে চলার তৌফিক দান কর। এরপর তিনি সকলের গুণাহের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়ে বিদায় সভা সমাপ্ত করলেন।

ইন্তেকালঃ প্রত্যেক মানুষকে মৃত্যুর সাধ গ্রহণ করতে হবে। এ নশ্বর জগতে কেহই অমর হতে পারেনি। কোন নবী পয়গম্বর, ওলি আওলিয়া, রাজা বাদশাহ, কেউই মৃত্যুর তুহিন পরশ থেকে রেহাই পায়নি। হযরত শাহজালাল রহমাতুল্লাহ-এর জীবনেও কোন বিপরীত হয়নি। এক সময় মহা তাপস হযরত শাহজালাল রহমাতুল্লাহ-এরও মৃত্যুর ডাক এল। এ বিশ্বের বুক ঘাের তমসার অন্ধকার কেটে যখন আলাের দিশা পেল এ বাংলার মানুষ এহেন সন্ধিক্ষণেই সুবিশাল জীবনে মহাদায়িত্ব ভার পালন করে তার জীবনের সমাপ্তির রেখা টানলেন।

জনদরদী গরীবের বন্ধু মহাসাধক হযরত শাহজালাল রহমাতুল্লাহ, ১৩৮৪ সালে জিলহজ্জ মাসের ২০ তারিখ সারা বাংলার মানুষকে শােক সাগরের অতল গহবরে ডুবিয়ে দুনিয়া থেকে চির বিদায় নিয়ে চলে যান। ইন্না লিল্লাহে অইন্না ইলাইহে রাজেউন। মহা পুরুষ হযরত শাহজালাল রহমাতুল্লাহ, আজীবন নিষ্কাম কঠোর সাধনা সংযম ও পরিশ্রমের মধ্যেই জীবন কাটিয়েছে। দুনিয়ার আবর্তে যখন তিনি বৃদ্ধাবস্থায় উপনীত হলেন, তখনও কঠোর সাধনায় নিজেকে আত্ম নিয়ােগ করেছেন। এত পরিশ্রম করায় শারীরিক দুর্বল হয়ে পড়াও ছিল স্বাভাবিক। এক সময় তিনি তার শারীরিক দুর্বলতাকে বেশী ভাবেই অনুধাবন করতে পারলেন।

এবারে আল্লাহর ওলি হযরত শাহজালাল রহমাতুল্লাহ, বুতে পারলেন যে তার প্রস্থানের সময় এসে গেছে।সেহেতু এক সময় হিন্দু মুসলিম, বৌদ্ধ, খৃষ্টান, ধনী, দরিদ্র, অসহায় দুঃস্থদের আহবান করলেন তাদের থেকে বিদায় নেবার জন্য এবার তিনি তার সুললিত কন্টে জনতার উদ্দেশ্য বিদায়ী ভাষণ শুরু করলেন। তার ভাষণের প্রতিটি কথাই শ্ৰেতাৱা অনুধাবন করতে পারলেন বুঝতে পারলেন হুজুর আর বেশী দিন আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন না। তিনি কোন সম্প্রদায়ীকতায় বিশ্বাসী ছিলেন না। কোন দল গােষ্ঠীর মধ্যে তার ওলিত্ব সীমাবদ্ধ ছিল না। তাইতাে উপস্থিত সকল ধর্মের সকল স্তরের মানুষ কান্নায় ঢলে পড়ল। মনে হল দুনিয়ায় নেমে এসেছে এক শােকের অন্ধকার। শুধু মানব জাতিই নয় পশু পাখি,গাছপালা, তরুলতা সকলেই যেন দুঃখের সাগরে ভেসে কান্নায় ভেংগে পড়ল। সকলেই অনুভব করল তাদের প্রিয়জন দুনিয়ার বেশী দিন থাকবে না। সারা ময়দানে দুঃখের প্লাবন বয়ে গেল। ওলঠ পালট হয়ে গেল সকলের অন্তর। জীর্ণ শীর্ণ হয়ে গেল সকলের শরীর। সকলেই ধুকে ধুকে প্রার্থনা করতে লাগল হে প্রভু! এই রহমত আমাদের মাকে আরাে কিছু দিন বিদ্যমান রাখুন।

আল্লাহর লীলাকে বুঝতে পারে। আল্লাহও তার প্রিয়নান্দা কে তার সান্নিধ্যে নেয়ার জন্য সঠিক সময়টি স্থির করে ফেললেন। সে যাই হােক এক সময় বিদায়ী সভা ভেংগে গেল আস্তে আস্তে অসুস্থ হয়ে পড়লেন এবারে তিনি স্বীয় হুজরায় ঢুকে ধ্যানে নিমগ্ন হলেন। অনেকে তার হুজরায় ঢুকতে চাইলে হুজুর তাদেরকে নিষেধ করলেন কেউই তার কাছে গেলেন না।

লােকেরা দেখতে লাগল হুজুর হাত তুলে কি যেন বলছেন আর চক্ষু থেকে পানি বয়ে বক্ষদেশ ভিজে জমিনে পড়ছে। তিনি এমন মহাপুরুষ ছিলেন যে তার সময়ও নিজের ব্যক্তিগত কোন স্বার্থের জন্য কাদেননি। এ বলেই তিনি ফরিয়াদ করেছেন হে প্রভূ! আমি আমার দয়িত্ব পূর্ণভাবে পালন করতে পারছি কিনা এ ব্যাপারে নিজেই আমি সন্দিহান। তাইতাে হে প্রভু তুমি আমাকে সকল অপরাধ ক্ষমা করে পরকালেও যেন তােমার প্রেম লাভ করতে পারি সেই তাওফিক দান কর।

এবারে তার শরীরের করুণ অবস্থা দেখে সবাই তার নিকটবর্তী হলেন। এভাবে আপন গতিতে মহামতি আজরাইল হযরত শাহজালাল রহমাতুল্লাহ-এর কাছে আগমন করলেন। হযরত আবার বিষন্ন বদনে সকলকে দূরে যেতে বললেন। আবার সবাই একটু দূরে সরে গেল। কিছুক্ষণ পর সকলে শুনতে পেল হযরত শাহজালাল সুললিত কণ্ঠে কলেমা তাইয়্যেবা ও কলেমা শাহাদাত পাঠ করছেন। সকলে এ দুঃখময় ব্যাপারটা বুঝতে পারল কিন্তু কেউই তার হুজরায় ঢুকল না। সকলে সেখানে দাড়িয়ে রইল। অনেক সময় ধরে কোন টু শব্দটুকু নেই। এবার একজন ঢুকে দেখল হুজুর আর দুনিয়ায় নেই। দুধপায়ী সন্তানের ন্যায় তিনি চির নিদ্রায় শায়ীত হলেন। কেঁদে সকলে জারে জার হয়ে গেল।

সারা বিশ্ব দুঃখের নিঃশ্বাস ফেলে কান্নায় ভেংগে পড়ল। পশু পাখী গাছপালা ঝিমুতে লাগল। | সারা দুনিয়ায় নেমে এল ঘাের অন্ধকার । সকলের চোখেই সরষে ফুল ফুটল। শিষ্য সাগরেদরা এমন কান্না শুরু করল দেখলে মনে হত যেন তাদের আপন জন পিতামাতা | দুনিয়া থেকে বিদায় নিচ্ছে। দেশ-বিদেশ থেকে দলে দলে মানুষ এসে শেষ বারের মত দেখা করতে লাগল সিলেট বাসীরা হযরত শাহজালাল রহমাতুল্লাহ কে পেয়ে ধন্য হয়েছিল। তারা পেয়েছিল তার মাধ্যমে সঠিক পথের সন্ধান।

দেশের মানুষরা নামের পূর্বে লিখত শ্রী সেখানে আজ তারা লিখতে সক্ষম হল নামের শুরুতে মােহাম্মদ। সামাজিক জীবনেও তার অবদান অপরিসীম। সেহেতু এক বাক্যে বলা যেতে পারে হযরত শাহজালাল ছিলেন সলেটের নবজীবনের জন্মদাতা। তাইতাে তার মৃত্যুর শােক সংবাদ শুনে সলেটের সকল স্তরের মানুষের অন্তরে শােকের ঝড় বইল।

ইতিহাসের পাতা থেকে জানা যায় যে তিনি ১৩৫৪ খৃস্টাব্দে সিলেটে শুভ পদার্পণ করেন। তবে তার জন্ম ও মৃত্যু সম্পর্কে দুটি মত পাওয়া যায়। কোন এক ঐতিহাসিক বলেন, তিনি ১৩১৮ খৃঃ জন্ম গ্রহণ করেন এবং ৬২ বছর বয়সে ১৩৮০ খৃষ্টাব্দে ইহধাম ত্যাগ করেন। দ্বিতীয় মত প্রকাশে কোন ঐতিহাসিক বলেন, ওলিয়ে কামেল হযরত শাহজালাল রহমাতুল্লাহ ১৩২২ পৃঃ জন্ম গ্রহণ করেন। এবং ৬২ বছর বয়সে ১৩৮৪ পৃষ্টাব্দে দুনিয়া থেকে চির বিদায় নেন। | তবে একথায় সকল ঐতিহাসিকগণ যে একমত, তাতে কোন সন্দেহ নাই সেটা হল এই যে তিনি দুনিয়ার বুকে ৬২ বছর বেঁচে থেকে জিলহজ্জ মাসের ৩০ তারিখে রােজ শুক্রবার ইহধাম ত্যাগ করেন।

সে যাই হােক আল্লাহ রাব্দুল আলামীন যে বান্দার উপর সন্তুষ্ট থাকেন তার প্রতিটি কাজই সুফল জনক হয়ে থাকে। যার প্রত্যক্ষ উদাহরণ আমরা আমাদের সর্বজন শ্রদ্ধেয় হযরত শাহজালাল রহমাতুল্লাহ-এর জীবনে দেখতে পাই। পবিত্র জুময়ার নামাজ বাদ ৫ সহস্রাধিক মানুষ জমায়েত হয়ে তার নামাজে জানাজা আদায় করেন। যুগে যুগে যে সকল মহাত্মা মনীষীর আবির্ভাব হয়েছে তারা এই পাপাসক্ত পৃথিবীকে পাপ মুক্ত করে মানুষের মাঝে চির অমর হয়ে আছেন। মহাসাধক হযরত শাহজালাল রহমাতুল্লাহ ছিলেন তাদের মধ্যে একজন। তাইতাে আজো গােটা পৃথিবীর আনাচে-কানাচে থেকে অসংখ্য মানুষ হযরত শাহজালাল রহমাতুল্লাহ-এর মাজার জিয়াত করার উদ্দেশ্যে সিলেটে আগমন করেন।

খাজা বাবার জীবনী পড়তে এখানে ক্লিক করুন।

হযরত শাহজালাল এর জীবনী

আব্দুল কাদের জিলানী-প্রেরণার উৎস বড় পীর আবদুল কাদের জিলানী (রহ.)

আব্দুল কাদের জিলানী-প্রেরণার উৎস বড় পীর আবদুল কাদের জিলানী (রহ.)

আব্দুল কাদের জিলানী রহমাতুল্লাহ।

বড়পীর আব্দুল কাদের জিলানীর নাম ও উপাধি-ঃ ইতিহাস পাঠে জানা যায়, রুহানী জগতের খাটি প্রজ্ঞাদাতা আউলিয়া কুলের শিরােমণি হযরত আবদুল কাদের জিলানী রহমাতুল্লাহ-এর কুনিয়াত আবু মােহাম্মদ। তার উপাধি মুহিউদ্দীন। ইতিহাসবিদদের দৃষ্টিকোণ থেকে জানা যায় পবিত্র ইরাকের অন্তর্গত ঝিলান নামক স্থানে জন্মগ্রহণ করেছেন বলে তাকে জিলানী বলা হত। সত্যি কথা বলতে হয়, তিনি সারা বিশ্বের সর্বসাধারণের নিকট এই আবু মুহাম্মদ মুহিউদ্দীন আবদুল কাদের জিলানী নামে পরিচিত হলেও ধরাধামের বিভিন্ন অঞ্চলে তাকে বিভিন্ন গুণবাচক লকবে ভূষিত করা হয়ে থাকে। আমাদের এতদঞ্চলে সাধারণতঃ তিনি কুতবুল আফতাব, গাওসুল আযম এবং বড় পীর নামেই প্রসিদ্ধ।

ইতিহাসের দৃষ্টিকোণ থেকে এ কথাও জানা যায় গাওসুল আযম বড় পীর আবদুল কাদের জিলানী রহমাতুল্লাহ-কে কোন কোন মহলের জনসাধারণ তাকে কুতুবে রাব্বানী নামেও অভিহিত করে থাকে। কোন কোন স্থানের লােকেরা তাকে পীরানে পীর দস্তেগীর আফযালুল আউলিয়া উপাধিতে ভূষিত করে থাকে। ঐতিহাসিকদের দৃষ্টিকোণ থেকে একথাও জানা যায়, কোন কোন স্থানে তিনি নূরে ইয়াযদানী নামেও পরিচিত। এমনি ভাবে তার আরও বহু গুণবাচক উপাধি রয়েছে। মুমীর লাখ নবী কর্তৃক রচিত সাওয়ানেহে ওমরী হযরত গাওসুল আযম নামক কিতাবে বহু কিতাবের হাওলা দিয়ে লিখিত হয়েছে। যে একদা সত্যের সৈনিক আউলিয়া কুলের শিরমণি রুহানী জগতের খাটি প্রজ্ঞাদাতা হযরত আব্দুল কাদের জিলানী ভ্রমণের উদ্দেশ্যে ঐতিহাসিক বাগদান শহরের বাইরে গমন করলেন। যাবার পথে পথিমধ্যে জনৈক ব্যক্তিকে দেখতে পেলেন, কৃশতা ও দুর্বলতাবশতঃ সম্পূর্ণ অক্ষম হয়ে পথের পাশে পড়ে আছে। পরিতাপের বিষয় হল জনৈক ব্যক্তি উঠবার জন্য পুনঃপুন আপ্রাণ চেষ্টা করছে কিন্তু দুর্বলতার কারণে পড়ে যাচ্ছে।

বিশ্ব নিয়ন্ত্ৰা আল্লাহ রাব্দুল আলামীনের অসীম রহমতে সে ব্যক্তি আকস্মাৎ মাহবুবে সােবহানী সাধক কুলে শিরমণি বড়পীর হযরত গাওসুল আযমের নুরানী চেহারা মােবারকের প্রতি দৃষ্টিপাত করে কাকুতি মিনতি সহকারে আরয করল, “হে ব্যথিতজনের পৃষ্ঠপােষক আল্লাহর ওয়াস্তে আমার দিকে দৃষ্টিপাত করুন এবং আপনার ঈর্ষা তুল্য ফু দ্বারা আমার মৃতপ্রায় দেহে নবজীবন দান করুন। যাই হােক তার কাকুতি মিনতী শুনে হযরত আব্দুল কাদের জিলানী রহমাতুল্লাহ দয়াপরবশ হয়ে পড়লেন এবং তার হস্ত ধারণপূর্বক-ইল্লাল্লাহ বলে তাকে জমিন হতে উঠায়ে দিলেন।

সত্যি কথা বলতে হয় মহান করুণার আধার আল্লাহ জাল্লাহ শাননুহর অসীম রহমতে হযরত গাসুল আযম বড়পীর আব্দুর কাদের জিলানী রহমাতুল্লাহ সাহেবের পবিত্র হস্তের পরশ লাগামাত্র সেই মরণােন্মুখ বৃদ্ধ সবুজ খােরমা বৃক্ষের ন্যায় সতেজ ও সবল হয়ে উঠে দাঁড়াইল এবং বলতে লাগল“হে মুহিউদ্দিন, আল্লাহর অসীম রহমতে আপনি আমাকে স্থায়ী জীবন দান করলেন। আপনি কি আমাকে চিনতে পেরেছেন? আমি আম্বিয়াকুল শিরমণি হযরত মুহাম্মদ (সঃ)এর ইসলাম ধর্ম। দুর্বলতাবশতঃ আমার এই মৃতপ্রায় অবস্থা হয়ে গিয়াছিল। বিশ্ব নিয়ন্ত্রা আল্লাহ রাব্দুল আলামীনের লাখ লাখ শোেকর তিনি আপনাকে সৃষ্টি করে আমাকে নবজীবন দান করেছেন। মহান করুণার আঁধার আল্লাহ জাল্লাহ শানুহুর তরফ হতে তাই আপনার উপাধি হল মুহিউদ্দিন, ধর্মকে সজীবকারী ।

যাই হােক তথা হতে বড়পীর গাওসুল আযম আব্দুল কাদের জিলানী রহমাতুল্লাহ বাগদাদে এসে মসজিদে প্রবেশ করলে তাকে দেখা মাত্রই একব্যক্তি হঠাৎ বলে উঠল-আসসালামু আলাইকুম ইয়া মুহিউদ্দিন। এরপর হতেই কেহ তাকে দেখলে মুহিউদ্দিন উপাধিতে সম্বােধন করতেন। ইতিহাস পাঠে এ কথাও জানা যায়-বড়পীর সাহেব মসজিদ থেকে নামাজ শেষ করে উঠলে সারা মসজিদে মহিউদ্দিন নামে উপাধি উচ্চারণে ধুম পড়ে গেল। সত্যি, আস্তে আস্তে তিনি সকলের নিকট মুহিউদ্দিন পথিত্বে পরিচিতি হয়ে গেলেন। ইতিহাসবেত্তা ও ইসলামী জ্ঞান তাপসগণ বলেন ইতিপূর্বে তার বহুল প্রচলিত উপাধি কেহই জানত না।

বংশ পরিচয় ও ইতিহাসের দৃষ্টিকোণ থেকে আমরা দেখতে পাই-মাহবুবে সােবহানী রুহানী জগতের খাটি প্রজ্ঞাদাতা বড়পীর হযরত আব্দুল কাদের জিলানী রহমাতুল্লাহ পিতা ও মাতার উভয় দিক হতে সাইয়্যেদ খানদানের সহিত সম্পর্কিত ছিলেন। ইতিহাস বেত্তারা বলেন, পড়পীর সাহেবের পিতার নাম হযরত সাইয়েদ আবু ছালেহ মুসা জঙ্গী দোস্ত। প্রিয় পাঠক পাঠিকার সুপ্ত হৃদয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে নামের শেষে কেন “জঙ্গী-দোস্ত” লাকবে ভূষিত করার কারণ ছিল, তিনি খুব আল্লাহ ওয়ালা, পরহেজগার লােক ছিলেন। ইসলামী জ্ঞানবীদগণ বলেন, তিনি ধর্মীয় জিহাদে অংশগ্রহণ করা খুবই পছন্দ করতেন। তাঁর মাতার নাম ছিল ফাতেমা। তার কুনিয়াত ছিল উম্মুল খায়ের। তিনি বিশ্বনিয়ন্তা আল্লাহ রাম্বুল আলামীনের খাছবান্দা ছিলেন।

ইতিহাস পর্যালােচনা করলে আমরা এ কথা দেখতে পাই তিনি একজন সুফী সাধক শ্রেষ্ঠ বুযুর্গ লােক-আবদুল্লাহ ছাওমাঙ্গের অতি আদরের কন্যা ছিলেন। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় আওলিয়া জগতের উজ্জ্বল নক্ষত্র তরীকত, হাকীকত, এবং শরীয়তে মােহাম্মদীয়া দিশারী হযরত বড়পীর সাহেব-এর পিতার উর্ধ্বতন বংশপরম্পরা সাইয়্যেদ কুলের শিরমণি হযরত ইমাম হাসান রাযিয়াল্লাহু আনহুর সহিত। এবং মাতার উর্ধতন বংশপরম্পরা সাইয়্যেদ কুলের গৌরব হযরত ইমাম হুসাইন ছিলেন, এই কারণে তাকে আলহাসানী ওয়াল’ হুসাইনী বলা হত। |

পিতৃবংশঃ রুহানী জগতের খাটি প্রজ্ঞাদাতা সুফী সাধক হযরত আব্দুল কাদের জিলানী রহমাতুল্লাহ ইবনে’ সাইেয়্যেদ আবু ছালে মুসা জঙ্গী-দোস্ত রহমাতুল্লাহ ইবনে সাইয়্যেদ আবু আবদুল্লাহ আলজিবিল্লী রহমাতুল্লাহ ইবনে সাইয়্যেদ ইয়াহইয়া যাহেদ রহমাতুল্লাহ ইবনে সাইয়্যেদ মােহাম্মদ রহমাতুল্লাহ ইবনে সাইয়্যেদ দাউদ রহমাতুল্লাহ ইবনে আবদুল্লাহ সানী রহমাতুল্লাহ ইবনে সাইয়্যেদ মুসালজুন রহমাতুল্লাহ ইবনে সাইয়্যেদ দাউদ রহমাতুল্লাহ আবদুল্লাহ আর মাহাস রহমাতুল্লাহ ইবনে সাইয়্যেদ হাসানুল মুসান্না রহমাতুল্লাহ ইবনে আমীরুল মু’মেনীন হযরত আলী ইবনে আবু তালে কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহু অর্থাৎ বেলায়েত জগতের সম্রাটের একাদশ ঔরসে সত্যের সেনানী সূফী সাধক হযরত বড়পীর ছাহেব রহমাতুল্লাহ আবির্ভূত হন।

মাতবংশ? গাওসুল আযম হযরত বড়পীর সাহেবের রহমাতুল্লাহ মাতা হযরত সাইয়্যেদা উম্মুল খায়ের আমাতুল জাবদর ফাতেমা বিনতে হযরত সাইয়্যেদ আবদুল্লাহ ছামাদ যাহেদ রহমাতুল্লাহ ইবনে সাইয়্যেদ আবু জামাল রহমাতুল্লাহ ইবনে সাইয়্যেদ মােহাম্মদ রহমাতুল্লাহ ইবনে সাইয়্যেদ মাহমুদ রহমাতুল্লাহ ইবনে সাইয়্যেদ আবুল আতা আবদুল্লাহ ইবনে সাইয়্যেদ কামালুদ্দীন ঈসা রহমাতুল্লাহ ইবনে সাইয়্যেদ আবু আলাউদ্দীন মােহম্মাদুল জাউয়াদ রহমাতুল্লাহ ইবনে সাইয়্যেদ আলীউররেযা রহমাতুল্লাহ ইবনে সাইয়্যেদ মুসা আল কাসেম রহমাতুল্লাহ ইবনে সাইয়্যেদুনা ইমাম জাফর সাদেক রহমাতুল্লাহ ইবনে সাইয়্যেদুনা ইমাম যাকের রহমাতুল্লাহ ইবনে সাইয়্যেদেনা যাইনুল আবেদীন রহমাতুল্লাহ ইবনে সাইয়্যেদুনা আমিরুল মু’মেনীন হযরত হুসাইন রাজিয়াল্লাহু আনহু ইবনে সাইয়্যেদুনা হযরত আলী কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহুর অষ্টাদশ ঔরসে জন্যগ্রহণ করেন। ঐতিহাসিকগণ বলেন, উপরােক্ত উভয় নসবনামার প্ররিপ্রেক্ষিতে তিনি হাসানী এবং হুসাইনী সাইয়্যেদ। |

জন্ম ইতিহাস পাঠে জানা যায়, হযরত গাওসুল আযম মহীউদ্দীন আব্দুল কাদের জিলানী রহমাতুল্লাহ চারশত সত্তর মতন্তরে চারশত একাত্তর হিজরী সনের পবিত্র রমজান মাসের পহেলা কিংবা ২১শে প্রসিদ্ধ জিলান শহরে সুবিখ্যাত সাইয়্যেদ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে জানা যায় প্রসিদ্ধ জিলান শহরটি পারস্য রাজ্যের অধীন পবিত্র ইরাক প্রদেশের অন্তর্গত একটি ক্ষুদ্র শহর যারা ইতিহাসের পাতায় সীলান নামেও পরিচিত। প্রিয় পাঠক পাঠিকার সুপ্ত হৃদয়ে প্রশ্ন হতে পারে যে হযরত আব্দুল কাদের জিলানী সাহেবের রহমাতুল্লাহ নামের শেষে কেন জিলানী সংযােগ করা হল জবাবে বলা যেতেপারে যে জিলানের সহিত সম্বন্ধযুক্ত বলে তাকে জিলানী অর্থাৎ জিলান দেশীয় বলা হয়। ইতিহাস বেত্তারা বলেন প্রসিদ্ধ জিলান শহরটি বাগদাদ হতে ওয়াসেতের পথে একদিনের পথ। কোন কোন ইতিহাস বেত্তারা বলেন ৪০০ মাইল দূরে অবস্থিত। | নামকরণ ইসলামী জআনবীদদের দৃষ্টিকোণ থেকে জানা যায়, আওলীয়াকুলের শিরমণি সুফী সাধক হযরত গাওসাল আযম আব্দুল কাদের জিলানী সাহেবের রহমাতুল্লাহ শুভ জন্মের কিছু সময় পরই নিখিল বিশ্বের ত্রাণকর্তা সুপারিশের কাণ্ডারী নবীয়ে সােজাহান হযরত মােহাম্মদ রহমাতুল্লাহ স্বীয় প্রধান সাহাবায়ে কেরামকে সাথে লয়ে সূফী সাধক সাইয়্যেদ আবু সালেহ মূসার বাসগৃহে তাশরীফ আনলেন এবং সাইয়্যেদ আবু সালেহকে লক্ষ্য করে অদৃশ্য জগত হতে বললেন, হে আবু সালেহ। এ পার্থিব জগতে তুমিই অধিক ভাগ্যবান। যেহেতু তােমার গৃহে, আওলীয়াকুলের শিরমণি রুহানী জগতের খাটি প্রজ্ঞাদাতা আল্লাহর ওলী আজ জন্মগ্রহণ করেছেন। তােমার ভাগ্যবান শিশুটির নাম রাখ মাহবুবে সোবহীন। সে পার্থিব জগতের মানুষের কাছে আব্দুল কাদের নামে অর্থাৎ মহাশক্তিমান আল্লাহতায়ালার বান্দা নামে। আমি খাস করে তােমার শিশুর জন্য দোয়া করিতেছি। তােমার শিশু যেন জগত মাঝে সুনাম সুখ্যাতি ছড়ায়ে অমর কীর্তি স্থাপন পূর্বক চিরস্মরণীয় হয়। এহেন কথা শুনে কার হৃদয়ে আনন্দ না হয়। দ্রুপই সত্যের সৈনিক সূফী সাধক আবু সালেহ, রহমাতুল্লাহ এই বিস্ময়কর অদৃশ্য বাণী শ্রবণ করে অতি মাত্রায় আনন্দিত হলেন এবং তখনই দুই রাকাত শােকরানার নামাজ আদায় করলেন। অতঃপর মহা করুণার আধার আল্লাহ জাল্লা শানহুর শাহী দরবারে অনেকক্ষণ যাবৎ মােনাজাত করলেন। | ফাযায়েলে গাওসিয়্যাহ নামক কিতাবে ইসলামের বীর সেনানী হযরত আলী রহমাতুল্লাহ হতে একটি রেওয়াতে বর্ণনা করা হয়েছে যে, সাইয়্যেদুর মুরসালিন হযরত মােহাম্মদ রহমাতুল্লাহ, তার জীবনকালে মাহবুবে সােবহানী আওলীয়াকুলের শিরমণি হযরত আব্দুল কাদের জিলানী রহমাতুল্লাহ সম্বন্ধে এরূপ দোয়া করেছিলেনঃ হে পরওয়ারদিগার আপনি আমার সেই নায়েবের প্রতি রহমত বর্ষিত করুন, যে আমার পরে ধরাধামে আনিভূত হবে সেই সাধক কুলের শিরমণি আমার হাদীসমূহ বর্ণনা করে আমার ধন শরীয়তের পথে পরিচালিত করবে।

ছেলে বেলার একটি কাহিনী ও ইতিহাস পাঠে জানা যায়, শাবান মাসের শেষ দিন। সন্ধ্যাবেলা আকাশে পবিত্র মাহে রমজানের চাঁদ উঠবে চাঁদ দেখার জন্য সবাই ভীড় ইমালেন। চাঁদ দেখে সকলে রােযা রাখবে, কিন্তু পরিতাপের বিষয় হল সেদিনের আকাশ ছিল মেঘলা। আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হওয়ার কারণে জিলানী অধিবাসীরা কেহই চাঁদ দেখিতে পারল না। যাই হােক পরের দিন রােযা রাখতে হবে কিনা এ নিয়ে জিলানী অধিবাসীরা তার পিতা যিনি হযরত আবদুল কাদের জিলানী রহমাতুল্লাহ সাহেবের বাবা ছিলেন সেকালে মশহুর আলেম, জিলান অধিবাসীরা সমস্যা সমাধানের নিরসন কল্পে হযরত আব্দুল কাদের জিলানী সাহেবের রহমাতুল্লাহ সনামধন্য পিতার কাছে এলেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় হল-এ সময় তিনি বাড়ী ছিলেন না। যাই হােক জিলান অধিবাসীদের সব কথাগুলাে হযরত সাইয়্যেদা ফাতেমা শুনলেন। তাদের কথা শুনে কিছুক্ষণ পরই সাইয়্যেদা ফাতেমা বললেন এটা তাে বাস্তব কথা যে চাদ দেখে রােযা রাখা উচিত। তবে আমার মনে হয় চাঁদ দেখা না গেলেও আজ পহেলা রমযান। জিলান অধিবাসীরা অনেকেই তার কথা মেনে নিলেন না। তারা সাইয়্যেদা ফাতেমাকে প্রশ্ন করলেন আপনি কিভাবে অনুধাবন করলেন যে আজ পয়লা রমযান। তিনি কিছু সময় ভাববার পর বললেন আজ আমার শিশু সন্তান-সেহরীর পর হতে আর দুধ পান করেনি। সত্যি শুনলে আপনাদের অবাক লাগবে, মুখে কিছু দিলেও সে খাচ্ছে না তাই আমার মনে হয় সে রােযা রেখেছে। তার আচরণ থেকে বুঝা যায় আজই প্রথম রােষা-সত্যি সাইয়্যেদা ফাতেমার পবিত্র মুখের কথাগুলাে শুনে সবাই অবাক হয়ে গেলেন বরং কেউ কোন প্রতিবাদ করল। ইতিহাস বেত্তারা বলেন পরদিনই অনেকেই মাহে রমযানের রােযা রাখলেন। | ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে এ কথাও জানা যায় যে হযরত সাইয়্যেদা ফাতেমার কথাই ঠিক।’ গতকালই ছিল মাহে রমযানের প্রথম দিন। একথা দিবালােকের ন্যায় সমুজ্জ্বল যে কতৰে কৰানী পীরে দাস্তেগীর হযরত শাহ মুহিউদ্দিন সাইয়্যেদ আবু মােহাম্মদ আব্দুল কাদের জিলানী রহমাতুল্লাহ ছােটবেলা হতেই একটু ভিন্ন প্রকৃতির ছিলেন। বর্তমান যুগের ছেলেদের মত হৈ হুল্লার মধ্যে দিয়ে তিনি কাটাতেন না। তাকে দেখা যেত চুপচাপ বসে কি যেন ভাৰতেন। ইতিহাস পর্যালােচনা করলে দেখা যায় তিনি নিরিবিলি থাকা পছন্দ করতেন। পূর্বেই আলােচিত হয়েছে যে, রুহানী জগতের খাটি প্রদাতা হযরত আব্দুল কাদের জিলানী সাহেবের রহমাতুল্লাহ, মাতা খুবই পরহেজগার ছিলেন। তার মাতা সর্বদা কোরআন শরীফ তেলওয়াত করতেন। এমন দেখা গেছে একটু সময় পেলেই তিনি কারআন শরীফ তেলাওয়াত করতেন তখন সত্যের সৈনিক আওলীয়াকুলের শিরমণি হযরত আব্দুল কাদের জিলানী রহমাতুল্লাহ, পাশে বসে শুনতেন। প্রিয় পাঠক-পাঠিকাগণ শুনলে অবাক হবেন, হ্যা অবাক হবার কথাও। মায়ের কোরআন তেলাওয়াত শুনেই তিনি পাৰ বছর বয়সের সময়ই মহাগ্রন্থ আল কোরানের আঠারাে পারা মুখস্ত করে ফেলেন। | একথা বাস্তব সত্য কথা যে হযরত আব্দুল কাদের জিলানী রহমাতুল্লাহ যে আল্লাহর প্রিয় বান্দা হলেন, আশং মাঝে যে তার নাম। তার নাম সােনালী অক্ষরে লিখা থাকবে-এইসব আলামত তার শিশু জীবন হতেই প্রকাশ পেয়েছিল। প্রিয় পাঠক-পাঠিকাগণ। একটু চিন্তা করে দেখুন আওলিয়া জগতের উজ্জ্বল নক্ষএ আব্দুল কাদের জিলানী রহমাতুল্লাহ যে আল্লাহর প্রিয় বান্দা হবেন তা উক্ত কাহিনীতেই সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ পেয়েছিল।

প্রাথমিক শিক্ষাঃ সত্যের সেনানী আওলিয়াকুলের উজ্জ্বল নক্ষত্র বড়পীর আব্দুল কাদের জিলানী রহমাতুল্লাহ সাহেবকে তার যােগ্য পিতা জিলান নগরীর একটি মক্তবে বিদ্যা শিক্ষা করার জন্য ভর্তি করান। মক্তবে ভর্তি হবার আগেই মাতার মুখে কোরআন তেলাওয়াত শুনে আল কোরানের বিরাট অংশ মুখস্ত করে ফেলেছিলেন। ইসলামী আনৰীদদের দৃষ্টিকোন থেকে একথাও জানা যায় যে, গাওসুল আযম হযরত বড়পীর সাহেবকে রহমাতুল্লাহ প্রথমে শিক্ষার উদ্দেশ্যে মক্তৰ্বের পাঠানাে হলে যাত্রাপথে পথিমধ্যে শেল ফেরেশতা এসে তাকে বেষ্টন করে রইলেন এবং তাকে তারা বেষ্টন করে শিক্ষা কেন্দ্রে নিয়ে গেলেন। ইতিহাস পাঠে একথাও জানা যায় হযরত বড়পীর সাহেবকে রহমাতুল্লাহ যখন মক্তবে নিয়ে যাওয়া হল তখন মক্তবে ছাত্রদের সংখ্যা অনেক ছিল। সবার কোন গান ছিল না, তখন হঠাৎ তার সঙ্গী ফেরেশতাগণ গায়েব হতে আওয়াজ দিলেন তােমরা বিশ্বনিয়া আল্লাহ রাব্দুল আলামীনের প্রিয় বান্দার জন্য স্থান প্রশস্ত করে দাও। সত্যি এহেন অদৃশ্য বাণী শুনে শিক্ষক-ছাত্রবৃন্দ চমকিয়ে উঠলেন। যাই হােক সাথে সাথে শিক্ষক ছাত্রগণ আগন্তুকের জন্য জায়গা করে দিতে নির্দেশ প্রদান করলেন। যাইহােক ছাত্রগণ তৎক্ষণাৎ পাশ্বেরর দিকে চেপে বসে মাহবুবে সােবহানী রুহানী জগতের খাটি প্রজ্ঞাদাতা হযরত আব্দুল কাদের জিলানী সাহেবের রহমাতুল্লাহ জন্য জায়গা করে [দিলেন। ইতিহাসে বেত্তাদের দৃষ্টিকোণ থেকে একথাও জানা যায় মক্তবে ভর্তি করার পর ওস্তাদজী আওলীয়াকুলের শিরমণি সূফী সাধক হযরত বড়পীর সাহেবকে রহমাতুল্লাহ একেবারে প্রাথমিক স্তরে পড়তে বললেন সত্যি, মাথার তাজ সমতুল্য ওস্তাদজীর নির্দেশ মােতাবেক তিনি সর্বপ্রথম আউযুবিল্লাহ এবং বিসমিল্লাহ পাঠ করলেন প্রিয় পাঠকপাঠিকাগণ শুনলে অবশ্যই অবাক হবেন। হ্যা অবাক হবারই কথাও। আউযুবিল্লহ এবং বিসমিল্লাহ পাঠ করতঃ আলিফ-লাম-মীম হতে আরম্ভ করে মহাগ্রন্থ আল কোরান কারীমের পনের পারার শেষ পর্যন্ত মুখস্ত পড়ে ফেললেন। শুধু মুখস্ত নয় বরং তারতীব তাজভীদ সহকারে পড়েছিলেন। তার পড়া শুনে ওস্তাদজী অবাক হয়ে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কিভাবে কার নিকট হতে এত সুন্দরভাবে কোরান পড়া শিখেছ এবং কি ভাবে পনের পারা কোরান শরীফ মুখস্ত করলে? ওস্তাদজীর কথাৰ জৰাৰে সত্যের সেনানী মাহবুবে সােবহানী হযরত বড়পীর সাহেব উত্তর করলেন-আমার মাতা পনের পারা কোরআন শরীফের হাফেজ, তিনি তাহা প্রত্যহ তেলওয়াত করে থাকেন। তার তেলয়াত শুনে আমারও মুখস্ত হয়ে গেছে। ইতিহাস বেত্তারা বলেন, হযরত বড়পীর সাহে রহমাতুল্লাহ সেই পনের পারার হাফেজ হয়ে দুনিয়ায় আসেন। তিনি যখন গায়ের মক্তবে পড়াশুনার জন্য ভর্তি হন, তখন তার বয়স ছিল মাত্র পাঁচ বছর। তবে বয়সের দিক দিয়ে কম হলেও পড়াশুনায় ছিলেন খুবই মনােযােগী। অল্পলিনের মধ্যে তিনি অনেক কিছু শিখে ফেললেন। এমনও দেখা গেছে অন্য ছাত্ররা সাতদিনে যতােটুকু পড়া আয়ত্ত করতে পারে নাই রুহানী জগতের খাটি প্রদাতা মাহবুবে সােবহানী হযরত আব্দুল কাদের জিলানী রহমাতুল্লাহ তা দু’এক দিনেই আয়ত্ব করে ফেলতেন। ভাল ছাত্র হিসাবে তার সুনাম সুখ্যাতি মক্তবের বাইরেও ছড়ায়ে পড়লাে। সত্যি, ওস্তাদগণ বড়পীর সাহেবের মেধার অবস্থা দেখে লােকমুখে বলতে লাগলেন আব্দুল কাদের ভবিষ্যতে নামকরা আলেম হবেন। রুহানী জগতের খাটি প্রজ্ঞাদাতা সত্যের সৈনিক বড়পীর সাহেব রহমাতুল্লাহ শুধু পড়েই সন্তুষ্টি ছিলেন না, জীবন জগৎ ও প্রকৃতি সম্পর্কে গভীরভাবে চিন্তা করতেন। তাকে এমনও দেখা গেছে যখন যে বিষয়ে পড়াশুনা করতেন তা শেষ না করে ক্ষান্ত হতেন না, ওস্তাদগণকে আদৰ সহকারে নানারকম প্রশ্ন করতেন, যে প্রশ্নগুলাে ছিল অনেক উচ্চস্তরের। শিক্ষকগণ বড়পীর সাহেবের অদম্য জ্ঞান-পিপাসা ও বুদ্ধির তীক্ষ্ণতা দেখে অবাক হয়ে যেতেন। আর দুহাত তুলে মহান করুণার আধার আল্লাহ জাল্লাহ শানুহুর শাহী দরবারে তার জীবনের উন্নতির জন্য দোয়া করতেন। ঐতিহাসি দৃষ্টিকোণ থেকে জানা যায় পরিতাপের বিষয় হল মক্তব্যের শিক্ষা সমাপ্ত হতে না হতেই তার পিতা দুনিয়া থেকে বিদায় নেন। পিতার ইহধাম ত্যাগের পর থেকে সংসারের যাবতীয় ভার পরে মাহবুবে সােবহানী হযরত আব্দুল কাদের রহমাতুল্লাহ-এর উপর। সাংসারিক অবস্থা তাদের তেমন ভাল না থাকায় নিজ হাতে অনেক কাজ করতে হয়। কিন্তু আল্লাহর অসীম রহমতে সাংসারিক ঝামেলার মধ্যে পড়া সত্ত্বেও তার বিদ্যাশিক্ষার আগ্রহকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। সাংসারিকত কাজ সমাধা করেই লেখাপড়ায় মনােযােগ দিতেন। এমনও দেখা গেছে-যেদিন পড়াশুনা না করতে পারতেন সেদিন তার মন খুব খারাপ থাকত। একথা সর্বজনবিদিত যে ছােট বেলা তেকেই মাহবুবে সােবহানী সুফী সাধক হযরত

আব্দুল কাদের জিলানী রহমাতুল্লাহ একটু ভিন্ন প্রকত্তির ছিলেন। ধর্মের প্রতি ঝোক ছিল। ধর্মের প্রতিটি হুকুম আহকাম মেনে চলতেন। ছােটবেলা হতেই তিনি বেশি কাত বলা পছন্দ করতেন না। তার সহপাঠীদের সাথেও কোনদিন একটু বাজে আলাপ করেননি। সর্বদা তার খেয়াল ছিল পড়াশুনার দিকে, কিভাবে জ্ঞান অর্জন করা যায়।

ইতিহাস পর্যালােচনা করলে দেখা যায় হিজরী ৪৮৮ সালে যবন তার বয়স ১৮ বৎসর, তখন তিনি মুসলিম বিশ্বের শ্রেষ্ঠতম রাজধানী ঐতিহাসিক বাগদাদে পদার্পণ করেন । উচ্চশিক্ষা অর্জন করতে হলে সে সময় বাগদাদে যেতেই হত। রাজধানীর বাগদাদের সনদই সে কালে উচ্চস্তরের সনদ বলে গণ্য হত। মাহবুবে সােবহানী সূফী সাধক হযরত আব্দুল কাদের জিলানী রহমাতুল্লাহ যে বসর বাগদাদ নগরীতে পদার্পণ করেন, সেই বৎসরই খলীফা আলমুস্তাহের বিল্লাহ, খেলাফতের আসন গ্রহণ করেন। ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে একাথাও সুস্পষ্টভাবে জানা যায় এই খলিফাও সেই ৪৭০ হিজরী সনেই জন, লাভ করেছিলেন। সে বৎসর রুহানী জগতের খাটি প্রজ্ঞাদাতা মাহবুবে সােবহানী হযরত বড়পীর আব্দুল কাদের জিলানী রহমাতুল্লাহ জন্মগ্রহণ করেন। বড়পীর সাহেব গ্রামের পাঠশালার পড়াশুনা শেষ করে বাগদাদের বিশ্ববিখ্যাত মাদ্রাসায়ে নিয়ামিয়তেই ভর্তি হলেন। এই নিযামিয়া মাদ্রাসার শিক্ষা ব্যবস্থা ছিল অনেক উন্নতমানের। এ সময় বাগদাদ নগরীতে ছানি এলেমের নামকরা প্রতিষ্ঠান ছিল। নুি তার মধ্যেও মাদ্রাসায়ে নিযামিয়া ছিল উর্ধ্বে। এই মাদ্রাসা থেকে পাশ করা ছাত্র সমাজের সকলের কাছে উচ্চ শিক্ষিত বলে পরিচিত ছিল। একথা বাস্তব সত্য কথা যে বিশ্বের সেরা ওবাছাই করা নামকরা ওলামায়ে কেরাম নিযামিয়া মাদ্রাসায়ে অধ্যাপনা করতেন। এই মাদ্রাসার শিক্ষকগণ আদ্যাত্মিক বিদ্যায়ও শ্রেষ্ঠ স্থান অধিকার করেছিলেন।

গাওসুল আযম বড়পীর আব্দুল কাদের জিলানী রহমাতুল্লাহ বাগদাদ এসেই কুরানের তাফসী ও কেতাৰ প্রভৃতি বিষয়ে পারদর্শিতা লাভ করেন। ইতিহাস পাঠে জানা যায়। সাহিত্যে তার ওস্তাদ ছিলেন সাহিত্য জগতের অন্যতম লেখক আৰু যাকারিয়া তিৰবিয়া। ইলমে ফেকাহ এবং উসুল শাস্ত্রের ওস্তাদ ছিলেন সেকালের নামকরা মুফল শেখ আকুল ওফা আলী বিন আৰুৱ। হাদীস পাঠে জানা যায় মাহবুবে সােবহানী সাধক স্কুলের শিরমণি হযরত আব্দুল কাদের জিলানী রহমাতুল্লাহ হাদীস শাস্ত্রের জ্ঞান অর্জন করেন শ্রেষ্ঠ হাদীসৰী আবুল বরকত তালহা আল আকুলী। আল্লাহর অসীম রহমতে হযরত আব্দুল কাদের জিলানী সাহেব রহমাতুল্লাহ অল্প বয়সেই সুমনা সুখ্যাতি নিয়ে নিযামিয়া মাদ্রাসার সর্বশ্রেষ্ঠ পরীক্ষা কামেল ক্লাশের সনদ লাভ করেন। এ বিদ্যা শিক্ষকালে সত্যের সৈনিক হযরত বড়পীর সাহেব অসীম। কষ্ট সহিষ্ণুতার পরিচয় দিয়েছেন। সে সম্পর্কে তিনি নিজেই বলেন, ‘আমার মনে যখন দুঃখ-কষ্ট বেশির ভাগ অনুভব হত তখন আমি মাটিতে শুয়ে ব্যাশ বাণী আল কোরানের এই আয়াতটি পড়াতাম- “ইন্নামাল উসরি ইউসরা” অবশ্যই দুঃখ-কষ্ট বিনে সুখ হয় না যাই হােক নানা দুঃখ-কষ্টের মধ্যে দিয়ে শিক্ষা জীবনের ৯টি বছর কেটে গেল।

ইতিহাস পাঠে একথাও জানা যায় সত্যের দিশারী আওলীয়া জগতের উজ্জ্বল তারকা হয়রত বড়পীর আব্দুল কাদের জিলানী সাহেব রহমাতুল্লাহ না করে সুনাম সুখ্যাতি নিয়ে তেরােটি বিষয়ে সনদ লাভ করেন। আরবী ভাষায় তার প্রচুর আন ছিল। অনলি আরবীতে কথা বলতে পারতেন, আরবী ভাষায় সুন্দর সুন্দর কবিতা লিখে কৰি ৰলেও পরিচিত ছিলেন। এক কথায় বলতে গেলে সেকালে মাহবুবে সােবহানী হযরত গাওসুল আযম পড়পীর সাহেবের মত সেরা ছাত্র ছিল না। ছাত্র হিসাবে তিনি যে অধিক মেধাবী ছিলেন উহা একটা ঘটনার মাধ্যমেই অনুধাবন করা যাবে। হাদীস শাস্ত্ৰেণয় সাফল্য অর্জন করার পর

তাকে যখন সাটিফিকেট দেওয়া হল, ঐ সময় তার ওস্তাদ তাকে বললেন হে আব্দুল কাদির, হাদীস শাস্ত্রে তােমাকে আজ আমরা যে সনদ দিচ্ছি, এটা একটা প্রচলিত নিয়ম মাত্র। তোমার মেধার এ নিয়ে পরিমাপ করা সম্ভব না। কেননা হাদীসের অনেক ব্যাখ্যা ও মর্মার্থ আ ই সময় তােমার সাথে আলােতনা করেই জানতে পেরেছি। সত্যের অগ্রনায়ক আওলীয়াকুলের শিরমণি বড়পীর সাহেব উচ্চশিক্ষা সমাপ্ত করে বসে রইলেই না। বিশ্ব নিয়া আল্লাহ রাব্দুল আলামীনের সান্নিধ্য লাভের জন্য তার ছিল দারুণ ইচ্ছা। শিক্ষা জীবন সমাপ্ত হবার পর থেকে দয়াময় আল্লাহর মহব্বত থাকে পাগল করে তুললাে।

সূফী সাধক হযরত আব্দুল কাদের জিলানী রহমাতুল্লাহ সাহেব সর্বদা ভাবতেন কিভাবে মহান করুণার আধার আল্লাহ জাল্লাহ শানহুর নৈকট্য লাভ করা যায়। আস্তে আস্ত দেখা গেল বড়পীর সাহেবের দুনিয়ার প্রতি কোন খেয়াল নেই। বড় বড় অলী আবদালের সােহবতে কাটালেন অনেকদিন। যাই হােক উন্নতি সাধনে গভীরভাবে মনােনিবেশ দিলেন। পার্থিব যাবতীয় সম্পর্ক ছিন্ন করে একনিষ্ট চিত্রে মহান করুণার অপার আপ্তাহ-জাল্লাহ শানহুর নৈকট্য লাভে ব্রতী হলেন। দুনিয়ার সকল প্রকার আরাম আয়শ ত্যাগ করে এমন কি মানুষের স্বাভাবিক খাদ্য ও ব্যবহার্য দ্রবাশি ত্যাগ করে বনে ফলমূল ও শাক-সবজি ইত্যাদি দ্বারা ক্ষুধা নিবারণ করতে লাগলেন। মানুষের সাথে মেলামেশা বাদ দিয়ে নিরবে নির্জনে বসবাস করতে লাগলেন। নিজের সম্পূর্ণ সময়টুকু বিগ নিয়ন্ত্র। আল্লাহ রাব্দুল আলামীনের সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য ব্যয় করলেন। রাত্রের ন্দ্রিা নিজের জন্য হারাম করে সারারাত্রি ইবাদত বন্দেগীতে কাটাতেন। ইসলামী জ্ঞানীদের দৃষ্টিকোণ থেকে একথাও জানা যায় যে মাহবুবে সােবহানী বড়পীর আব্দুল কাদের জিলানী রহমতুল্লাহ সাহেব প্রতি রায়ে নফল নামাজ কোরান শরীফ খতম করতেন। অনেক সময় দেখা গেছে যে বিশ্ব নিয়ন্ত্র আল্লাহ রাব্দুল আলামীনের জিকির ও ধ্যান করতে করতে তিনি নিস্পন্দ অবস্থায় সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়ে রয়েছে না জীবিত আছেন বলে কোন লক্ষণই

যাই হােক এমনিভাবে কঠোর সাধনার ফলে রুহানী জগতের আঁটি প্রজ্ঞাদাত সূফীকুলের শিরমণি হযরত আব্দুল কাদের জিলানী রহমাতুল্লাহ, একজন কামেল ওলীতে পরিণত হয়েছেন। প্রিয় পাঠক-পাঠিকাগণ একটু চিন্তা করে দেখুন বড়পীর সাহেব কত সাধনার মধ্যে দিয়ে বিশ্ব নিয়া আল্লাহ রাব্দুল আলামীনের নৈকট্য অর্জন করেছিলেন। বড়পীর সাহেব তার মনে লােভ লালসা, রাগ-হিংসা সম্পূর্ণ দমন করতে সক্ষম হলেন লাভ করলেন মহান করুণার আধার আল্লাহ জাল্লা শানহুর নৈকট্য অর্জন করলেন আল্লার পিয়ারা বান্দা হওয়ার সৌভাগ্য। | মধোসার অধ্যক্ষ পদ ! ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় হযরত আবু সাঈদ মাখদুমী রাহেমাহুল্লাহ কুর্তৃক তার মাদ্রাসার অধ্যক্ষ পদে অধিষ্ঠিত হয়ে মাহবুবে সােবহানী হযরত আব্দুল কাদের জিলানী রহমাতুল্লাহ উচ্চ পর্যায়ের যােগ্যতার সহিত শিক্ষা প্রদান করতে লাগলেন। অল্পদিনের মধ্যেই তার সুযােগ্য শিক্ষ পদ্ধতির খ্যাতি সারা বাগদাদ শহরে ছড়িয়ে পড়ল। বহু দূর-দূরান্ত থেকে দলে দলে ছাত্র পঙ্গপালের মতাে ফুটে আসতে লাগল এবং তার নিকট হতে শিক্ষা এবং ফায়েজ লাভ করতে লাগল। আস্তে আস্তে মাদ্রাসায় ছাত্র সংখ্যা অনুপাতে স্থান খুবই সংকীর্ণ হয়ে পড়ল। বড়পীর সাহেব সর্বদা তাফসীর, হাদীস, এলমে নাহ এলমে ছরফ এবং উসুলে ফেকাহর তালীম প্রদানে মসগুল থাকতেন। যাই হােক সুনাম সুখ্যাতির সাথে মাদ্রাসার শিক্ষকতা কাজ করেন। আল্লাহ রাসুল আলামীনের অসীম রহমতে অল্পদিনের মধ্যেই মাদ্রাসাটির সুনাম চারদিকে ছড়িয়ে পড়লাে। বহু দূরের জাত্ররা এসে ৰতি হতে লাগলো এখানে। সত্যি। আস্তে আস্তে ছাত্র সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়াতে

বড়পীর সাহেবের সুনাম সুখ্যাতি আরও ছড়িয়ে পড়ল। মাদ্রাসার ছাত্রদের জায়গা দেওয়াই কঠি হয়ে পড়লাে। বড়পীর সাহেব চিন্তার মধ্যে পড়ে গেলেন কিভাবে মাদ্রসার ঘর বৃদ্ধি করা যায়। ইন্দে করলেই তাে আর বাড়ানাে যায় না, এ জন্যে অর্থের প্রয়োজন ॥ মাহবুবে সােবহানী গসুল আজম হ্যরত বড়পীর সাহেব একটিদন এক বিরাট মজলিসে ব্যাপারটা তুলে ধরে সাহায্যের আবেদন জানালেন সত্যি কথা বলতে কি তার কথায় সকলের সাড়া দিল ধনী ‘গরীব সকল স্তরের লােক অংশ গ্রহণ করলেন।

মাদ্রাসি-ই- কাদেরিয়া ! মহান করুণার আঁধার আল্লাহ আল্লাহ শানহুর অসীম রহমতে জনসাধারণের মিলিত সহযােগীতায় দ্বীনি প্রতিষ্ঠানের নতুন ঘর তৈরি হলাে। সকলে বহুদিনের আশা পূর্ণ হল। তৈরি হল নতুন পরিবেশ। ইতিহাস পাঠে জানা যায় মাদ্রাসার নাম দেয়া হল মাদ্রাসা-ই-কাদেরিয়া মাহবুবে সােবহানী সত্যেই সৈনিক আওলিয়াকুলের শিরমণি হযরত আব্দুল কাদের জিলানী রহমাতুল্লাহ-এর সুযােগ্য পরিচালনার মাদ্রাসা যেন নতুন জীবন লাভ করলাে।। | বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী এ কথা দিবালােকের মত সমুজ্জ্বল যে সত্যের সৈনিক রুহানী জগতের আঁটি প্রজ্ঞাদাতা মাহবুবে সােবহানী বড়পীর আব্দুল কাদের জিলানী রহমাতুল্লাহ শুধুমাত্র ইলমে শরীয়ত ও মারেফতের পন্ডিত ছিলেন না। বরং তিনি কাব্য, সাহিত্য, দর্শন, ইতিহাস, ভূগােল প্রভৃতি শাস্ত্রের সুপন্ডিত ছিলেন। সত্যি কথা বলতে কি তাঁর প্রণীত বহু, কিতাৰ অদ্যাবধি এ কথার সাক্ষ্য বহন করছে। এসব কিতাবের মধ্যে ফুত গীয়ৰ, গুনিয়াতুত তালেবিন, ফতহুর রব্বানী, কাসীদায়ে গাওসিয়া সমধিক প্রসিদ্ধ। আল্লাহর অসীম রহমতে এই সকল কিতাবের বাংলা ওজুমাও হয়েছে। যার দ্বারা অসংখ্য লােক সিরাতুল মুস্তাকিমের সঠিক সন্ধান পেয়েছে। প্রিয় পাঠক-পাঠিকাগণ হযরত বড়পীর সাহেব কেবল শরীয়ত মারেফাত বিদ্যায়ই পান্ডিত্য অর্থন করেছিলেন তা নয়, তিনি বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী ছিলেন। এক কথায় বলতে গেলে যাবতীয় ইসলামী আখলাখের অপূর্ব সমাবেশ ও বিকাশ ঘটেছিল হযরত বড়পীর সাহেবের জীবনে। | বড়পীর রহমাতুল্লাহ-এর কয়েকটি উপদেশাবলীঃ একথা সর্বজন বিদিত যে রুহানী জগতের আঁটি প্রজ্ঞাদাতা আওলীয়াকুলের শিরমণি হযরত আব্দুল কাদের জিলানী রহমাতুল্লাহ গােটা জীবনের সাধনাই ছিল মানব কল্যাণ। মানুষের কল্যাণের জন্য তিনি আজীবন চেষ্টা করে গেছেন। সােনালী ইসলামের নির্মল আদর্শ প্রতিষ্ঠা করাই ছিল সত্যের সৈনিক গাওসুল আযম হযরত বড়পীর সাহেবের রহমাতুল্লাহ প্রধান ও একমাত্র জীবনের লক্ষ্য ও কর্তব্য। তিনি শিক্ষকতা, পুস্তক প্রণেতা, ওয়াজ নসীহতের মাধ্যমে মানুষদেরকে ইসলামের পথে আনার চেষ্টা করে গেছেন। মােট কথা মাহবুবে সােবহানী গাওসুল আযম হযরত বড়পীর রহমতুল্লাহ ছিলেন ইসলামে একনিষ্ঠ খাদেম। বিশ্ব নিয়স্তা আল্লাহ রাব্দুল আলামীনের ইচ্ছায় তিনি তার উপর নির্দিষ্ট দায়িত্ব সযত্নে পূর্ণাঙ্গরূপে আদায় করেছেন। ইসলামী জ্ঞান তাপসদের দৃষ্টিকোণ থেকে জানা যায় হযরত বড়পীর সাহেব রহমাতুল্লাহ ইসলামের শরীয়ত ও মারফতের জ্ঞান সাধনা ও বিতরণকরে অন্তরে বাইরে তিনি ইসলাম প্রতিষ্ঠার সত্যিকার প্রশস্ত রাজপথ নির্মাণ করে গিয়েছেন, যাহা বিশ্বের সকল মুসলমানদের পাথেয় সত্যের সেনানী বড়পীর সাহেব যাহা বলেছেন তাহাই মানবজাতীয় কল্যাণের জন্য করেছেন। তিনি ইসলাম প্রচার করতে যেয়ে যে ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন তা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। হযরত বড়পীর সাহেব রহমাতুল্লাহ পরহেজগার ব্যক্তিবর্গের জন্য কয়েকটি মূল্যবান নির্দেশ রেখে গেছেন যা নিম্নে দেওয়া হল

১। শপথ ও প্রতিক্ষা করা উচিত নহে। তবে শপথ বা প্রতিজ্ঞা করে বসলে তাহা পালন করবেন।

২। মিথ্যা কথা বলিও না। কোনভাবেই মিথ্যা বলতে নাই। উপহাস, ঠাট্টা, হাস্যকৌতুক করেও মিথ্যা বলও না। সদা সর্বদা সত্য কথা বলবে।

৩। কখনও বিশ্বনিয় আল্লাহ রাব্দুল আলামীনের নাম শপথ করাে না।

৪। কোন মুসলমানকে নিশ্চিতভাবে মুনাফিক কাফের কল না। মহান করুণার আঁধার আল্লাহ জাল্লাহ শানহু ছাড়া কে জানে না কে মুনাফিক, কে মুশরিক।

৫। কোন মানুষের নিকট কোন আশা-আকাক্সক্ষা কর না।

৬। বিনয়ী হও। আদব-কায়দা, নম্রতা ও শিষ্টাচারের মধ্যে ধর্মভিরুতা রয়েছে। তোমার সৎ আচরণগুলি ইবাদতের সহিত সংশ্লিষ্ট।

৭। কাকেও অভিসম্পাত কর না। ধৈর্যধারণ পূর্বক যে কোন আপদ বিপদ দুঃখ-কষ্ট, অভাব-অনটন মুকাবিলা করবে।

৮, নিজের মর্তবা অর্জনের জন্য কারও উপর কার্যদায়িত্ব চাপাইয়া দিওনা। ইহা | পুরাপুরিভাবে বিশ্বনিয়া আল্লাহ রাব্বল আলামিনের দায়িত্ব। তিনিই তােমার | রিজিকদাতা।

ইন্তেকাল । একথা সর্বজন বিদিত যে মানুষ মরণশীল। প্রত্যেক মানুষেরই মৃত্যুর | শরবত পান করতে হবে। পার্থিব জগতের কেহই মৃত্যুর হাত থেকে রেহাই পানে না | পই মাহবুবে সােবহানী আওলীয়াকুলের উজ্জ্বল নক্ষত্র সূফী সাধক গাওসুল আযম

হযরত আব্দুল কাদের জিলানী রহমাতুল্লাহ ও মতর হাত থেকে রেহাই পাননি। তাকেও | পার্থিব জগতের মায়া মমতা ছিন্ন করে পরপারে যাত্রা করতে হয়েছে। ইসলামী জগতে বড়পীর হযরত আঙ্গুল কাদের জিলানীকে না জানে এমন লােক বিৱল। সারা পৃথবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছড়িয়ে রয়েছে তা অনুসারীরা। বাংলাদেশের ঘরে ঘরে রয়েছে ‘ তার অগণিত ভক্ত অনুরক্তের দল। এই কুতুবুল আফতাৰ মুসলিম মিল্লাতকে এমিত করে। | হিজরী ৬৬২ সালের ১১ই রবিউসসানী তার মাশুকের আলার নিকট গমন করেন। | ইন্নালিল্লাহ or rever.। ইন্তেকালের সময় তার বয়স হয়েছিল ৯১ বছর। এটা বাস্তব সত্য

কথা যে জাগতিক মৃত্যুর তুহিন শীতল সংস্পর্শে তার কর্মজীবনের অবসান ঘটলেও তার | প্রতিষ্ঠিত সংস্কার ও আদর্শ পৃথিবী প্রলয় পর্যন্ত অম্লান থাকৰে। ইসলামের খিদমতের জন্য তিনি যেমন কাজ করেছেন সারা দুনিয়ায় মুসলমানদের জন্য অনন্ত কাল ধরে প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। বড়পীর সাহেবের ইহধাম ত্যাগের দিন ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম মুসলমানদের জাতীয় পর্বে পরিণত হয়েছে। তার ইন্তেকালের বার্ষিকীতে সারা বিশ্বের | মুসলিমগণ বিশেষ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে মিলাদ মাহফীল, কোরান খতম করে তার আত্মার মাগফেরাত কামনা করে। আল্লাহ পাক আমাদেরকে তার রুহানী ফায়েজ হাসিল করার তুকি দান করুন।

কাফন দাফন । সত্যের দিশারী রুহানী জগতের অন্যতম সাধক হযরত বড়পীর সাহেবের রহমাতুল্লাহ, ইহধাম ত্যাগের সংবাদ মুহূর্তের মধ্যে চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ল। সংবাদ শোনা মাত্রই মানুষ পঙ্গপাল পাখীর মত তার বাসভবনে ঘটে আসলেন। ঐতিহাসিক বাগদাদ শহরের সকল শ্রেণীর লােকেরা তাদের প্রিয় ও শ্রদ্ধেয় শিক্ষক ওস্তাদ পীর সাহেব কেবলা রহমাতুল্লাহ-কে শেষ দেখা দেখতে বন্যার হাতের মত এসে ভীড় জমাইলেন। সমস্ত দিন চলল শেষ দেখা লােকের সমামে আর দিনের বেলায় তাকে দাফন করা গেল না। তার আদরের সুযােগ্য পুত্র শেখ আবদুল ওয়াহহাব তাকে শেষবারের মত গােসল করালেন এবং কাফন পরালেন। বড়পীর সাহেবের ভক্তবৃন্দের শেষ দেখা সমাপ্ত হলে তার পবিত্র মরদেহ তারই আজীবনের কর্মক্ষেত্রে সর্বশ্রেষ্ঠ জনি প্রতিষ্ঠান মাদ্রাসায়ে কাদেরিয়ার বারান্দায় চিরজীবনের জন্য শায়িত করা হল।

মনসুর হাল্লাজ এর জীবনী পড়তে এখানে ক্লিক করুন।

খাজা বাবার জীবনী

খাজা বাবার জীবনী

খাজা বাবার জীবনী ও অলৌকিক ঘটনা এবং বিশেষ উপদেশাবলীঃ

খাজা বাবার জীবনী পরিচিতি ও ইতিহাস পাঠে জানা যায়, যে সকল মহান ব্যক্তির অক্লান্ত কর্ম প্রচেষ্টার ফলে বঙ্গ-ভারতে সােনালী ইসলামের নির্মল আদর্শ প্রতিষ্ঠা ও বিকাশ সম্ভব হয়েছে, তাদের মধ্যে রূহানী জগতের খাটি প্রজ্ঞাদাতা সূফী কুলের শিরােমণি মর্দে মুজাহিদ হযরত খাজা মঈনুদ্দীন চিশতী (রহঃ) এর নাম বিশেষভাবে স্মরণীয়।

একথা বাস্তাব সত্য যে তিনিই সাধক কুলের সম্রাট সুফীবৃন্দের গৌরব, তাপসগণের শিরমণি ইসলামী রেনেসাঁর অগ্রনায়ক হযরত মঈনুদ্দীন চিশতী রহমাতুল্লাহতার বিচিত্র জীবন কাহিনী ধ্যানােপাসনার জন্য প্রেরণাদানকারী হিসাবে আমাদের নিকট খুবই

খাজা বাবার জীবনী

খাজা বাবার জীবনী

তাৎপর্যপূর্ণ। ইতিহাসের পাতা খুললে আমরা দেখতে পাই ইসলামের জন্য তার আত্মত্যাগ তাকে ইতিহাসের সােনালী পাতায় অবিস্মরণীয় করে রেখেছে। সত্যি কথা বলতে কি তার জীবন কাহিনী বহু কর্তি ও সাধনা সমৃদ্ধ ছিল। আলেম কুলের শিরমণি হযরত খাজা মঈনুদ্দীন চিশতী রহমাতুল্লাহ সােনালী ইসলামের নির্মল আদর্শ প্রচারে বহু বাধা বিপত্তির সম্মুখিন হয়ে শেষ পর্যন্ত সফলতার স্বর্ণ শিখরে আরােহণ করতে সমর্থ হয়েছিলেন।

ঐতিহাসিকগণ বলেন, বঙ্গ-ভারতের ইসলাম প্রচারেখাজা মঈনুদ্দীন চিশতী (রহঃ) যে অবিস্মরণীয় অবদান রেখে গেছেন, তাহা ইতিহাসের পাতায় চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবে। তাকে কেন্দ্র করে অনেক উপাখ্যান রচিত হয়েছে। পরিশেষে আমরা এইরূপ সিদ্ধান্তে উপনীত হই যে সত্যের সৈনিক হযরত খাজা মঈনুদ্দীন চিশতী (রহঃ) এমন একজন আদর্শ স্থানীয় মানুষ ছিলেন যে পার্থিব ভােগ বিলাসিতা দূরের কথা কৃচ্ছ সাধনায়ই কেটে ছিল তা সারাজীবন। ইতিহাসবেত্তাদের দৃষ্টিকোণ থেকে জানা যায়, আলেম কুলের শিরমণি হযরত খাজা মঈনুদ্দীন চিশতী রহমাতুল্লাহ-এর হাতে অসংখ্য মুসলমান ও অমুসলমান বাইয়াত গ্রহণ করে নিজেদের জীবন ধন্য করেছেন।

খাজা বাবার জীবনী ও পরবর্তী ধাপঃ

জন্ম ও বংশ পরিচয় :- রূহানী জগতের খাটি প্রজ্ঞাদাতা হযরত খাজা মঈনুদ্দীন চিশতী সাহেবের জন্ম হয় সিস্তানের গনজর পল্লীতে। ঐতিহাসিকদের দৃষ্টিকোণ থেকে জানা যায়, তার পিতা খাজা গিয়াসুদ্দীন ছিলেন একাধারে খােদাভক্ত আবেদ এবং বিত্তশালী ব্যক্তি। তিনি সর্বদা কুরান ও সুন্নাহ অনুযায়ী জীবন যাপন করতে চেষ্টা করতেন। সুতরাং খাজা সাহেব বাল্যকালে অত্যন্ত যত্ন ও স্নেহের সাথে প্রতিপালিত হয়ে ছিলেন। হযরত খাজা মঈনুদ্দীন হাসান চিশতী সানজারী রহমাতুল্লাহ পবিত্র আরবের সুবিখ্যাত কুরাইশ বংশদ্ভূত হযরত আলী কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহুর নিম্নতর বংশধর ছিলেন। ইতিহাস পাঠে জানা যায়, তিনি মাতৃ বংশসূত্র ও পিতৃ বংশসূত্র উভয় দিক দিয়াই সত্যের সৈনিক শেরে খােদার সহিত ওঁতপােতভাবে জড়িত ছিলেন। সত্যের সেনানী হযরত খাজা গরীবে নেওয়াজ মঈনুদ্দীন হাসান চিশতী রহমাতুল্লাহ এর জন্ম সাল ও তারিখ সম্বন্ধেও সুসাহিত্যিক লেখকদের মধ্যে বেশ মত পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়।

১। সিয়ারুল আকতারের লেখকের মতে সত্যের অগ্রনায়ক হযরত খাজা গরীবে নেওয়াজ রহমাতুল্লাহ এর জন্মসাল হল ৫৩৭ হিজরী। তিনি বহু চিন্তা ভাবনা যুক্তি তর্ক ও বিস্তারিত আলােচনার পর তার জন্ম দিন হিসাবে ৫৩৭ হিজরী সালের ১৪ই রজব সােমবারকে মনােনয়ন করেছেন এবং তিনি, এ কথা বলেছেন যে সুফীকুলের শিরমণি ইসলামী রেনেসাঁর অগ্রনায়ক খাজা মঈনুদ্দীন চিশতী রহমাতুল্লাহ উক্ত তারিখেই ধরাধামে আগমন করেছেন।

২। অন্যদিকে খাজা সাহেবের রহমাতুল্লাহ সাল ও তারিখ সম্বন্ধে প্রসিদ্ধ গ্রন্থ সজিনাতুন আসফিয়ার-এর লেখক উল্লেখ করেছেন যে, আলেম কুলের শিরমণি হযরত খাজা মঈনুদ্দীন চিশতী (রহঃ) হিজরী ৫৩০ সনের ১৪ই রজব সােমবার বােহে সাদিকের সময় এ ধরাধামে আগমন করেছেন। উক্ত আলােচনা হতে অনুধাবন করা যেতে পারে যে, উভয় লেখকই দুইটি বিষয়ে একমত এবং একটি বিষয়ে ভিন্নমত পােষণ করতেছেন। যে বিষয়দ্বয়ে তারা একমত প্রকাশ করেছেন তাহা হল ১৪ই রজব এবং সােমবার। কিন্তু সনের ক্ষেত্রে উভয় এমন মত পােষণ করেছেন যে এখন দুই মতের মধ্যে সাত বছরের ব্যবধান রয়েছে। তবে খাজা গরীব নেওয়াজ রহমাতুল্লাহ যে কোন সালেই জন্মগ্রহণ করুন না কেন, ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলামী ব্যান্ডকে সমুন্নত করবার জন্য তিন যে অবদান রেখে গেছেন তা ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লিখা থাকবে।

ইতিহাস পাঠে জানা যায়, সৈয়দা উমমুল ওয়ারা গর্ভাবস্থায় অনেক নেক স্বপ্ন দেখেছিলেন। এমনও দেখা গেছে বহু সময় তিনি নিজের স্বপ্নের কথা সলজ্জভাবে স্বামী হযরত খাজা গিয়াসুদ্দীন রহমাতুল্লাহ এর নিকট ব্যক্ত করতেন। পূন্যবান ও বিচক্ষণ স্বামী তাকে নানাভাবে প্রবােধ দান করতেন এবং মনে মনে ভাৰী সুসন্তানের চন্দ্র মুখ দেখবার প্রত্যাশায় উৎফুল্ল হয়ে উঠতেন। | সত্যি কথা বলতে হয়, একদিন তাদের বাসগৃহে উজ্জ্বল করে রূহানী জগতের খাটি প্রদাতা সত্যের দিশারী খাজা গরীব নেওয়াজ রহমাতুল্লাহ ধরাধামে পদার্পন করেন। তার আগমনে সারা পরিবারে আনন্দের ফোয়ারা ছুটলো। ইতিহাস বেত্তারা বলেন, তার আগমনের তিন কিংবা সাত দিন পর, নবজাত শিশুর নাম রাখা হয় মঈনুদ্দীন কিন্তু বিবি উম্মু ওয়ার ও খাজা গিয়াসুদ্দীন রহমাতুল্লাহ তাকে হাসান নামেই ডাকতেন। যার কারণে ইতিহাস বেত্তারা এ জীবনীকার হাসান-শব্দটিকে তার আসল নামের সহিত সংযুক্ত করে তার নামকে মঈনুদ্দীন হাসান বলে উল্লেখ করেন।

খাজা মইনুদ্দীন চিশতীর বাল্য জীবনীঃ

ইসলামের দিশারী সুফীসুধক হযরত খাজা মঈনুদ্দীন চিশতী (রহঃ) এর বয়স যখন সাত বৎসরে উপনিত হয়েছে, তখন হতেই তিনি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ নিয়মিত আদায় করতেন। শুধু নামাজ আদায় করে ক্ষ্যান্ত হতেন না। এই বাচ্চা বয়সে তিনি নিয়মিত রােজা রাখতেন ও জিকিরের মজলিসে যােগ দিতেন। যদি কোন ধর্মীয় অনুষ্ঠানের কথা তার কানে আসত, শুনিমাত্রই তিনি বাধাবিপত্তি পেরিয়ে মজলিসে অংশগ্রহণ করতেন। প্রিয় পাঠক-পাঠিকাগণ একটু চিন্তা করলেই অনুধাবন করতে পারবেন যে, খাজা মঈনউদ্দীন চিশতী রহমাতুল্লাহ বাল্যকালে কতদূর খােদাভীতি অর্জন করেছিলেন, যাহা নিম্নের ঘটনার দ্বারাই প্রতিফলিত হবে।

একদা তিনি স্বীয় পিতার সাথে ঈদের নামাজ পড়তে ঈদগাহের উদ্দেশ্যে যাচ্ছিলেন, এহেন সময় পথিমধ্যে এক অন্ধ ও অসহায় বালককে ময়লা ও ছেড়া কাপড় পরিধান করে নামাজ পড়তে দেখলেন। সত্যি, খাজা মঈনুদ্দীন চিশতী রহমাতুল্লাহ, উহা দেখিবামাত্রই কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন। ইহাতে তার হৃদয়ের মনিকোঠায় এক অজানা ব্যথার উদয় হল। তিনি এ বালকের অবস্থা দেখতে দাঁড়ায়ে বহুক্ষণ চিন্তা করলেন। ইতিহাস বেত্তারা বলেন, তাপৰ পিতার অনুমতি ও নির্দেশের অপেক্ষা না করে নিজের পরিধেয় নতুন বস্ত্র খুলিয়া অন্ধ বালকটিকে পরিধান করালেন এবং হরষিত চিত্তে মহান করুণার আধার আল্লাহ জাল্লা শানুর শুকুরিয়া আদায় করলেন এবং নিঃস্ব অবস্থায় ঈদের নামাজ আদায় করে মনের হয়ে নিজ গৃহে প্রতীত্যন করলেন। হানী জগতের খাটি প্রজ্ঞাদাতা হযরত খাজা মঈনউদ্দি চিশতী রহমাতুল্লাহ এর সমুদয় কার্য কলাপই হযরত খাজা গিয়াসুদ্দীন (রাঃ) অদূরে থেকে নিরীক্ষণ করলেন, এবং মনে মনে বিশ্বনিয়ন্তা আল্লাহ রাব্দুল আলামীনের শুকর গুজারী করলেন।

উপসংহারে একথা বলা যেতে পারে যে, সূফী সাধক আলেম কুলের শিরমণি হযরত খাজা মঈনউদ্দিন চিশতী রহমাতুল্লাহ ইসলামের ইতিহাসের তথা ইতিহাসের পাতায় চির ভাস্কর হয়ে থাকবেন, তা তার বাল্যকালের প্রতিভা, চালচলন থেকেই প্রকাশ পেয়েছিল। ইতিহাস পাঠে জানা যায় যে, হযরত খাজা মঈনুদ্দিন চিশতী রহমাতুল্লাহ ছিলেন দুনিয়ার গছে আজম, কুতুবুল আক্তার এবং সমগ্র জিল ও ইনসানগণের পথ প্রদর্শক। তিনি যে বেলায়েতী গগনের দীপ্তিমান সূর্যস্বরূপ হবেন তা তার বাল্যকালেয় প্রতিচ্ছৰি থেকেই অনুধবন করা যেত। ইসলামের ইতহাস পর্যালােচনা করলে দেখা যায়, তিনি মাতৃ গর্ভ হতে তিনি অলীরূপে ভূমিষ্ট হয়েছিলেন।

একথা বাস্তব সত্য যে শিশুকাল হতেই তিনি অকল্পনীয় কারামত এবং ঐশী, ক্ষমাসমূহের অধিকারী ছিলেন। একথাও শুনা যায় কেবলমাত্র যখন সাত বৎসর বয়সে উপনিত হয়েছিলেন এ সময় তিনি অর্থসহ ঐশীগ্রন্থ আল কোরান হেফজ করেন। অল্প দিনের মধ্যে তিনি ইলমে হাদীস ও ইলমে ফেকাতত পান্ডিত্ব অর্জন করেন। প্রিয় পাঠক-পাঠিকাগণ শুনলে অবাৰ হবেন সত্যের অগ্রনায়ক খাজা মঈনুদ্দিন চিশতী রহমাতুল্লাহ মাত্র পনের বছর বয়সে এলমে তাছাউফ তত্ব সম্পর্কিত একখানা মূল্যবান গ্রন্থ তক্ত প্রণীত হয়েছিল। বাল্যকালের এসব নিদর্শন থেকেই প্রমাণ করেছিল যে তিনি ইসলামের একজন অলী হবেন।

খাজা বাবার ১২ টি বিখ্যাত বানী শুনতে এখানে ক্লিক করুন।

ত্রিজীবন ও অধ্যবসায়ঃ

যে ব্যক্তি এলমে দ্বীন হাসিলের উদ্দেশ্যে বের হয়, ফিরে আসার পূর্ব পর্যন্ত আল্লাহর পথেই থাকে।” (আল হাদীস) | খাজা মঈনুদ্দীন চিশতী রহমাতুল্লাহ সেই সময়ে দ্বীন অর্জনের নিমিত্ত ঘরবাড়ী পরিত্যাগ করলেন। প্রথমে তিনি সমৱকাৰ গমন করলেন। সে সময় সমরকন্দ ও বােখরা ইসলামী শিক্ষাকেন্দ্র হিসাবে বিখ্যাত ছিল। বড় বড় মােহাদ্দেছ, ফকীহ, দার্শনিক ও চিন্তাশীল পণ্ডিতগণ সেখানে বাস করতেন। খাজা সাহেব প্রথমে কোরআন শরীফ হেফজ করলেন। অতঃপর তাফসীর, হাদীছ, ফেকা, ওসূল মানতেক ইত্যাদি বিষয় অধ্যায়ন করলেন। তখনকার দিনে সাধারণত মানুষের স্মৃতিশক্তি প্রখর ছিল। খাজা মঈনুদ্দীন চিশতী রহমাতুল্লাহ এর স্মৃতিশক্তি ছিল তার চাইতেও প্রখর। কোরআন শরীফ হেফম করতে তার মাত্র গুটিকয়েক দিন সময় ব্যয়িত হয়েছিল। তাফসীর হাদীছ ইত্যাদি শিক্ষা করতেও তার খুব বেশি দিন লাগে নাই। বিশেষতঃ দুনিয়ার পিছনে তার কোন আকর্ষণ ছিল না বলিয়া একনিষ্ঠ ভাবে তিনি সাধনা করতে পেরেছিলেন এবং এর ফলেই শিক্ষাক্ষেত্রে মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই তিনি প্রচুর দক্ষতা অর্জন করতে সক্ষম হন।

খাজা বাবার জীবনী ও পরবর্তী ধাপঃ

যাহেরী বিদ্যায় পারদর্শিতা লাভ করেও তার তৃষ্ণাতুর মনের আন-পিপাসা নিবৃত হইল না। তিনি বােখরা পরিত্যাগ করে আবার নিরুদ্দেশের পথে যাত্রা করলেন।

খাজা ওসমান হারুনী রহমাতুল্লাহ নিকট বাইয়াত গ্রহণঃ

ইসলামের ইতিহাস পর্যালােচনা করলে দেখা যায়; তৎকালে নিশাপুরের অধিবাসী খাজা ওসমানহারুনী ছিলেন সুফী জগতের উজ্জ্বল নক্ষত্র। আলেম কুলের শিরমণি যুগ সেরা তাপস। ইসলামী রেনেসাঁর অগ্রনায়ক হযরত খাজা মঈনুদ্দীন চিশতী রহমাতুল্লাহ, আধ্যাত্মিক জগতের শেষ প্রান্তে পেীছার মানষে দেশ বিদেশে যােগ্য মাশায়েখ খুছতেছিলেন। যাই হােক অনেক খোজাখুজির পর শেষ পর্যন্ত যােগ্য মাশায়েক খাজা ওসমান হারুনী হমাহ কে পেয়ে অবশেষে তার নিকট মুরীদ হয়ে আধ্যাত্মিক জগতের পথকে সুগম করলেন এবং নিজেকে ধন্য করলেন।

ইতিহাস বেত্তারা বলেন, রুহানী জগতের আঁটি প্রজ্ঞাদাতা হযরত খাজা মঈনুদ্দীন চিশতী রহমাতুল্লাহ আড়াই বছরকাল পীরের খেতমতে ছিলেন। কঠোর ইবাদত, রিয়াযাত ও মোরাকাবা মােশাহিদৱ মাধ্যমে তিনি বাতেনী কামালিয়াত অর্জন করে সফর শুরু করলেন। ইতিহাস বেক্তারা বলেন, প্রথমে তিনি মক্কা শরীফে উপস্থিত হয়ে হজ্জ পালন করলেন। এর পর মদিনা শরীফে নিখিল বিশ্বের ত্রাণকর্তা সুপারিশের কান্ডারী হযরত মুহাম্মদ (সঃ)-এর পবিত্র রওজা মােৰাৱক যিয়ারত করবার সময় শুনতে পাইলেন, নৰীয়ে দোজাহান হযরত মুহাম্মদ (সঃ) তাকে বলতেছেন, তোমাকে আমি হিন্দুস্থানের বেলায়েত অর্জন করতেছি। তুমি যেখানে যেয়ে সােনালী ইসলামের নির্মল আদর্শের কথা মানুষের মাঝে প্রচার কর। সত্য কথা বলতে কি, সত্যের সৈনিক হযরত খাজা মঈনুদ্দীন চিশতী (রাঃ) যখন এই দেশে আগমন করলেন, তখন হিন্দুস্থানের প্রায় সর্বত্রই মুর্তি পূজার প্রচলন ছিল। সত্যি কথা বলতে হয় সিন্ধু বিজয়ের ফলে এই দেশে মুসলিম সভ্যতা যতটুকু প্রসার লাভ করেছিল, কালের প্রভাবে তাও বিলিন হয়ে গিয়েছিল। | খােদাদ্রোহীদের প্রতারণার জালে আবদ্ধ হয়ে এই দেশবাসী দেব দেবীর পূজায় নিজেদের উৎসর্গ করেছিলেন। তাদের শােচনীয় পরিনামের কথা স্মরণ করে রুহানী জগতের খাটি প্রজ্ঞাদাতা মঈনুদ্দীন চিশতী রহমাতুল্লাহ ভ্রান্ত মানবদিগকে সত্যিকার খোদার দিকে ফিরায়ে আনার জন্য আত্ম নিয়ােগ করলেন।

খাজা বাবার জীবনী ও পরবর্তী ধাপঃ

দিল্লীর প্রতিকূল অবস্থাঃ ইতিহাস বেত্তাদের দৃষ্টিকোণ থেকে জানা যায়, যে, দিল্লীর রাজা ছিলেন তখন পৃথ্বিরাজ। তারাইনের প্রথম যুদ্ধে তিনি বিপ্লবী বীর মুহাম্মদ ঘুরীর মত বাহাদুরকেও পরাজিত করেছিলেন। মুহাম্মদ ঘুরীর এই আক্রমণ সমস্ত হিন্দু দিগকে মুসলিম বিদ্বেষী করে তুলছিল। হিন্দুগণ মুসলমানদিগকে নীচ আত ও মে বলে ধারণা করত এবং তাদের কথা শুনলে চটে যেত। এহেন ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে রুহানী জগতের খাটি প্রজ্ঞাদাতা আলেম কুলের শিরমণি মর্দে মুজাহিদ খাজা সাহেব আল্লাহর শপথ নিয়ে আল্লাহর উপর ভরসা করে সর্বস্তরের মানুষকে গােনালী ইসলামের দিকে আহবান দিতে লাগলেন। দেশ বিদেশ হতে মানুষ তার দরবারে আসত।

মহান আল্লাহ জাল্লা শানুর অসীম কৃপায় খাজা সাহেবের সুমিষ্ট ভাষণ ও আন্তরিক রুহানিয়াতের প্রভাবে ক্রমে ক্রমে লােকেরা সত্যের দিকে ঝুকে পড়ল। তার অলৌকিক ক্ষমতা দর্শনে ও যুক্তিপূর্ণ বক্তব্য শ্ৰবনে বহু গোঁড়া হিন্দু তাকে শ্রদ্ধার সৃষ্টিতে দেখতে লাগলেন। প্রিয় পাঠক, পাঠিকাগণ উক্ত আলােচনা থেকেই অনুধাবন করতে পারেন যে সত্যের সৈনিক হযরত খাজা সাহেব কত উচ্চ পর্যায়ের লোক ছিলেন। একথা দিবালোকের ন্যায় সমুজল যে হযরত খাজা মঈনুদ্দীন সাধক কুলের শিরমণি ছিলেন। ইতিহাসের পাতা খুললে দেখা যায়, ভারতীয় উপমহাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কিকট তিনি একজন সর্বজন মান্য ও এজাজান তাপস ব্যক্তি ছিলেন। সত্যি কথা বলতে হয় ইসলাম প্রচারে তার অবদান ছিল অবিস্বরনীয়।

আজমীর গমনঃ

খাজা বাবার জীবনী ও অলৌকিক ঘটনাঃ

খাজা সাহেব তার প্রাণপ্রিয় মুরীদ খাজা কুতুবুদ্দীনকে দিল্লীতে রেখে আজমীরের দিকে রওয়ানা হলেন। খাজা সাহেব আজমীরে গমন করে যেখানে নিজ বাসভূমি স্থাপন করলেন তা ছিল হিন্দু রাজার চারণভূমি। আলেমকুলের শিৱমণি খাজা মঈনুমীন চিশতী রহমাতুল্লাহ-কে দেখে রাখালগণ বিরক্ত হলেন, শুধু বিরক্ত নয় শেষ পর্যন্ত সেইখান হতে তাকে চলে যাওয়ার জন্য বলল। প্রিয় পাঠক-পাঠিকাগণ এই ভেবে দেখুন খাজা সাহেব কতদূর আল্লাহর মায়ার বান্দা ছিলেন।

সন্ধ্যার সময় রাখালগাল উটগুলাে সহাস্থানে রেখে চলে গেলেন। পরের দিন খুব ভােরে রাখালগণ এসে দেখলাে উটের চামড়া মাটির সাথে যুক্ত হয়ে আছে। এহেন অবস্থা দেখে রাখালগণ কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেলেন, অগত্যা রাখালগণ সাধক কুলের শিরমণি খাজা সাহেবের পদপ্রান্তে পড়ে মাফ চাইল। মাফ চাওয়া মাত্রই দেখলাে উটগুলাে যথাস্থানে দাঁড়াইয়া রয়েছে। অল্পক্ষণের মধ্যে এই অলৌক্কি ঘটনা সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ল। এই ঘটনার পর থেকেই তার কাছে বহু হিন্দু ইসলাম গ্রহণ করলেন।

আনা সাগরের তীরবর্তী মন্দির এর কথা সর্বজন বিদিত যে, রাজকীয় রাখালদের উৎপীড়নে সাধক কুলের শিরমণি হযরত খাজা সাহেব ঐতিহাসিক আনা সাগর তীরবর্তী ঝর্ণার নিকট আস্তানা স্থাপন করেন, তিনি সেখান থেকে ইসলাম প্রচার করে চলছেন। ইতিহাসবেত্তাদের মতে, ঐতিহাসিক আনা সাগরের দুই তীরে বহু সংখ্যক মন্দির বিদ্যমান ছিল। এখানে এসে তিনশত পূজারী পূজা করত। দেশর নামি দামি ব্যক্তিবর্গ ও রাজ পরিষদের লোকজন মাঝে মাঝে এসে এই সকল মন্দিরে পূজা করত। ইতিহাস বেত্তাদের মুখে একথাও শুনা যায় মন্দিরে প্রতিদিন তিন মন তেল খরচা হতাে। বহুদিন ধরে পূজা সাধনের কাজ নির্বিঘ্নে চলে আসছিল। একদিন সন্ধ্যার সময় পূজারীরা মধুমাখা আজানের ধ্বনি শুনতে পেয়ে জজ ফকীরের স্পর্ধা দেখে অবাক হয়ে গেল।

পূজারীগণ রাজ সিংহাসনে গিয়ে অভিযােগ করল। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় অভিযোগ শুনে রাজা ক্রোধান্ধ হয়ে সেই মুহূর্তে একদল সিপাহী প্রেরণ করলেন। সত্যি কথা বলতে হয় রাজার আদেশ পেয়ে সিপাহীরা রুহানী জগতের খাটি প্রজ্ঞাদাতা হযরত খাজা মঈনুদ্দীন চিশতী রহমাতুল্লাহ সাবের উপর খেপে গেল। আক্রোশ করে খ্যান্ত হলেন না, বরং খাজা সাহেবকে তাড়াইয়া দিতে উদ্যত হল। রাজকীয় সৈন্য বাহিনীয়রা সূফী কুলের শিরমণি হযরত খাজা সাহেবের নিকটবর্তী হয়ে নানা প্রকার গালাগালি বর্ষণ করতে লাগল। এদিকে সত্যের সৈনিক হযরত খাজা সাহেব আল্লাহর ধ্যানে মগ্ন ছিলেন। রাজকীয় সৈন্যবাহিনীরা যে তাকে বিভিন্ন ভাষায় গালিগালাজ দিতেছে সেদিকে মােটই তার খেয়াল ছিল না। যাই হােক খাজা সাহেব ধ্যান শেষে তাদেরকে নরমভাবে জিজ্ঞেস করলেন তােমরা কি চাও? সত্যি, তোমাদের আমি বলি তােমরা সামনে আর এক কদমও এসাে না, তাহলে তােমাদের উপর আল্লাহর গজব বর্ষিত হবে।

খাজা বাবার জীবনী ও ইতিহাস পাঠে জানা যায়, রাজকীয় বাহিনী খাজা সাহেবের এই আদেশ অমান্য করে সামনে অগ্রসর হতে লাগল। অগত্য খাজা সাহেব তাদের দিকে এক মুষ্ঠি ধূলি নিক্ষেপ করলেন। সত্যি, ধূলি নিক্ষেপ করা মাত্রই রাজকীয় বাহিনীর সৈন্যদল পাগল হয়ে চিৎকার করতে করতে পালায়ে বাঁচল। ইতিহাস বেত্তাদের কাছে একথা সুস্পষ্ট যে সৈন্য দলের কেউ অন্ধ, কেউ বধির, কেউ খঞ্জ আর কেউ মাতাল হয়ে গেলেন। অল্প সময়ের মধ্যেই রাজার নিকট এই অলৌকিক কাজের কথা পৌছাল। প্রিয় পাঠক-পাঠিকাগণ এখান থেকেই অনুধাবন করতে পারেন যে, সত্যের সেনানী সূফী সাধক হযরত খাজা মঈনুদ্দীন চিশতী কত উচ্চ পর্যায়ের আল্লার ওলী ছিলেন।

রামদেব ও অজয় পালের ইসলাম গ্রহণঃ

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় পৃথ্বিরাজ ভাবছিলেন যে আলেমকূলের শিরমণি হযরত খাজা সাহেব একজন অসামান্য যাদুকর, এই চিন্তা ভাবনা করার পর শেষ পর্যন্ত তৎকালীন নামকরা যাদুকর রামদেব ও অজয় পালকে তলব করলেন। আর আদেশ পেয়ে তারা তড়িৎগতিতে খাজা সাহেবের নিকট হাজির হল। ঐ সময়, সাধক হযরত খাজা মঈনুদ্দীন চিশতী রহমাতুল্লাহ ধ্যানে মগ্ন ছিলেন। তাদের আগমনে ধ্যান ভঙ্গ করে তাদের প্রতি জ্যোতির্ময় দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন। একথা সর্বদা মনে রাখতে হবে হেদায়েত করার মালিক একমাত্র আল্লাহই, সত্যিই মুহূর্তের মধ্যে রামদেব ও অজয় পালের হৃদয়ে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সূচনা দেখা দিল। মহান করুণার আঁধার আল্লাহ জাল্লা শানুহুর কুদরত কে বুঝতে পারে? তাৎক্ষণিকভাবে তারা রুহানী জগতের খাটি প্রজ্ঞাদাতা হযরত খাজা সাহেবের পদপ্রন্তে লুটিয়ে পড়ল এবং ইসলামের ছায়া তলে আশ্রয় নিল ।

প্রিয় পাঠক পাঠিকাগণ একটু ভেবে দেখুন আল্লার অলীকে তাড়াতে এসে তারা নিজেরাই ইসলাম ধর্মে দীক্ষা গ্রহণ করলেন। আলেমকূলের শিমণি হযরত খাজা মঈনুদ্দীন চিশতী রামদেবের ইসলাম গ্রহণ করার পর তার নাম রাখলেন ‘মুহাম্মদ সাদী, অভিধান সূত্রে জানা যায়, সাদী অর্থ ভাগ্যবান। পরবর্তীতে রামদেব কামেল ওলী হিসেবে সুনাম সুখ্যাতি অর্জন করেছিলেন। অজয় পাল ইসলাম গ্রহণ করার পর খাজা সাহেব তার নাম রাখেন আবদুল্লা বিয়ানী।

পৃথিরাজের উপর খাজা সাহেবের অভিশাপ ইহিহাস বেত্তারা বলেন, প্রথম তরাইনের যুদ্বে মুহাম্মদ ঘুরী পরাজিত হয়ে পুনরায় দ্বিতীয়বার যুদ্ধে অবতীর্ণ হলেন। অতীব সত্য কথা যে, এই যুদ্ধে পৃথ্বিরাজ বিপুল সৈন্যবাহিনী নিয়ে পরাজিত ও নিহত হলেন। ইতিহাসবিদগণ ও ইসলামী জ্ঞানতাপসগণ বলেন, দ্বিতীয় তরাইনের যুদ্ধের পশ্চাতে সূফী কুলেল শিরমণি হযরত খাজা সাহেব-এর অভিশাপ খুবই কার্যকরী হয়েছিল। প্রথমতঃ সাধককুলের শিরমণি হযরত খাজা মঈনুদ্দীন চিশতী রহমাতুল্লাহ সাহেব পৃথ্বিরাজকে ইসলাম গ্রহণ করবার জন্য এক চিঠিতে দাওয়াত দিয়েছিলেন। খাজা সাহেব তার মূল্যবান চিঠির মধ্যে উল্লেখ করেন যে, পৃথ্বিরাজ একথা সর্বজন বিদিত যে, মূর্তি অচেতন পদার্থ তার কোন শক্তি নেই। সে মানব জাতির কোন প্রকার উপকার করতে পারে না। মহান আল্লাহ জাল্লা শানুহ এক, অদ্বিতীয় তার কোন শরীক নেই। অতএব, তুমি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে সােনালী ইতিহাসের নির্মল আদর্শ অনুযায়ী জীবন গঠন কর। তোমার উপর আল্লাহর রহমতের করুণা বর্ষিত হবে।

খাজা সাহেবের চিঠি পেয়ে পৃথ্বিরাজ ক্রোধে উন্মাদ হয়েছিলেন। দ্বিতীয়তঃ পৃথ্বিরাজ খাজা সাহেবের এক ভক্ত মুরীদ কর্মচারীকে অন্যায়ভাবে চাকুরী হতে বরখাস্ত করায় খাজা সাহেব একথা শুনে এক টুকরাে কাগজে লিখে পাঠান “আমি তোমাকে জীবিত অবস্থায় মুসলিম সৈন্যদের হাতে সােপর্দ করলাম। প্রিয় পাঠকপাঠিকাগণ রুহানী জগতের খাটি প্রজ্ঞাদাতা খাজা সাহেবের এই অভিশাপ সত্যে পরিণত হয়েছে, তা একটু খেয়াল দিয়ে শুনুন এবং চিন্তা করে দেখুন খাজা সাহেব কতদূর আল্লাহ ওয়ালা ছিলেন।

চিশতীয়া তরীকা ?

একথা সর্বজন বিদিত যে ইলমে মারেফাতের অনেকগুলি তরীকার মধ্যে চারটি তরীকাই আসল, যথাঃ-চিশতীয়, কাদিরীয়া, নকশবন্দীয়া মুজাদ্দেদীয়া। ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে জানা যায় চিশতী হিন্দুস্থানের একটি গ্রামের নাম । সাধক ‘কুলের শিরমণি সত্যের সৈনিক হযরত খাজা মঈনুদ্দীন চিশতী রহমাতুল্লাহ ও তরীকার অধিকাংশ তাপসগণ এই গ্রামে অবস্থান করতেন বলে তার নামানুসারে তাদের প্রবর্তিত তৈরিকার নাম চিশতীয়া তরীকা হয়েছে। ইতিহাস, বেত্তারা বলেন, চিশতিয়া তরিকা যদিও খাজা সাহেবের আগেই প্রচলিত ছিল। কিন্তু এই তরীকার পূর্ণাঙ্গ বিকাশ লাভ করে তারই সময় হতে। এই তরিকার অজিফা ও আমল অত্যন্ত সহজ ও সরল হওয়ার কারণে সাধারণ মানুষ অতি সহজে এই তরীকার চর্চা ও অনুসরণ করতে সক্ষম হয়।

মঈনুদ্দীন চিশতী

খাজা বাবার জীবনী

খাজা বাবার কতিপয় বিশেষ উপদেশাবলীঃ

বিভিন্ন সময়ে সূফী সাধক হযরত খাজা মঈনুদ্দীন চিশতী রহমাতুল্লাহ নিজ শিষ্যবর্গকে যে সব মূল্যবান নসীহত প্রদান করেছেন তার তুলনা হয় না। নিম্নে তার কতিপয় নসীহত দেওয়া হলঃ

১। এলেম গভীর সাগর সাদৃশ্য, মারেফত উহার তরঙ্গ।

২। দান করলেই খােদায়ী নেয়ামত লাভ করা সম্ভব।

৩। আরেফের(কামেল লোকের) নিদর্শন এই যে, তিনি মৃত্যুকে বন্ধু মনে করেন এবং প্রতিটি শ্বাস-প্রশ্বাসে তিনি খােদাকে স্মরণ করেন।’

৪। মুহাব্বতের নিদর্শন এই যে, বান্দা আল্লাহ তায়ালার ইবাদত করবে এবং সাথে সাথে তার এ ভয়ও থাকবে যেন তার নৈকট্য হতে সে বঞ্চিত না হয়।

৫। পিতামাতার দিকে ভক্তিপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকানও এবাদত।

৬। হতভাগা সেই লােক, যে নিজেকে গুণাহর কাজে লিপ্ত করে।

৭। পরিশ্রম ব্যতীত কোন কিছুই লাভ করা সম্ভব নয়।

৮। চার শ্রেণীর লােক খুবই ভালঃ ১মঃ যে দরবেশ সর্বদা নিজেকে ধনী মনে করে। অর্থাৎ সম্বলহীন হওয়া সত্ত্বেও যে নিজের দারিদ্র কখনও প্রকাশ করে না। ২য়ঃ যে ক্ষুধার্ত নিজেকে তৃপ্ত ভাবে, ৩য়ঃ যে চিন্তাক্লিষ্ট বিপন্ন সর্বদা হাসিমুখে থাকে, ৪র্থঃ যে লােক শত্রুর সহিত বন্ধু সুলভ আচরণ করে।

৯। সর্ব প্রথম যে বিষয়টি মানুষের উপর ফরয করা হয়েছে, তা হল আল্লাহর মারেফত।

১০। তাওবার শুরু কয়েকটি-জাহেলের সংসর্গ পরিত্যাগ করা, ভ্রান্তিদের থেকে দূরে থাকা, অবিশ্বাসীদের সান্নিধ্য পরিহার করা, খােদার প্রিয় বান্দাদের সােহবত অবলম্বন করা ও নেক কাজে মনােনিবেশ করা ।

১১। নেক করার চাইতে নেককারের সােহবত যত উত্তম, পাপ করার চাইতে পাপীর সােহবত তত খারাপ।

১২। কোরআন শরীফ, কাবাগৃহ, পিতামাতা, আলেম ও ওস্তাদের প্রতি দৃষ্টিপাত করা এবাদতের শামিল।

১৩। আরেফ(কামেল লোক) যখন নীরব থাকেন,তখন তুমি মনে করবে তিনি প্রভুর সাথে কথা বলতেছেন।

১৫। ঐ ব্যক্তি প্রকৃত দরবেশ যার কাছে এসে কোন লােক খালি হাতে ফেরত যায়না।

১৬। ভালবাসার প্রকৃত দাবীদার ঐ সকল লােক, যারা সর্বদা বন্ধুর কথা শুনতে ভালোবাসে।

১৭। সত্যিকার বন্ধু ঐ ব্যক্তি, যে বন্ধুর দেওয়া বিপদকে হৃষ্টচিত্তে গ্রহণ করে।

১৮। একজন মুসলিম ভাইকে বেইজ্জতি বা অপদস্থ করলে যত ক্ষতি হয় সারাজীবন গুনার কাজে লিপ্ত থাকলেও তত ক্ষতি হয় না। |

১৯। যে সকল কথা বা কাজ আল্লাহ পাক অপছন্দ করেন, বান্দাও যদি সেই সকল কাজ ও কথা ঘৃণা করতে শিখে, তবেই তার দােস্তী সে অনায়াসে লাভ করতে পারে।

২০। ক্ষুধার্তকে অন্নদান, অভাগ্রস্তের অভাবপূরণ ও শত্রুর সাথে সদাচরণ, চরিত্রের বিশেষ গুণ।

২১। ঐ ব্যক্তিই প্রকৃত প্রেমিক যার ইহলােক ও পরলােকের সকল আশা ত্যাগ করে একমাত্র মহান মাহবুব আল্লাহ তায়ালার দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রয়েছে।

২২। কোন লােক ততক্ষণ আরেফ(কামেল) হতে পারে না, যতক্ষণ না সে নিজ অস্তিত্ব একেবারে ভুলে না যায়।

২৩। প্রেমের পথে যে অটল থাকে, প্রেমাগ্নি তার অস্তিত্বকে বিলোপ করে দেয়।

খাজা বাবার জীবনী পরবর্তী ধাপঃ

ইন্তেকাল ও দাফনঃ

একথা সর্বজন বিদিত যে মানুষ মরণশীল। জন্মিলে মরতে হয়। এ নীতির উপর ভিত্তি করে বিশ্ব নিয়ন্তা আল্লাহ রাব্দুল আলামীনের প্রিয় হাবীব নিখিল বিশ্বের ত্রাণকর্তা সুপারিশের কান্ডারী হযরত মুহাম্মদ (সঃ) এর মত নবীও মৃত্যুর শীতল স্পর্শ হতে পরিত্রাণ পাননি। অতপর রুহানী জগতের খাটি প্রজ্ঞাপাতা হযরত খাজা মঈনুদ্দীন চিশতী রহমাতুল্লাহ ও একদিন চীর বিদায়ের ইঙ্গিত প্রাপ্ত হলেন তার মহা প্রস্থানের সময় ঘনাইয়া আসল। ইতিহাস পাঠে জানা যায়, তার মৃত্যু সম্বন্ধে কথিত আছে যে আলেমকুলের শিরমণি হযরত খাজা মঈনুদ্দীন চিশতী যে রাত্রে ইহধাম ত্যাগ করেছিলেন, সেই রাত্রিতে বিশ্বনিয়ন্তা আল্লাহ রাব্দুল আলামীনের অসংখ্যক অলীআল্লাহ থাকে দেখতে পান যে সাইয়্যেদুল মুরসালিন হযরত মুহাম্মদ (সঃ) বলতেছেন মঈনুদ্দীন আল্লাহ পাকের বন্ধু । আমরা তাকে অভ্যর্থনা জ্ঞাপন করবার জন্য আগমন করছি ।

ইতিহাস বেত্তরা বলেন, হিজরী ৬২৭ সালের ৬ই রজব তারিখে ইশার নামাজ আদায় করবার পর সুফী সাধক হযরত খাজা মঈনুদ্দীন চিশতী (রাহঃ) নিজ কক্ষে ঢুকলেন এবং ভিতর হতে উক্ত কামরা বন্ধ করে দিলেন, ক্রমে ফজরের সময় হল। অতীব দুঃখের বিষয় হল প্রতিদিনের মত আর হুজুরার দরজা খুলল না। খাদেমগণ অত্যন্ত চিন্তিত হয়ে পড়লেন। পরিশেষে দরজা ভেঙ্গে দেখা গেল যে সূফী সাধক রুহানী জগতের খাটি প্রজ্ঞাদাতা হযরত খাজা মঈনুদ্দীন চিশতী সাহেবের প্রাণ বায়ু শেষ হয়ে গেছে। ইন্নালিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। খাজা সাহেবের ইহধাম ত্যাগের সংবাদ শুনে জনসাধারণ অত্যন্ত মর্মাহত হয়। দেশ বিদেশ হতে মানুষের ঢল নেমে আসল। তার জানাযার নামাজে অসংখ্য লােক শরীক হন। তার সুযােগ্য পুত্র খাজা ফখরুদ্দীন রহমতুল্লাহ জানাযার নামাজ পড়ান। তিনি যে হুজরায় মৃত্যু বরণ করেন সেই দুজরাতেই তাকে দাফন করা হয়।

হযরত শাহজালালের জীবনী পড়তে এখানে ক্লিক করুন।

খাজা বাবার জীবনী।